বিবর্তন কি? হার্বার্ট স্পেন্সারের সামাজিক বিবর্তন তত্ত্ব আলোচনা কর

বিবর্তন কী? হার্বার্ট স্পেন্সারের সামাজিক বিবর্তন তত্ত্ব

ভূমিকা:- "বিবর্তন কী এবং সমাজবিজ্ঞানের জনক হিসেবে খ্যাত হার্বার্ট স্পেন্সারের সামাজিক বিবর্তন তত্ত্ব কীভাবে সমাজকে ব্যাখ্যা করে- তা প্রতিটি সমাজতত্ত্বের শিক্ষার্থীর জানা জরুরি। সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে সমাজ হলো একটি স্বাভাবিক ‘Super-organic system’ বা অতি-জৈব ব্যবস্থা। এটি বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে এমন এক নেটওয়ার্ক তৈরি করে, যা ব্যক্তির জীবনধারণকে অর্থবহ করে তোলে।

প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী হার্বার্ট স্পেন্সারের মতে, সমাজ কতগুলো সুশৃঙ্খল কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অবিরত পরিবেশের সাথে সংগ্রামে লিপ্ত থাকে। এই জীবন সংগ্রামে হয় সমাজ বিবর্তিত হয়ে টিকে থাকে, না হয় তার পতন ঘটে। মূলত সরল সমাজ থেকে জটিল সমাজে উত্তরণের এই নিরন্তর প্রক্রিয়াই হলো সামাজিক বিবর্তন। আজকের নিবন্ধে আমরা স্পেন্সারের এই যুগান্তকারী তত্ত্বটির বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।"

বিবর্তন কি? হার্বার্ট স্পেন্সারের সামাজিক বিবর্তন তত্ত্ব

হার্বার্ট স্পেন্সারের বিবর্তন

হার্বার্ট স্পেন্সার ১৮২০ সালে ইংল্যান্ডের ডার্বি নগরে জন্মগ্রহণ করেন। উনবিংশ শতাব্দীতে ইংল্যান্ডে নতুন ধারণা প্রবর্তিত হয়, ধর্মের বিরুদ্ধে প্রকাশিত হয় অনেক বক্তব্য। তাত্ত্বিকদের চিন্তা হয়ে উঠে পার্থিব।

বিবর্তন বা অভিব্যক্তি হলো এমন একটি জীববৈজ্ঞানিক ধারণা যা প্রজম্ম থেকে প্রজম্মান্তরে জীবের গাঠনিক ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যর ক্রমপরিবর্তনকে বোঝায়। তখন এ বক্তব্য প্রতিষ্ঠিত হয় যে, মানুষ বিশেষ ধারায় বিবর্তনের মাধ্যমে এই বর্তমানে এসে পৌছেছে।

H. Spencer তাঁর প্রখ্যাত ‘Social Statics’ গ্রন্থে সামাজিক বিবর্তনের উপর নতুন দর্শন প্রকাশ করেন। তিনি মনে করেন বিবর্তন হচ্ছে সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা একটি নির্দিষ্ট নিয়মে সম্পাদিত হয়। বিবর্তন হলো একটি আকস্মিক ভাঙনের ঘটনা যা সমাজ সৃষ্টি করে।

H. Spencer (হার্বার্ট স্পেন্সার) মনে করেন ‘‘বিবর্তন সর্বদা অগ্রগামী ও সর্বজনীন’’। তিনি আরও বলেন ‘‘ There is an evolution from incoherent homogeniety to incoherent heterologeneity’’ এভাবে সমাজ সমরুপ আবস্থা হতে বিবর্তনের মাধ্যমে অগ্রগামী হয় এবং বিভিন্নরুপে বিস্তৃত হয়। তিনি তার এ ধারণা নিয়েছেন জীববিজ্ঞান থেকে। জীব যেমন এককোষী দেহ হতে বহুকোষি দেহে বিকশিত হয় তেমনি তার সমাজ পরিবর্তনের ব্যাখ্যাটিও।

স্পেন্সার সমাজ পরিবর্তন ব্যাখ্যাটিতে যে সূত্র প্রদান করেছেন তাহলো সমাজের এই পরিবর্তন চক্রাকার ও অগ্রগামী এবং বিবর্তন হচ্ছে উন্নয়ন যা দ্রুত বিস্তার ঘটায় যেখানে সমাজ অত্যান্ত সাধারণ অবস্থা হতে বিভিন্ন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে জটিল ও সংঘটিত অবস্থায় রূপান্তরিত হয়।

হার্বার্ট স্পেন্সারের সামাজিক বিবর্তন তত্ত্ব বিশ্লেষণ

H. Spencer এর মতে বিবর্তনের ধারা সমগ্র বিশ্বচরাচর জ্যোতিমন্ডল ও ভূত্বকের অভ্যন্তরেও ক্রিয়াশীল। উল্লেখ্য H. Spencer এর সামাজিক বিবর্তনবাদ প্রধানত অতি জৈবিক (Super Organic) ধারণার উপর ভিত্তি করে তৈরী হয়েছে। হার্বার্ট স্পেন্সার সুপার অর্গানিক লাইফ সম্পর্কে যা বুঝিয়েছেন তা মূলত সমাজ নির্ভর এবং সামাজিক ব্যবস্থার উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে। স্পেন্সার বস্তুত এ সমাজকেন্দ্রিক আলোচনায় অধিক আগ্রহী ছিলেন।তাই বিশ্বজনীন বিবর্তন ধারাকে প্রবিষ্ট করেছেন সমাজ বিবর্তনের গতিরেখা অন্বেষণের মাধ্যমে। H. Spencer এর মতে বিবর্তন প্রক্রিয়ার সমাজ বিকাশের ক্ষেত্রে তার নির্দিষ্ট কতকগুলো ধাপ রয়েছে। যেমন-

১। পরিধির বিস্তার

প্রাক সভ্যতার আদি লগ্নে প্রথম মানুষ যখন সভ্যতার দুয়ারে কারাঘাত করে, তখন পৃথিবী ছিলো তার কাছে বৈরী হওয়ার পরিপূর্ণ অনিশ্চিত এক বাসভূমি। ‘টিকে থাকার সংগ্রামে’ মানব সমাজ সমগ্র ভূবন ছিলো শুধুমাত্র নিজেকে কেন্দ করে। ক্রমান্বয়ে সভ্যতার উম্মেষের সাথে সাথে আত্মকেন্দিক এ জগৎ বিস্তৃত হতে থাকে, সংগী-সাথীকে কেন্দ্র করে ধীরে ধীরে যা পত্তন ঘটায় জনবসতির, সৃষ্টি হয় গোষ্ঠীর, গোষ্ঠীর সাথে গড়ে উঠে গোত্র, গোত্র হতে জাতি, রাষ্ট্র প্রভৃতির উদ্ভব ঘটে। এ বিস্তৃতি কেবলমাত্র বিমূর্ত সম্পর্কযুক্ত নয়। দৃশ্যমান আকৃতিগত ও বটে এ ব্যপ্ততা সমাজস্থ উপাদানগুলোর মধ্যে ঐক্যবিধান ও ঘটায়।

২। সামঞ্জস্য বা সংবদ্ধতা

ঐক্যবিতান ও বৈসাদৃশ্যর পরিবৃদ্ধি ধীরে ধীরে সংবদ্ধতা আনয়ন করে। যেমন সভ্যতার উষালগ্নে যাযাবর গোষ্ঠী বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিস্তৃত হচ্ছিল। এ বিস্তৃতি ঘটেছিল একাকী কিংবা দলগতভাবে। কিন্তু দলগতভাবে হলেও বৃহৎ গোষ্ঠী হতে তারা বিচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল। তাদের মধ্য কোন সামাজিক বা রাজনৈতিক অবস্থান ছিলো না। পরবর্তীতে তা ক্রমান্বয়ে বিক্ষিপ্ত গোষ্ঠীসমূহ হতে গোত্রের উদ্ভব হয় এবং গোত্রসমূহ সংবদ্ধ হয়।

৩। সুনির্দিষ্টতা

খাদ্য সংগ্রহ অর্থনীতি থেকে ক্রমান্বয়ে যাযাবর গোষ্ঠীর উত্তরণ ঘটে খাদ্য উৎপাদন অর্থনীতিতে। মানুষ যাযাবর অবস্থা ত্যাগ করে স্থায়ী বসতি স্থাপন করেন। ধীরে ধীরে সমাজস্থ সংগঠনগুলি সুনির্দিষ্ট হয়ে পড়ে। এ সুনির্দিষ্টতা বিভিন্ন ক্ষেত্রে লক্ষণীয়। যেমন- চিরাচরিত প্রথার অস্পষ্টতা ও ধ্রুমজাল ছিন্ন করে আইন তার নিজরুপে আত্মপ্রকাশ করে। প্রথা ও আইন দুটি ভিন্ন প্রত্যয়রুপে নির্দিষ্ট হয় এবং আইন একটি পরিপূর্ণ সত্তারুপে স্থায়িত্ব লাভ করে।

৪। বহুরুপিতা:

বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের সুনির্দিষ্টতার সাথে সাথে তাদের কর্মপদ্ধতিরও বিভিন্নতা দেখা দেয়। প্রাথমিক পর্যায়ে বিভিন্নমুখী প্রতিষ্ঠানগুলো অস্পষ্টভাবে মিশ্রিত ছিলো ‘পরিবার নামক’ একটি প্রতিষ্ঠানের আওতায়। ধীরে ধীরে তা পৃথক হয়ে পড়ে সত্যতার স্বকীয়তা অর্জন করে।

হার্বার্ট স্পেন্সারের মতে “উপযুক্ত প্রক্রিয়ায় সামাজিক বিবর্তন সূত্র পরিপূর্ণ হয় এবং একটি সরল সমাজকে পরিধির বিস্তার, সংঘবদ্ধতা এবং বহুরুপিতার উপাদানে বিভূষিত করে বিবর্তনের জটিলতম রুপের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। যেমন-

ক. সাদৃশ্যতার বিলুপ্তি:

আদিম সমাজে মৌলিক একক পরিবারের মধ্য সীমাবদ্ধ ছিলো বহুবিদ ও বিচিত্রমুখী কার্যাবলি। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে পরিবারের সীমিত গন্ডী ভেঙে প্রতিষ্ঠানগুলি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং একটি মাত্র সত্তা পরিবারের অন্তভূক্ত হয়।

খ. উপাদান সমূহের জ্যামিতিকহারে পরিবৃদ্ধি:

সমাজ বিকাশের ক্ষেত্রে দেখা যায় সমাজ বিকাশের সাথে সাথে সমাজস্থ উপাদানসমূহের বিস্তৃতি ও ঘটে জ্যামিতিক হারে।

গ. বিচ্ছিন্ন উপাদানসমূহের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য অর্জন প্রবণতা:

এক্ষেত্রে মূল সামাজিক সংগঠনের উপাদানরুপে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে বিবেচনা করা যেতে পারে এছাড়া পারিবারিক এককের পরিবর্তে যে প্রতিষ্ঠান সমূহের উদ্ভব ঘটে সে গুলোও বিবেচ্য হতে পারে। উভয় ক্ষেত্রে এ প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনসমুহের কর্মপদ্ধতি ও কার্যধারা সম্পূর্ণ ভিন্নমুখী। যেমন অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের মধ্য প্রণালীগত ও পদ্ধতিগত ভিন্নতা রয়েছে।

ঘ. অন্তর্গত শৃঙ্খলা ও ভারসাম্য অবস্থা:

সমাজে বিদ্যমান বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সমূহের মধ্য নিজস্ব স্বকীয়তা বিদ্যমান থাকলেও তাদের মধ্যে রয়েছে পারস্পারিক নির্ভরশীলতা যা সুষম ভারসাম্য বজায় রাখে।

হার্বার্ট স্পেন্সার বর্ণিত এ যে বিবর্তন প্রক্রিয়া এখানে তিনটি বৈশিষ্ট্য লক্ষনীয়। যথা- (ক) একত্রীকরণ (integration) (খ) পৃথকীকরণ (differentioation) (গ) নিয়মানুগত্য (determination)। এ তিনটি বৈশিষ্ট্যর উপস্থিতি সুস্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়ে উঠে স্পেন্সার প্রদত্ত সমাজ অগ্রসরতার আলোচনায়। প্রথমে একত্রীকরণ গড়ে উঠে সরল সমাজে ‘পরিবার’ নামক একককে কেন্দ্র করে। কেননা জনগণের বৃদ্ধি ও সংযোগের ক্ষেত্রে পরিবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা বহন করে। এছাড়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানাদির একত্রিত রুপটিও ছিল পরিবারের গন্ডিতেই। অতঃপর জটিল সমাজ ও যৌথ সমাজে এসে পৃথকীকরণ ঘটে আকৃতিগত, বিমূর্ত সম্পর্কগত এবং প্রক্রিয়াগত সবক্ষেত্রে যা পরবর্তীতে নিয়মানুগত্যকে অবলম্বন করে সামাজিক যোযোগ ব্যবস্থার বৈচিত্র ঘটিয়ে জাতিকে পরিণত করে। কেননা স্পেন্সারের মতে এ যে সমসত্ত্বতা (homogencity) থেকে অসমত্ত্বাতায় (heterogeneity) উত্তরণ তা পরিস্ফুটিত হয়ে উঠেছে যোদ্ধা সমাজ হতে শিল্প সমাজের উত্তরণের ক্ষেত্রে।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, হার্বার্ট স্পেন্সার প্রদত্ত সমাজ পরিবর্তনের বিবর্তনবাদী মতবাদ সমাজবিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ অবদান হিসেবে বিবেচিত। এই তত্ত্বের মাধ্যমে তৎকালীন সমাজব্যবস্থা, সামাজিক কাঠামো ও সমাজ পরিবর্তনের ধারাবাহিক রূপ সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। হার্বার্ট স্পেন্সারের মতে সমাজ একটি জীবের ন্যায় ক্রমাগত বিকাশমান, যেখানে সমাজের ভাঙন, পুনর্গঠন, ভারসাম্য সৃষ্টি এবং বিভিন্ন অংশের মধ্যে সমন্বয় সাধনের মধ্য দিয়েই সমাজ এগিয়ে চলে। কখনো সমাজে বিশৃঙ্খলা বা ভাঙন সৃষ্টি হয়, আবার সেই ভাঙনের মধ্য দিয়েই নতুন ভারসাম্য ও সংগঠিত কাঠামোর জন্ম হয় এই ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই মূলত সমাজ টিকে থাকে।

স্পেন্সার তার তত্ত্বে সমাজের এই পরিবর্তনশীল ও বিবর্তনশীল প্রকৃতিকে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। যদিও তার বিবর্তনবাদী মতবাদকে অনেক ক্ষেত্রে রক্ষণশীল এবং সামাজিক বৈষম্যকে পরোক্ষভাবে সমর্থনকারী বলে সমালোচনা করা হয়েছে, তথাপি সমাজ পরিবর্তন ও সামাজিক কাঠামো বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এই তত্ত্ব সমাজবিজ্ঞানের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

আরও জানুন- হারর্বাট স্পেন্সার -এর জীবনী ও রচনাবলি সম্পর্কে।

shikhaprotidin

I have a Master's degree in Sociology from the National University and I run my sociology and education platform Shikhaprotidin.com to help students.

নবীনতর পূর্বতন