প্যারেটোর রেসিডিউস ও ডেরিভেশন বলতে কি বুঝ?
ভূমিকা:- ইতালীয় সমাজবিজ্ঞানী ভিলফ্রেডো প্যারেটো (Vilfredo Pareto) সমাজবিজ্ঞানের জটিল আচরণকে ব্যাখ্যা করতে মনোবিজ্ঞানভিত্তিক এক নতুন ধারণা উপস্থাপন করেন। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ The Mind and Society (1916)-এ তিনি দেখিয়েছেন যে সমাজ কেবল প্রতিষ্ঠান বা কাঠামোর সমষ্টি নয়; বরং মানুষের আচরণ, অনুভূতি, চেতনা ও মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতার সমন্বিত রূপ। মানুষের আচরণ অনেক সময়ই যুক্তিভিত্তিক নয়, বরং আবেগ, প্রবৃত্তি ও অচেতন মানসিক উপাদান দ্বারা পরিচালিত। এই অযুক্তিক আচরণ বোঝাতে তিনি দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা ব্যবহার করেন: রেসিডিউস (Residues) এবং ডেরিভেশন (Derivations)।
রেসিডিউস (Residues):
প্যারেটোর মতে, মানুষের আচরণের পেছনে যে গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও জৈবিক উপাদান কাজ করে, তাকে বলা হয় রেসিডিউস। এটি কোনো নির্দিষ্ট আবেগ নয়; বরং মানুষের মনোজগতের গভীরে থাকা স্থায়ী মানসিক অবস্থা। তিনি রেসিডিউসকে বলেছেন; “manifestation of sentiments”, অর্থাৎ ‘‘মানুষের অভ্যন্তরীণ অনুভূতির প্রকাশ।’’
প্যারেটো রেসিডিউস সম্পর্কে কিছু মূল বৈশিষ্ট্য
১. রেসিডিউস মানুষের গভীর মনস্তাত্ত্বিক অবস্থার প্রতিফলন:
এগুলো মানুষের দৈনন্দিন মনোভাব নয়, বরং ব্যক্তিত্ব ও আচরণের অচেতন স্তরের সাথে সম্পর্কিত। তাই এগুলো আবেগ বা অনুভূতির সাময়িক পরিবর্তনের মতো নয়।
২. রেসিডিউস হলো সহজাত প্রবৃত্তির সাথে সম্পর্কিত শক্তি:
যদিও রেসিডিউসকে পুরোপুরি জৈবিক প্রবৃত্তি বলা যায় না, তবুও এগুলোর সাথে মানুষের সহজাত অন্তর্নিহিত প্রবণতার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। এটি আংশিক জৈবিক, আংশিক মনস্তাত্ত্বিক উপাদান।
৩. রেসিডিউস ব্যাখ্যাতীত ও প্রায় অপরিবর্তনীয়:
প্যারেটো বলেন, রেসিডিউস হলো মানুষের এমন অভ্যন্তরীণ শক্তি যা সহজ ব্যাখ্যায় ধরা যায় না এবং সময়ের সাথে সহজে পরিবর্তিতও হয় না। এটি এক ধরনের স্থায়ী মানসিক কাঠামো।
অর্থাৎ রেসিডিউস হলো ব্যক্তির জৈবিক ও মনস্তাত্ত্বিক অবস্থার এমন সমন্বিত শক্তি, যা মানুষের আচরণের মূল চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করে।
এগুলো আবেগ নয়, আবার সম্পূর্ণ প্রবৃত্তিও নয়; বরং দুইয়ের মিশ্রণে তৈরি মানসিক ভিত্তি।
ডেরিভেশন (Derivation) সংজ্ঞা
সাধারণ অর্থে Derivation হলো Residues এর ব্যাখ্যা । এগুলো সাধারণ কোন নির্দিষ্ট কাজ বা চিন্তার যুত্তি প্রদান করে থাকে।
প্যারেটোর মতে, মানুষ অধিকাংশ সময়েই যুক্তিহীন বা অযৌক্তিক আচরণ করে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো মানুষ পরবর্তীতে সেই অযৌক্তিক আচরণকে যুক্তিযুক্ত করে তুলতে বিভিন্ন ব্যাখ্যা, যুক্তি, তর্ক বা নিয়ম তৈরি করে। এই যুক্তিকরণ বা বৈধতা দেওয়ার প্রচেষ্টাকেই বলা হয় ডেরিভেশন।
ডেরিভেশন হলো রেসিডিউসের ব্যাখ্যা অর্থাৎ মানুষের আচরণ আসলে রেসিডিউস দ্বারা পরিচালিত, কিন্তু সে আচরণকে সমাজে গ্রহণযোগ্য করতে মানুষ যুক্তির আশ্রয় নেয়। সেই যুক্তির কাঠামোকেই প্যারেটো "ডেরিভেশন" বলেছেন।
ডেরিভেশনের বৈশিষ্ট্যসমূহ
১. অযুক্তিক আচরণকে যৌক্তিক রূপ দান:
মানুষ প্রথমে আবেগ, প্রবৃত্তি বা অচেতন দ্বারা প্রভাবিত হয়ে কাজ করে। পরে সেই কাজকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করে যৌক্তিক দেখাতে চায়।
২. এটি আচরণের পরবর্তী ব্যাখ্যা:
আচরণ ঘটে যাওয়ার পর মানুষ তার যথার্থতা প্রমাণের চেষ্টা করে।
৩. সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য ভাষ্য তৈরি:
ডেরিভেশন সমাজে আচরণকে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে যুক্তিপূর্ণ ব্যাখ্যার কাঠামো তৈরি করে।
অতএব, ডেরিভেশন হলো মানুষের ভ্রান্ত বা অযুক্তিক আচরণকে যুক্তি, তর্ক ও ব্যাখ্যার মাধ্যমে যৌক্তিক প্রমাণের প্রচেষ্টা।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় প্যারেটো ডেরিভেশন বলতে বুঝিয়েছেন এমন এক যুক্তিহীন ক্রিয়াকে যেগুলো মানুষ নানা রকম তর্ক, যুক্তি, ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের মাধ্যমে যৌক্তিকরনের চেষ্টা করে থাকে।
