সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে মার্কস ও এঙ্গেলসের আলোচনা ব্যাখ্যা
ভূমিকা:- লেনিন কর্তৃক সামাজ্যবাদ প্রত্যয়ের বিশ্লেষণকে পুঁজিবাদী মার্কসীয় অধ্যয়নে নিঃসন্দেহে একটি নব দিগন্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সাথে সাথে এই বিশ্লেষণটি শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলনের কার্যক্রমকে উৎসাহিত করতে ও পরিচালিত করতে শানিত হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে বলে ধারণা করা হয়। কার্ল মার্কস তাঁর 'Das Kapital' গ্রন্থের তৃতীয় খণ্ডে পুঁজিবাদের পরিবর্তিত রূপ সম্পর্কে কতকগুলো গভীর মন্তব্য করেছেন যেগুলোকে পরবর্তীতে মার্কসবাদীরা সামাজ্যবাদ তত্ত্ব গঠনের প্রারম্ভিক সূত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
মার্কস ও এঙ্গেলস- সাম্রাজ্যবাদ তত্ত্ব
কার্ল মার্কস ও তাঁর অনুসারীদের মতে, সাম্রাজ্যবাদ নিছক "বলয় বিস্তারের ধারা" (trend toward expansion) বা “বৈদেশিক ভূমিদখল" (Conquest of foreign lands) নয়। যদিও অধিকাংশ রাজনৈতিক বিজ্ঞানী এবং সমাজবিজ্ঞানী সাম্রাজ্যবাদ বলতে তাই মনে করেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলোর বড় বড় বুর্জোয়াদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে যে সাধারণ পরিবর্তন সূচিত হয় তাকে সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য 'সাম্রাজ্যবাদ' (Imperialism) শব্দটি ব্যবহার করা হয়। এ পরিবর্তনগুলো বুর্জোয়াদের মৌল কাঠামোর পরিবর্তনের সাথে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত। এ সম্পর্কে E. German বলেন, "The word is used in a much more precise sense to describe the general changes which occured in the political, economic and social activity of the big bourgeoisie of the advanced capitalist countries, beginning in the last quarter of the 19th these bourgeoisies." অর্থাৎ, সাম্রাজ্যবাদ প্রত্যয়টি ব্যবহৃত হয়েছে সুনির্দিষ্টভাবে উনবিংশ শতকের শেষার্ধের, পুঁজিবাদী সমাজে বড় বড় বুর্জোয়াদের কর্মকাণ্ডের সাধারণ পরিবর্তন বুঝাতে যার ফলে সমাজে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সাধারণ পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। এই পরিবর্তনগুলো বুর্জোয়া শ্রণির মৌলিক কাঠামোর পরিবর্তনের সাথে সম্পর্কিত।
মার্কস তাড়াতাড়ি মারা যাওয়ার কারণে তিনি এ পরিবর্তনগুলো ব্যাখ্যা করতে পারেননি। প্রাথমিক নিদর্শনগুলো ছাড়া বেশি কিছু তিনি দেখেননি, এতদসত্ত্বেও মার্কস তাঁর শেষ লেখাগুলোতে এমন কিছু গভীর মন্তব্য রেখে গেছেন। পরবর্তীতে। তাঁর অনুসারীরা সেগুলোকে সাম্রাজ্যবাদ তত্ত্ব বিনির্মাণের সূচনা। পর্ব হিসেবে ব্যবহার করেছেন। মার্কসীয় সাম্রাজ্যবাদ তত্ত্ব বিনির্মাণে যার নামটি সবার আগে আসে তিনি হলেন এঙ্গেলস। এঙ্গেলস এর ধারণা ও মতাদর্শ ব্যতীত মার্কসীয় সাম্রাজ্যবাদ তত্ত্ব অসম্পূর্ণ।
সীমিত দায়দায়িত্বের বড় বড় কোম্পানিগুলো দ্রুত বিকাশকে অধ্যয়ন করতে গিয়ে মার্কস তাঁর 'Das Capital' গ্রন্থের তৃতীয় খণ্ডের ২৩নং অনুচ্ছেদে উল্লেখ করেন যে, মুষ্টিমেয় পুঁজিপতিদের আগ্রাসনে অধিকাংশ পুঁজিপতিরা হারিয়ে যাওয়ার যে নতুন রূপটি দৃশ্যমান হচ্ছে এসব কোম্পানি তারই প্রতিনিধিত্ব করছে। মার্কস-এর ভাষায়, "These companies represent a new form of the expropriation of mass of capitalists by a small handful of capitalists." অর্থাৎ, এই কোম্পানিগুলো মুষ্টিমেয় পুঁজিপতিদের দ্বারা পুঁজিপতিদের একটা নতুন ধরনের বাজেয়াপ্তকরণ নির্দেশ করে।
তিনি আরো বলেন, "In this expropriation the legal owner loses his function as entrepreneur and abandons his role in the process of production and his position of command over the productive forces and the labour force." অর্থাৎ, এই বাজেয়াপ্তকরণ প্রক্রিয়ায় পুঁজির আইনগতভাবে বৈধ মালিক উদ্যোক্তা হিসেবে তার কার্যক্রম হারায় এবং সাথে সাথে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় তার ভূমিকা এবং উৎপাদন শক্তি ও শ্রম শক্তির উপর তার যে নিয়ন্ত্রণমূলক অবস্থান ছিল তাও হারায়।
এমনকি ব্যক্তিগত সম্পত্তিও নিরুদ্ধ হচ্ছে। তবে এটি নিরুদ্ধ হচ্ছে সামষ্টিক মালিকানার অনুকূলে নয় বরং মুষ্টিমেয় পুঁজিপতির ব্যক্তিগত মালিকানার অনুকূলে। Marx তাঁর - "Capital' গ্রন্থে মুনাফার হার হ্রাসের বিপরীতধর্মী প্রবণতা বর্ণনা করতে গিয়ে অনুন্নত দেশগুলোতে পুঁজির রপ্তানির গুরুত্ব বর্ণনা করেন। তিনি তার ধারণাটিকে আরো কিছুটা সাধারণীকরণ করে বলেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইতে গিয়ে ধনতান্ত্রিক সমাজকে অবশ্যই প্রতিনিয়ত এর মৌল কাঠামো ও শোষণের পরিধি বৃদ্ধি করতে হবে।
মার্কসের এই মন্তব্যের সাথে Engels আরো বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে অন্যান্য কাঠামোগত প্রপঞ্চগুলোর উপর দৃষ্টি দিয়েছেন যেগুলোর উপর সাম্রাজ্যবাদের অন্যান্য তাত্ত্বিকগণ গুরুত্বারোপ করেছেন। Engels-এর ভাষায়, শিল্পবিপ্লবের শুরু থেকে ১৮৭০-এর দশক পর্যন্ত ইংল্যান্ড বিশ্ববাজারের উপর একচ্ছত্র শিল্পের আধিপত্য চর্চা করেছিল। এ ধরনের একচ্ছত্র আধিপত্যের জন্য ধন্যবাদ। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের সময় ক্রাফট ইউনিয়নের উদ্ভব ঘটে, ইংরেজ পুঁজিবাদ শ্রমিক শ্রেণির একটি অংশকে গুরুত্বপূর্ণ অনুমোদন প্রদান করে। কিন্তু উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে জার্মান, ফরাসি এবং আমেরিকানরা ইংরেজদের একচেটিয়া আধিপত্যে অনুপ্রবেশ করে এবং এটি গ্রেট বিটেনে তীব্র শ্রেণিসংগ্রামের একটি পর্যায়ের সূচনা করে।
উপসংহার: উপর্যুক্ত আলোচনা পরিশেষে বলা যায় যে, মার্কস ও এঙ্গেলস-এর সাম্রাজ্যবাদ তত্ত্বের মূলকথা, হলো, পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় শ্রমিক শোষণ ও শ্রেণিসংগ্রাম যখন তীব্রতর রূপ ধারণ করে তখন সাম্রাজ্যবাদের সূচনা ঘটে। বস্তুত মার্কস ও এঙ্গেলস ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে বুর্জোয়া শ্রেণির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট পরিবর্তন বলতে সাম্রাজ্যবাদ প্রত্যয়টি ব্যবহার করেছেন এবং এই পরিবর্তন মার্কস ও তার অনুসারীরা যে তাত্ত্বিক কাঠামোর মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছেন তাকে মার্কসীয় সাম্রাজ্যবাদ তত্ত্ব বলা হয়। পুঁজিবাদী সমাজ, বুর্জোয়া শ্রেণির সুনির্দিষ্ট সাধারণ পরিবর্তন, একটা একচেটিয়া বিশ্ববাজার, শ্রেণিসংগ্রাম প্রভৃতি বিষয়গুলো মার্কস ও এঙ্গেলস-এর সাম্রাজ্যবাদ তত্ত্বের মৌলিক বিষয়সমূহ।