Showing posts with label মার্কসীয় সমাজতত্ত্ব. Show all posts
Showing posts with label মার্কসীয় সমাজতত্ত্ব. Show all posts

লিঙ্গভিত্তিক অসমতা কি? সামাজিক অসমতা ও সামাজিক স্তরবিন্যাসের মধ্যে কী পার্থক্য বিদ্যমান?

লিঙ্গভিত্তিক অসমতা সংজ্ঞা এবং সামাজিক অসমতা ও সামাজিক স্তরবিন্যাসের মধ্যে পার্থক্য 

ভূমিকা:- পৃথিবীতে এমন কোনো সমাজ নেই যেখানে নারী পুরুষের মধ্যে পার্থক্য নেই। পৃথিবীর সব সমাজেই নারী পুরুষের মাঝে পার্থক্য বিদ্যমান। এই পার্থক্য কিংবা বৈষম্যমূলক আচরণের কারণ এবং যৌক্তিকতা কতটুকু সেটা বিশ্লেষণের বিষয়। নারী-পুরুষের প্রতি সমাজের বৈষম্যমূলক আচরণ কি উদ্দেশ্য প্রণোদিত? স্বাভাবিকভাবে নারী পুরুষের মাঝে বিদ্যমান কিছু মৌলিক পার্থক্যের কারণে অনিচ্ছাকৃতভাবে সমাজে বৈষম্যমূলক আচরণ সৃষ্টি হয়েছে

লিঙ্গভিত্তিক অসমতা কি? সামাজিক অসমতা ও সামাজিক স্তরবিন্যাসের মধ্যে কী পার্থক্য বিদ্যমান?


বিভিন্ন সমাজ স্থানীয় আর্থসামাজিক ও পরিবেশগত অবস্থার ভিত্তিতে নারী পুরুষকে বিভিন্নভাবে মূল্যায়িত করে এসেছে। অর্থাৎ সর্বক্ষেত্রেই নারী পুরুষের মাঝে বৈষম্য বিদ্যমান। সাধারণ এ বৈষম্য বা লিঙ্গভিত্তিক এ অসমতাকেই লিঙ্গভিত্তিক অসমতা বলে।

লিঙ্গভিত্তিক অসমতা:

লিঙ্গভিত্তিক অসমতা বলতে নারী পুরুষের মাঝে বিদ্যমান বৈষম্যকে বুঝানো হয়। অর্থাৎ বিদ্যমান সমাজব্যবস্থায় নারী পুরুষের মাঝে যে বৈষম্যমূলক আচরণ প্রকাশ পায় তাকে লিঙ্গভিত্তিক অসমতা বলে। আর লিঙ্গভিত্তিক অসমতায় নারী-পুরুষের মাঝে এ বৈষম্যমূলক আচরণের ব্যাপারে জীববিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞানে আমরা সুদৃঢ় প্রমাণ পেয়ে থাকি। বস্তুত, সহজ কথায় অতীত ইতিহাস এবং বর্তমান প্রচলিত সমাজব্যবস্থায় আমাদের চোখে সহজেই এ বিষয়টি অনুমিত হয়। মোটকথা নারী পুরুষের মাঝে বিদ্যমান বৈষম্যকেই লিঙ্গভিত্তিক অসমতা বলে। অনেক সময় ধর্মীয় কারণেও নারী-পুরুষের মধ্যে বৈষম্য বেড়ে যায়। ধর্মের দোহাই দিয়ে অনেকে নারীদেরকে ঘরে বন্দি রাখতে চায়। ফলে নারীরা নানা বৈষম্যের শিকার হন। বিশেষ করে আরব দেশগুলোতে এ ধরনের বৈষম্য লক্ষ করা যায়। সমাজবিজ্ঞানী কলিন্স বলেছেন, "লিঙ্গভিত্তিক অসমতা দুটি বিষয়ের উপর প্রতিষ্ঠিত। যথা:-

১. মানুষের মধ্যে যৌন তৃপ্তির তাড়না বেশ প্রবল। যদিও অন্যান্য প্রাণীর মধ্যে যৌন তাড়না রয়েছে, তথাপি তা সীমিত সময়ের জন্য। সব জীবের মধ্যে মানুষ যৌন আচরণের দিকে থেকে অনন্য ও অনুপম।

২. গড়পরতা হিসেবে নারীর তুলনায় পুরুষেরা দৈহিক আকার আকৃতিতে বড় এবং তারাই অধিক শক্তিশালী। নারী গর্ভধারণ করে এবং সন্তানের যত্ন নেয় বিধায় তারা দৈহিক দিক থেকে বেশ অরক্ষিত (Vulnerable) অবস্থায় থাকে।"এবং এ থেকে দেখা যায় যে, সকল সমাজে পুরুষেরা নারীর এ অরক্ষিত (Vulnerable) অবস্থার সুযোগ গ্রহণ করে। অর্থাৎ পুরুষেরা নারীর উপর্যুক্ত দুর্বলতার সুযোগ নেয়; নারীর উপর প্রভুত্ব করে এবং প্রভুত্ব বা খবরদারি করার মতো আদর্শ বা মূল্যবোধ তৈরি করে। বস্তুত মানবসমাজের এ ধারণা থেকে লিঙ্গভিত্তিক অসমতা সৃষ্টি হয়েছে। পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় দেখা যায় তারাই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন। পরিবারের সদস্যরা পুরুষদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হন।

উপর্যুক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে একথা বলতে পারি যে, নারী-পুরুষের মাঝে চলমান বৈষম্যই হলো লিঙ্গভিত্তিক অসমতা। এদেশে সাধারণত পুরুষশাসিত সমাজ প্রচলিত। আমাদের সমাজে অর্থনৈতিক যোগ্যতা, দক্ষতা, শারীরিক ক্ষমতা প্রভৃতি দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে নারীকে পুরুষের তুলনায় অক্ষম বা তুচ্ছ মনে করা হয়। তবে বর্তমানে নারীরা সর্বক্ষেত্রে তাদের অবদান রাখার ক্ষেত্রে বদ্ধপরিকর।

 

সামাজিক অসমতা ও সামাজিক স্তরবিন্যাসের মধ্যে পার্থক্যসমূহ

আধুনিক সমাজবিজ্ঞানীগণ সামাজিক স্তরবিন্যাসকে সামাজিক অসমতার একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এ কারণেই তারা সামাজিক অসমতার বিভিন্ন দিক আলোচনা করার পাশাপাশি সামাজিক স্তরবিন্যাস সম্পর্কেও আলোচনা করেছেন। কারণ সামাজিক স্তরবিন্যাস হচ্ছে সামাজিক অসমতার একটি কাঠামোবদ্ধ ব্যবস্থা। অন্যকথায় স্তন রবিন্যাস হচ্ছে অসমতার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। তাই বলা যায় সামাজিক স্তরবিন্যাসের সাথেই সামাজিক অসমতার অবস্থান।

সামাজিক অসমতা ও স্তরবিন্যাসের পার্থক্য:-

নীচে সামাজিক অসমতা ও স্তরবিন্যাসের মধ্যে পার্থক্যগুলো আলোচনা করা হলো।

১. সংজ্ঞাগত পার্থক্য:

আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক ও অন্যান্য দুর্লভ উপাদানের অসম বণ্টনের কারণে সৃষ্ট অসমতাই হলো সামাজিক অসমতা।

Fairchild-এর মতে, "পারিবারিক ঐতিহ্য, সামাজিক রীতিনীতি, আচার-অনুষ্ঠান, সম্পদ, আয়, শিক্ষা, রাজনৈতিক ক্ষমতা ইত্যাদির উপর ভিত্তি করে একটি সাদৃশ্যপূর্ণ সমাজে সামাজিক মর্যাদার ক্ষেত্রে সৃষ্ট পার্থক্য হলো সামাজিক অসমতা।"

অন্যদিকে, সামাজিক স্তরবিন্যাস হলো এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে বিভিন্ন আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধার ভিত্তিতে সমাজে বিদ্যমান জনসংখ্যা বিভিন্ন স্তরে বিভক্ত।

Dressler-এর মতে, "সামাজিক স্তরবিন্যাস হলো এমন একটি ব্যবস্থা যার মাধ্যমে ব্যক্তিদেরকে বিভিন্ন স্তর, মান, মর্যাদা ও সম্মানে বিভক্ত করা হয়।"

২. নিয়ম ও কাঠামোগত পার্থক্য:

সামাজিক অসমতা নিয়ম ও কাঠামো নির্ভর নয়। এটি কাঙ্ক্ষিত বিষয়বস্তুকে ব্যক্তির *বা গোষ্ঠীর অসম অধিকারকে বুঝায়। বুঝায় কাঙ্ক্ষিত বিষয় বস্তুর সামাজিক স্তরবিন্যাস অটল ও স্থির রূপ পরিগ্রহ করে। এজন্য স্ত রবিন্যাস ও অসমতার মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করতে গিয়ে Kriesberg (ক্রিসবার্গ) বলেন, সামাজিক স্তরবিন্যাস হলো অসমতার এমন একটি অটল এবং স্থির ব্যবস্থা যা নিয়ম ও কাঠামো নির্ভরে গড়ে উঠে।" (Social stratification refers to the persistent pattern of a system of inequality based on rules and structures.)

৩. ক্ষেত্রগত পার্থক্য:

সমাজবিজ্ঞানী Smalsar তাঁর The Components in Inequality Webers Statement' শিরোনামে Wealth, Prestige এবং Power সম্পর্কে আলোচনা করে দেখিয়েছেন কীভাবে ঐসব উপাদান সামাজিক অসমতাকে প্রভাবিত করে। অন্যদিকে Runciman তাঁর 'The three Dimensions of Social Inequality' শিরোনামে এক প্রবন্ধে Class, Status এবং Power সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিয়েছেন এবং ঐগুলো যে অসমতার দিক বা ক্ষেত্র তা নির্দেশ দিয়েছেন।

৪. ধরনগত:

অবশ্য বলার অপেক্ষা রাখে না যে সামাজিক অসমতা একটি ব্যাপক বিষয়। অন্যদিকে অসমতারই একটি বিশেষ ক্ষেত্র ও প্রত্যয় হচ্ছে সামাজিক স্তরবিন্যাস।

৫. প্রাতিষ্ঠানিক দিক:

বস্তুত অসমতার প্রাতিষ্ঠানিক দিকটিকেই সামাজিক স্তরবিন্যাস বলা হয়। তার স্তরবিন্যাসের প্রাতিষ্ঠানিক দিক রয়েছে। অন্যদিকে, অসমতার তা নেই; বরং প্রাতিষ্ঠানিক অসমতা বিশ্লেষণে স্তরবিন্যাস পদটিকেই ব্যবহার করা হয়। এ সম্পর্কে Kriesberg বলেছেন, "We use the term (stratification) to discuss institutionalized inequality."

উপসংহার: উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে বলা যায় যে, সামাজিক অসমতা ও সামাজিক স্তরবিন্যাস একটি অপরটির অবিচ্ছেদ্য অংশ। সামাজিক অসমতা ব্যতীত সামাজিক স্তরবিন্যাস পরিলক্ষিত হয় না। সামাজিক অসমতা ও স্তরবিন্যাস প্রত্যয় দুটি সম্পৃক্ত ও সমগোত্রীয়। সামাজিক অসমতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক উপাদানকে প্রাধান্য দেওয়া হয় যেখানে অসমতার মাত্রাগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। স্তরবিন্যাসের ক্ষেত্রে অসমতার উপাদানগুলো গুরুত্বপূর্ণ হলেও স্থায়িত্ব ও সামাজিক স্বীকৃতি, কাঠামোবদ্ধতা, প্রাতিষ্ঠানিক গুরুত্ব বেশি মাত্রায় প্রণিধানযোগ্য। পরিশেষে বলা যায় প্রত্যয় দুটি সমগোত্রীয়। এদের মধ্যে মাত্রাগত পার্থক্য থাকলেও মৌলিক পার্থক্য খুবই কম।

Class for itself এবং Class in itself কী? কিভাবে একজন শ্রমিক তার উৎপাদিত পণ্য সমাজ ও নিজ সত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়

মার্কস এর Class for itself এবং Class in itself বলতে কী বুঝ? কিভাবে একজন শ্রমিক তার উৎপাদিত পণ্য সমাজ ও নিজ সত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয় আলোচনা কর

ভূমিকা:- কার্ল মার্কস সমাজকে পরিপূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য কতকগুলো প্রত্যয় ব্যবহার করেছেন। এগুলোর মধ্যে আত্মসচেতন শ্রেণি এবং অনাত্মসচেতন শ্রেণি প্রত্যয় দুটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই দুটি প্রত্যয় মার্কসের শ্রেণিসংগ্রাম তত্ত্বের একটি বিরাট অংশ দখল করে আছে। মূলত কাল মার্কস সর্বহারাদের বৈশিষ্ট্য বিবৃত করার জন্যই এ প্রত্যয় দুটির ব্যবহার করেছেন।

শ্রেণী সচেতনতা কি? কিভাবে একজন শ্রমিক তার উৎপাদিত পণ্য সমাজ ও নিজ সত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়

 

আত্মসচেতন (Class for itself) ও অনাত্মসচেতন শ্রেণি (Class in itself):

আত্মসচেতন ও অনাত্মসচেতন আলোচনার ক্ষেত্রে মার্কস এ দুটি প্রত্যয় এর মধ্যে পার্থক্য দাঁড় করিয়েছেন এভাবে তাদের অধিকারও দৃঢ়ভাবে আদায় করার পরিকল্পনা হয়। বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে নিজেদেরকে সংগঠিত করে তোলে। এভাবে সর্বহারা একটি আত্মসচেতন শ্রেণিতে পরিণত হয়। কোনো সমাজের জনগণ নিজেদের অবস্থা এবং পরিণতি সম্পর্কে সচেতন হতে এবং তার আলোকে সুসংঘবদ্ধ হতে না পারলে শ্রেণিতে পরিণত হতে পারে না। বিষয়টি কোনো না কোনোভাবে মূল্যায়িত হবে একদিন। তারা অভিন্ন আর্থিক অবস্থার অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিবর্গের সমাহার। একই গুণ সম্পন্ন এই শ্রেণি হলো অনাত্মসচেতন শ্রেণি। পরবর্তীতে সময়ের স্রোতে সর্বহারা শ্রেণি তাদের স্বার্থ রক্ষায় ও রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য নিজেদেরকে বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে সংগঠিত করে। এভাবে সর্বহারা আত্মসচেতন মানুষ proletaria. মজুরি থেকে শুরু করে কর্মঘণ্টা এমন কি উৎসব ভাতা নিয়ে আলোচনা করেছেন। কার্ল মার্কস-এর সর্বহারা শ্রেণি প্রথমে আত্মসচেতন ছিলো না।

পরিশেষে বলা যায় যে, সর্বহারা শ্রেণি প্রথমে অনাত্মসচেতন ছিল। তারা স্বার্থের ব্যাপারে একমত হতে পারেননি। পরবর্তী সময়ে তারা নিজেদের স্বার্থ সচেতন হয়ে ওঠে। এভাবে তারা 'Class for itself' গড়ে তোলে।


কীভাবে একজন শ্রমিক তার উৎপাদিত পণ্য সমাজ ও নিজ সত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন

মার্কস পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় শ্রমিকদের মধ্যেই বিচ্ছিন্নতাবোধ প্রত্যক্ষ করেন। তার বিচ্ছিন্নতার ধারণা অক্ষমতার ধারণার সাথে সম্পৃক্ত। তিনি পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় শ্রমিকদের মনে করেন যে, এ সমাজব্যবস্থায় শ্রমিক তার জৈবিক ক্রিয়া ব্যতীত আর কোনোভাবেই নিজেকে স্বাধীন মনে করে না। তিনি বিচ্ছিন্নতাবোধ প্রত্যয়টিকে সামাজিক বিষয় হিসেবে দেখেন। তিনি মনে করেন পুঁজিবাদী সমাজের বৈষম্য ও শোষণের ফলশ্রুতি হিসেবে বিচ্ছিন্নতাবোধ দেখা যায়। পুঁজিবাদের বিকাশের সাথে সাথে বিচ্ছিন্নতাবোধের ব্যাপ্তিও বেড়ে যায় এবং একজন শ্রমিক তার উৎপাদিত পণ্য সমাজ ও নিজ সত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

শ্রমিকের বিচ্ছিন্নতার ব্যাখ্যা কার্ল মার্কস

বিচ্ছিন্নতাবোধের সাথে আবশ্যিকভাবে শ্রমিক শ্রেণির সম্পর্ক বিদ্যমান। তাই তার এই তত্ত্বকে Theory of Alienated labour বলা হয়। মার্কস দেখিয়েছেন একজন শ্রমিক কোন কোন ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্নতাবোধ করে থাকে। তিনি উলেখ করেন একজন শ্রমিক তিনভাবে বিচ্ছিন্নতাবোধের শিকার হয়। এগুলো হলো-

১. উৎপাদিত পণ্য হতে

২. উৎপাদন কর্মকাণ্ড থেকে (নিজ সত্তা)

৩. অন্যান্য মানুষের থেকে (সমাজ)

নিচে এগুলো বিস্তারিত বর্ণনা করা হলো:

১. উৎপাদিত পণ্য হতে:

শ্রমিক মজুরির বিনিময়ে উৎপাদন করে। আর পুঁজিপতি শ্রমিকের উৎপাদন থেকেই মুনাফা করে সম্পদের পাহাড় গড়ে। তাই শ্রমিক যত বেশি উৎপাদন করে বেশি পুঁজি বাড়তে থাকে। আর সাথে সাথে শ্রমিক নিজে পুঁজির শক্তির কাছে অক্ষম হয়ে পড়ে। পুঁজিপতি যত ধনী হবে শ্রমিক ততই গরিব হতে থাকবে। এ প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা যায় যে, শ্রমিক যা উৎপাদন করে তা তার কাছে একটি অপরিচিত বস্তু হিসেবে দেখা দেয়। এই শ্রম ফসল তার কাছে একটি ভিন্ন সত্তা অর্থাৎ অপরিচিত বস্তু। এই পণ্য একটি সার্বভৌম শক্তি। এর সাথে যেন শ্রমিকের কোনো যোগ নেই। সে তার উৎপাদিত বস্তু হতে বিচ্ছিন্ন।

২. উৎপাদন কর্মকাণ্ড থেকে (নিজ সত্তা): 

উৎপাদিত বস্তু হতে বিচ্ছিন্নতাবোধের ফলে শ্রমিক উৎপাদন কার্য থেকেও নিজেকে বিচ্ছিন্ন মনে করে। কেননা উৎপাদিত বস্তু হচ্ছে উৎপাদন কার্যেরই ফসল। শ্রমিক তখন নিজেকে তাঁর উৎপাদনের সাথে পরিচিত মনে করতে পারে না। স্বভাবতই উৎপাদনকার্যের সাথেও শ্রমিক তার একাত্মতা অনুভব করে না। কারণ-

প্রথমত, শ্রম শ্রমিকের কাছে একটা বাইরের জিনিস অর্থাৎ শ্রমের মধ্যে শ্রমিক কখনো আপন সত্তাকে অনুভব করতে পারে না। তাই তাঁর কাছে শ্রমটা বাইরের জিনিস বলেই মনে হয়।

দ্বিতীয়ত, মার্কসের মতে এ ধরনের অনুভূতির মূল কারণ হলো পুঁজিপতির জন্য শ্রমিকের বাধ্যতামূলক শ্রম। শ্রমিকরা খেয়ে পরে বেঁচে থাকার জন্য কাজ করে এবং কাজ করতে বাধ্য হয়। কেননা এছাড়া শ্রমিকের আর কোনো উপায় নেই। পুঁজিবাদী সমাজে উৎপাদনের উৎসসমূহের মালিক হলো পুঁজিপতি। আর তাই শ্রমিক সে সমাজে কেবল শ্রম বিক্রি করে প্রাণ বাঁচাতে পারে। মার্কস এজন্যই এদেরকে সর্বহারা বলেছেন।

তৃতীয়ত, শ্রমকে শ্রমিকের কাজে বাহ্যিক মনে হবার কারণ, শ্রম তার নিজস্ব কিছু নয়।

৩. অন্যান্য মানুষের থেকে (সমাজ):

এ ধরনের বিচ্ছিন্নতার সূত্রপাত হয় উৎপাদিত বস্তুর ভোগ এবং মালিকানা হতে। এই ভোগ এবং মালিকানার ফলে পুঁজিপতি শ্রমিককে নিয়ন্ত্রণ করে। এই ভোগ এবং শোষণ থেকেই এ ধরনের বিচ্ছিন্নতার সূত্রপাত ঘটে।

মার্কসীয়দের মতে এই বিচ্ছিন্ন শ্রমের সামাজিক প্রকাশ ঘটে তিনভাবে। যথা:

ক. পুঁজিশক্তির উৎপাদন এবং উৎপাদিত পণ্যের উপর রাজত্বে।

খ. সামাজিক শ্রম বিভক্তির দুইটি বিরোধীরূপে।

গ. শ্রমিকের উপর বাধ্যতামূলক এবং সামাজিকভাবে স্বীকৃত শ্রমের আধিপত্যে।

উপসংহার: উপরের আলোচনা থেকে বলা যায় যে মার্কস এর বিচ্ছিন্নতাবোধের ধারণাটি অক্ষমতার সাথে সম্পৃক্ত। তিনি মনে করেন বিশেষায়িত কাজের কারণে এবই কাজ বার বার করার ফলে শ্রমিকের দক্ষতা কমে যাবে এবং এক সময় সে কর্মস্পৃহা হারিয়ে ফেলবে। এ কারণে তিনি দেখিয়েছেন একজন শ্রমিক কোন কোন ক্ষেত্র থেকে এবং কীভাবে এ বিচ্ছিন্নতাবোধ করে।

শ্রমের লৈঙ্গিক বিভাজন কী? সামাজিক ও লৈঙ্গিক শ্রমবিভাজনের মধ্যে পার্থক্য লিখ

শ্রমের লৈঙ্গিক বিভাজন কী? সামাজিক ও লৈঙ্গিক শ্রমবিভাজনের মধ্যে পার্থক্য

ভূমিকা:- সমাজতাত্ত্বিক আলোচনায় একটি বহুল পরিচিত প্রত্যয় হলো শ্রমবিভাজন বা Division of labour. শ্রমবিভাজন বলতে সাধারণত কোনো অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় অংশগ্রহণকারীরা যাতে বিশেষায়িত হতে পারে তার জন্য কাজের পৃথকীকরণকে বুঝায়। তবে মার্কসীয়রা শ্রমবিভাজনকে একটি বিচ্ছিন্নতাবোধ প্রক্রিয়া হিসেবে দেখেন যেখানে বিশেষায়িত শ্রমিকরা বারংবার একই কাজ করার মাধ্যমে উৎপাদন প্রক্রিয়া থেকে সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। শ্রমবিভাজনের দুটি প্রেক্ষিত রয়েছে। একটি হলো শ্রমের সামাজিক বিভাজন এবং অপরটি হলো শ্রমের লৈঙ্গিক বিভাজন।

শ্রমের লৈঙ্গিক বিভাজন কী? সামাজিক ও লৈঙ্গিক শ্রমবিভাজনের মধ্যে পার্থক্য লিখ


শ্রমবিভাজন (Division of labour)

সাধারণ অর্থে কোনো অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় অংশগ্রহণকারীরা যাতে বিশেষায়িত হতে পারে তার জন্য কাজের পৃথকীকরণকে শ্রমবিভাজন বা Divison of labour বলে। কিন্তু মার্কসবাদীদের নিকট শ্রমবিভাজন হলো একটি বিচ্ছিন্নতাবোধ প্রক্রিয়া (A process of alienation) যেখানে বিশেষায়িত শ্রমিকরা বারবার একই কাজ করার মাধ্যমে উৎপাদন প্রক্রিয়া থেকে সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এই প্রক্রিয়ায় শ্রমিকরা পুরোপুরি যন্ত্ররূপে আবির্ভূত হয়।

শ্রমের লৈঙ্গিক বিভাজন (Sexual Division of labour)

মার্কসের শ্রমের লৈঙ্গিক বিভাজন তত্ত্বটি নারীবাদের একটি শাখা। যা মনে করে ব্যক্তিগত ও পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় লৈঙ্গিক শ্রমবিভাজনের ফলে নারীরা নির্যাতিত। মার্কসীয় নারীবাদী ফার্গুনসন এ সম্পর্কে বলেন, "Women liberation can only be achieved through a radical restructuring of the current capitalist economy, in which much of women is labour is uncompensated." অর্থাৎ, বর্তমান পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে মহিলাদের শ্রমটি প্রতিদানহীন বা অপরিশোধিত। তাই নারীমুক্তি অর্জিত হতে পারে একমাত্র বর্তমান পুঁজিবাদী অর্থনীতির বৈপবিক পুনর্গঠনের মাধ্যমে। শ্রমের লৈঙ্গিক বিভাজন বুঝার ক্ষেত্রে এর তাত্ত্বিক দিক এবং উৎপাদনশীলও পুনরুৎপাদনশীল শ্রম সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। এই দুটি বিষয় আলোচনার মাধ্যমে নীচে শ্রমের লৈঙ্গিক বিভাজনের আলোচনা তুলে ধরা হলো:

তাত্ত্বিক পটভূমি (Theoritical background)

কার্ল মার্কস ও Frederick Engels কর্তৃক রচিত, 'The Communist Manifesto' (1848) এবং মার্কস কর্তৃক রচিত 'A contribution to the critique of political economy' (1859)-এর লেখনী লৈঙ্গিক শ্রমবিভাজন তত্ত্বের ভিত্তিভূমি রচনা করেছেন। এখানে তারা ঐতিহাসিক বস্তুবাদ (Historical Materialism), পুঁজিবাদ, লৈঙ্গিক শ্রমবিভাজন ও নির্যাতন এ তিনটি প্রত্যয়ের মধ্যে সম্পর্কের উপর আলোকপাত করেছেন।

মার্কসের ভাষায়, "Historical materialism recognizes the ways in which economic systems structure society as a whole and influence eveyday life and experiences." অর্থাৎ ঐতিহাসিক বস্তুবাদ সেই ধরনকে উপলব্ধি করে যেখানে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সার্বিক সমাজ গঠন করে এবং প্রতিদিনের জীবন এবং অভিজ্ঞতাকে প্রভাবিত করে।

ঐতিহাসিক বস্তুবাদ সমাজের মৌল কাঠামো নির্ধারণের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত অনুঘটকগুলোর ভূমিকার উপর বিশাল গুরুত্বারোপ করেছেন। মৌল কাঠামো এমন কতকগুলো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা তৈরি করে যা শ্রমিক শ্রেণিকে শোষণের মাধ্যমে ক্ষমতাশীলদের স্বার্থকে এগিয়ে নিয়ে যায়। লেনিনের ভাষায় "These systems are set by the ruling class in accordance with their need to maintain on increasse class conflict in order to remain in power." অর্থাৎ, এই ব্যবস্থা শাসক গোষ্ঠীর ক্ষমতায় থাকা বা শ্রেণিসংগ্রামের বৃদ্ধির মাধ্যমে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য শাসকগোষ্ঠীর দ্বারা স্থাপিত ব্যবস্থা। তবে মার্কসবাদীরা মনে করে শ্রমিক শ্রেণির সেই সামর্থ্য আছে এ কাঠামোর পুনর্গঠন করে নতুন শাসক শ্রেণির ক্ষমতায়ন করার।

এ সম্পর্কে লেনিন বলেন, "The organization of social consciousness by a vanguard party is vital to the working class revolutionary process." অর্থাৎ সামাজিক সচেতনতা গড়ে উঠে Vanguard Party-এর মাধ্যমে যা শ্রমজীবী শ্রেণির বৈপবিক প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এঙ্গেলস বলেন, সামন্ততন্ত্র থেকে পরিবর্তিত হয়ে ভূমিতে ব্যক্তিগত মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সাথে সাথে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে নারী পুরুষের কর্মক্ষেত্র আলাদা হয়ে গেল এবং সামঞ্জস্যহীনভাবে মজুরি শ্রমে নারীদের বাদ দিয়ে পুরুষদের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা হলো। এঙ্গেলস আরো বলেন, জৈবিক কারণে নয় বরং সামাজিক সম্পর্কের কারণে নারীরা পুরুষের অধীনস্থ। একক পরিবারের আবির্ভাবের মাধ্যমে নারীদের শ্রমকে নিয়ন্ত্রণ করার পুরুষদের প্রচেষ্টাগুলো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করলো।

ফার্গুনসনের ভাষায়, "Gender oppression is closely related to class oppression and the relationship between men and women in society is similar to the relationship between proletariat and bourgeoisie." অর্থাৎ, "জেন্ডার নিপীড়ন সামাজিক নিপীড়নের সাথে গভীরভাবে জড়িত এবং সমাজে নারী পুরুষের মধ্যকার সম্পর্ক অনেকটা প্রলেতারিয়েত বুর্জোয়া সম্পর্কের মতো।"

পরিশেষে বলা যায় যে, শ্রমের লৈঙ্গিক বিভাজন নারীর প্রতি বৈষম্য ও নির্যাতনের অপর নাম। জৈবিক নয়, বরং সামাজিক সম্পর্কের কারণে নারীদেরকে পুরুষের অধীনস্ত করে রাখা হয় এবং তাদেরকে গৃহের অভ্যন্তরে পুনরুৎপাদনশীল কর্মে নিযুক্ত করা হয় যার কোনো আর্থিক মূল্য বা স্বীকৃতি থাকে না। নারীর শ্রমের লৈঙ্গিক বিভাজনকে মার্কসবাদীরা ও নারীবাদীরা নারী শোষণের ভিত্তি বলে মনে করেন। বস্তুত শ্রমের লৈঙ্গিক বিভাজন নারী পুরুষের কর্মক্ষেত্রকে পৃথক এবং সকল ক্ষেত্রে পুরুষের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত করেছে।


সামাজিক ও লৈঙ্গিক শ্রমবিভাজনের মধ্যে পার্থক্য

সাধারণ অর্থে কোনো অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অংশগ্রহণকারীরা যাতে বিশেষায়িত হতে পারে তার জন্য কাজের -পৃথকীকরণকে শ্রম বিভাজন বলে। মার্কসবাদীদের নিকট শ্রম বিভাজন হলো একটি বিছিন্নতাবোধ প্রক্রিয়া যেখানে বিশেষায়িত - শ্রমিকরা, বারংবার একই কাজ করার মাধ্যমে উৎপাদন প্রক্রিয়া থেকে সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন হয়ে যয়। সামাজিক ও লৈঙ্গিক শ্রম বিভাজন শ্রমবিভাজনের দুটি প্রেক্ষিত।

সামাজিক ও লৈঙ্গিক শ্রমবিভাজনের মধ্যে পার্থক্য

সাধারণত নিম্নলিখিত বিষয়াবলির দৃষ্টিকোণ থেকে সামাজিক ও লৈঙ্গিক শ্রমবিভাজনের মধ্যে পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়।

ক. সংজ্ঞাগত পার্থক্য:

শিল্প, ব্যবসালয় ও শ্রমিকের পেশার মধ্যে বিভক্ত, বিশেষায়িত পণ্য উৎপাদনের সামাজিক কাঠামোগত ভিত্তি হলো শ্রমের সামাজিক বিভাজন। শ্রমের সামাজিক বিভাজন সম্পর্কে ম্যান্ডেল (Mandel) বলেন, "Social division of labour, one of the two aspects of the division of labour is the social structural foundation of the specialized commodity production divided between industries, firms and occupations of workers or the technical division of tasks."

অপরপক্ষে, শ্রমের লৈঙ্গিক বিভাজন বা লৈঙ্গিক শ্রমবিভাজন মার্কসীয় দৃষ্টিকোণ বিবেচনায় নারীবাদের একটি শাখা, যা মনে করে, ব্যক্তিগত ও পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় লৈঙ্গিক শ্রমবিভাজনের ফলে নারীরা নির্যাতিত।


খ. তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্য:

নিচে শ্রমের সামাজিক ও লিঙ্গভিত্তিক বিভাজনের তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গির উল্লেখ করা হলো:

i. শ্রমের সামাজিক বিভাজন শ্রমের সামাজিক বিভাজন বুঝতে হলে দুইটি বিষয় সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। বিষয় দুটি হলো সম্পত্তি বনাম শ্রম এবং শ্রেণিসংগ্রাম।

সম্পত্তি বনাম শ্রম:

মার্কস সবসময় নিখুঁত একটি সমাজের স্বপ্ন দেখতেন। তিনি বলেন, এ পৃথিবীতে পূর্বে মানুষ বিচ্ছিন্নতা অনুভব করেনি। কারণ, তখন বিচ্ছিন্ন উৎপাদন ছিল না। শ্রমের সামাজিক বিভাজনের মাধ্যমে মানুষ যখন বিচ্ছিন্ন উৎপাদন। ব্যবস্থায় পতিত হলো তখনই এই সমাজে ব্যক্তিগত সম্পত্তির জন্ম হলো। সময়ের পরিক্রমায় মানুষ স্বীয় স্বার্থে অন্যের শ্রমের পণ্যকে আত্মসাৎ করতে লাগল। এভাবে একজন মানুষের স্বহস্তে তৈরি পণ্যই তাকে অন্যের দাসে পরিণত করতে লাগল। শ্রমের সামাজিক বিভাজনের মাধ্যমে গড়ে উঠা বিচ্ছিন্ন শ্রম ব্যবস্থায় মানুষের জীবনীশক্তি হরণ করতে লাগল।

শ্রেণি সংগ্রাম:

কার্ল মার্কসের শ্রমবিভাজন তত্ত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে রুশোর শ্রমবিভাজন তত্ত্বের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। উভয়ের যুক্তি হলো ব্যক্তিগত সম্পত্তির আকাঙ্ক্ষা সমাজকে শ্রমবিভাজনের দিকে ধাবিত করে, শ্রমবিভাজনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক বৈষম্য, সৃষ্টি হয়। আর অর্থনৈতিক বৈষম্যের ওপর ভিত্তি করেই পৃথক সামাজিক শ্রেণির অস্তিত্ব জন্মলাভ করে। আর বুর্জোয়া শ্রেণির স্বার্থরক্ষা বা আধিপত্য বজায় রাখার যন্ত্র হিসেবে রাষ্ট্রের জন্ম। দ্বান্দ্বিকতার মাধ্যমে, সর্বহারার বিপ্লব সংঘটিত হলে সর্বহারা বুর্জোয়া পুঁজিবাদের শেষ চিহ্নটুকু ধ্বংস করতে রাষ্ট্রকে ব্যবহার করবে। শ্রমবিভাজন উঠে যাবে এবং পুঁজিবাদের শেষ চিহ্নটুকু থাকবে না এবং রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যাবে।

ii. শ্রমের লৈঙ্গিক বিভাজন:

বর্তমান পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে মহিলাদের শ্রমটি প্রতিদানহীন বা অপরিশোধিত। তাই নারীমুক্তি অর্জিত, হতে পারে একমাত্র বর্তমান পুঁজিবাদী অর্থনীতির বৈপ্লবিক পুনর্গঠনের মাধ্যমে। পুঁজিবাদী সমাজে বিদ্যমান উৎপাদনশীল ও পুনরুৎপাদনশীল শ্রম দুটোই অপরিহার্য। পুনরুৎপাদশীল শ্রম ব্যক্তিগত পর্যায়ের সাথে সংশ্লিষ্ট এবং এমন বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে যা নিজের জন্য মানুষকে করতেই হয়। এ ধরনের কাজ মজুরি লাভের উদ্দেশ্য করা হয় না। উভয় ধরনের শ্রমই প্রয়োজনীয় কিন্তু ব্যক্তিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে এ ধরনের শ্রমে মানুষের প্রবেশাধিকার ভিন্ন ভিন্ন পুঁজিবাদী ব্যবস্থা নারীদের আবদ্ধ করে রেখেছে যেখানে শ্রম পুনরুৎপাদনশীল বিনিময়হীন ও অস্বীকৃত। অন্যদিকে, পুঁজিবাদ উৎপাদনশীল শ্রমে। পুরুষদের একচেটিয়া প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করেছে। এভাবে শ্রমের লৈঙ্গিক বিভাজন হলো সরকারি ও বেসরকারি স্বার্থে শ্রম শোষণের একটি সস্তা পদ্ধতি।

উপসংহার: উপর্যুক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে একথা বলা যায় যে, সামাজিক শ্রমবিভাজন ও লৈঙ্গিক শ্রমবিভাজন শ্রমবিভাজনের দুইটি প্রকরণ। দৃষ্টিভঙ্গীর দিক থেকে এ দুই প্রকারের শ্রমবিভাজনের মধ্যে পার্থক্য বিদ্যমান। শ্রমের সামাজিক বিভাজন মূলত বুর্জোয়া শ্রেণি তাদের স্বার্থে করে থাকে এবং এই বিভাজনের মাধ্যমে তারা অর্থনৈতিকভাবে শ্রমিকদের শোষণ করে। অন্যদিকে শ্রমের লৈঙ্গিক বিভাজন নারী পুরুষের কর্মক্ষেত্রকে পৃথক করে এবং সকল ক্ষেত্রে পুরুষের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।

উপনিবেশবাদ ও নব্য উপনিবেশবাদের পার্থক্য আলোচনা কর

উপনিবেশবাদ ও নব্য উপনিবেশবাদের বৈশাদৃশ্যগুলো আলোচনা

ভূমিকা:- ঔপনিবেশিক শাসন আন্তর্জাতিক রাজনীতির ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। শক্তিশালী দেশগুলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে বিভিন্ন উপায়ে বিশ্বের বিভিন্ন দুর্বল রাষ্ট্রগুলোকে দখল করে ঔপনিবেশিক শাসন কায়েম করে। প্রাচীন সভ্যতার কেন্দ্রভূমিগুলো যেমন- প্রাচীন মিশর, পারস্য, রোম, গ্রিস যুদ্ধের মাধ্যমে অন্য দেশে নিজেদের উপনিবেশ স্থাপন করেছে। ইউরোপের দেশগুলোই ঔপনিবেশিক, সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তবে, আরব, মোঙ্গল এবং চৈনিকরাও এক্ষেত্রে পশ্চাৎপদ ছিল না।

উপনিবেশবাদ ও নব্য উপনিবেশবাদের পার্থক্য আলোচনা কর


উপনিবেশবাদ ও নব্য উপনিবেশবাদের মধ্যে পার্থক্য

অনেকে নব্য উপনিবেশবাদ ও উপনিবেশবাদকে একই আর্থ ব্যবহার করেন। আসলে উভয়ের মধ্যে আদর্শ, উদ্দেশ্য, ধরন ও কাঠামোগত পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। নিম্নলিখিত আলোচনার মাধ্যমে তা স্পষ্ট হয়ে উঠে:

১. উদ্দেশ্যগত পার্থক্য (Motivational difference):

নব্য উপনিবেশবাদের উদ্দেশ্য হলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা। অন্যদিকে, উপনিবেশবাদের উদ্দেশ্য ছিল নিজেদের সাম্রাজ্য বিস্তার করার জন্য ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণ কায়েম করা।

২. আদর্শগত পার্থক্য (Idealization difference):

ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র থেকে অর্থনৈতিক শোষণের মাধ্যমে নিজ ছিল। বলা হয়, "Colonialism in its sest sense is a দেশের সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলা উপনিবেশবাদের আদর্শ natural overflow of nationality." অন্যপক্ষে, নব্য উপনিবেশবাদের আদর্শ হলো সরাসরি অর্থনৈতিক শোষণ নয়, সমাজবাদী ও পুঁজিবাদী রাষ্ট্রসমূহের উৎপাদিত পণ্যের ভার সৃষ্টির মাধ্যমে অর্থনৈতিক শোষণ শোষণ।

৩. সময়মত পার্থক্য (Time difference):

সময়মত পার্থক্য হলো উপনিবেশবাদ ও নব্য উপনিবেশবাদের অন্যতম প্রধান পার্থক্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্ব পর্যন্ত উপনিবেশবাদ ছিল। মূলত উপনিবেশবাদের পরিসমাপ্তি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর ঘটে। অপরদিকে, নব্য উপনিবেশবাদের যাত্রা শুরু হয় দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর থেকে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একমাত্র নব্য ঔপনিবেশিক শক্তি।

৪. স্বার্থগত পার্থক্য (Egoistic difference):

নিজেদের স্বার্থে প্রায়শই ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদীরা দ্বন্দ্বে অবতীর্ণ হতো এবং এক্ষেত্রে তারা বহির্বিশ্বের চাপকে ভয় পেত না। অপরপক্ষে, কারণ ছাড়া নব্য ঔপনিবেশিক কোনো শক্তি সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের দিক থেকে বা নিজেদের স্বার্থে যখন তখন দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়ে বিশ্বশান্তি বিনষ্ট করতে পারত না।

৫. কৌশলগত পার্থক্য (Technical Difference):

শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার জন্য অধিবাসীদেরকে পৃথিবীর সকল ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো অনুন্নত Colony-গুলোর রাখার চেষ্টা করে এবং অর্থনৈতিকভাবে দাবিয়ে রাখার চেষ্টা করে। এর মূল লক্ষ্য হলো পরনির্ভরশীলতা সৃষ্টি করা। কিন্তু নব্য উপনিবেশবাদে স্বাধীনতা প্রাপ্ত দেশগুলোর অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও স্বনির্ভরতা অর্জনের জন্য কারিগরি সাহায্য প্রদান করে থাকে।

৬. শিক্ষা ও সংস্কৃতিগত পার্থক্য (Educational and cultural difference):

সরাসরিভাবে নিজেদের শিক্ষা ও সংস্কৃতি ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রসমূহে অনুপ্রবেশ করিয়ে সাম্রাজ্যবাদকে শক্তিশালী করা উপনিবেশবাদের লক্ষ্য ছিল। অন্যদিকে, বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে যেমন- ডিস এন্টেনা, বি বি সি, সি এন এন এবং বিভিন্ন বৃত্তি প্রদানের মাধ্যমে সাবেক ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রে পুঁজিবাদী দেশসমূহের সংস্কৃতিকে বিশ্বের অন্যতম সেরা বলে পরিচিত ঘটানো নব্য উপনিবেশবাদের লক্ষ্য।

৭. শাসন ও শোষণগত পার্থক্য (Domination and exploitation difference):

নব্য উপনিবেশবাদের উদ্দেশ্য হলো নিজেদের অস্ত্রের বাজার টিকিয়ে রাখার জন্য এক রাষ্ট্রের সাথে অন্য রাষ্ট্রের সীমানাগত কৌশল ও দ্বন্দ্ব বজায় রাখা। অন্যদিকে, উপনিবেশবাদের উদ্দেশ্য ছিল ঔপনিবেশিক রাজ্যের অভ্যন্তরে যোগাযোগ সৃষ্টি করে নিজেদের শাসন ও স্বার্থকে টিকিয়ে রাখা।

৮. সামরিক কৌশলগত (Military technical):

নব্য উপনিবেশবাদে দেখা যায়, অনুন্নত রাষ্ট্রের সাহায্যে সহযোগিতার নামে উন্নত রাষ্ট্রগুলো নিজেদের সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করে। অপরপক্ষে, উপনিবেশবাদের ঔপনিবেশিক রাজ্যগুলো থেকে লোক সংগ্রহ করে তাদের সামরিক বাহিনীকে শক্তিশালী করে।

৯. রাজনৈতিক ক্ষেত্রে পার্থক্য (Difference in political sector):

রাজনৈতিক ক্ষেত্রে উপনিবেশবাদে প্রত্যক্ষভাবে শাসকরা শোষণ করে। ঔপনিবেশিক রাজ্যগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করা উপনিবেশবাদের প্রধান লক্ষ্য। কিন্তু নব্য উপনিবেশবাদে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন ও মৌলবাদকে উৎসাহিত করে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে।

১০. অর্থনৈতিক পার্থক্য (Economical difference):

উপনিবেশবাদে ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহ কলোনিগুলোতে অর্থনৈতিকভাবে শোষণ চালাত। স্বীয় স্বার্থে তারা জনগণের উপর বিভিন্ন নীতি আরোপ করতো। অন্যদিকে, নব্য উপনিবেশবাদে স্বাধীন দেশগুলোতে নানা অর্থনৈতিক সাহায্য ও সহযোগিতা এ প্রদান করে এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক জোটের মাধ্যমে শোষণ করার চেষ্টা চালাচ্ছে।

১১. জাতীয় শক্তির ক্ষেত্রে (Sector of national power):

নব্য উপনিবেশবাদে বর্তমানে কোনো রাষ্ট্র তার জাতীয় শক্তি বাড়াতে পারে অন্য রাষ্ট্রের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন করে। কিন্তু উপনিবেশবাদে কোনো রাষ্ট্র ইচ্ছা করলেই তার জাতীয় শক্তি বৃদ্ধি করতে পারত না।

১২. আধুনিক অর্থে (Modern perspective):

উপনিবেশবাদের শাসন ছিল বর্বর যুগের। কারণ সেখানে দেখা গেছে ঔপনিবেশিক জনগণ ছিল অসহায় ও সম্বলহীন। অপরদিকে, নব্য উপনিবেশবাদে দেখা যাচ্ছে আধুনিক পদ্ধতি এখানে সকল মানুষই কমবেশি জানে। কিন্তু তারা অর্থনৈতিক দিক থেকে অধস্তন বলে নিজেদের অর্থনীতিকে সচল করার চেষ্টা করে।

১৩. পদ্ধতিতে পার্থক্য (Methodological Difference):

নব্য উপনিবেশবাদের শাসন ও শোষণের পদ্ধতি হচ্ছে পরোক্ষ। অপরদিকে, উপনিবেশবাদে ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণের পদ্ধতি ছিল প্রত্যক্ষ।

১৪. কাঁচামালের ক্ষেত্রে (Sector of raw-material):

নব্য উপনিবেশবাদের আসল লক্ষ্য হচ্ছে নিজেদের উৎপাদিত পণ্যের বিশ্ব বাজার গড়ে তোলা এবং কাঁচামাল সংগ্রহ করা। অন্যদিকে, উপনিবেশবাদের মূল লক্ষ্য ছিল নিজেদের উৎপাদনের জন্য সস্তায় শ্রম ও কাঁচামাল সংগ্রহ করা।

১৫. স্থায়িত্বের ক্ষেত্রে (Sector of duration):

নব্য উপনিবেশবাদের স্থায়িত্ব উপনিবেশবাদের তুলনায় অনেক কম। কিন্তু উপনিবেশবাদের স্থায়িত্ব ছিল তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি।

উপনিবেশবাদের বর্তমান প্রকৃতি (Present nature of colonialism):

উপনিবেশবাদ বর্তমান আন্ত র্জাতিক রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচিত বিষয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে বিশেষ করে ১৯৩৯ সালের পূর্বে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো বিভিন্ন কৌশলের মাধ্যমে বিশ্বের দুর্বল রাষ্ট্রগুলো বিভিন্ন কৌশলের মাধ্যমে বিশ্বের দুর্বল রাষ্ট্রগুলোকে নিজেদের আয়ত্তে নিয়ে এসে ঔপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠা করে। নিচে উপনিবেশবাদের বর্তমান প্রকৃতি বা বৈশিষ্ট্যের স্বরূপ তুলে ধরা হলো:

১. বৃহৎ শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ:

বৃহৎ বা একক শক্তি হিসেবে রাষ্ট্রের পরিচিতি লাভ করা উপনিবেশ স্থাপনের অন্যতম। কারণ। বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে ব্রিটিশদের যে উপনিবেশ ছিল, তার মূলভিত্তি বৃহৎ আকারের ভূখণ্ড। অর্থনৈতিক, সামাজিক, ভূখণ্ড এবং সামরিক বাহিনীর সম্মিলিত শক্তির মাধ্যমে এটা সম্ভব হয়েছে। এ কারণে বৃহৎ আকারের ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর।

২. শাসনব্যবস্থার প্রকৃতি:

উপনিবেশভুক্ত অঞ্চলে ঔপনিবেশিক যুগে বিশেষ করে দখলকৃত অঞ্চলে দখলদার দেশ বা প্রভু রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান বা শাসকের নামে সমস্ত শাসনকার্য চালানো হতো। যেমন- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ও পূর্বে রাজা বা রানির নামে শাসনব্যবস্থা প্রচলিত ছিল, তা বর্তমানেও স্বীকৃত। এ শাসনব্যবস্থার উপনিবেশভুক্ত অঞ্চলগুলোতে রাজা বা রানি দেশের প্রতিনিধি তথা মন্ত্রিপরিষদের মাধ্যমে শাসনকার্য চালাতেন।

৩. রাজনৈতিক অবস্থার গতিধারা:

রাজনৈতিক পরাধীনতা স্বীকার করে নেওয়া উপনিবেশবাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য বা প্রকৃতি। সাধারণত উপনিবেশভুক্ত অঞ্চলগুলোতে রাজনৈতিক স্বাধীনতা রক্ষা করা হতো না। এসব অঞ্চলে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড তেমন একটা পরিলক্ষিত হয় না। অর্থাৎ, তাদের নিজস্ব স্বকীয়তা। ছিল না। কিন্তু জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক আন্দোলন জোরদার করা হয় ঔপনিবেশিকতার শেষের দিকে।

৪. জাতীয়তাবাদী চরিত্র:

জাতীয়তাবাদী চরিত্র হিসেবে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের গতিধারাকে ত্বরান্বিত করা উপনিবেশবাদের আরেকটি লক্ষ্য। বিশেষ করে, স্বাধীনতা লাভের জনা আপামর জনতা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের দিকে ঝুঁকে পাড় ঔপনিবেশিক শাসনের শেষ পর্যায়ে ঔপনিবেশিক বা সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে বিতাড়িত করে।

৫. সামরিক হস্তক্ষেপ:

ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলো তাদের সামরিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে উপনিবেশিবাদ এর বিস্তৃতি ঘটিয়েছে। সামরিক শক্তির সর্বোচ্চ প্রয়োগের মাধ্যমে বিভিন্ন অঞ্চল দখল করে নিজেদের তাঁবেদার হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি এবং সামরিক বাহিনীর আয়তন বৃহৎ করার নিমিত্তে তাদের ঔপনিবেশিক অঞ্চলগুলোতে সামরিক বাহিনীর সদস্যদের নিয়োগ করতো।

৬. অর্থনৈতিক লাভ:

অর্থনৈতিক প্রতিপত্তি লাভ করা উপনিবেশবাদের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। অর্থাৎ, উপনিবেশিক অঞ্চলগুলোতে অর্থনৈতিক শোষণের মাধ্যমে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। বিভিন্ন প্রকার কর আরোপ, জমিদারি প্রথা প্রবর্তন প্রভৃতির মাধ্যমে জনগণের উপর অর্থনৈতিক শোষণ চালাত। তাছাড়া, সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো তাদের দখলকৃত অঞ্চল থেকে কাঁচামাল শোষণ করে তা থেকে তৈরিকৃত দ্রব্যাদি পুনরায় তাদের অধিকৃত অঞ্চলগুলোতে বিক্রি করতো।

৭. ধর্মীয় অনুভূতি:

সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র বা প্রভু রাষ্ট্রগুলো তাদের নিজস্ব Colony বা উপনিবেশভুক্ত এলাকাগুলোতে খ্রিস্টধর্ম প্রচারের জন্য বিভিন্ন মিশনারিজ ও দাতব্য সংস্থা গড়ে তুলতো। কারণ, উপনিবেশবাদের ক্ষেত্রে ধর্মীয় অনভূতি যথেষ্ট ইন্ধন যুগিয়েছে। এভাবে তারা সাধারণ জনগণকে প্রভাবিত করতো।

৮. সামাজিক কারণ:

সামাজিক বৈষম্য সৃষ্টি করা উপনিবেশিকবাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। এ কারণে উঁচুনিচু শ্রেণির মধ্যে ভেদাভেদ সৃষ্টি হয়। ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র বা Colony উপনিবেশভুক্ত জনগণের মধ্যে বিভিন্ন শ্রেণির সৃষ্টি করে। এ বৈষম্য বর্তমানেও বিদ্যমান।

৯. সাংস্কৃতিক অনুপ্রবেশ:

উপনিবেশবাদের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে সংস্কৃতিক অনুপ্রবেশ তথা সাংস্কৃতিক কারণকে চিহ্নিত করা যায়। ঔপনিবেশিক অঞ্চলগুলোতে নিজস্ব সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করার জন্য তারা বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করতো। এ কারণে সাংস্কৃতিক অনুপ্রবেশ হিসেবে ঔপনিবেশিক শক্তি নিজেদের সংস্কৃতিকে ঔপনিবেশিক এলাকাগুলোর উপর চাপিয়ে দিচ্ছে।

১০. পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রবর্তন:

পাশ্চাত্য শিক্ষাব্যবস্থার প্রবর্তন করা উপনিবেশবাদের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। এলিট শ্রেণি তৈরি করার জন্য পাশ্চাত্য শিক্ষার অনুপ্রবেশ ঘটায় আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করার লক্ষ্যে।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, নিজস্ব রাষ্ট্রের প্রতিপত্তি স্থাপন করে Colony বা উপনিবেশগুলোকে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে দাবিয়ে রাখা। এজন্য বলা যায় উপনিবেশবাদের প্রকৃতিগুলোকে এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করছে। বর্তমান সময়ে এর ইতিবাচক দিকের চেয়ে নেতিবাচক দিকগুলো জনগণের কাছে বেশি পরিচিত পায়। তবে, উপনিবেশবাদের নেতিবাচক দিকের সাথে কিছু ইতিবাচক প্রভাবকেও অস্বীকার করা যায় না।

কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো কি? মার্ক্সীয় বস্তুবাদ ও হেগেলীয় ভাববাদের মধ্যে পার্থক্য।

মার্কসের 'কমিউনিস্ট মেনিফেস্টোর' কি? মার্ক্সীয় বস্তুবাদ ও হেগেলীয় ভাববাদের পার্থক্য তুলে ধর।

ভূমিকা:- আধুনিক সমাজতন্ত্রের প্রবক্তা হলেন কার্ল মার্কস। তিনি তার জীবনের অধিকাংশ সময় ব্যয় করেছেন শ্রমিক শ্রেণি ও নিপীড়িত মানুষের মুক্তির চিন্তা করে। তিনি গ্রন্থ ও গবেষণা পত্র রচনা করেছেন। তার এসব কাজে প্রধান সহযোগী ছিলেন ফ্রেডরিক এঙ্গেলস। মার্কস ও এঙ্গেলস প্রবর্তিত আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েই রাশিয়াসহ পূর্ব ইউরোপ, চীন, উত্তর কোরিয়া, ল্যাটিন আমেরিকা প্রভৃতি দেশে বা অঞ্চলে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মার্কস এর Communist Manifesto-কে সমাজতন্ত্রের সংবিধান হিসেবে গণ্য করা হয়।

কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো কি? মার্ক্সীয় বস্তুবাদ ও হেগেলীয় ভাববাদের মধ্যে পার্থক্য


Communist Manifesto এর পরিচয়

Communist manifesto হলো একটি বই যেটি কার্ল মার্কস এবং এঙ্গেলস যৌথভাবে ১৮৪৮ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকাশ করেন। একই বছর জুলাই মাস থেকে এটি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়।

কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো গ্রন্থটির গুরুত্ব

১৮৪৭ সালে Communist league এর ইশতেহার হিসেবে এটি প্রকাশিত হয়। আকারে গ্রন্থটি খুবই ছোট হলেও এর গুরুত্ব ও তাৎপর্য সুবিশাল। প্রথমত ১৮৪৭ সালে সমগ্র ইউরোপে এটি ছিল বিপ্লবের সময়। অন্যদিকে এই গ্রন্থ প্রকাশের সাথে সাথে সারা পৃথিবীর সমাজতান্ত্রিকদের আন্দোলনের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়।

গ্রন্থের বিষয়বস্তু:

১৮৪৭ সালে Communist league এর ইশতেহার হিসেবে এটি প্রকাশিত হয়। গ্রন্থের শুরুতেই মার্কস ও এঙ্গেলস পৃথিবীর শ্রমিক শ্রেণিকে একত্র হওয়ার আহ্বান জানান। 'দুনিয়ার মজদুর এক হও' এই শ্লোগানকে সামনে রেখে বলা হয় যে পৃথিবীতে যে সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠেছে তার ইতিহাস মূলত শ্রেণি সংগ্রামের ইতিহাস। মার্কস ও এঙ্গেলস দর্শনের দ্বন্দ্ব তত্ত্বকে গ্রহণ করেছেন এবং নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা করেছেন। এ গ্রন্থে বলা হয় আদর্শের সংঘাত নয় বরং শ্রেণি সংঘাতই ইতিহাসকে পরিচালিত করে। সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটে উৎপাদন পদ্ধতির কারণে, কোনো আদর্শিক সংঘাতের কারণে নয়। তারা এই গ্রন্থের মাধ্যমে পৃথিবীর দরিদ্র মানুষকে সংগঠিত হয়ে পুঁজিবাদীদের ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার কথা বলেন।

উপসংহার: পৃথিবীর আলোড়ন সৃষ্টিকারী গ্রন্থসমূহের মধ্যে Communist manifesto অন্যতম। আকারে ছোট হলেও এই গ্রন্থ প্রকাশের পর পরই সারা পৃথিবীতে আলোড়ন সৃষ্টি করে। এটা সমাজতান্ত্রিকদের আন্দোলনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। মার্কস ও এঙ্গেলস এ গ্রন্থের মাধ্যমে পৃথিবীর দরিদ্র মানুষদেরকে একত্রিত হয়ে সর্বহারাদের একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার আহ্বান করেন। পাশাপাশি পুঁজিবাদীদের থেকে ক্ষমতা গ্রহণ এবং উৎপাদন ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণেরও আহ্বান জানানো হয়।

মার্ক্সীয় বস্তুবাদ ও হেগেলীয় ভাববাদের মধ্যে পার্থক্য

দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি মার্কসীয় চিন্তাধারায় গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত। 'A Dictionary of Marxist Thought গ্রন্থে টম বটোমোর বলেন, "দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি প্রত্যয়টি প্রথম ব্যবহার করেন প্লেখানভ তবে দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ার কথা প্রথমে বলেন জার্মান দার্শনিক হেগেল। পরবর্তীতে কার্ল মার্কস হেগেলের চিন্তাধারার বিশেষ করে দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়া যারা অনুপ্রাণিত হয়ে দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়া এক নয়। একথা মার্কস নিজেও বলেছেন, আমরা দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতি হেংগলীয় পদ্ধতি থেকে কেবল স্বতন্ত্রই নয় বরং তাঁর বিপরীত।" মার্কস হেগেলের নিকট থেকে দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ার সূত্র গ্রহণ করেছেন তবে তাঁর ভাববাদী ব্যাখ্যা গ্রহণ করেননি। বরং মার্কস দ্বান্দ্বিক পদ্ধতির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছেন।

বস্তু ও ভাববাদ:

বিশ্ব ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অভিমত হলো বস্তুবাদ ও ভাববাদ। মানুষের চেতনার বিকাশের আসিকাল থেকে এ দুই মতবাদের দ্বন্দ্ব চলে আসছে। বস্তুবাদকে দুইভাবে ভাগ করে বিবেচনা করা হয়। সাধারণ বস্তুবাদ ও দার্শনিক বস্তুবাদ। সাধারণ বস্তুবাদ বলতে জগৎ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মতবাদ বুঝায়। চারপাশের জগৎ সত্য না মিথ্যা, মায়া না যথার্থ এ সম্পর্কে মানুষের মনে আদিকাল থেকেই প্রশ্ন জেগেছে। সাধারণ মানুষ গভীর যুক্তিতর্ক ব্যতিরেকেই জীবনযাপনের বাস্তব প্রয়োজনে জগৎ এবং বাস্তবতাকে সত্যা বলে মেনে নেয়। এ সাধারণ বস্তুবাদের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ ঘটেছে দার্শনিক বস্তুবাদ।

অন্যদিকে ভাববাদ জগৎ ব্যাখ্যার এমন এক পদ্ধতি যা বস্তুর তুলনায় আত্মা বা চৈতন্যকে আদি মনে করে। ভাববাদ মনে করে সমস্ত বস্তুই আত্মা জাতীয় কিছুর নির্ণায়ক। ভাববাদ মূলত ধর্ম বা ঈশ্বরতত্ত্ব। লেনিন বলেছেন- ভাববাদ হলো যাজকতন্ত্র। বিশেষ কোনো ভাববাদী তত্ত্ব ধমের খোলস ত্যাগ করলেও সমস্ত ভাববাদই বিভিন্ন প্রশ্নে ধর্মীয় দৃষ্টিএডির অনুবর্তন মাত্র। কুসংস্কার অতিপ্রাকৃত। গুপ্ত রহস্য ও জ্ঞানাতীত কিছুতে বিশ্বাস, আর ভাববাদ অবিচ্ছেদ্য। অতএব ধর্ম ও ভাববাদের মূল একই।

বস্তুবাদ ও ভাববাদের পার্থক্য:

১. বস্তুবাদ ভাববাদের পরিপন্থি কারণ ভাববাদ যেখানে আত্মা বা মানসকে বস্তুর আগে স্থান দেয়। বস্তুবাদ সেখানে বস্তুাকই প্রধান বলে স্বীকার করে।

২. ভাববাদ একটি রক্ষণশীল ও প্রতিক্রিয়াশীস শক্তি। অন্যদিকে বস্তুবাদ যৌক্তি ও বাস্তববাদসম্মত ধারণা। বাস্তুবাদ প্রতিটি প্রশ্নকে বিচার করা, অনুধাবন করা ও ব্যবস্থা করার একটি উপায়।

৩. ভাববাদ মূলত ধর্ম বা ঈশ্বরতত্ত্ব। কুসংস্কার অতিপ্রাকৃত, রহস্য ও জ্ঞানাতীত কিছুতে বিশ্বাস ভাববাদের আলোচ্যবিষয়। পক্ষান্তরে বাস্তব জীবনের যে সব বিষয়বস্তু আমরা যাচাই করে নিতে পারি, বুঝতে পারি ও নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। বস্তুবাদ তাদের সাহায্যেই বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যা করে।

৪. ভাববাদ মনে করে সবসময়েই একটি উচ্চতর আয়ো বেশি বাস্তব ও অবস্তুময় জগতের অস্তিত্ব আছে যা চূড়ান্ত উৎস ও কারণ আছে। যার দ্বারা মন্ত্রময় জগৎ নিয়ন্ত্রিত। অন্যদিকে বস্তুবাদ মনে করে, জগৎ একটাই আর তা হলো বস্তুময় জগৎ।

৫. ভাবধান মূলত দুই জগতে বিশ্বাসী যথা- ভাবগত ও বস্তুগত এবং ভাবজগতে বস্তুজগতের উপর প্রধান স্থান দিয়ে থাকে। অপরদিকে বস্তুজগতে একটি জগৎকেই প্রাধান্য দেয়া হয়। সেটি হলো বাস্তবজগৎ।

৬. ভাববাদ অনুযায়ী বাস্তবয়জগৎ ভাবজগতের উপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে, বস্তুবাদের শিক্ষা হলো এ যে, প্রকৃতিগত কারণেই এ বিশ্ব বস্তুময় প্রতিটি জিনিসের উৎপত্তি বাস্তব কারণে এবং প্রতিটি জিনিসের উদ্ভব ও বিকাশ প্রকৃতির গতির নিয়মের অনুগামী।

৭. ভাববাদ মনে করে চৈতন্য অথবা মন অথবা ভাব এর বস্তু থেকে স্বতন্ত্র অস্তিত্ব থাকতে পারে এবং আছে। অন্যদিকে, বস্তুবাদের শিক্ষা হলো এই যে, মনের বাইরে মন নিরপেক্ষ বস্তুর বাস্তব অস্তিত্ব আছে এবং মানসিক ব্যাপার বাস্তব থেকে বিচ্ছিন্ন তা নয়ই বরং যা কিছু আত্মিক বা মানসিক তা বাস্তব প্রক্রিয়ার ফল।

৮. ভাববাদের মতে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা এবং বিজ্ঞানের সাহায্যে আমরা যা জানতে পারি তার উর্ধ্বে একটি রহস্যময় অম্লানা বজগৎ আছে। অন্যদিকে, বস্তুবাদের শিক্ষা হলো বিশ্ব ও তার নিয়ম পুরোপুরি জানান সম্ভব এবং বেশি কিছু জানা না গেলেও এমন কিছু নেই যা প্রকৃতিগত কারণেই অজানা।

উপসংহার: উপর্যুক্ত আলোচনা প্রেক্ষিতে বলা যায় যে, মার্ক্সীয় বস্তুবাদ ও হেগেলীয় ভাববাদের মধ্যে অনেক পার্থক্য থাকলে এদের মধ্যে এক ধরনের সম্পর্ক বিদ্যমান। এর মাধ্যমে ভাববাদ এবং বস্তুবাদ সম্পর্কে বিশদ জানা সম্ভব হয়।

উন্নয়নশীল দেশে সাম্রাজ্যবাদের প্রভাব আলোচনা কর

উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সাম্রাজ্যবাদের সুদূরপ্রসারী প্রভাব আলোচনা 

ভূমিকা: অতীতে বিশ্বের বহু উন্নত দেশে সাম্রাজ্যবাদকে জাতীয় নীতি রুপায়নের একটি মাধ্যম হিসেবে প্রয়োগ করেছে। আধুনিক কালে সাম্রাজ্যবাদের প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন। বহুবার সাম্রাজ্যবাদের দ্বারা বিশ্ব শান্তি ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়েছে। সাম্রাজ্যবাদ পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অগ্রগতি এবং উপনিবেশিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা ও  প্রসারের সাথে অঙ্গাঅঙ্গি ভাবে জড়িত। ক্রমশ সাম্রাজ্যবাদ শব্দটি ঔপনিবেশিক শাসনের সাথে যুক্ত হয়ে  পড়ে।

উন্নয়নশীল দেশে সাম্রাজ্যবাদের প্রভাব আলোচনা কর


সম্রাজ্যবাদের ফলাফল:

নিচে সাম্রাজ্যবাদের ফলাফল তুলে ধরা হলো:

১. বাজার ব্যবস্থা (Market system):

তৃতীয় বিশ্বের বাজার ও আর্থিক নিয়ন্ত্রণ করে নব্য সাম্রাজ্যবাদ। তৃতীয় বিশ্বের উপর বর্তমানে যে সাম্রাজ্যবাদ চলছে তা মূলত অর্থনৈতিক ক্ষেত্রের উপর। রপ্তানি ক্ষেত্রে বাজারের প্রভুত্ব বজায় রাখে উন্নত বিশ্ব। একটি দরিদ্র দেশ শিল্পোন্নত দেশগুলোর বাজারে প্রবেশ করার জন্য অন্যান্য গরিব দেশের সাথে তীব্র প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয় হয়। ধনী দেশগুলো এ অবস্থা সৃষ্টি হওয়ায় তাদের নিজেদের জন্য সুবিধাজনক সব বাণিজ্য শর্ত আরোপ করে এবং দরিদ্র দেশগুলোতে একের বিরুদ্ধে অপরকে লাগিয়ে দেয়। নব্য সাম্রাজ্যবাদের শিকার এ দরিদ্র রাষ্ট্রগুলো সবসময়ই তাদের রপ্তানি পণ্যের জন্য কম মূল্য পায়। অথচ শিল্পোন্নত দেশগুলো থেকে পণ্য আমদানির জন্য এসব দরিদ্র দেশকে দিতে হয় অনেক বেশি দাম। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো আর্থিক অবস্থা ভালো করার জন্য বাণিজ্য জোট গঠনের উদ্যোগ নিলেও তারা তেমন সফল আ হয় না। যেমন: সার্ক এক্ষেত্রে একটি উদাহরণ। রাজনৈতিক মত পার্থক্য, অর্থনৈতিক পরনির্ভরশীলতা এবং বিকল্প বাজারের অভাব এ দরিদ্র রাষ্ট্রগুলোকে একত্রিত করতে পারে না।  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রগতিশীল চিন্তাবিদ মাইকেল প্যারেন্টির মতে, "তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো শিল্পপণ্য তৈরির সাহস দেখালে শিল্পোন্নত রাষ্ট্রগুলো তাদের প্রযুক্তি ও ঋণ প্রদান বন্ধ করাসহ নে বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি দেয়। বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলো বিপুল বিনিয়োগ, বিপননের উন্নত কৌশল, একচেটিয়া পেটেন্ট ও উন্নত ব্যবস্থাপনা দিয়ে স্থায়ী বাণিজ্য উদ্যোগগুলোকে বাজারে প্রবেশে বাধা দান করে। ভেনিজুয়েলার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট কার্গোজ আন্দ্রেজ পেরেজের মতে, "এর ফলে অবিরাম ও বর্ধিত হারে পুঁজির নির্গমন ঘটছে এবং আমাদের দেশগুলো দরিদ্র হয়ে পড়ছে।"

২. ঋণের আধিপত্য (Debt supremacy):

তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে ঋণের আধিপত্য বড় রকমের একটি কৌশল। দরিদ্র দেশগুলোতে অধিকাংশ শিল্পকারখানার মালিকানা অথবা নিয়ন্ত্রণ বিদেশি কোম্পানীগুলোর হাতে থাকে। যেখানে বহুজাতিক যা কোম্পানিগুলোর মালিকানা কম সেখানে থাকে তাদের ভেটো ক্ষমতা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীতে যখন সরাসরি ঔপনিবেশিক সে শাসন থেকে তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্র মুক্ত হতে শুরু করল এবং ভৌগোলিক স্বাধীনতা লাভ করতে শুরু করল তখন উন্নত রাষ্ট্রসমূহ যারা এতদিন ঔপনিবেশিক শাসন উন্নত রাষ্ট্রসমূহ তারা এতদিন ঔপনিবেশিক শাসন চালিয়ে আসছে, তারা নিজেদের বাজার ধরে রাখা এবং অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার জন্য বিশ্ব্যাংকের এ আইন মত প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে। এসব প্রতিষ্ঠান অনুন্নত দেশগুলোতে ঋণ দেওয়া শুরু করে চড়া সুদ ও শর্তের মাধ্যমে আবার কোনো শিল্প উদ্যোগের সম্পূর্ণ মালিকানা কোনো একটি দেশের হওয়ার পর প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক বাজারের উপর প্রায় একচেটিয়া অধিকার থাকার বহুজাতিক কোম্পানীগুলো সুবিধা ভোগ করে থাকে। যেমন- বড় কোম্পানিগুলো অশোধিত তেল উৎপাদনের মাত্র ৩৮ শতাংশের মালিক হলেও পরিশোধ ও সরবরাতের প্রায় পরোটাই তাদের বাজার।

প্যারান্টি বলেন, আশির দশকের শেষভাগে প্যারাগুয়ের রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশই চলে গেছে বৈদেশিক ঋণের সুদ এ পরিশোধ করতে। ১৯৮০ সালের দিকে বিদেশী ব্যাংকগুলো তৃতীয় বিশ্বের প্রদত্ত ঋণ থেকে যে পরিমাণ সুদ পেয়েছে, তা সেখানে তাদের সরাসরি বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্ত মুনাফার চেয়ে নিজ ক্ষেত্রে বেশি। তৃতীয় বিশ্বের গরিব দেশগুলা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পাশ্চাত্য রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলে (IMF) থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেয় তা শোধ করতে - পারে না। ফলে যে দেশে ঋণের পরিমাণ বেশি সে দেশের ঘাটতি মিটাতে আরো ঋণ দেয়ার চাপও বেশি এবং এ বাড়তি ঋণ নিতে হয় চড়া সুদ ও করা শর্তে। যে দেশগুলো ঋণগ্রস্থ তাদের আয়ের বড় একটি অংশ চলে যায় ঋণ পরিশোধে। অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটাতে সামান্য অবশিষ্ট থাকে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) প্রদত্ত কাঠামো পুনর্বিন্যাসের শর্তে মত দিতে হয় ঋণগ্রহীতা দেশকে নতুন ঋণ পাওয়ার যোগ্যতা অর্জনের জন্য। ঋণগ্রহীতা দেশকে মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঘটাতে থাকে। ফলে দেশগুলোতে খাদ্যে ভর্তুকি ও - গৃহায়ন ও অন্যান্য মানবসেবা খাতের বরাদ্দ কমে যায়। ফলে বঞ্চিত হয় সাধারণ জনগণ। কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি স্থগিত রাখতে হয়। দ্রব্যমূল্যও বৃদ্ধি করতে হয়। সুতরাং সাম্প্রদায়িক কালে সাম্রাজ্যবাদের মাধ্যমে যে ঋণের জালে আমরা আবদ্ধ হচ্ছি - সে ঋণ পরিশোধের অর্থ হচ্ছে তৃতীয় বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের সম্পদের একটি বড় অংশ আন্তর্জাতিক লগ্নিপুজির মালিকদের হাতে জমা।

৩. বৈদেশিক সাহায্য (Foreign aid):

দরিদ্র দেশগুলো নিজেরা নিজেদের সম্পদ ও বণ্টনব্যবস্থা সংস্কারের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থার উন্নতি করতে চাইলে এ সাহায্য বন্ধ করে দেয়া হয়। যেমন- চিলিতে ১৯৭০ সালে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত আলেন্দের সরকার যখন সংস্কারের মাধ্যমে শ্রমজীবী শ্রেণির স্বার্থে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয় তখন সেখানে মার্কিন সাহায্য বন্ধ হয়ে যায়। কিছুক্ষেত্রে স্থানীয় উৎপাদন ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্যও বৈদেশিক সাহায্য ব্যবহার হয়। যেমন- ওয়াশিংটন সোমালিয়াতে তাদের স্বনির্ভর গ্রামীণ অর্থনীতি পঙ্গু করে ফেলা ও স্থানীয় উৎপাদনকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য সেখানে ভুট্টা পাঠায়। বৈদেশিক সাহায্যের পাশে বিস্ময়চক চিহ্ন দেয়ার অর্থ হচ্ছে আদৌ একে কোনো সাহায্য বলা যায়, নাকি সাম্রাজ্যবাদের একটি হাতিয়ার হচ্ছে এ সাহায্য। আমরা জানি, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এর সাহায্য গ্রহীতা দেশগুলোকে ওয়াদা করতে হয় যে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের অধিকৃত দামে মার্কিন পণ্য কিনবে এবং এবং মার্কিন জাহাজে পণ্য বহন করবে। তাছাড়া - তারা যে সাহায্য দেয় তার একটি ছোট অংশ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে। সাহায্যের বড় অংশ চলে যায় মার্কিন বাণিজ্যিক বা যায় বিনিয়োগির জন্য ভর্তুকি হিসেবে।

বৈদেশিক সাহায্যের একটি অন্যতম হাতিয়ার হচ্ছে। বিশ্বব্যাংক। এরা এমন সব প্রকল্পে ঋণ দেয় যেগুলো অত্যাচারী শাসক শ্রেণিকে জোরদার করে কিন্তু দরিদ্র জনগোষ্ঠী ও পরিবেশের বিপক্ষে যায়। বিশ্বব্যাংক সম্পর্কে জিম হাইউত্তরায় মন্তব্য করেন, "বিশ্বব্যাংক মাত্র ৫০ বছরে যা করেছে পৃথিবীর সব ব্যাংক ডাকাতরা মিলে এ পর্যন্ত তার এক শতাংশের এক দশমাংশও করতে পারেনি।" এছাড়া প্যারান্টি বলেন, "আশির দশকে বিশ্বব্যাংক উত্তর পশ্চিম, ব্রাজিলে বনভূমি ধ্বংস করে একটি মহাসড়ক নির্মাণ করে। এরপর কয়েক লক্ষ একর বনভূমি সাফ করে দেয়া হয়, যা মূলত করা হয় ধনী ব্রাজিলিয়ান পশুখামার মালিকদের ব্যবসায় স্বার্থে। ১০ বছরের মধ্যে পুরো এলাকা দারিদ্র্য ও ব্যাধিতে ভরে যায়।"

৪. নিচু মাত্রার যুদ্ধ (Low duration war):

সাম্রাজ্যবাদের ক্ষেত্রে বর্তমানে বিশ্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রায় এককভাবে আধিপত্য বিস্তার করে চলেছে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তি যখন কোনো রাষ্ট্রে সাম্রাজ্য স্থাপনের উদ্দেশ্যে সে দেশের উপর নিম্ন জোরপূর্বক যুদ্ধ চাপিয়ে দেয় তখন তার নিজ দেশের বহু সৈন্য জা নিহত হয়। এতে সে দেশের জনগণ যুদ্ধের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় ও বা প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশের সাম্রাজ্য স্থাপনের জন্য প্রচুর অর্থব্যয় করে। যা বহন করে সে দেশের চা জনগণ। ফলে সে দেশের জনগণ এ ব্যয় বহন করতে করতে সা ক্লান্ত হয়ে পড়ে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির পক্ষে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। ওয়াশিংটনের নীতি নির্ধারকেরা নিচু মানের যুদ্ধ কৌশল উদ্ভাবন করেছেন। এ যুদ্ধ জনগণের চোখে পড়ে না।  ফিলিপাইনে ২০ বছরের বেশি, কলম্বিয়ায় ৩০ বছরের বেশি যুদ্ধ চালানো হয়। এ যুদ্ধে তেমনভাবে বড় হত্যাযজ্ঞ লড়াই বা নাটকীয় কোন বিজয় বা বিপর্যয় না থাকায় তেমনভাবে তা নজর করে না। নিকারাগুয়ায় বিরুদ্ধে রিগ্যান ও সিনিয়র বুশ প্রশানন এক দশক ধরে যুদ্ধ চালিয়েছে। 

৫. গাট (GATT):

GATT (General Ayreement f on Tarifts and trade) সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর নতুন ক কৌশল। গ্যাট বা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (WTO) নামে যে আস্ত র্জাতিক সংগঠন তৈরি করেছে যার আইনগত অবস্থা জাতিসংঘের মত। যে কোনো দেশের সামাজিক, পরিবেশগত, ক্রেতার এ স্বার্থরক্ষার এবং শ্রম বিষয়ক আইন খারিজ বা স্থগিত করার কর্তৃত্ব WTO (World Trade Organization) এর রয়েছে। গ্যাট দিয়ে শুল্ক প্রতিবন্ধকতা দূর করা, বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক  ব্যবস্থাকে একটি বিশ্বব্যবস্থার সাথে সমন্বিত করা ও বর্ধিত বাণিজ্যের ফলে সবদেশের উপকৃত হওয়ার কথা বললেও আসলে তা তৃতীয় বিশ্বের জন্য কোনো সুবিধাই বয়ে আসছে না। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নির্দেশ মোতাবেক কোনো রাষ্ট্র যার আইন পরিবর্তন করতে অস্বীকার করলে WTO সে দেশের উপর আন্ত র্জাতিক বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগ করতে পারে। দুর্বল দেশগুলোকে বঞ্চিত করে WTO শক্তিশালী দেশগুলোকে উপকৃত করবে এবং গরিবদের সমবায় স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে রক্ষা করবে ধনীদের স্বার্থ। এজন্য কোরীয় কৃষক আত্মাহুতি দেয় যখন তাদের ভূতর্কি কমানোর কথা বলা হয়।

৬. ইচ্ছাকৃত সহিংসতা (Willingly violent):

মাইকেল প্যারেন্টি বলেন, "সাম্রাজ্যবাদী আধিক পণ্যের জন্য সন্ত্রাস এক নৈমিত্তিক অস্ত্র।" পূর্বে যেমন লক্ষ্য লক্ষ্য নিরাপরাধ মানুষকে দাসে পরিণত করা হয়েছে ঔপনিবেশিকতার মাধ্যমে ঠিক তেমনি সাম্প্রতিক কালের তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে দরিদ্র মানুষ নব্য উপনিবেশবাদের শিকার হচ্ছে। মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা CIA এবং এ ধরনের সংগঠনের আর্থিক ও কারিগরি সাহায্য বিভিন্ন বশংবদ রাষ্ট্রের সামরিক ও পুলিশ বাহিনীকে নজরদারি, গোয়েন্দাগিরি, জেরা, অত্যাচার, ভীতি প্রদর্শন ও খুন করার প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। গুয়েতেমালায় CIA সৃষ্ট ২৫ বছরের যুদ্ধে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ১ লাখ। নিখোঁজ হয় ৬০ হাজার মানুষ। গেরিলাদের প্রতি সহানুভূতি আছে এ সন্দেহে প্রায় ৪৪০টি গ্রাম ধ্বংস করা হয়, প্রায় ১০ লাখ লোক অন্য দেশে পালিয়ে যায় এবং ১০ লাখ মানুষ নিজেদের বাসস্থান ছেড়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নেয়। জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের পোট বেনিংয়ে অবস্থিত মার্কিন সামরিক বাহিনীর স্কুল অব আমেরিকান (SDA) এর প্রশিক্ষণ কেন্দ্র মার্কিন বংশোদ্ভূত রাষ্ট্রগুলোর সামরিক অফিসারদের অত্যাচার চালানোর সর্বাধুনিক কৌশল সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেয়া হয় বলে সারা লাতিন আমেরিকার জনসাধারণ এর নাম দিয়েছে 'খুনীদের পাঠশালা'। এলসালভেদরের গ্রামগুলোতে হত্যাযজ্ঞ ও নৃশংসতা চালানোর দায়ে অভিযুক্ত অধিকাংশ সামরিক বাহিনী এখানে প্রশিক্ষণ পেয়েছে। ইন্দোনেশিয়ায় মার্কিন মদদপুষ্ট সেনাবাহিনী ১৯৬৫ সাল থেকে ৫-১০ লাখের মত নিরীহ জনগণকে হত্যা করে। নিউইয়র্ক টাইমস ১২ মার্চ ১৯৬৬ সালে একে আধুনিককালের রাজনৈতিক ইতিহাসে বর্বর গণহত্যা নামে আখ্যায়িত করে। এসব ঘটনা প্রমাণ করে বর্তমানে নিজেদের স্বার্থে গণতন্ত্রের দাবিদার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পুঁজিবাদী শিল্পোন্নত রাষ্ট্র এভাবেই বিভিন্ন দেশে আগ্রাসন চালায় এবং ধ্বংস করে দেয় তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোর সার্বিক অবস্থা।

উপসংহার: উপর্যুক্ত আলোচনার শেষে বলা যায় যে, এখনও তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রগুলো উপনিবেশ থেকে মুক্তি পায়নি। নামে কেবল স্বাধীন রাষ্ট্র কিন্তু অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সাম্রাজ্যবাদ আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তি থেকে মুক্তি পেতে হলে লড়াই করার বিকল্প নেই। চুপচাপ বসে থাকলে সাম্রাজ্যবাদ কিছুদিন পর আমাদের মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীকে নিঃস্ব করে দিবে। নিম্ন শ্রেণি আরো নিঃস্ব হবে এবং কিছু লোকের হাতে অঢেল অর্থের সমাগম হবে। সাম্রাজ্যবাদের করাল গ্রাস থেকে মুক্তি পেতে হলে এদের কৌশলগুলো বুঝতে হবে। চালানোর বৈধ কর্তৃত্ব কার এ নিয়েও জনসাধারণের মধ্যে বিতর্ক আছে। এসব দেশে সামরিক বাহিনীর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপেরও বিরুদ্ধে জনমতের প্রবল কোনো বাধা নেই।

সাম্রাজ্যবাদের উদ্ভব ও বিকাশের কারণ আলোচনা কর

সাম্রাজ্যবাদের উদ্ভব ও বিকাশের কারণসমূহ আলোচনা

ভূমিকা:- সাম্রাজ্যবাদের উদ্ভব ও বিকাশের অনেক কারণ রয়েছে। তন্মধ্যে নিম্নিলিখিত কারণসমূহ বিশেষ উল্লেখযোগ্য। যেমন-

সাম্রাজ্যবাদের উদ্ভব ও বিকাশের কারণ


১. অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জন (Acquired of economical opportunities)

অর্থনৈতিক বাণিজ্যিক সুবিধা লাভ, কাঁচামাল ও উৎপাদিত পণ্যের বাজারের চাহিদা সাম্রাজ্যবাদের উৎসরূপে কাজ করেছে। সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠার পিছনে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি কাজ করেছে সেটি হলো অর্থনৈতিক সুযোগ সুবিধা অর্জন। এ বিষয়টি অষ্টাদশ, ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে সাম্রাজ্যবাদ প্রসারে প্রত্যক্ষ প্রেরণা যুগিয়েছিল।

২. ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য প্রসারণ (To extending colonial empire):

ইউরোপের উন্নত দেশসমূহকে সাম্রাজ্য বিস্তারে উৎসাহিত করেছিল শিল্পবিপ্লব ও অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের প্রসার। জাতীর মর্যাদা এবং আত্মপ্রতিষ্ঠার প্রতীকে পরিণত হয়েছিল ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যের প্রসার। ঐ সময়েই ইউরোপের সাম্রাজ্যাবাদী শাসনের অধীনস্থ হয় আফ্রিকার বিস্তীর্ণ অংশ। এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন অংশেও ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য প্রসারিত হয়।

৩. সভ্যতা বিকাশে (To develop civilization):

বিশ্বের অনুন্নত অঞ্চলে সভ্যতার আলো পৌছে দিতে যথেষ্ট সাহায্য করেছে সাম্রাজ্যবাদ। সাম্রাজ্যবাদ যার ফলে ব্যাপক সমর্থন লাভ করেছে। সাম্রাজ্যবাদের বিস্তারে ফলে খুব দ্রুত উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। তাছাড়া বিভিন্ন কবি, সাহিত্যিক, লেখক, রাজনীতিবিদ সাম্রাজ্যবাদের জয়গান গেয়েছেন। বিশ্বের সর্বত্র এভাবে সাম্রাজ্যবাদের প্রসার ঘটেছে। উন্নয়নশীল দেশগুলো উত্তরোত্তর উন্নতির দিকে ধাবিত হয়েছে।

৪. নতুন বাজার সন্ধানে (To find new market):

উৎপাদিত পণ্যের নতুন বাজারের সন্ধান এবং শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও শক্তি সংগ্রহের জন্য শিল্পসমৃদ্ধ আস্ত র্জাতিক প্রতিযোগিতার আসরে অবতীর্ণ হয়। প্রতিটি রাষ্ট্র নিজের অর্থনেতিক স্থবিরতার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে নিজের বস্তুগত অধিকার বজায় এবং নতুন ভূখণ্ড দখলের জন্য সচেষ্ট হয়ে ওঠে। বিংশ শতকের শুরুতে পৃথিবীর অর্ধেক ভাগ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির করতলগত হয়।

৫. সামরিক কারণ (Military cause):

সামরিক স্বাধীনতা অর্জন সাম্রাজ্যবাদের উদ্ভব ও বিকাশের অন্যতম কারণ। নিজের স্বার্থ ও যুদ্ধের প্রয়োজনে সকল সাম্রাজ্যবাদী শক্তি সাম্রাজ্যভুক্ত জনবলকে ব্যবহার করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইংরেজদের সামরিক প্রাধান্য বজায় রাখার জন্য ইংরেজ সরকারকে ভারতীয় এবং নেপালি গুর্খা বাহিনীর উপর নির্ভর করতে হয়েছিল। এভাবেই সাম্রাজ্যবাদী শক্তি কোনো উপনিবেশের অধিবাসীদের নিয়ে গঠিত সেনাবাহিনীকে অন্য উপনিবেশের জনসাধারণের জন্য ব্যবহার করেছে।

৬. পুঁজি রপ্তানি (Capital export):

পুঁজি রপ্তানি সাম্রাজ্যবাদ উদ্ভব ও বিকাশের অন্যতম কারণ। পুঁজিবাদের একচেটিয়া পর্যায়ে বা সাম্রাজ্যবাদের যুদ্ধে আর্থিক পুঁজির মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় পুঁজি রপ্তানি। এ উদ্দেশ্যে পুঁজি রপ্তানির মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদ অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য গড়ে তোলে।

৭. উদ্বৃত্ত জনগণকে পুনর্বাসিত করার জন্য (For rehabilitate to surplus people):

নিজ দেশের উদ্বৃত্ত জনগণকে অন্য অংশে পুনর্বাসিত করার প্রচেষ্টা থেকে সাম্রাজ্যবাদের উদ্ভব হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। কিন্তু এ মতকে অনেকেই অস্বীকার করেছেন। যুক্তিস্বরূপ তারা বলেছেন, এ ফ্রান্সের উদ্বৃত্ত জনসংখ্যা না থাকা সত্ত্বেও ফরাসি সাম্রাজ্যের প্রসার ঘটেছিল। জার্মানি তার জনসংখ্যার সামান্য অংশকে সাম্রাজ্যে বসবাস করার জন্য ব্যবহার করেছিল।

৮. রাজনৈতিক অধিকার গ্রহণ (Reciept of political right):

রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য সাম্রাজ্যবাদী কর্তৃত্ব অধিকৃত এলাকার জনগণের উপর নির্যাতন চালায় এবং অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে হত্যা করে। অন্যের রাষ্ট্র দখল করে। নিজেদের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা এবং ঐ দেশের অর্থনৈতিক অধিকার হরণ করা সাম্রাজ্যবাদ উদ্ভব ও বিকাশের অন্যতম প্রধান কারণ।

৯. ধর্মের ভূমিকা (Rule of religion):

সাম্রাজ্যবাদের প্রসারে ধর্মপ্রচারের ইন্ধন যুগিয়েছে। ফরাসি ও পর্তুগিজ ধর্মযাজকেরা তাদের স্ব-স্ব দেশের সাম্রাজ্য বিস্তারের ক্ষেত্রে একটি স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। প্রকৃতপক্ষে, ধর্মীয় প্রচারের অন্ত রালে তারা সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থকে বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন।

১০. সার্বিক দিক নিয়ন্ত্রণ (Control of whole side):

সাম্রাজ্যবাদী শক্তির স্বার্থরক্ষার্থে সাম্রাজ্যবাদী দেশ তার অধিকৃত এলাকার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে। সাম্রাজ্যবাদের উদ্ভব ও বিকাশের অন্যতম একটি কারণ এটি এবং আরেকটি কারণ হলো সংশ্লিষ্ট এ এলাকার জনগণকে অবহেলা করা। 

১১. মহাজনি মূলধনের সৃষ্টি (Creatiions of owner's capital):

সাম্রাজ্যবাদ বিকাশের অন্যতম কারণ মহাজনি মূলধনের সৃষ্টি। অর্থাৎ, শিল্পের কেন্দ্রীভূত পুঁজির সাথে ব্যাংকের পুঁজির মিলন হয় এবং তাতে করে এ মহাজনি মূলধনের সৃষ্টি হয়। এসব মহাজনি মূলধনের মালিকানা সাম্রাজ্যবাদী শক্তির হাতেই থাকে।

১২. অন্য রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ (Control of other state):

অন্য রাষ্ট্রকে দখল করে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে এনে বিভিন্ন রকমের সুযোগসুবিধা লাভ করাও একটি অন্যতম কারণ। অন্যের রাষ্ট্র দখল বিরাট এলাকা জুড়েও হতে পারে আবার ক্ষুদ্র এলাকা জুড়েও হতে পারে।

সাম্রাজ্যবাদের শ্রেণিবিভাগ (Classification of imperialism)

সাম্রাজ্যবাদের দু'টি ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। যথা: পুরাতন সাম্রাজ্যবাদ এবং নতুন সাম্রাজ্যবাদ। তবে সাম্রাজ্যবাদের এ শ্রেণিবিভাগ তিনটি স্তর বা পর্যায়ে আলোচনা করা যেতে পারে যা নিম্নরূপ-

প্রথম স্তর (First stage):

ষোড়শ শতাব্দীর শুরু থেকে ১৭৬৩ সাল পর্যন্ত। এ স্তরে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বণিক বৃত্তির (Mercantilism) জাতীয় রাষ্ট্রের উদ্ভব এবং ধর্মীয় মতদ্বৈততা ও খ্রিস্টান মিশনারিদের কর্মকাণ্ডের প্রসার ঘটে। ইউরোপীয় শক্তিসমূহের কাছে এর ফলে এরা বিশ্বের দ্বারা উন্মুক্ত হয়। ব্রিটেনেই সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হিসেবে বেশি লাভবান হয়। যুদ্ধবিগ্রহ ও ঔপনিবেশ স্থাপনের মাধ্যমে পৃথিবীর অনেক অঞ্চল বিদেশি শাসন ও শোষণের অধীনস্থ হয়।

দ্বিতীয় স্তর (Second Stage):

১৭৩৬ সাল থেকে ১৮৭০ সাল পর্যন্ত। এ স্তরে শিল্প বিপ্লব, অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যের প্রসার ইউরোপের উন্নত দেশগুলোতে সাম্রাজ্য বিস্তারে উৎসাহিত করে। সাম্রাজ্যের প্রসারকে জাতীয় মর্যাদা ও আত্মপ্রতিষ্ঠার প্রভাবক মনে করা হয়। 

তৃতীয় স্তর (Third stage):

১৮৭০ সাল থেকে ১৯১৯ সাল পর্যন্ত। এ স্তরের প্রথমার্ধে আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে অতি দ্রুত সাম্রাজ্যবাদের প্রসার ঘটতে থাকে। মূলত শিল্পসমৃদ্ধ পশ্চিমা দেশগুলো স্বীয় অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার্থে বিশ্বের বিভিন্ন এলাকায় অধিকার রক্ষার জন্য তৎপর হয়ে ওঠে। বিশ্বের অনেক রাষ্ট্র বিংশ শতাব্দীর সাম্রাজ্যবাদী শক্তির করতলগত হয়।

উপসংহার: উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, সাম্রাজ্যবাদী দেশসমূহের মধ্যে গ্রেট ব্রিটেন, স্পেন, পর্তুগাল, জার্মানি, ফ্রান্স, জাপান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস-এর নাম বিশেষ উল্লেখযোগ্য। উনবিংশ শতাব্দীর শেষে পৃথিবীর অর্ধেক ভূখণ্ড এদের অধীনে ছিল। গ্রেট ব্রিটেনের ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যই ছিল বৃহত্তম। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বর্তমান প্রেক্ষাপটে বড় শক্তিগুলো একটি দেশ দখল করে সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটাতে পারে না বটে তবে নতুন আঙ্গিকে আধিপত্য বিস্তৃত হচ্ছে।

মার্কস ও এঙ্গেলস সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে যা বলেছেন তা ব্যাখ্যা কর

সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে মার্কস ও এঙ্গেলসের আলোচনা ব্যাখ্যা

ভূমিকা:- লেনিন কর্তৃক সামাজ্যবাদ প্রত্যয়ের বিশ্লেষণকে পুঁজিবাদী মার্কসীয় অধ্যয়নে নিঃসন্দেহে একটি নব দিগন্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সাথে সাথে এই বিশ্লেষণটি শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলনের কার্যক্রমকে উৎসাহিত করতে ও পরিচালিত করতে শানিত হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে বলে ধারণা করা হয়। কার্ল মার্কস তাঁর 'Das Kapital' গ্রন্থের তৃতীয় খণ্ডে পুঁজিবাদের পরিবর্তিত রূপ সম্পর্কে কতকগুলো গভীর মন্তব্য করেছেন যেগুলোকে পরবর্তীতে মার্কসবাদীরা সামাজ্যবাদ তত্ত্ব গঠনের প্রারম্ভিক সূত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

সাম্রাজ্যবাদ কী? মার্কস ও এঙ্গেলস সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে যা বলেছেন তা ব্যাখ্যা কর

 

মার্কস ও এঙ্গেলস- সাম্রাজ্যবাদ তত্ত্ব (Marx and Engels - Theory of Imperialism)

কার্ল মার্কস ও তাঁর অনুসারীদের মতে, সাম্রাজ্যবাদ নিছক "বলয় বিস্তারের ধারা" (trend toward expansion) বা “বৈদেশিক ভূমিদখল" (Conquest of foreign lands) নয়। যদিও অধিকাংশ রাজনৈতিক বিজ্ঞানী এবং সমাজবিজ্ঞানী সাম্রাজ্যবাদ বলতে তাই মনে করেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলোর বড় বড় বুর্জোয়াদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে যে সাধারণ পরিবর্তন সূচিত হয় তাকে সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য 'সাম্রাজ্যবাদ' (Imperialism) শব্দটি ব্যবহার করা হয়। এ পরিবর্তনগুলো বুর্জোয়াদের মৌল কাঠামোর পরিবর্তনের সাথে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত। এ সম্পর্কে E. German বলেন, "The word is used in a much more precise sense to describe the general changes which occured in the political, economic and social activity of the big bourgeoisie of the advanced capitalist countries, beginning in the last quarter of the 19th these bourgeoisies." অর্থাৎ, সাম্রাজ্যবাদ প্রত্যয়টি ব্যবহৃত হয়েছে সুনির্দিষ্টভাবে উনবিংশ শতকের শেষার্ধের, পুঁজিবাদী সমাজে বড় বড় বুর্জোয়াদের কর্মকাণ্ডের সাধারণ পরিবর্তন বুঝাতে যার ফলে সমাজে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সাধারণ পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। এই পরিবর্তনগুলো বুর্জোয়া শ্রণির মৌলিক কাঠামোর পরিবর্তনের সাথে সম্পর্কিত।

মার্কস তাড়াতাড়ি মারা যাওয়ার কারণে তিনি এ পরিবর্তনগুলো ব্যাখ্যা করতে পারেননি। প্রাথমিক নিদর্শনগুলো ছাড়া বেশি কিছু তিনি দেখেননি, এতদসত্ত্বেও মার্কস তাঁর শেষ লেখাগুলোতে এমন কিছু গভীর মন্তব্য রেখে গেছেন। পরবর্তীতে। তাঁর অনুসারীরা সেগুলোকে সাম্রাজ্যবাদ তত্ত্ব বিনির্মাণের সূচনা। পর্ব হিসেবে ব্যবহার করেছেন। মার্কসীয় সাম্রাজ্যবাদ তত্ত্ব বিনির্মাণে যার নামটি সবার আগে আসে তিনি হলেন এঙ্গেলস। এঙ্গেলস এর ধারণা ও মতাদর্শ ব্যতীত মার্কসীয় সাম্রাজ্যবাদ তত্ত্ব অসম্পূর্ণ।

সীমিত দায়দায়িত্বের বড় বড় কোম্পানিগুলো দ্রুত বিকাশকে অধ্যয়ন করতে গিয়ে মার্কস তাঁর 'Das Capital' গ্রন্থের তৃতীয় খণ্ডের ২৩নং অনুচ্ছেদে উল্লেখ করেন যে, মুষ্টিমেয় পুঁজিপতিদের আগ্রাসনে অধিকাংশ পুঁজিপতিরা হারিয়ে যাওয়ার যে নতুন রূপটি দৃশ্যমান হচ্ছে এসব কোম্পানি তারই প্রতিনিধিত্ব করছে। মার্কস-এর ভাষায়, "These companies represent a new form of the expropriation of mass of capitalists by a small handful of capitalists." অর্থাৎ, এই কোম্পানিগুলো মুষ্টিমেয় পুঁজিপতিদের দ্বারা পুঁজিপতিদের একটা নতুন ধরনের বাজেয়াপ্তকরণ নির্দেশ করে।

তিনি আরো বলেন, "In this expropriation the legal owner loses his function as entrepreneur and abandons his role in the process of production and his position of command over the productive forces and the labour force." অর্থাৎ, এই বাজেয়াপ্তকরণ প্রক্রিয়ায় পুঁজির আইনগতভাবে বৈধ মালিক উদ্যোক্তা হিসেবে তার কার্যক্রম হারায় এবং সাথে সাথে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় তার ভূমিকা এবং উৎপাদন শক্তি ও শ্রম শক্তির উপর তার যে নিয়ন্ত্রণমূলক অবস্থান ছিল তাও হারায়।

এমনকি ব্যক্তিগত সম্পত্তিও নিরুদ্ধ হচ্ছে। তবে এটি নিরুদ্ধ হচ্ছে সামষ্টিক মালিকানার অনুকূলে নয় বরং মুষ্টিমেয় পুঁজিপতির ব্যক্তিগত মালিকানার অনুকূলে। Marx তাঁর - "Capital' গ্রন্থে মুনাফার হার হ্রাসের বিপরীতধর্মী প্রবণতা বর্ণনা করতে গিয়ে অনুন্নত দেশগুলোতে পুঁজির রপ্তানির গুরুত্ব বর্ণনা করেন। তিনি তার ধারণাটিকে আরো কিছুটা সাধারণীকরণ করে বলেন, " a capitalist society must continuously extend its base, its area of exploitation." অর্থাৎ, পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইতে গিয়ে ধনতান্ত্রিক সমাজকে অবশ্যই প্রতিনিয়ত এর মৌল কাঠামো ও শোষণের পরিধি বৃদ্ধি করতে হবে।

মার্কসের এই মন্তব্যের সাথে Engels আরো বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে অন্যান্য কাঠামোগত প্রপঞ্চগুলোর উপর দৃষ্টি দিয়েছেন যেগুলোর উপর সাম্রাজ্যবাদের অন্যান্য তাত্ত্বিকগণ গুরুত্বারোপ করেছেন। Engels-এর ভাষায়, "From the beginning of the industrial revolution until the 1870's. England exercised practically an industrial monopoly over the world market. Thanks to that monopoly in the second half of the 19th century the German, French and American competition made in roads into this English monopoly and inaugurated a period of sharp class struggle in Great Britain." অর্থাৎ, শিল্পবিপ্লবের শুরু থেকে ১৮৭০-এর দশক পর্যন্ত ইংল্যান্ড বিশ্ববাজারের উপর একচ্ছত্র শিল্পের আধিপত্য চর্চা করেছিল। এ ধরনের একচ্ছত্র আধিপত্যের জন্য ধন্যবাদ। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের সময় ক্রাফট ইউনিয়নের উদ্ভব ঘটে, ইংরেজ পুঁজিবাদ শ্রমিক শ্রেণির একটি অংশকে গুরুত্বপূর্ণ অনুমোদন প্রদান করে। কিন্তু উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে জার্মান, ফরাসি এবং আমেরিকানরা ইংরেজদের একচেটিয়া আধিপত্যে অনুপ্রবেশ করে এবং এটি গ্রেট বিটেনে তীব্র শ্রেণিসংগ্রামের একটি পর্যায়ের সূচনা করে।

উপসংহার: উপর্যুক্ত আলোচনা পরিশেষে বলা যায় যে, মার্কস ও এঙ্গেলস-এর সাম্রাজ্যবাদ তত্ত্বের মূলকথা, হলো, পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় শ্রমিক শোষণ ও শ্রেণিসংগ্রাম যখন তীব্রতর রূপ ধারণ করে তখন সাম্রাজ্যবাদের সূচনা ঘটে। বস্তুত মার্কস ও এঙ্গেলস ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে বুর্জোয়া শ্রেণির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট পরিবর্তন বলতে সাম্রাজ্যবাদ প্রত্যয়টি ব্যবহার করেছেন এবং এই পরিবর্তন মার্কস ও তার অনুসারীরা যে তাত্ত্বিক কাঠামোর মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছেন তাকে মার্কসীয় সাম্রাজ্যবাদ তত্ত্ব বলা হয়। পুঁজিবাদী সমাজ, বুর্জোয়া শ্রেণির সুনির্দিষ্ট সাধারণ পরিবর্তন, একটা একচেটিয়া বিশ্ববাজার, শ্রেণিসংগ্রাম প্রভৃতি বিষয়গুলো মার্কস ও এঙ্গেলস-এর সাম্রাজ্যবাদ তত্ত্বের মৌলিক বিষয়সমূহ।

উপনিবেশবাদ কি? নব্য উপনিবেশবাদের ৭টি বৈশিষ্ট্য লিখ

উপনিবেশবাদের সংজ্ঞা ও নব্য উপনিবেশবাদের বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচনা

ভূমিকা: যে কোন উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের শাসিত, শোষিত, বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর ভূমিকা নগণ্য। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে উন্নয়নশীল রাষ্ট্র হচ্ছে শোষণ ও নির্যাতনের উর্বর মঞ্চ।  তৃতীয় বিশ্ব উন্নয়নশীল রাষ্ট্র সমূহের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় জাতীয় পর্যায়ে একদিকে রয়েছে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার অব্যবহিত তৎপরতা অপরদিকে রয়েছে সমাজের এলিট গোষ্ঠী ও প্রান্তসীমায় অবস্থান করছে উপেক্ষিত শাসিত, শোষিত জনগোষ্ঠী। আর শোষণ ও নির্যাতনের থাবা চলছে উন্নত দেশসমূহ যেমন ব্রিটেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, রাশিয়া প্রভৃতি দেশ। তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্র সমূহে সামাজিক,  রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করছে। এ কেন্দ্র  প্রান্ত সম্পর্কে তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রসমুহে উপনিবেশবাদের সুস্পষ্ট অভিব্যক্তি। 

উপনিবেশবাদ কি? নব্য উপনিবেশবাদের ৭টি বৈশিষ্ট্য লিখ


উপনিবেশবাদ (Colonialism)

উন্নয়ন-অনুন্নয়নের দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের ইতিহাসের দ্বিতীয় পর্ব ধরা যায় উপনিবেশবাদকে। বর্ধিত ভৌগোলিক দায়দায়িত্ব বা বিজয়ের মাধ্যমে অর্জন করা হয়েছে এ যুগের প্রধান বৈশিষ্ট্য। ইউরোপীয় শিল্প দ্রব্যের জন্য নিয়ন্ত্রিত বাজার ব্যবস্থার প্রত্যাশা উপনিবেশবাদের আরেকটি বৈশিষ্ট্য। ধীরে ধীরে বা প্রথমদিকে অনিচ্ছুকভাবে অপেক্ষাকৃত অসংগঠিত বাণিজ্যিক শোষণকে প্রতিস্থাপিত করে মাতৃভূমির প্রয়োজনের সাথে উপনিবেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক সংগঠনকে সংগতিপূর্ণ করার জন্য পরিলক্ষিত প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়। এসব অনুন্নত এলাকাগুলোকে অগ্রসর করতে গিয়ে পাশ্চাত্যকে তাদের প্রযুক্তি, উৎপাদন পদ্ধতি, সামাজিক সংগঠন, সাংস্কৃতিক প্রলক্ষণ, রাজনৈতিক ও আইন ব্যবস্থা স্থানান্তরিত করতে হয়েছে। মার্কসবাদী তত্ত্বের আলোকে বলা যায় যে, এটি করতে গিয়ে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদ এসব ঔপনিবেশিক এলাকাকে আরও অনুন্নত করে। এ ধরনের প্রসারণ ইউরোপীয়দের বসতির কাছে কেন্দ্রীভূত হতে থাকার ফলে ঔপনিবেশিক ও উপনিবেশোত্তর সমাজের দ্বৈততা। সংক্ষেপে বলা যায় যে, পাশ্চাত্য সভ্যতা এজেন্ট হিসেবে কাজ করে।

বুৎপত্তিগত অর্থে উপনিবেশবাদ

উপনিবেশ শব্দটির মূল অর্থ 'মানবসমাজের একটি স্থানান্তরিত অংশ'। ল্যাটিন শব্দ কলোনিয়া (Colonia) থেকে ইংরেজি Colony বা উপনিবেশ শব্দটির উৎপত্তি হয়। এছাড়া রাজনৈতিক দিক দিয়ে বিচার করলে উপনিবেশের অর্থ হয়: ক. দেশের সীমান্তের বাইরে কোনো রাষ্ট্রে বসতি স্থাপন এবং খ. রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো একটি ভূখণ্ড। তবে বর্তমানে উপর্যুক্ত দুটোর মধ্যে দ্বিতীয়টি বেশি প্রযোজ্য।

প্রামাণ্য সংজ্ঞা:

আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিভিন্ন লেখক বিভিন্নভাবে উপনিবেশবাদের সংজ্ঞা প্রদান করেন। নিচে তাঁদের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সংজ্ঞা প্রদান করা হলো।

কে. এ. হবসন (K.A. Hobson) তাঁর ''Imperialism A Study' গ্রন্থে ঔপনিবেশিকতার আলোচনা প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন যে, "Colonialism is the best sense, is a natural overflow of nationality; its test is the power of colonists to transplant the civilization they represent to the new natural and social environment is which they find themselves." অর্থাৎ উপনিবেশবাদ হলো জাতীয়তাবাদের এক বহিঃসম্প্রসারণ; উপনিবেশবাদীরা যে নতুন প্রাকৃতিক ও সামাজিক পরিবেশ উপনিবেশ স্থাপন করে সেখানে তাদের নিজস্ব সভ্যতাকে অনুপ্রবিষ্ট করার যে ক্ষমতা তাদের রয়েছে, তাই উপনিবেশবাদ নির্ধারণের মানদণ্ড।

আন্দ্রে গুন্ডার ফ্রাঙ্ক (A.G. Frank) বলেছেন "উপনিবেশবাদ হলো বিভিন্ন জনপদের মধ্যে আধিপত্যের জোরালো সম্পর্ক।"

'Encyclopedia of Science' গ্রন্থে উপনিবেশবাদের দুটি অর্থ উল্লেখ করা হয়েছে-

১. দেশীয় সীমান্তের বাইরে অপর কোনো রাষ্ট্রীয় সীমানায় বসতি স্থাপন এবং

২. রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো একটি ভূখণ্ড যা উক্ত রাষ্ট্রের সাথে আনুগত্য প্রকাশ করে।

রুপার্ট এমারসন (Rupert Emerson)-এর মতে,

"উপনিবেশবাদ হলো কোনো বিদেশি জনসাধারণের উপর দীর্ঘ সময় ধরে শাসন প্রতিষ্ঠা এবং তা বজার রাখার ব্যবস্থা।"

ই. এম. উইনসলো (E.M. Winslow)-এর মতে,"Colonialism means and occupation of virgin territory in which conflict was incidental or even unnecessary and subordinate to the desire of Europeans of find a new place to live." অর্থাৎ, উপনিবেশ বলতে এমন কোনো ভূখণ্ড অধিকার করাকে বুঝায় যেখানে বসবাসের নতুন স্থান লাভ করাই ছিল ইউরোপীয়দের ইচ্ছা এবং যেখানে দ্বন্দ্ব বিরোধ ইচ্ছারই আনুষঙ্গিক এমনটি অপ্রয়োজনীয় ঘটনা ছিল এবং সেখানেও দ্বন্দ্ব বিরোধ ইচ্ছার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

টাউনসেন্ড (Townsend) ও পিক (Peak)-এর মতে, "উপনিবেশবাদ বলতে এক বিশেষ ধরনের শোষণকেই বুঝায়"।

উপসংহার : উপর্যুক্ত সংজ্ঞাগুলোর আলোকে ঔপনিবেশকতা বলতে বুঝায় কোনো অঞ্চলের মানুষের উপর সাম্রাজ্যবাদী নীতি অনুসরণকারী অন্য কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের শাসন। তবে এ ধারণা সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে পরিবর্তিত হচ্ছে।

নব্য উপনিবেশবাদের বৈশিষ্ট্যসমূহ

 নব্য উপনিবেশবাদ এবং উপনিবেশবাদ মূলত একই অর্থে ব্যবহৃত হয়। উপনিবেশবাদের নতুন রূপকে নব্য উপনিবেশবাদ বলে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ঔপনিবেশিক শাসনে ধস নামে। নব্য উপনিবেশবাদে পূর্ববর্তী উপনিবেশবাদের সকল শোষণ প্রক্রিয়া ভিন্ন কৌশলে উপস্থাপন করা হয় মাত্র। নিজেদের প্রভাব প্রতিপত্তি ধরে রাখার জন্য ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহ উপনিবেশবাদ গড়ে তোলে।

নব্য উপনিবেশবাদের সাতটি বৈশিষ্ট্য:

তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহ ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণ থেকে এখনো মুক্ত হতে পারেনি। তৃতীয় বিশ্ব বর্তমানে উন্নত বিশ্বের উপর বিভিন্নভাবে নির্ভরশীল। নব্য উপনিবেশবাদ তার পুরাতন নীতির কোনো পরির্বতন করেনি, কতকগুলো কৌশল পরিবর্তন করেছে মাত্র। ফলে উপনিবেশবাদের থাবা থেকে তৃতীয় বিশ্ব মুক্ত হতে পারছে না। নব্য উপনিবেশবাদের সাতটি বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো:

১. অর্থনৈতিক শোষণ প্রক্রিয়া:

পূর্বে যেখানে উপনিবেশিক শক্তিসমূহ সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে তৃতীয় বিশ্বকে শোষণ করতো বর্তমানে সেখানে শোষণ প্রক্রিয়া অর্থনৈতিক কেন্দ্রীভূত হয়েছে। নব্য উপনিবেশবাদের অর্থনৈতিক শোষণ ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণ ও পরিকল্পনা প্রণয়নে তৃতীয় বিশ্ব বহুলভাবে ঔপনিবেশিক শক্তির উপর নির্ভরশীল। উন্নত বিশ্বের উপর অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতার যবনিকা তৃতীয় বিশ্বে কখনো ঘটেনি। তৃতীয় বিশ্বের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রসমূহ বিভিন্নভাবে অর্থনৈতিক শোষণ অব্যাহত রাখে।

২. আর্থিক সহায়তা ও ঋণ প্রদান:

বিভিন্ন ক্ষেত্রে তৃতীয় বিশ্বের ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র আর্থিক সাহায্য এবং ঋণ প্রদান করে। ঋণগ্রহণের সময় তৃতায় বিশ্ব কঠিন শর্তে আবদ্ধ হয়ে পড়ে, যা থেকে তারা কখনো মুক্ত হতে পারে না। যেসব দেশ এ সহায়তা ও ঋণ গ্রহণ করে তারা ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে কোনো কথা বলতে পারে না। এভাবে কৌশলগতভাবে নব্য উপনিবেশবাদে শোষণ প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে।

৩. খাদ্য সাহায্য প্রদান:

তৃতীয় বিশ্বে ব্যাপক দারিদ্র্যের কারণে উন্নত বিশ্বের খাদ্য সাহায্য গ্রহণ করতে হয়। বিশ্বে প্রতিবছর চার লাখ মানুষ অনাহারে এবং অর্ধাহারে মৃত্যুবরণ করে। খাদ্য সাহায্য গ্রহণের বিনিময়ে সরকারকে প্রতিকূল শর্তে চুক্তিবদ্ধ হতে হয়। এছাড়া উন্নত বিশ্ব খাদ্য সাহায্যের নামে সাধারণ জনগণের সহানুভূতি লাভের সুযোগ গ্রহণ করে।

৪. মুক্ত বাজার অর্থনীতি:

সমগ্র বিশ্বে মুক্ত বাজার অর্থনীতির প্রচলন করেছে নব্য উপনিবেশবাদীরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের অবাধ সরবরাহের লক্ষ্যে। এতে তৃতীয় বিশ্বের উৎপাদিত পণ্যের বাজার নষ্ট হয় এবং উন্নত বিশ্বের উৎপাদিত পণ্য সে বাজার দখল করে। পরবর্তীতে তাদের মাঝে বাজার সৃষ্টির হীন উদ্দেশ্য সাধন করা হয়।

৫. পণ্য সাহায্য:

তৃতীয় বিশ্বে বিভিন্ন ধরনের পণ্য সাহায্য প্রদান করে উন্নত বিশ্ব। সেসব পণ্যের প্রতি মানুষের আকর্ষণ সৃষ্টি করে পরবর্তীতে তাদের মাঝে বাজার সৃষ্টির হীন উদ্দেশ্য সাধন করা হয়।

৬. প্রকল্প সাহায্য:

উন্নত বিশ্ব তৃতীয় বিশ্বে প্রকল্প সাহায্যের নামে উন্নয়ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করে। প্রকল্প সাহায্য প্রদানের বিনিময়ে তারা তৃতীয় বিশ্বকে কঠিন শর্তে আবদ্ধ করে। এর মধ্য দিয়ে উপনিবেশবাদের মূল লক্ষ্য অর্থনৈতিক শোষণ অব্যাহত রাখা হয়। প্রকল্প সাহায্যের মাধ্যমে তারা নিজেদের ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি বজায় রাখার সুযোগ পায়।

৭. বহুজাতিক সংস্থা:

বহুজাতিক সংস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহ নিজেদেরকে আরও শক্তিশালী ভিত্তির উপর দাঁড় করার এবং তৃতীয় বিশ্বকে বেশি করে শোষণের সুযোগ লাভ করে।

উপসংহার: উপর্যুক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, নব্য উপনিবেশবাদের মূলত কৌশলগতভাবে তৃতীয় বিশ্বের উপর শোষণ ও কর্তৃত্ব বজায় রাখা হয়। এর মধ্য দিয়ে তৃতীয় বিশ্বে ক্রমান্বয়ে উন্নত বিশ্বের উপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে এবং নিজস্ব শক্তি ও সামর্থ্যকে হ্রাস করে তুলছে। নব্য উপনিবেশবাদ হলো এক ধরনের নতুন পরিস্থিতি যেখানে নতুন কৌশলের মাধ্যমে পূর্বের সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ, নিজের আধিপত্য ও শোষণ অব্যাহত রাখার চেষ্টা করে।

জড়বাদ সংজ্ঞা, বৈশিষ্ট্য। দ্বান্দ্বিক জড়বাদ সংজ্ঞা, মূলনীতি ও সমালোচনা আলোচনা

জড়বাদ সংজ্ঞা, বৈশিষ্ট্য এবং দ্বান্দ্বিক জড়বাদের সংজ্ঞা, মূলনীতি ও সমালোচনা

ভূমিকা : জীবন ও জগতের সাথে জড়িত সমস্যাবলি নিয়ে দর্শন আলোচনা করে। সত্তা সম্বন্ধীয় সমস্যাটি দর্শনের বিভিন্ন সমস্যাবলির মধ্যে অন্যতম। মৌলিক উপাদান মানে সত্তা। এ পরিদৃশ্যমান জগতের আড়ালে যে মূল উপাদান বা সত্তা রয়েছে তা জড় বা আধ্যাত্মিক, এ নিয়ে দর্শনে মূলত দুটি মতবাদ গড়ে উঠেছে। একটি হচ্ছে জড়বাদ বস্তুবাদ এবং অপরটি হচ্ছে ভাববাদ।

জড়বাদ কী? জড়বাদের বৈশিষ্ট্য


জড়বাদ (Materialism):

জড়বাদ হচ্ছে এমন একটি তত্ত্ববিষয়ক মতবাদ, জড়কে বিশ্বজগতের আদিসত্তা বলে মনে বরে। Materialism এর বাংলা প্রতিশব্দ জড়বাদ বা বস্তুবাদ। জড়ের ধর্ম হচ্ছে গতি। মন বা আত্মা বলে কোনো সত্তা নেই বরং মন ও প্রাণ জড় থেকেই উদ্ভূত। বিশ্বজগতের যাবতীয় বস্তু জড়বাদ পরমাণুর আকর্ষণ ও বিকর্ষণের ফলে সৃষ্টি হয় এবং বিশ্বজগৎ কতকগুলো যান্ত্রিক নিয়মের অধীন। মন ও প্রাণ জড়ের জটিলতম রূপ মাত্র। জড়বাদ বা বস্তুবাদের মূলকথা হচ্ছে জ্ঞেয় বস্তুর অস্তিত্ব বা সত্তা মানুষের জ্ঞান বা মনের উপর নির্ভর করে না। জড়বাদ যান্ত্রিক বিবর্তনবাদে বিশ্বাসী ও যন্ত্রবাদের মুখপাত্র। বস্তু এর অস্তিত্ব মান ও জ্ঞান নিরপেক্ষ। বস্তু জগতের বাইরে অন্য কিছু নিয়ে চিন্তার কোনো অবকাশ নেই। বস্তুই শুরু এবং বস্তুই শেষ। এছাড়া বস্তুবাদীরা আরো মনে করেন বস্ত্রই প্রথম এবং প্রধান ও বস্তু থেকেই সূত্রপাত।

জড়বাদের বৈশিষ্ট্য (Characteristics of materialism):

জড়বাদের মূলতত্ত্ব বিশ্লেষণ করলে যেসব বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয় তা নিম্নরূপ:

১. পৃথিবীর যাবতীয় বস্তুই জড়ের আকর্ষণ ও বিকর্ষণের ফলে সৃষ্ট।

২. জড়বাদীদের মতে, জড়ই হচ্ছে আদি সত্তা বা মৌলিক উপাদান নেই।

৩. জড়বাদে কোনো অলৌকিক বা আধ্যাত্মিক শক্তির স্থান

৪. জড়বাদ যান্ত্রিক বিবর্তনবাদে বিশ্বাসী।

৫. জড়বাদ শক্তির নিত্যতার নিয়মে বিশ্বাস করে।

৬. যান্ত্রিক কার্যকারণ সম্পর্ক হচ্ছে জড়বাদের আসল বৈশিষ্ট্য।

৭. আত্মার অস্তিত্ব, অমরত্ব, ঈশ্বর, ধর্ম ইত্যাদি জড়বাদের দিক থেকে মিথ্যা বা অলীক।

৮. জড়বাদের বাইরে কোনো জ্ঞান বা দর্শনকে বস্তুবাদীরা অস্বীকার করে।

৯. জড়বাদী ও বস্তুবাদীরা বিশ্বাস করে বস্তু থেকে ধারণা বা জ্ঞানের উৎপত্তি।

দ্বান্দ্বিক জড়বাদ (Dialectic materialism):

দ্বান্দ্বিক জড়বাদের উদ্ভব ঘটে শিল্পবিপ্লব থেকে উদ্ভূত তীব্র সমাজ সংগ্রাম থেকে। প্রাকৃতিক জগৎ ও সমাজ সম্পর্কে মার্কসের দর্শনে দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি ও বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয় পরিলক্ষিত হয় বলে মার্কসের দর্শনকে দ্বান্দ্বিক জড়বাদ বলা হয়। এই দ্বান্দ্বিক জড়বাদ আধুনিক জড়বাদের ইতিহাসে সচল ও ব্যবহারিক জড়বাদের এক বিস্ময়কর নিদর্শন। তিনি এঙ্গেলসের সাহায্যে এ মতবাদ ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে এ মতবাদ লেলিন, স্টালিন, মাওসেতুং প্রভৃতি নেতৃবৃন্দের মাধ্যমে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনের সরকারি দর্শন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সার্বিক সামাজিক উন্নয়নে এক বিরাট বিপ্লব সাধিত হয়। মার্কস ফুয়েরবার্ক এর বস্তুবাদ ও সমকালীন বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের প্রবর্তন করেন। কার্ল মার্কসের দ্বান্দ্বিক জড়বাদ দর্শনের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী সংযোজন। তিনি তাঁর দ্বান্দ্বিক জড়বাদে ভাববাদের অবৈজ্ঞানিক পথ বর্জন করে বিজ্ঞানসম্মন ও বাস্তব পন্থায় বিশ্বজগতকে জানার চেষ্টা করেছেন।

দ্বান্দ্বিক জড়বাদের মূলকথা (key word in dialictic materialism):

দ্বান্দ্বিক জড়বাদের মূলকথাগুলো নিচে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:

প্রথমত, জড়ই হচ্ছে একমাত্র সত্তা, এটিই দ্বান্দ্বিক জড়বাদের মূলকথা। চিন্তা হলো জড়ের জটিল প্রক্রিয়ার ফলস্বরূপ। কাজেই জড়ের অস্তিত্ব সচল জড়ের উপর নির্ভরশীল। সুতরাং মানুষ হলো উন্নতমানের জড় পিণ্ড।

দ্বিতীয়ত, এঙ্গেলস বলেছেন, "প্রকৃতির প্রক্রিয়া হলো দ্বান্দ্বিক।” দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ার যে কোনো সমস্যা সমাধানের দিকে অগ্রসর হয় এবং এখানে দ্বন্দ্ব বলতে চেতনার দ্বন্দ্ব নয় বরং জড়ের সাথে জড়ের দ্বন্দ্বের কথা বলা হয়েছে। লেনিন বলেছেন, দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি হলো বস্তুসত্তার জ্ঞানবিরোধ পাঠ, উন্নতি হলো বিপরীত প্রক্রিয়ায় দ্বন্দ্ব।"

তৃতীয়ত, জড়ের স্বাভাবিক ধর্ম হলো গতি, দ্বান্দ্বিক জড়বাদ অনুসারে। জাগতিক পরিবর্তন ও ক্রমোন্নতির একমাত্র কারণ, যা সকল অধ্যাত্মবাদ বা গতানুগতিক চিন্তাধারাকে বাতিল করে দিয়ে জড়ের ক্রমবিকাশের দৃষ্টি আকর্ষণ করে জড়ের দ্বান্দ্বিক গতি।

চতুর্থত, সচল জড়বাদের উপর জড়বাদ প্রতিষ্ঠিত। মানুষ কোনো দর্শন বা চিন্তাভাবনার সাহায্যে পরিচালিত নয়, বাস্তব জীবনের দ্বারা পরিচালিত। বাস্তবের উপর এ মতবাদ অধিক গুরুত্বারোপ করে। মার্কস এ প্রসঙ্গে বাস্তবতা বর্জিত জ্ঞানের কথা অস্বীকার করেন।

পঞ্চমত, ব্যক্তিরা একে অন্যের উপর এবং সমাজের উপর ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে গতিসৃষ্টি করে, যা সমাজের পরিবর্তন ঘটায়। মার্কস ব্যক্তিকে সমাজের ক্রমোন্নতির উপায় হিসেবে গ্রহণ করেন।

ষষ্ঠত, মার্কস মনকে সক্রিয় বলে স্বীকার করেন। বিবর্তন প্রক্রিয়া জড় থেকে মনের উদ্ভব হলেও জড়ের উপর মনের ক্রিয়া করার শক্তি আছে। তিনি বলেছেন, মানুষ তার নিজের ভাগ্য বিধাতা, ভাগ্যের ক্রিড়নক নয়।

সপ্তমত, মার্কস বলেছেন, "যখন শাস্ত্রকারী থাকবে না তখন ধর্ম তিরোহিত হবে। মার্কস ধর্মকে আফিম সেবন জনিত মোহনিদ্রার সাথে তুলনা করেছেন। ধর্ম ও ঈশ্বর শ্রেণির স্বার্থরক্ষা করে।

অষ্টমত, উৎপাদন পদ্ধতি সমাজ বিকাশে বিভিন্ন অবস্থা নিয়ন্ত্রিত করে। ইতিহাস অর্থনৈতিক অবস্থার দ্বারাই নির্দিষ্ট হবে। শ্রেণির দ্বন্দ্ব হলো মালিক-শ্রমিক দ্বন্দ্ব।

দান্দ্বিক জড়বাদের মূলনীতি (Principle of dialectic materialism):

'Dialectics of Nature' গ্রন্থে এঙ্গেলস জড়বাদের তিনটি মূলনীতি বা সূত্রের কথা বলেছেন। মার্কস একে সমর্থন করেন। নিচে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. ঐক্য ও বিরোধের সংগ্রাম:

বস্তুর সমস্ত পরিবর্তন এ নিয়ম মেনে চলে। মহাশূন্যে প্রতিনিয়ত বিপরীত শক্তির আকর্ষণের ফলে নতুন নতুন তারকার জন্ম হচ্ছে এবং বিকর্ষণের ফলে তারকার মৃত্যু হচ্ছে। জীবদেহে ও দুটি বিপরীত শক্তি কাজ করে। এই দুই শক্তির নাম আত্মীকরণ ও বিআত্মীকরণ এবং এ দুটি ঐক্যের নাম বিপাক। আত্মীকরণের প্রাধান্য থাকলে দেহ বাড়ে আর বিআত্মীকরণের প্রাধান্য থাকলে দেখ বুড়িয়ে যেতে থাকে।

আবার এ একই নিয়মের বলে উৎপাদন শক্তির সাথে উৎপাদন সম্পত্তির বিরোধ ঘটলে নতুন সমাজের পত্তন হয়। মার্কসের মতে, প্রকৃতি ও সমাজে কোনো সময় এ দুই শক্তির ভারসাম্য থাকে না বলে বিশ্বজগতের সবকিছুতেই পরিবর্তন ঘটে থাকে।

২. পরিমাণগত বিবর্তন থেকে গুণগত বিবর্তনে উত্তরণ:

মার্কসের মতে, “পরিমাণগত পরিবর্তনে ছেদ ঘটলে তা উল্লম্ফনের মাধ্যমে গুণগত পরিবর্তনে রূপান্তরিত হয়।" বস্তুর পরিমাণগত পরিবর্তন ধীরগতির অন্যদিকে গুণগত পরিবর্তনে ছেদ থাকে বলে তাতে উল্লম্ফের মাধ্যমে পরিবর্তিত হয়। সমাজ বিকাশের ক্ষেত্রে এ সূত্রটি সমভাবে কাজ করে। শ্রমিকদের আত্মশক্তি জোরদার হলে হঠাৎ করে তারা উৎপাদনের প্রতিবন্ধকতা শোষক শ্রেণিকে উৎখাত করে সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠা করে। এছাড়া জলের বরফে রূপান্তর পরিমাণগত পরিবর্তনের রূপান্তরের দৃষ্টান্ত।

৩. নেতিক নেতিকরণের নিয়ম:

বীজগাণিতিক মান কে - নঞবক ধরে করলে হবে । একে আবার নঞবক করলে হতে - x ( x) = x² বা x অপেক্ষা উন্নত। মার্কস সামাজিব। মতবাদে এ নীতি প্রেরণ করে বলেছেন যে পুঁজিবাদ তার নঞর্থকতা ছাড়া থাকতে পারে না। কিন্তু এই নঞর্থকতা পরিশেষে পুঁজিবাদকেই অস্বীকার করে। মার্কস দেখান যে, পুঁজিবাদীরা অধিক লাভের জন্য সারা পৃথিবীর অধিক শ্রমিক নিয়োগ করেন। যার ফলে বিশ্বের সংগঠিত শ্রমিক শ্রেণি পুঁজিবাদকে ধ্বংস করে শ্রেণিবিহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করে।

সমালোচনা (Criticism):

পৃথিবীতে কোনো কিছুই সমালোচনার উর্ধ্বে নয়। মার্কস বর্ণিত দ্বান্দ্বিক জড়বাদও এর ব্যতিক্রম নয়। নিচে সংক্ষেপে দ্বান্দ্বিক জড়বাদের সমালোচনাসমূহ উল্লেখ করা হলো:

১. বার্টার্ড রাসেলের মন্তব্য:

History of Western Philosophy' গ্রন্থে Bertrand Russell কার্ল মার্কসের সমালোচনা করতে গিয়ে বলেছেন, "মার্কস নিজেকে একজন নাস্তিক হিসেবে প্রচার করেছেন। কিন্তু নিজে মহাজাগতিক আশাবাদ পোষণ করেন, যা একজন একেশ্ববাদীই যাচাই বা প্রমাণ করতে পারেন।"

২. ধর্মীয় মূল্যবোধ বিরোধী:

দ্বান্দ্বিক জড়বাদ অন্যান্য জড়বাদের মতো প্রচলিত ধর্ম, ঈশ্বর, পরম মূল্য ইত্যাদি ধর্মবোধ ও নীতিবোধের উপর চরম আঘাত হেনেছে। কিন্তু এটি মোটেই গ্রহণযোগ্য পরিণত হয়েছে। নয়, এর ফলে মানুষ যন্ত্রে পরিণত হয়েছে 

৩. অবৈজ্ঞানিক প্রকৃতির:

অধিকাংশ তাত্ত্বিকদের মতে, মোটামুটিভাবে বলতে গেলে মার্কসের দর্শনের সব উপাদান যা হেগেলের দর্শন থেকে সৃষ্টি হয়েছে তা অবৈজ্ঞানিক। কারণ এ উপাদানগুলোকে সত্যি বলে ধরে নেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা সেন নেই।  

৪. অসন্তোষজনক:

'বস্তু দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ায় চলে' এ মতবাদ সন্তোষজনক নয়। কেননা অনেক প্রাকৃতিক বস্তু ও ঘটনার সাক্ষাৎ মিলে, যেগুলো একটি দ্বান্দ্বিক আকারে আচরণ করে বলে মনে হয়।

 ৫. অবাস্তব:

জড়ের গতির ফলে যে জীবের বা প্রাণের উৎপত্তি হয় তা ঠিক নয়। দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ সম্পর্কে মার্কসের বক্তব্য বাস্তব। মন এবং দেহ পরিবেশকে নিয়ন্ত্রণ করে কেননা জীব জীবনহীন জড় নয়। সুতরাং জড়ের গতি নেই, এটি সক্রিয়/এ নয়। কেবল সচেতন বস্তুর মাধ্যমেই দ্বান্দ্বিক উন্নতি সম্ভব।

৬. সাম্যবাদ ও পুজিবাদ বিরোধী:

মার্কস সাম্যবাদকে 'বাদ' ও পুঁজিবাদকে 'প্রতিবাদ' হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। কিন্তু সাম্যবাদ ও পুঁজিবাদ উভয়ের সমন্বয়ে হবে গণতন্ত্র।

৭. ব্যক্তিসত্তাকে অবজ্ঞা:

মার্কস ব্যক্তিকে সমাজের উপায় হিসেবে ব্যবহার করেন এবং ব্যক্তিসত্তার প্রয়োজনীয়তাকে খাটো করে দেখেন। তিনি ব্যক্তিকে কেবল সর্বনৈতিক ব্যবস্থার দাস হিসেবে ভাবেন। যদিও তিনি ব্যক্তি ও সমাজের ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ায় বিশ্বাসী, তবুও তিনি ব্যক্তির ইচ্ছায় স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন না।


উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, মার্কসের মতে, একমাত্র দ্বান্দ্বিক ব্যাখ্যার কল্যাণেই দর্শন নিরর্থক তত্ত্ব আলোচনাকে বর্জন করে মানব হিতৈষী বিদ্যার পরিণতি লাভকরতে পারে। তাই এর দার্শনিক মূল্যকে অস্বীকার করা যায় না। দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের সমালোচনা সত্ত্বেও দর্শনের ইতিহাসে দ্বান্দ্বিকতার সাহায্যে ব্যক্তি ও সমাজের উন্নয়নের এ ব্যাখ্যার প্রচেষ্টা এক অনন্য সর্বদা দাবি করতে পারে। কারণ, মার্কসই। প্রথম বৈজ্ঞানিক এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলির ভিত্তিতে জগতের। সবকিছুর দ্বান্দ্বিক উন্নয়নের কথা বলেন।