আদিবাসী সমাজে নারীদের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা
ভূমিকা: আদিবাসী জীবনে নারীর স্থান অনেক উচ্চে। এ সমাজে নারী একজন সম্পূর্ণ মানুষ। এ সমাজে ঘরের মধ্যে নারী স্বাধীন, ঘরের বাইরের ও স্বাধীন। আদিবাসী সমাজে নারী কাজ করায় স্বাধীনতা নিয়েই জন্যায় এবং বোড় ওঠে। আদিবাসী জীবনে ধর্ষণ, শোষণ এসব ছিল না। গাড়ো ভাষায় নারীদের অবনমিত সে লাঞ্ছিত করে এমন কোনো শব্দই নেই। সংসারের নকল কাজে আদিবাসী নারী পুরুষ সঙ্গী থাকে। অনেক আদিবাসী। সমাজে নারীকে রক্ষাকর্ত্রী হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়েছে। আদিবাসী সমাজে কোনো বরপণ ছিল না, যৌতুক নেয়া হতো না। এখানে তাই যৌতুকের কারণে নারী নির্যাতন ঘটে না।
আদিবাসী সমাজে নারীদের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থান
১. সমাজ ও পরিবারে আদিবাসী নারীর অবস্থান:
সমতাভিত্তিক সমাজব্যবস্থা আদিবাসী ঐতিহোর প্রধানতম অনুষঙ্গ। এই সমতা কেবল অর্থনৈতিক দিকে দিয়েই নয়, বরং স্বনির্ভরতার অন্যতম স্তম্ভ। ফলে বাঙালি সমাজের মতো তাদের উপেক্ষিত হতে হয় না। নিজেরাই নিজেদের পরিবার ও সমাজে আত্মমর্যাদাসম্পন্ন অবস্থান তৈরি করে নেয়। সুখের দিনে, দুঃখের দিনে উৎসব। আয়োজনে এই সমাজে নারী-পুরুষের সম্পর্ক বন্ধুপ্রতিম। নারী এখানে সম্পূর্ণ মানুষ। তারা ঘরে বাইরে সর্বত্র স্বাধীন, যতটা স্বাধীনতা নিয়ে একটি মানুষ জন্মায়। আদিবাসীদের ঐতিহ্যগত উপকথা, লোককথা, ছড়া, কাহিনি প্রভৃতি মৌলিক সাহিত্যে নারীর অবস্থান অনেক উর্ধ্বে। গারো ও খাসিয়া ভিন্ন এদেশের সকল আদিবাসী সমাজ পিতৃতান্ত্রিক হলেও কারণে অকারণে পিতৃতন্ত্রের পীড়ন নেমে আসে না আদিবাসী নারীদের ওপর।
তবে প্রতিবেশী বাঙালিদের প্রথাগত যৌতুক-সংস্কৃতির সংক্রমণে কলুষিত হচ্ছে আদিবাসী নারীর স্বপ্ন জগৎ। নিজ সমাজ ও নিজ পরিবারে নারীর অবস্থান সহনীয় হলেও, বিয়ের পর অধিকাংশ নারীর দুর্ভোগের জীবন শুরু হয়। একই পুরুষ পিতা হিসেবে কন্যার জন্য যতটা সহমর্মী, স্বামী হিসেবে ততটা নয়। অধিকাংশ আদিবাসী পরিবারে এই বাস্তবতা অতিক্রান্ত সময়ের সাথে সাথে ক্রমশ আরও প্রকট হয়ে ওঠে। অথচ কয়েক বছর আগেও মেয়ের বাবাকে উপযুক্ত পণ দিয়ে বিয়ে করাতে হতো আর এখন ছেলে পক্ষকে খুশি করতে হয় সবার আগে। অথচ বাঙালি সমাজে অধিকাংশ নারী বিয়ের পর ঘর-গৃহস্থালির কাজের মধ্য অবদ্ধ থাকলেও আদিবাসী নারীকে বিয়ের পরপরই স্বামীর মত কাজের সন্ধানে বাইরে বেরোতে হয়। তবুও তাদের যৌতুক নিতে হচ্ছে। সম্প্রতি কয়েক বছর ধরে বিশেষ করে সমতলের আদিবাসী জাতিগুলোর মধ্যে যৌতুকের প্রভাব ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ায় যেমন তাদের বিবাহরীতি স্বাতন্ত্র্য নষ্ট হচ্ছে, তেমনি বেড়ে যাচ্ছে যৌতুক, পারিবারিক অশান্তি ও নারী শিক্ষায় ক্রমাবনতি।
অধিকাংশ আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সামাজিক আইনে পিতা ও স্বামীর স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তিতে কন্যা ও স্ত্রীর কোনো অধিকার থাকে না। এক্ষেত্রে পিতৃতান্ত্রিক মাহাতো সম্যাজর কথা উল্লেখ করা হয় যেখানে জমি বা সহায়-সম্পত্তিতে কন্যা সন্তানের অধিকার থাকেনা। তবে মায়ের কাছে থেকে আংশ পাওয়ার সামাজিক রীতি রযেছে। একইভাবে মাহাতো সমাজে পবিবারে পিতার পুত্র সন্তান না থাকলে সেক্ষেত্রে মেয়েদের পূর্বে পিতার সম্পত্তিতে অধিয়ার পায় পিতার ভাইয়ের ছেলেরা। মোট সম্পত্তির ৪ ভাগের তিন ভাগ পায় ভাইয়ের ছেলে ১ ভাগ পায় কন্যারা। কিন্তু সম্প্রতি এর কিছুটা পরিবর্তন ঘটছে। এখন অধিভাংশ পিতা তার ভাইয়ের ছেলেদের চেয়ে তার কন্যাদের অগ্রাধিকার দিয়ে থাকেন। ছেলে না থাকালে মৃত্যুর পর ভাইয়ের ছেলেকে দিয়ে মুখে আগুন দিতে হয়। এজন্যে ভাইয়ের ছেলেদের সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা যায় না। এটাই মাহাত্মাদের সামাজিক রীতি।
আদিবাসি নারীদের রাজনৈতিক অবস্থান:
অনেক আনিবাসী স্বামীর হাতে বা বয়স্ক পুরুষের হাতে ন্যস্ত। মাতৃতান্ত্রিক আদিবাসী সমাজে সম্পত্তি ও বংশনাম মাতৃসূত্রীয় ধারায় বর্তায়। এক্ষেত্রে পরিবার মাতৃপ্রধান।
অদিবাসী সমাজে গণ্যমান্য ব্যক্তিরা বিচার কাজ করে থাকে। তবে এক্ষেত্রে একক নেতৃত্ব সমাজ গড়ে ওঠেনি। তবে স্থানীয় নেতৃত্ব ঐতিহ্যগতভাবে নারীবর্জিত। কিন্তু সম্প্রতি এসব ক্ষেত্রে নারীদের অন্তর্ভুক্তি ঘটেছে। বর্তমানে আদিবাসী সমাজে কেন্দ্রীয় প্রশাসন যন্ত্রের বিকাশ ঘটেছে বিধায় বর্তমানে নেতৃত্ব ও বিচারেও এসেছে পরিবর্তনের ছোঁয়া।
আদিবাসী নারীদের অর্থনৈতিক অবস্থা আদীবাসী সমাজে নারী, পুরুষের চেয়ে উদ্ভাবন শক্তি বেশি এবং নারীরাই স্থানীয় ঐতিহ্য আর জ্ঞানের বাহন। বাঙালি হিন্দু ও মুসলামান সমাজের নারীদের মত এদের জীবনের পুরোভাগ চার দেয়ালের মধ্যে আবদ্ধ নয়। জীবিকানির্বাহসহ প্রয়োজনীয় প্রতিটি ক্ষেত্রে তারা পুরুয়ের সহযোগী, সহকর্মী। প্রতিবেশী সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজের নারীদেন মতো আদিবাসী নারীরা কেবল রান্নাঘর এ গৃহবধুর ভূমিকা পালন করে না, তারা ঘরের বাইরে খেত খামারের কাজে জুম চাষে যায়, নিজ হাতে খরচাপাতি করে, উৎসব-আয়োজনে একত্রে মদপান করে।
কিছু কিছু আদিবাসী সম্প্রদায়ে পূর্বে সামাজিকভাবে বাইরে কাজ করায় ক্ষেত্রে, নারী-পুরষের বিভেদ থাকলেও বর্তমানে তাদের নিত্য অভাব সেই সামাজিক প্রথাকে ভেঙে দিয়েছে। এখন কাজের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষে বিভেদ নেই। তবে মজুরির বেলায় কিছুটা বিভেদ লক্ষ্য করা যায়। তবে তা অঞ্চলেভেদে ওঠা নামা করে। আদিবাসী নারীরা কর্মক্ষেত্রেও একই রকমভাবে অবমূল্যায়িত। দু-একটি বাদে সব এলাকার আদিবাসী নারী দিনমজুর যা শ্রমিকরা মজুরিবৈষম্যের শিকার। কোথাও এই বৈষম্যের পরিমাণ শতকরা ১০ ভাগ, কোথাও ৪০ ভাগ। অথচ পুরুষরাও স্বীকার করে নারীো তাদের চেয়ে বেশি শ্রম দেয়। কর্মসংস্থানের অভাব থাকায় আদিবাসী নারীদের এই বৈষম্য মুখ বুঝে মেনে নেয়া ছাড়া কিছু করার থাকে না।
অথচ আদিবাসী সমাজের পুরুষদের চেয়ে নারীরা সবসময়েই বেশি শ্রম দেয়, যাবতীয় ব্যাপারে অপেক্ষাকৃত বেশি সচেতন।। কিন্তু তবুও খুব কম ক্ষেত্রেই তাদের মতামতের মূল্য দেয়া হয় বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। প্রচলিত পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পুরুষ সকল ক্ষেত্রে প্রাধান্য ও প্রতাব বজায় রাখতে এটাই যেন স্বাভাবিক নিয়ম। অধিকাংশক্ষেত্রেই নারীরাই দিনশেষে মাতাল স্বামীর নির্যাতনের শিকার হন। কোনো কোনো পুরুষ মদ খেয়ে অলস হয়ে বেকার জীবন কাটায়। অবশ্য এক্ষেত্রে গারো ও খাসিয়া জনগোষ্ঠীতে নারীর অবস্থান ব্যতিক্রম এবং তা সম্ভব হয়েছে কেবল সেখানে মাতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা চালু হয়েছে বলে।
আদিবাসী নারীদের ক্ষমতায়ন:
কৃষিভিত্তিক সভ্যতার শুরুর পথে অধিকাংশ বা প্রায় সকল জাতির সমাজব্যবস্থা মাতৃতান্ত্রিক ছিল। কেননা, পুরুষরা সাধারণত পশুপালনে প্রবৃত্ত থাকত। এরপর যখন দেখা যায়, পশুপালনের চেয়ে কৃষিকাজ অধিক লাভজনক, তখন পুরুষরা ক্রমশ নারীদের কাছে থেকে কৃষিকে নিজেদের অধিকারে নিতে থাকে এবং এমনি করে এক সময় সারা সমাজব্যবস্থাকেই পুরুষদের মর্জিমাফিক রীতি-পদ্ধতি অনুযায়ী বিন্যস্ত করে। একইভাবে শুরু হয় নারীর প্রতি পুরুষতন্ত্রের বহুমুখী আইন ও বৈধ অন্যায় আচরণের। পৃথিবীর ইতিহাস থেকে ক্রমশ বিলুপ্ত হতে থেকে থাকে নারীর জম্মগত স্বাধীনতা।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, আদিবাসীদের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা বাঙালি হিন্দু ও মুসলমান সমাজের বাহণ মতো নয়। আদিবাসী সমাজে নারী পুরুষের চেয়ে উদ্ভাবন শক্তি বেশি এবং নারীরাই স্থানীয় ঐতিহ্য জীবিকানির্বাহসহ, রাজনৈতিক প্রশাসনিক প্রয়োজনীয় প্রতিটি ক্ষেত্রে তারা পুরুষের সহযোগী সহকর্মী।




