Showing posts with label হার্বার্ট স্পেন্সার. Show all posts
Showing posts with label হার্বার্ট স্পেন্সার. Show all posts

হার্বার্ট স্পেন্সারের পরিচয় দাও। হার্বার্ট স্পেন্সার কে?

হার্বার্ট স্পেন্সার এর পরিচয়

ভূমিকা:- হার্বার্ট স্পেন্সার ছিলেন একজন প্রখ্যাত ইংরেজ সমাজবিজ্ঞানী এবং দার্শনিক। তিনি সমাজবিজ্ঞানের উদ্ভব ও বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তার তত্ত্ব ও চিন্তাভাবনাগুলি সমাজবিজ্ঞানের মূলধারা তৈরিতে প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে, স্পেন্সারের বিবর্তনবাদী তত্ত্ব সমাজবিজ্ঞানে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, সমাজের বিকাশও প্রাকৃতিক বিবর্তনমূলক প্রক্রিয়া দ্বারা প্রভাবিত।

হার্বার্ট স্পেন্সারের পরিচয় দাও।

হার্বার্ট স্পেন্সারের পরিচয়:

হার্বার্ট স্পেন্সারের জন্ম ১৮২০ সালের ২৭শে এপ্রিল ইংল্যান্ডের ডার্বিশায়ারে একটি প্রোটেস্ট্যান্ট পরিবারে। তাঁর পরিবারে সৃষ্টিশীলতা এবং তাত্ত্বিক চিন্তা চর্চা ছিল প্রধান। তার শিক্ষা জীবন এবং কর্মজীবন তাকে এমন জায়গায় পৌঁছে দেয় যেখানে তিনি সমাজবিজ্ঞানের অন্যতম প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত হন।

শিক্ষা জীবন ও কর্মজীবন:

স্পেন্সার ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র এবং তার চিন্তা-ভাবনা ছিল গভীর। তিনি প্রাথমিকভাবে কৃত্রিম কৌশল এবং উপযোগিতাবাদী শিক্ষায় মনোযোগী ছিলেন। ছাত্রজীবনে তাঁর সৎ ও কর্মঠ মানসিকতা তাকে একদিকে যেমন বিজ্ঞান ও দর্শনে দক্ষ করে তোলে, তেমনি সমাজবিজ্ঞানে তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার পথও প্রশস্ত করে।

কর্মজীবনে তিনি “Economist” পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেছেন এবং ১৮৩৭ সালে এক রেলওয়ে কোম্পানিতে সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ শুরু করেন। এছাড়া সমাজবিজ্ঞানে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন তত্ত্ব ও গ্রন্থ রচনা করেন।

লেখক হিসেবে স্পেন্সারের অবদান

হার্বার্ট স্পেন্সার শুধুমাত্র একজন সমাজবিজ্ঞানী ছিলেন না, তিনি একজন সফল লেখকও ছিলেন। সমাজবিজ্ঞান সম্পর্কিত তার গ্রন্থগুলির মধ্যে অন্যতম হলো:

*The Proper Sphere of Government

*Social Statics

*The Principles of Sociology

*The Man Versus the State

এই গ্রন্থগুলিতে তিনি সমাজের সংগঠন, রাষ্ট্রের ভূমিকা এবং ব্যক্তি ও সমাজের সম্পর্ক নিয়ে গভীর আলোচনা করেছেন। স্পেন্সারের এই গ্রন্থগুলি সমাজবিজ্ঞানে বৈজ্ঞানিক আলোচনার নতুন দিক উন্মোচন করে।

দৃষ্টবাদী দর্শনের বাহক

স্পেন্সার ছিলেন দৃষ্টবাদী দর্শনের অন্যতম প্রবক্তা। উনবিংশ শতাব্দীর ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী অগাস্ট কোঁত যখন দৃষ্টবাদী দর্শন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, স্পেন্সার সেই দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ অনুসারী ছিলেন। তিনি সমাজের কাঠামো এবং রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডকে প্রাকৃতিক বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছিলেন। তার দর্শন রাষ্ট্র, সমাজ এবং ব্যক্তির সম্পর্কের একটি বৈজ্ঞানিক পরিপ্রেক্ষিত প্রদান করেছিল।

সমাজবিজ্ঞানে স্পেন্সারের অবদান

হার্বার্ট স্পেন্সার সমাজবিজ্ঞানে বিশেষভাবে পরিচিত তাঁর সামাজিক ডারউইনবাদ (Social Darwinism) তত্ত্বের জন্য। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, সমাজের কাঠামো এবং ধাপসমূহও বিবর্তনমূলক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উন্নত হয়েছে। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, সমাজের বিভিন্ন অংশ যেমন রাষ্ট্র, অর্থনীতি এবং শিক্ষা—এগুলো প্রাকৃতিক বিবর্তনশীল প্রক্রিয়ায় বিকশিত হয়েছে। হার্বার্ট স্পেন্সারের এই তত্ত্ব আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

উপসংহার: সর্বশেষ বলা যায় হার্বার্ট স্পেন্সার ছিলেন একজন সফল সমাজবিজ্ঞানী এবং তার তত্ত্ব ও চিন্তাভাবনা সমাজবিজ্ঞানের বিকাশে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। তিনি সমাজবিজ্ঞানে দার্শনিক দিক উপেক্ষা করে বৈজ্ঞানিক আলোচনার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। সমাজবিজ্ঞানী হিসেবে হার্বার্ট স্পেন্সারের অবদান অমর হয়ে থাকবে। স্পেন্সারের গ্রন্থাবলি সমাজবিজ্ঞানের নানা দিক নিয়ে আলোচনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে এবং তার চিন্তা আজও সমাজবিজ্ঞানের গবেষণায় প্রভাব ফেলছে।

Harbert Spencer হার্বার্ট স্পেন্সারের জীবদেহ ও সমাজের মধ্যকার সাদৃশ্য বিশ্লেষণ

হার্বার্ট স্পেন্সারের জীবদেহ এবং সমাজের মধ্যকার সাদৃশ্য বিশ্লেষণ

ভূমিকা:- হার্বার্ট স্পেন্সার (Harbert Spencer) বিবর্তনবাদী তত্ত্বের মূলভিত্তি স্থাপনে জৈবিক সাদৃশ্য তত্ত্বের প্রচ্ছন্ন আবদান রেখেছেন। কেননা, তিনি সমাজের বিবর্তনকে প্রধানত জীবজগৎ এর বিবর্তনের সংঙ্গে একিভূত করে আলোচনা করেছেন। তিনি জীবদেহ এবং সমাজের মধ্যকার সাদৃশ্যতার বিশ্লেষই হার্বার্ট স্পেন্সারের “জৈবিক সাদৃশ্য তত্ত্ব” নামে পরিচিত। অতএব জীবদেহ ও সমাজের মধ্যকার সাদৃশ্য বিশ্লেষণ কে হার্বার্ট স্পেন্সারের জৈবিক সাদৃশ্য তত্ত্ব বলা হয়। সামাজিক বিবর্তন ও জৈবিক সাদৃশ্যতত্ত্বে হার্বার্ট স্পেন্সারের অবদান অপরিসীম।
হার্বার্ট স্পেন্সার জীবদেহ ও সমাজের মধ্যকার সাদৃশ্য বিশ্লেষণ


জৈবিক সাদৃশ্য তত্ত্ব

হার্বার্ট স্পেন্সারের বিবর্তন তত্ত্বের মূল ভিত্তি স্থাপনে জৈবিক সাদৃশ্য তত্ত্বের অবদান অনস্বীকার্য। সামাজিক বিবর্তন ও জৈবিক সাদৃশ্যতত্ত্ব প্রদান করেছেন হার্বার্ট স্পেন্সার। তার এই জীবদেহ ও সমাজের মধ্যকার সাদৃশ্য বিশ্লেষণই জৈবিক সাদৃশ্য তত্ত্ব নামে পরিচিত। এই কারণে হার্বার্ট স্পেন্সারকে জৈবিক সাদৃশ্য তত্ত্বের প্রবক্তা বলা হয়।

জীবদেহ ও সমাজের মধ্যকার সাদৃশ্য বা জৈবিক সাদৃশ্যসমূহ

দৃশ্যত জীবদেহ ও সমাজ দুটি পৃথক সত্তা হলেও হার্বার্ট স্পেন্সারের জীবদেহ ও সমাজের মধ্য ব্যাপক সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়। নিম্নে হার্বার্ট স্পেন্সারের জীবদেহ ও সমাজের মধ্যকার সাদৃশ্যর বিষয়গুলোর উল্লেখ করে।
১। জীবদেহ ও সমাজের কাঠামোগত জটিলতা আকারের উপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ উভয়ের আকারগত সম্প্রসারণের মাধ্যমে তাদের কাঠামো গত জটিলতা বৃদ্ধি পায়।

২। উভয় ক্ষেত্রে কাঠামোগত পৃথকীকরণ তারতম্যর সৃষ্টি করে। যেমন- জীবদেহের প্রতিটি অঙ্গ ভিন্ন ভিন্ন ক্রিয়া সমাপাদন করে।

৩। ক্রমবিবর্তন সমাজ ও জীবদেহের মধ্য শুধু কাঠামোগত পার্থ্যকই প্রতিষ্ঠা করে না, তা উভয় সত্তা নিরুপণ করে সুনির্দিষ্ট সম্পর্ককে আবদ্ধ পার্থক্য নির্দেশ করে।

৪। জীবদেহের সচেতনতা কেন্দ্রিভূত হয় মূল সমষ্টির একটি ক্ষুদ্র অংশে কিন্তু সমাজে এটি বিস্তৃত হয় প্রতিটি ব্যক্তি বা সমাজের সদস্যের মধ্যে।

৫। সমাজ বিবর্তন ধারা ক্রমশ অগ্রগামী থাকে এবং এ বিবর্তনের শেষ ধাপ জানা নেই। অর্থাৎ সমাজে বিকাশ চলতে থাকে।

৬। জীবদেহ এবং সমাজ এক সময় ধ্বংস হয়ে যায় । অর্থাৎ সমাজ ও জীবদেহ উভয়েরই ধ্বংস অনিবার্য।কিন্তু জীবদেহ এবং সমাজের এককসমূহ টিকে থাকে।

৭। একটি জীব অন্য জীব হতে কোন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে পারে না তবে একটি সমাজ অন্য সমাজ হতে যে কোন সাংস্কৃতিক প্রশিক্ষণ গ্রহণে সক্ষম।

৮। জীবদেহ ও সমাজদেহ উভয়ই অজৈব সত্তা হতে পৃথক এবং উভয়ের বিকাশ ও প্রবৃদ্ধি দৃশ্যমান।

৯। মানুষের মস্তিষ্ক যেমন সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে, তেমনি সমাজের প্রতিষ্ঠানই সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করছে।

১০। জীবদেহের অঙ্গ সমূহ অবিচ্ছেদ্যভাবে পরস্পরের সংঙ্গে সংযুক্ত কিন্তু সমাজের অংশসমূহ তুলনামূলকভাবে স্বাধীন ও পৃথকযোগ্য।

উপসংহার: আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, হার্বার্ট স্পেন্সার জীববৈজ্ঞানিক ধারণার ভিত্তিতে সমাজকে একটি জৈবিক সত্তা হিসেবে ব্যাখ্যা করে এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গির সূচনা করেন। তিনি মনে করেন, যেমন একটি জীবদেহে বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গ পরস্পরের সাথে সমন্বিতভাবে কাজ করে, তেমনি সমাজেও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পরস্পরের উপর নির্ভরশীল থেকে সামগ্রিকভাবে সমাজ পরিচালনা করে। সামগ্রিক সমাজব্যবস্থায় মূল চালিকা শক্তি পারস্পরিক নির্ভরশীলতা। মূলত হার্বার্ট স্পেন্সার (Harbert Spencer) তাঁর জৈবিক সাদৃশ্য তত্ত্বে এই পারস্পরিক নির্ভরশীলতা দিকটিকেই বিধৃত করেছিলেন যা পরবর্তীতে আরও পুনঃবিন্যস্ত ও পরিবর্ধিত হয়ে তার উত্তরসূরীদের নতুন সিদ্ধান্তের সন্ধান দেয়।

হার্বার্ট স্পেন্সারের সমাজ পরিবর্তন তত্ত্ব আলোচনা কর।

হার্বার্ট স্পেন্সারের সমাজ পরিবর্তন তত্ত্ব

ভূমিকা:- সমাজবিজ্ঞানের ইতিহাস বিভিন্ন চিন্তাবিদ বিভিন্ন সময়ে সমাজবিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করেছেন। তেমনিভাবে ১৯ শতকের একজন বিখ্যাত সমাজ দার্শনিক হলেন হার্বার্ট স্পেন্সার (Herbert Spencer) । বিখ্যাত এই সমাজ দার্শনিক ১৮২০ সালে ২০ এপ্রিল ইংল্যান্ডে জম্মগ্রহন করেন। তিনি সমাজবিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন, বিশেষ করে সমাজ পরিবর্তনের বিষয়টি।

হার্বার্ট স্পেন্সারের সমাজ পরিবর্তন তত্ত্ব আলোচনা কর।


সাধারণ অর্থে সামাজিক পরিবর্তন

সমাজবিজ্ঞানীর মতে, পরিবর্তনশীলতা প্রকৃতির নিয়ম। মানবসমাজ নিয়মের অধীন। আজ সমাজে যে অবস্থা বিদ্যমান আগামীকাল সমাজের সে অবস্থা নাও থাকতে পারে। সকল সমাজ কমবেশি পরিবর্তনশীল।

সামাজিক পরিবর্তনের উপাদান

কোন কিছুর পরিবর্তনের মূলে কতকগুলো বিষয় কাজ করে। তেমনিভাবে সামাজিক পরিবর্তনের মূলেও কতকগুলি বিষয় কাজ করে। এই বিষয়গুলি হলো সামাজিক পরিবর্তন উপাদান। নিচে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান দুইটি আলোচনা করা হলো।

(১) মূখ্য উপাদান

হার্বার্ট স্পেন্সার (Herbert Spencer) এর মূখ্য উপাদান বলতে ব্যক্তির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে বুঝিয়েছেন। তিনি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বলতে বুঝিয়েছেন যা গোষ্ঠীর মধ্যে পরিবর্তনের সূচনা  করতে পারে। আর এগুলো হলো ব্যক্তির বুদ্ধিবৃত্তিক দৈহিক ও আবেগগত বৈশিষ্ট্য।

(২) গৌণ উপাদান

পরিবর্তনের ক্ষেত্রে আস্তে আস্তে মানুষ বিভিন্ন প্রয়োজনে অনেক কিছু উদ্ভাবন সম্ভব করে তোলে। পরিবর্তনের এই পর্যায়ের উপাদানগুলোও তাই মানবসৃষ্ট। মানুষ এই উপাদান গুলোকে বিভিন্ন সময়ে সৃষ্টি করেছে। নিচে এই গৌণ উপাদানগুলো আলোচনা করা হলো।

(ক) পরিবেশের প্রগতিসম্পন্ন পুনবিন্যাস

পরিবেশের প্রগতির জন্য মানুষ শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরী করেছে। যাতাযাতের জন্য তৈরী করেছে রাস্তাঘাট।

(খ) সমাজের আকারগত পরিবৃদ্ধি

সমাজ এর আকারগত পরিবর্তন ধীরে ধীরে সাধিত হয়। মানুষ তার প্রয়োজনে বিভিন্ন সংগঠন তৈরী করে।

(গ) ব্যক্তি ও সমাজে পারস্পরিক প্রভাব

ব্যক্তি ও সমাজ পরস্পর পরস্পরকে প্রভাবিত করে। হার্বার্ট স্পেন্সার তাঁর পদ্ধতিতেও এই বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশেও পরিবর্তন আনয়ন করে অর্থাৎ সমাজ ব্যক্তিকে প্রভাবিত করে।

(ঘ) অতিজৈব বস্তুর উদ্ভব ও বিকাশ

অতিজৈব বস্তু বলতে হার্বার্ট স্পেন্সার (Herbert Spencer) সেই সকল বিষয়কে বুঝিয়েছেন যা মানবদেহের বাইরের বিদ্যমান বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচিত।এই বৈশিষ্ট্য হলো নতুনভাবে অর্জিত বৈশিষ্ট্য।

(ঙ) সমাজের উপর পরিবেশগত উপাদানের প্রভাব

সমাজের উপর পরিবেশগত উপাদানের প্রভাব হার্বার্ট স্পেন্সার (Herbert Spencer) বলেছেন পরিবেশের উপর ভিত্তি করে অনেক কিছু পরিবর্তন সাধিত হয়। বিভিন্ন সামাজিক, পরিবেশগত উপাদান ব্যক্তি এবং সমাজের মধ্যে পরিবর্তন আনতে সহায়ক হয়।

পরিশেষে বলা যায় যে, হার্বার্ট স্পেন্সারের সমাজ বিবর্তন তত্ত্ব সামাজিক পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনি সমাজকে একটি জীবন্ত দেহের মতো বিবেচনা করে বলেছেন, সমাজও সময়ের সাথে ধীরে ধীরে বিবর্তিত হয়। তার মতে, ব্যক্তির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এবং সামাজিক প্রয়োজনের ফলে উদ্ভাবিত উপাদানসমূহ সমাজে পরিবর্তন আনে। তিনি ব্যক্তির মানসিক ও আবেগগত পরিবর্তন থেকে শুরু করে পরিবেশ, সমাজের আকারগত বৃদ্ধি, ও অতিজৈব উপাদানকে বিবর্তনের গৌণ উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। যদিও তার তত্ত্বে কিছু সীমাবদ্ধতা বা দুর্বলতা রয়েছে তবুও সমাজ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এটি একটি মৌলিক ও যুগান্তকারী চিন্তা। আধুনিক সমাজবিজ্ঞানীরা সমাজের গঠন ও বিকাশ বিশ্লেষণে স্পেন্সারের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এখনও অনুপ্রেরণা গ্রহণ করেন। তাই তার সমাজ বিবর্তন তত্ত্ব সমাজবিজ্ঞানে আজও প্রাসঙ্গিক।

সমাজবিজ্ঞানের উৎপত্তি ও বিকাশে হার্বার্ট স্পেন্সার (Herbert Spencer) এর অবদান আলোচনা কর।

সমাজবিজ্ঞানের বিকাশে হার্বার্ট স্পেন্সারের অবদান

ভূমিকা: সমাজবিজ্ঞান (Sociology) একটি স্বতন্ত্র বৈজ্ঞানিক শাস্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে দীর্ঘ সময় লেগেছিল। এই যাত্রায় যেসব মনীষী অবদান রেখেছেন, তাদের মধ্যে হার্বার্ট স্পেন্সারের নাম চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ফরাসী সমাজবিজ্ঞানী হার্বার্ট স্পেন্সার সমাজবিজ্ঞানের অনেক গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব উদ্ভাবন করেছেন, যা আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের ভিত্তি গঠনে সহায়ক হয়েছে। আজকের এই ব্লগ পোস্টে আমরা তার অবদান নিয়ে আলোচনা করব।

সমাজবিজ্ঞানের উৎপত্তি ও বিকাশে হার্বার্ট স্পেন্সার এর অবদান


হার্বার্ট স্পেন্সার: সমাজবিজ্ঞানে এক অনন্য নাম

হার্বার্ট স্পেন্সার ছিলেন একজন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী, যিনি সমাজবিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব উদ্ভাবন করেছেন। তার বিশিষ্ট তত্ত্বগুলোর মধ্যে রয়েছে সামাজিক বিবর্তন তত্ত্ব, অধিকার তত্ত্ব, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র‌্যবাদ এবং ক্রিয়াবাদী তত্ত্ব। এই তত্ত্বগুলো আধুনিক সমাজবিজ্ঞানে আজও প্রভাবশালী।

১. সামাজিক বিবর্তন তত্ত্ব:

স্পেন্সার সামাজিক বিবর্তন তত্ত্ব প্রদান করেন, যার মাধ্যমে তিনি সমাজের একরূপ থেকে অন্যরূপে পরিবর্তন হওয়ার প্রক্রিয়াকে ব্যাখ্যা করেন। তার মতে, সমাজ একটি জীবন্ত সত্তা, যা সময়ের সাথে সাথে উন্নতি ও পরিবর্তন ঘটায়। তার "Progress: Its Law and Cause" গ্রন্থে সামাজিক বিবর্তন তত্ত্ব ধারণাটি বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। স্পেন্সারের এই তত্ত্বের মাধ্যমে সমাজের পরিবর্তনকে প্রাকৃতিক এবং বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয়েছে।

২. ব্যক্তিস্বাতন্ত্র‌্যবাদ:

স্পেন্সার ব্যক্তিস্বাতন্ত্র‌্যবাদী হিসেবে পরিচিত। তার মতে, প্রত্যেক ব্যক্তি তার নিজস্ব স্বাধীনতা ভোগ করতে চায়। "The Man Versus the State" গ্রন্থে তিনি ব্যক্তির স্বাধীনতা এবং সরকারের হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করেন। তার মতে, স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিস্বাতন্ত্র‌্যবাদ সমাজের অগ্রগতির অন্যতম শর্ত।

৩. অধিকার তত্ত্ব:

হার্বার্ট স্পেন্সার তার অধিকার তত্ত্বে নারী, পুরুষ এবং শিশুর অধিকার নিয়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেন। তার মতে, সমাজে পুরুষ ও নারীর সমান অধিকার হওয়া উচিত, এবং শিশুরাও সমাজে স্বাধীনভাবে চলাফেরা এবং ভাববিনিময় করতে সক্ষম। এভাবে তিনি মানবাধিকার এবং সমতার ধারণাকে সমাজবিজ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত করেন।

৪. সমাজবিজ্ঞানের স্বতন্ত্র শাস্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা:

স্পেন্সার সমাজবিজ্ঞানের একটি স্বতন্ত্র শাস্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। তার মতে, সমাজবিজ্ঞান অন্য বিজ্ঞান থেকে আলাদা এবং এটি সমাজের কাঠামো, কার্যকলাপ এবং মানুষের জীবনধারা নিয়ে আলোচনা করে। সমাজবিজ্ঞানের এই ভিত্তি তার অবদান হিসেবে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

৫. সমাজতন্ত্রের নীতি:

স্পেন্সার সমাজবিজ্ঞানে দুটি মৌলিক নীতি প্রবর্তন করেন জৈবিক নীতি এবং সামাজিক পরিবর্তনের ধারা। তার মতে, সমাজের পরিবর্তন প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া হিসেবে ঘটে এবং এটি কোনো বাহ্যিক প্রভাব ছাড়া নিজস্ব গতিতে চলে।

৬. স্তর চিহ্নিতকরণ:

স্পেন্সার তার সমাজবিজ্ঞানের বিবর্তনে দুটি স্তরের কথা উল্লেখ করেছেন: সমরবাদ (Warrior Phase) এবং শিল্পবাদ (Industrial Phase)। প্রথম পর্যায়ে সমরবাদীরা সমাজের শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিল, এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে শিল্পবিপ্লবের মাধ্যমে সমাজে শিল্পের বিপ্লব ঘটেছিল। এই স্তরগুলির পরিবর্তন সমাজবিজ্ঞানের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

৭. ক্রিয়াবাদী তত্ত্ব:

স্পেন্সার ক্রিয়াবাদী তত্ত্ব উদ্ভাবন করেন, যেখানে তিনি সমাজকে একটি জৈব সত্তা হিসেবে দেখেছিলেন। তার মতে, সমাজের বিভিন্ন কাঠামো এবং অঙ্গ-প্রতিষ্ঠানগুলি একে অপরের সাথে ক্রিয়াশীলভাবে কাজ করে এবং সমাজের অগ্রগতি নির্ধারণ করে।

৮. অঙ্গ-প্রতিষ্ঠানের বিকাশ:

স্পেন্সার সামাজিক অঙ্গ-প্রতিষ্ঠানগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন:

  • সংরক্ষণমূলক ব্যবস্থা: এটি সমাজের মানুষের জীবনধারণের সাথে সম্পর্কিত।

  • বন্টনমূলক ব্যবস্থা: এখানে সমাজের শ্রম বিভাজন আলোচনা করা হয়।

  • নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা: এটি রাষ্ট্র সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে আলোচনা করে।

উপসংহারহার্বার্ট স্পেন্সারের সমাজবিজ্ঞানে অবদান আজও প্রাসঙ্গিক। তার তত্ত্বগুলি সমাজের বিবর্তন, স্বাধীনতা, অধিকার এবং সামাজিক কাঠামো নিয়ে গভীর দৃষ্টিকোণ প্রদান করে। সমাজবিজ্ঞানের ইতিহাসে তার অবদান চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে, এবং তিনি সমাজবিজ্ঞানের বিকাশে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত।

বিবর্তন কি? হার্বার্ট স্পেন্সারের সামাজিক বিবর্তন তত্ত্ব

বিবর্তন কি? হার্বার্ট স্পেন্সারের সামাজিক বিবর্তন তত্ত্ব

ভূমিকা:- সমাজ স্বাভাবিকভাবেই একটা  ‘super-organic system’ যা কতকগুলি সামাজিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্যক্তির জীবন ধারনের জন্য নেটওয়ার্ক তৈরী করে। এছাড়া সমাজ কতকগুলি সুশৃঙ্খল কর্মকান্ডের মাধ্যমে পরিবেশের সাথে সংগ্রামে লিপ্ত, সেখানে হয় সে টিকে থাকে নয়তো তার ভাঙন ঘটে, এভাবেই সমাজ এগিয়ে চলে বিবর্তনের পথে।
বিবর্তন কি? হার্বার্ট স্পেন্সারের সামাজিক বিবর্তন তত্ত্ব

হার্বার্ট স্পেন্সারের বিবর্তন

হার্বার্ট স্পেন্সার ১৮২০ সালে  ইংল্যান্ডের ডার্বি নগরে জম্মগ্রহণ করেন। উনবিংশ শতাব্দীতে ইংল্যান্ডে নতুন ধারণা প্রবর্তিত হয়, ধর্মের বিরুদ্ধে প্রকাশিত হয় অনেক বক্তব্য। তাত্ত্বিকদের চিন্তা হয়ে উঠে পার্থিব।

বিবর্তন বা অভিব্যক্তি হলো এমন একটি জীববৈজ্ঞানিক ধারণা যা প্রজম্ম থেকে প্রজম্মান্তরে জীবের গাঠনিক ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যর ক্রমপরিবরতনকে বোঝায়। তখন এ বক্তব্য প্রতিষ্ঠিত হয় যে, মানুষ বিশেষ ধারায় বিবর্তনের মাধ্যমে এই বর্তমানে এসে পৌছেছে। 

H. Spencer তাঁর প্রখ্যাত ‘Social Statics’ গ্রন্থে সামাজিক বিবর্তনের উপর নতুন দর্শন প্রকাশ করেন। তিনি মনে করেন বিবর্তন হচ্ছে সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা একটি নির্দিষ্ট নিয়মে সম্পাদিত হয় । বিবর্তন হলো একটি আকস্মিক ভাঙনের ঘটনা যা সমাজ সৃষ্টি করে।

H. Spencer (হার্বার্ট স্পেন্সার) মনে করেন ‘‘বিবর্তন সর্বদা অগ্রগামী  ও সর্বজনীন’’। তিনি আরও বলেন ‘‘ There is an evolution from incoherent homogeniety to incoherent heterologeneity’’ এভাবে সমাজ সমরুপ আবস্থা হতে বিবর্তনের মাধ্যমে অগ্রগামী হয় এবং বিভিন্নরুপে  বিস্তৃত হয়। তিনি তার এ ধারণা নিয়েছেন জীববিজ্ঞান থেকে । জীব যেমন এককোষী দেহ হতে বহুকোষি দেহে বিকশিত হয় তেমনি তার সমাজ পরিবর্তনের ব্যাখ্যাটিও।

স্পেন্সার সমাজ পরিবর্তন ব্যাখ্যাটিতে যে সূত্র প্রদান করেছেন তাহলো ‘‘A transformation from inorganic to organic and from organic to super organic.’’ তিনি মনে করেন সমাজের এ পরিবর্তন চক্রাকার ও অগ্রগামী এবং বিবর্তন হচ্ছে উন্নয়ন যা দ্রুত বিস্তার ঘটায় যেখানে সমাজ অত্যান্ত সাধারণ অবস্থা হতে বিভিন্ন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে জটিল ও সংঘটিত অবস্থায় রুপান্তরিত হয়।

হার্বার্ট স্পেন্সারের সামাজিক বিবর্তন তত্ত্ব বিশ্লেষণ

H. Spencer এর মতে বিবর্তনের ধারা সমগ্র বিশ্বচরাচর জ্যোতিমন্ডল ও ভূত্বকের অভ্যন্তরেও ক্রিয়াশীল। উল্লেখ্য H. Spencer এর সামাজিক বিবর্তনবাদ প্রধানত অতি জৈবিক (super organic) ধারণার উপর ভিত্তি করে তৈরী হয়েছে। হার্বার্ট স্পেন্সার সুপার অর্গানিক লাইফ সম্পর্কে যা বুঝিয়েছেন তা মূলত সমাজ নির্ভর এবং সামাজিক ব্যবস্থার উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে। স্পেন্সার বস্তুত এ সমাজকেন্দ্রিক আলোচনায় অধিক আগ্রহী ছিলেন।তাই বিশ্বজনীন বিবর্তন ধারাকে প্রবিষ্ট করেছেন সমাজ বিবর্তনের গতিরেখা অন্বেষণের মাধ্যমে। H. Spencer এর মতে বিবর্তন প্রক্রিয়ার সমাজ বিকাশের ক্ষেত্রে তার নির্দিষ্ট কতকগুলো ধাপ রয়েছে । যেমন-

১। পরিধির বিস্তার

প্রাক সভ্যতার আদি লগ্নে প্রথম মানুষ যখন সভ্যতার দুয়ারে কারাঘাত করে, তখন পৃথিবী ছিলো তার কাছে বৈরী হওয়ার পরিপূর্ণ অনিশ্চিত এক বাসভূমি। ‘টিকে থাকার সংগ্রামে’ মানব সমাজ সমগ্র ভূবন ছিলো শুধুমাত্র নিজেকে কেন্দ করে। ক্রমান্বয়ে সভ্যতার উম্মেষের সাথে সাথে  আত্মকেন্দিক এ জগৎ  বিস্তৃত হতে থাকে, সংগী-সাথীকে কেন্দ্র করে ধীরে ধীরে যা পত্তন ঘটায় জনবসতির, সৃষ্টি হয় গোষ্ঠীর, গোষ্ঠীর সাথে গড়ে উঠে গোত্র, গোত্র হতে জাতি, রাষ্ট্র প্রভৃতির উদ্ভব ঘটে। এ বিস্তৃতি কেবলমাত্র বিমূর্ত সম্পর্কযুক্ত নয়। দৃশ্যমান আকৃতিগত ও বটে এ ব্যপ্ততাসমাজস্থ উপাদানগুলোর মধ্যে ঐক্যবিধান ও ঘটায়।

২। সামঞ্জস্য বা সংবদ্ধতা

ঐক্যবিতান ও বৈসাদৃশ্যর পরিবৃদ্ধি ধীরে ধীরে সংবদ্ধতা আনয়ন করে। যেমন সভ্যতার উষালগ্নে যাযাবর গোষ্ঠী  বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিস্তৃত হচ্ছিল। এ বিস্তৃতি ঘটেছিল একাকী কিংবা দলগতভাবে। কিন্তু দলগতভাবে হলেও বৃহৎ গোষ্ঠী হতে তারা বিচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল। তাদের মধ্য কোন সামাজিক বা রাজনৈতিক অবস্থান ছিলো না। পরবর্তীতে তা ক্রমান্বয়ে বিক্ষিপ্ত গোষ্ঠীসমূহ হতে গোত্রের উদ্ভব হয় এবং গোত্রসমূহ সংবদ্ধ হয়।

৩। সুনির্দিষ্টতা

খাদ্য সংগ্রহ অর্থনীতি থেকে ক্রমান্বয়ে যাযাবর গোষ্ঠীর উত্তরণ ঘটে খাদ্য উৎপাদন অর্থনীতিতে। মানুষ যাযাবর অবস্থা ত্যাগ করে স্থায়ী বসতি স্থাপন করেন। ধীরে ধীরে সমাজস্থ সংগঠনগুলি সুনির্দিষ্ট হয়ে পড়ে। এ সুনির্দিষ্টতা বিভিন্ন ক্ষেত্রে লক্ষণীয়। যেমন- চিরাচরিত প্রথার অস্পষ্টতা ও ধ্রুমজাল ছিন্ন করে আইন তার নিজরুপে আত্মপ্রকাশ করে। প্রথা ও আইন দুটি ভিন্ন প্রত্যয়রুপে নির্দিষ্ট হয় এবং আইন একটি পরিপূর্ণ সত্তারুপে স্থায়িত্ব লাভ করে।

৪। বহুরুপিতা:

বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের সুনির্দিষ্টতার সাথে সাথে তাদের কর্মপদ্ধতিরও বিভিন্নতা দেখা দেয়। প্রাথমিক  পর্যায়ে বিভিন্নমুখী প্রতিষ্ঠানগুলো অস্পষ্টভাবে মিশ্রিত ছিলো ‘পরিবার নামক’ একটি প্রতিষ্ঠানের আওতায়। ধীরে ধীরে তা পৃথক হয়ে পড়ে সত্যতার স্বকীয়তা অর্জন করে।

হার্বার্ট স্পেন্সার এর মতে “উপযুক্ত প্রক্রিয়ায় সামাজিক বিবর্তন সূত্র পরিপূর্ণ হয় এবং একটি সরল সমাজকে পরিধির বিস্তার, সংঘবদ্ধতা এবং বহুরুপিতার উপাদানে বিভূষিত করে বিবর্তনের জটিলতম রুপের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। যেমন-

ক. সাদৃশ্যতার বিলুপ্তি:

আদিম সমাজে মৌলিক একক পরিবারের মধ্য সীমাবদ্ধ ছিলো বহুবিদ ও বিচিত্রমুখী কার্যাবলি । কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে পরিবারের সীমিত গন্ডী ভেঙে প্রতিষ্ঠানগুলি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং একটি মাত্র সত্তা পরিবারের অন্তভূক্ত হয়।

খ. উপাদান সমূহের জ্যামিতিকহারে পরিবৃদ্ধি:

সমাজ বিকাশের ক্ষেত্রে দেখা যায় সমাজ বিকাশের সাথে সাথে সমাজস্থ উপাদানসমূহের বিস্তৃতি ও ঘটে জ্যামিতিক হারে।

গ. বিচ্ছিন্ন উপাদানসমূহের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য অর্জন প্রবণতা:

এক্ষেত্রে মূল সামাজিক সংগঠনের উপাদানরুপে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে বিবেচনা করা যেতে পারে এছাড়া পারিবারিক এককের পরিবর্তে যে প্রতিষ্ঠান সমূহের উদ্ভব ঘটে সে গুলোও বিবেচ্য হতে পারে। উভয় ক্ষেত্রে এ প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনসমুহের কর্মপদ্ধতি  ও কার্যধারা সম্পূর্ণ ভিন্নমুখী। যেমন অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের মধ্য প্রণালীগত ও পদ্ধতিগত ভিন্নতা রয়েছে।

ঘ. অন্তর্গত শৃঙ্খলা ও ভারসাম্য অবস্থা:

সমাজে বিদ্যমান বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সমূহের মধ্য নিজস্ব স্বকীয়তা বিদ্যমান থাকলেও তাদের মধ্যে রয়েছে পারস্পারিক নির্ভরশীলতা যা সুষম ভারসাম্য বজায় রাখে।

হার্বার্ট স্পেন্সার বর্ণিত এ যে বিবর্তন প্রক্রিয়া এখানে তিনটি বৈশিষ্ট্য লক্ষনীয়। যথা- (ক) একত্রীকরণ (integration) (খ) পৃথকীকরণ (differentioation) (গ) নিয়মানুগত্য (determination)। এ তিনটি বৈশিষ্ট্যর উপস্থিতি সুস্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়ে উঠে স্পেন্সার প্রদত্ত সমাজ অগ্রসরতার আলোচনায়। প্রথমে একত্রীকরণ গড়ে উঠে সরল সমাজে ‘পরিবার’ নামক একককে কেন্দ্র করে। কেননা জনগণের বৃদ্ধি ও সংযোগের ক্ষেত্রে পরিবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা বহন করে। এছাড়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানাদির একত্রিত রুপটিও ছিল পরিবারের গন্ডিতেই। অতঃপ জটিল সমাজ ও যৌথ সমাজে এসে পৃথকীকরণ ঘটে আকৃতিগত, বিমূর্ত সম্পর্কগত এবং প্রক্রিয়াগত সবক্ষেত্রে  যা পরবর্তীতে নিয়মানুগত্যকে অবলম্বন করে সামাজিক যোযোগ ব্যবস্থার বৈচিত্র ঘটিয়ে জাতিকে পরিণত করে। কেননা স্পেন্সারের মতে ‘Evolution is a change from a state of relatively indefininite, incoherent, homogencity to a state of relatively, define, coherent heterogeneity.’ এ যে সমসত্ত্বতা (homogencity) থেকে অসমত্ত্বাতায় (heterogeneity) উত্তরণ তা পরিস্ফুটিত হয়ে উঠেছে যোদ্ধা সমাজ হতে শিল্প সমাজের উত্তরণের ক্ষেত্রে।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, হার্বার্ট স্পেন্সার প্রদত্ত সমাজ পরিবর্তনের বিবর্তনবাদী মতবাদ সমাজবিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ অবদান হিসেবে বিবেচিত। এই তত্ত্বের মাধ্যমে তৎকালীন সমাজব্যবস্থা, সামাজিক কাঠামো ও সমাজ পরিবর্তনের ধারাবাহিক রূপ সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। হার্বার্ট স্পেন্সারের মতে সমাজ একটি জীবের ন্যায় ক্রমাগত বিকাশমান, যেখানে সমাজের ভাঙন, পুনর্গঠন, ভারসাম্য সৃষ্টি এবং বিভিন্ন অংশের মধ্যে সমন্বয় সাধনের মধ্য দিয়েই সমাজ এগিয়ে চলে। কখনো সমাজে বিশৃঙ্খলা বা ভাঙন সৃষ্টি হয়, আবার সেই ভাঙনের মধ্য দিয়েই নতুন ভারসাম্য ও সংগঠিত কাঠামোর জন্ম হয় এই ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই মূলত সমাজ টিকে থাকে।

স্পেন্সার তার তত্ত্বে সমাজের এই পরিবর্তনশীল ও বিবর্তনশীল প্রকৃতিকে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। যদিও তার বিবর্তনবাদী মতবাদকে অনেক ক্ষেত্রে রক্ষণশীল এবং সামাজিক বৈষম্যকে পরোক্ষভাবে সমর্থনকারী বলে সমালোচনা করা হয়েছে, তথাপি সমাজ পরিবর্তন ও সামাজিক কাঠামো বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এই তত্ত্ব সমাজবিজ্ঞানের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।