Showing posts with label সংখ্যালঘু সমাজবিজ্ঞান. Show all posts
Showing posts with label সংখ্যালঘু সমাজবিজ্ঞান. Show all posts

বাংলাদেশের বনভূমিতে আধিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকারের গৃহীত পদক্ষেপসমূহ আলোচনা কর

বাংলাদেশের বনভূমিতে আধিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকারের গৃহীত পদক্ষেপসমূহ

ভূমিকা: বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম দেশের অন্যতম বনভূমিবেষ্টিত পার্বত্য অঞ্চল। বাংলাদেশের মোট আয়তনের এই বনভূমির পরিমাণ খুবই সামান্য। অধিবাসী জনগণ আবার বিচ্ছিন্ন সাংস্কৃতিক ও ভৌগোলিক কারণে দেশের মূলধারা হতে বিচ্ছিন্ন প্রায়। নিম্নে প্রশ্নালোকে বাংলাদেশের বনভূমিতে আদিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ পর্যালোচনা করা হলো।

বাংলাদেশের বনভূমিতে আধিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকারের গৃহীত পদক্ষেপসমূহ


বনভূমিতে আদিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকারের পদক্ষেপ:

বাংলাদেশ বিশ্বপরিমণ্ডলে আয়তনে ক্ষুদ্র একটি দেশ। এই দেশের আয়তনের তুলনায় বনভূমির পরিমাণ মাত্র ছয় শতাংশ, যা এই বনভূমির উপর নির্ভরশীল। বিভিন্ন আদিবাসী গোষ্ঠীগুলোর জন্য পর্যাপ্ত নয়। তাই সরকার কীভাবে বনভূমিকে আরো বেশি উৎপাদনশীল করা যায় সে ব্যাপারে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। নিম্নে তা আলোচনা করা হলো-

১. বনভূমি রক্ষায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড:

বনের সংরক্ষণ ও বনের অধিকার প্রতিষ্ঠায় আদিবাসী আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃতভাবে তাকে বলা হয় বনের অধিকার।

(ক) আদিবাসী সম্প্রদায় যে বনভূমিতে বসবাস করে সেই বনভূমির উপর তাদের স্বাধীন ও সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠা এর আওতায় থাকে। যথা-

  • বনে গবাদিপশু চারণ: প্রত্যেকটি আদিবাসী যাতে করে বনে গবাদিপশু চারণ করতে পারে সেই অধিকার দিতে হবে।
  •  ফল-ফসল, সবজি চাষের অধিকার: পার্বত্য আদিবাসী যাতে করে তারা নিজেরা ফল-ফসল ও সবজি চাষ করতে পারে সেই অধিকার দিতে হবে।
  • জ্বালানি সংগ্রহ: আদিবাসী লোকেরা প্রত্যেক বন থেকে কাঠ সংরক্ষণ করে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে। কেননা আদিবাসী লোকেরা সবসময় কাঠ কেটে তাদের জীবন পরিচালনা করে থাকে।
  • কৃষিকাজ অধিকার: আদিবাসী লোকেরা যাতে করে বনে কৃষিকাজ করতে পারে সেই অধিকার দিতে হবে। কেননা বনে কৃষি কাজ করে তাদের জীবন অতিবাহিত করতে হয়।


(খ) শিকার সংগ্রাহক সমাজ যে পর্যন্ত চারণ করবে সে পর্যন্ত বনভূমি তাদের বনভূমি হিসেবে স্বীকৃতি পাবে।

(গ) রাষ্ট্র কোনো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে চাইলে ঐ বনভূমিতে বসবাসরত আদিবাসীদের পূর্ণ সমর্থন নিয়ে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিয়ে অন্যত্র সমপরিমাণ বনভূমিতে তাদের পুনর্বাসিত করতে হবে।

(ঘ) আধিবাসীদের যেকোনো ধর্মীয় ঐতিহ্যগত যা সাংস্কৃতিক প্রয়োজন তাদের বনভূমি যথেষ্ট ব্যবহারের স্বাধীনতা দিতে হবে।

২. সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ:

বাংলাদেশে বসবাসরত অধিকাংশ নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাস করে। ফলে তারা জীবন ও জীবিকার জন্য নানাভাবে বনভূমির উপর নির্ভরশীল। ১৮৭১ সাল থেকে ১৮৮৫ পর্যন্ত পার্বত্য এলাকায় তিন-চতুর্থাংশ ভূমি তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার সরকারি বনভূমি হিসেবে ঘোষণা করেছিল। অবশিষ্ট বনভূমির মধ্যে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন হিসেবে কিছু নির্দিষ্ট বনভূমি ছাড়া অন্য সমগ্র বনভূমি সরকারি খাসজমি হিসেবে নির্দিষ্ট হয়। সরকারি জমির এক-চতুর্থাংশ আবার নির্দিষ্ট সংরক্ষিত বনাঞ্চল হিসেবে তাতে পাহাড়ি বনজীবী মানুষের সার্বিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হয়। আর বাকি বনাঞ্চল পাহাড়িদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। শুষ্ক মৌসুমে যখন ফসল উৎপাদন হ্রাস পায় তখন বিভিন্ন বনজীবী দরিদ্র মানুষ এখানে উৎপাদিত খাদ্য পণ্যসমূহ বিক্রয় করেও জীবিকানির্বাহ করতে পারে। আর প্রতিটি সাধারণ বনে কি চাষ করা হবে মৌজা প্রধানদের সাথে নিজস্ব মৌজাভিত্তিক জনগণের মতামত বিনিময়ের প্রেক্ষিতে নির্ধারিত হয় এক-একটি VEF-এ একেক ধরনের নিয়ামক থাকলে তা মোটামুটি নিম্নরূপ-

(ক) VEF এলাকায় কোনো আগুনের কাজ করা যাবে না।

(খ) কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতীত VEF এলাকায় সাধারণের প্রবেশ নিষেধ।

(গ) অনুমতি ছাড়া বাঁশ কর্তন করলে জরিমানা দিতে হবে।

(ঘ) ফল, সবজি, বাঁশ পরিণত না হলে কাটা নিষেধ।

(ঙ) মুনাফার ভিত্তিতে VEF পণ্য বিক্রয় নিষিদ্ধ।

(চ) বনের বিভিন্ন জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা।

(ছ) VEF এলাকায় সব ধরনের শিকার নিষিদ্ধ।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, বাংলাদেশে বসবাসরত আদিবাসী নৃগোষ্ঠীগুলোর জীবন-জীবিকা সম্পূর্ণভাবে বনভূমির উপর নির্ভরশীল। তাই বন রক্ষার জন্য সরকার কিছু নীতিমালা প্রণয়ন করেছে, যার ফলে বনগুলো এখনো তাদের প্রয়োজনীয় সামগ্রীর পর্যাপ্ত সরবরাহ পাচ্ছে।

উপজাতির বৈশিষ্ট্যসমূহ লিখ। জাতি ও উপজাতির মধ্যে পার্থক্য লিখ

উপজাতির বৈশিষ্ট্যসমূহ এবং জাতি ও উপজাতির মধ্যে পার্থক্য

ভূমিকা: উপজাতি হচ্ছে ছোট বা ক্ষুদ্র জাতি। উপজাতি বলতে এমন একটি সামাজিক গোষ্ঠী, বোঝায় যাদের নিজস্ব একটি বিশেষ ভাষা ও সংস্কৃতি আছে, যা অন্য উপজাতি থেকে ভিন্নতর। যেসব ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী আদিম জীবনযাপনপ্রণালিতে অভ্যস্ত তারা উপজাতি (Tribe) বলে পরিচিত। উপজাতিরা কোনো না কোনো রাষ্ট্রীয় পরিসীমায় নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য ও স্বকীয়তা নিয়ে বসবাস করে।

উপজাতির বৈশিষ্ট্যসমূহ লিখ। জাতি ও উপজাতির মধ্যে পার্থক্য লিখ


উপজাতির বৈশিষ্ট্যসমূহ:

বিভিন্ন নৃবিজ্ঞানী উপজাতিসংক্রান্ত আলোচনায় এমন সব ভিন্ন ভিন্ন উক্তি, করেছেন যে, সেগুলো থেকে একটি চূড়ান্ত বা স্থির সিদ্ধান্তে আসা কঠিন। ফলে চূড়ান্তভাবে উপজাতির বৈশিষ্ট্য নির্ণয় করা কঠিন কাজ। সাধারণত একটি উপজাতির নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্যাবলি দেখা যায়। যথা:

১. নির্দিষ্ট বসতি এলাকা:

উপজাতিরা নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকায় স্থায়ীভাবে বাস করে।

২. ঐক্যবোধ:

উপজাতিদের সংহতিবোধ অত্যন্ত দৃঢ়। উপজাতিদের মধ্যে পরস্পরের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিদ্যমান। ঐক্যবোধের কারণেই তারা সংগঠিত ও সংঘবদ্ধ থাকে।

৩. স্বতন্ত্র সংস্কৃতি:

উপজাতির পৃথক ও স্বতন্ত্র সংস্কৃতি রয়েছে। এরা ঐতিহ্যপ্রিয় ও সহজসরল অথচ বৈচিত্র্যপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অধিকারী।

৪. নির্দিষ্ট ভাষা বা উপভাষা:

প্রায় প্রতিটি উপজাতিরই নিজস্ব ভাষা বা উপভাষা রয়েছে। তবে অধিকাংশেরই ভাষার লিখিত কোনো রূপ নেই।

৫. টোটেম প্রথা:

উপজাতিদের মধ্যে টোটেম প্রথার প্রচলন রয়েছে। বর্তমান যুগেও টোটেম বিশ্বাস তাদের মধ্যে দৃঢ়।

৬. পরিবর্তন বিমুখ:

উপজাতিরা সাধারণত ঐতিহ্যবাহী জীবনধারায় অভ্যস্ত। পরিবর্তন বা আধুনিকায়নকে সহজেই তারা গ্রহণ করতে চায় না। তাই তাদের আশপাশে অন্য সমাজব্যবস্থাতে ব্যাপক পরিবর্তন আসলেও তারা আধুনিকায়ন বা পরিবর্তনকে সহজে গ্রহণ করতে চায় না।

৭. প্রাচীন অর্থনীতি:

উপজাতীয়দের মধ্যে এখনো আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার অতটা জনপ্রিয় নয়। তারা এখনো পালাক্রম চাষ বা জুম চাষে অভ্যন্ত। তারা এখনো খাদ্য আহরণ ও শিকারের উৎপাদন কৌশলে অভ্যন্ত।

৮. পূর্বপুরুষে বিশ্বাস:

উপজাতীয় জনগণ একই পূর্বপুরুষ থেকে এসেছে এমন একটি বিশ্বাস পোষণ করে। এ পূর্বপুরুষের রীতি-নীতি, বিশ্বাস, মূল্যবোধ, ধর্মীয় প্রথা ইত্যাদি তারা অবশ্য পালনীয় বিষয় হিসেবে গ্রহণ করে।

পরিশেষে বলা যায়, উপজাতীয় সম্প্রদায়গুলোর জীবন জীবিকা, সামাজিক আচার, প্রথা সবকিছুতে একধরনের নির্দিষ্ট এবং বিচ্ছিন্ন জীবন পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়।

জাতি ও উপজাতির মধ্যে পার্থক্যসমূহ

জাতি হচ্ছে এমন এক জনসমষ্টি, যারা একই ভাষা, ধর্ম, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও ভৌগোলিক এলাকায় ঐক্য সূত্রে আবদ্ধ হয়ে বসবাস করে এবং অন্য কারো শাসন মানতে রাজি নয়। আর উপজাতি হচ্ছে দেশের অন্যান্য জাতি থেকে পৃথক পৃথক অঞ্চলে বসবাসে আগ্রহী এবং এদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি রয়েছে।

জাতি ও উপজাতির মধ্যে পার্থক্য: জাতি ও উপজাতির মধ্যে পার্থক্য নিম্নে উল্লেখ করা হলো-

১. জাতি বলতে এমন একটি জনসমাজকে বোঝায়, যা রাজনৈতিক দিক থেকে সম্পূর্ণভাবে আত্মত্মসচেতন ও সংগঠিত এবং স্বশাসনে রাষ্ট্রের মধ্যে নিজস্ব জাতীয় ঠিকানা সাধনে প্রয়াসী। অপরপক্ষে, উপজাতি বলতে এমন এক জনসমাজকে বোঝায়, যাদের একটি নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি রয়েছে এবং যারা মূল জাতি থেকে নিজেদের স্বতন্ত্র মনে করে।

২. জাতি বলতে একটি রাষ্ট্রের সকল জনগণকে সম্পৃক্ত করে যার সমগ্র ভৌগোলিক এলাকাজুড়ে জাতীয়তার ভিত্তিতে আত্মপরিচয় প্রকাশ করে। অন্যদিকে, উপজাতিরা রাষ্ট্রের একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে বসবাস করে এবং এদের মধ্যে বিশেষ ঐক্যবোধ রয়েছে।

৩. জাতি হলো একটি সামগ্রিক ধারণা, এখানে সমগ্র জনগণ ঐ রাষ্ট্রের প্রচলিত রাষ্ট্রীয় ভাষা, সংস্কৃতি, বিশ্বাস, মূল্যবোধ অনুসরণসহ আধুনিক সংস্কৃতির সাথে নিজেদের সম্পৃক্ত করে। অপরদিকে, উপজাতিদের নিজস্ব অতীত ঐতিহ্য রয়েছে এবং আধুনিক সংস্কৃতির বেড়াজাল থেকে তারা পাশ কাটিয়ে নিজস্ব ধ্যান-ধারণায় অভ্যস্ত হতেই বেশি পছন্দ করে। 

৪. জাতি হলো এমন একটি গোষ্ঠী, যারা জাতীয় পেশা তথা বিভিন্ন পেশা থেকে নিজস্ব পেশা পছন্দ করে জাতীয় প্রেক্ষাপটে সামাজিক, রাজনৈতিক ইস্যুকে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। অপরদিকে, উপজাতিদের খাদ্যসংগ্রহ, কৃষিব্যবস্থা ও পশুপালন, অর্থনীতি রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবন জাতীয় চেতনায় বিশ্বাসীদের থেকে ভিন্ন। 

পরিশেষে বলা যায়, জাতি ও উপজাতির মধ্যে উপর্যুক্ত পার্থক্য থাকলেও এরা একে অপরের পরিপূরক। জাতি না থাকলে যেমন উপজাতি মূল্যহীন ঠিক তেমনি উপজাতির সমষ্টি ব্যতীত জাতি গঠন সম্ভব নয়।

ভূমি অধিগ্রহণ বা উচ্ছেদকরণ প্রক্রিয়ার ফলাফল

ভূমি অধিগ্রহণ বা উচ্ছেদকরণ প্রক্রিয়ার ফলাফল বর্ণনা কর

ভূমিকা: কোনো সরকারি বা বেসরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার জন্য যে ভূমির প্রয়োজন হয় তার সঠিক সংকুলানের নিমিত্তে অনেক সময়ে ভূমিতে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীকে তাদের বসতবাড়ি হতে উচ্ছেদ করে সেখানে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। সেই স্থান হতে মানুষকে বিতাড়ন করা হয় সেই ভূমি আগে থেকে রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি হাত পারে বা অন্য সাধারণ জনগণের সম্পত্তি হতে পারে। এই সমগ্র প্রক্রিয়াকে ভূমি অধিগ্রহণ বলা হয়।

ভূমি অধিহগ্রহণ বা উচ্ছেদকরণ প্রক্রিয়ার ফলাফল


ভূমি অধিগ্রহণ বা উচ্ছেদকরণ প্রক্রিয়ার ফলাফল

নিম্নে ভূমি অধিকগ্রহণ বা উচ্ছেদকরণ প্রক্রিয়ার ফলাফলসমূহ তুলে ধরা হলো।

১. সামাজিক সংগঠনের ভাঙন:

উচ্ছেদকরণ প্রক্রিয়ায় সব থেকে বড় নেতিবাচক প্রভাবটি হলো বিদ্যমান সামাজিক প্রতিষ্ঠাগুলোকে ভেঙে ফেলা। কোনো একটি স্থানে কয়েক প্রজন্ম ধরে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীকে যখন উন্নয়ন প্রকল্পের দোহাই দিয়ে উচ্ছেদকরণ করা হয় তখন তাদের বিভিন্ন সামাগ্রিক সম্পর্ক এবং জাতিসৎম্পর্কের বন্ধন ছিন্ন করে তাকে উৎখাত করা হয়। উন্নয়নের জন্য যখন ভূমি অধিগ্রহণের নোটিশ দেয়া হয় তখনই বসবাসকারী জনগণ একধরনের অস্থির হতাশাজনক পরিস্থিতিতে পড়েন। নতুন পরিস্থিতিতে একেকজন এক একভাবে আপ্ত হবে।

২. সংখ্যালঘু আদিবাসী এবং উপজাতীয় সংস্কৃতি বিনষ্ট:

সাধারণত বেশিরভাগ সময়ে নগরের উপকণ্ঠে অথবা নগরের বাইরে অথবা দেশের প্রান্তিক বিভিন্ন ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন এলাকায় উপজাতীয় এবং আদিবাসীবিশিষ্ট সংস্কৃতি এবং নৃতাত্তিক গোষ্ঠীসমূহ অবস্থান করে। এই প্রকার অবস্থান কয়েক প্রজম্ম ধরে বজায় থাকায় ঐ স্থানের প্রাকৃতিক পরিবেশের সাথে উপজাতীয় নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীসমূহের বিশেষ আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এই আন্তঃসম্পর্কের গভীরতা এদের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাজের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হতে থাকে। অনেক সময় সগর উপকন্ঠের এসর স্থানে মানববসতি কম বলে উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বা বিভিন্ন নাগরিক বিনোদন-কেন্দ্র স্থাপনের জন্য এসব এলাকাগুলো নির্বাচন করা হয়।

৩. বনভূমি ধ্বংস:

অনেক সময়ে নগর, নগরের উপকষ্ঠ এবং উপনগরগুলোতে ঘনবসতি থাকায় অথবা সংখ্যাগুরু শ্রেণীর অবস্থান থাকার কারণে এসব স্থানে উন্নয়ন প্রকল্পায়ন রাষ্ট্রের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচিত হয়। অপেক্ষাকৃত কম জনগোষ্ঠীর আবাস বনভূমিকে ধংস করে তাতে উন্নয়ন প্রকল্প পরিচালনা করে সরকারের নিকট অনেক সময় কম ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচিত হয়। কারণ বনভূমির জন্য কোনোভাবেই এখানে ঘনবসতি গড়ে ওঠা সম্ভব নয়। তাই উন্নয়ন প্রকল্প চালনা করা হলে অপেক্ষাকৃত কম মানুষকে বিতাড়ন বা উচ্ছেদকরণ করতে হবে। তাই উন্নয়ন প্রকল্প বনভূমির বন ধ্বংস করে পাওয়া বিস্তৃর্ণ অঞ্চলে করাই অনেক বেশি শ্রেয়তর মনে করা হয়। উন্নয়ন পরিকল্পনাবিদরা উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার জন্য বনভূমিকে বেছে নেন। এভাবে যদিও বনভূমির মানববসতি উচ্ছেদ করে এবং তাদের জীবনকে নিরাপত্তাহীনতায় পর্যবসিত করা হয় এবং দেশের জন্য প্রয়োজনীয় শতাংশে বনভূমি কমে যায়।

৪. কৃষিভূমি ধংস:

তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশে প্রচুর জনসংখ্যার জন্য ঘনবসতি দেখা যায়। এই ঘনবসতির দেশে অপেক্ষাকৃত ফাঁকা এলাকাগুলোর বেশিরভাগই কৃষিভূমি, যেখানে খাদ্যশস্যের আবাদ হয়। উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য ফাঁকা স্থানের সন্ধানে পরিকল্পনাবিদদের বিবেচনায় প্রাধান্য পায় বনভূমি এবং এর পরেই কৃষিভূমি। ব্যাপক আয়তনের কৃষিভূমি অধিগ্রহণ করে উন্নয়ন প্রকল্প করার ফলে কৃষিকাজের সাথে সাথে খাদ্যশস্যের উৎপাদন ব্যাহত হয়। ক্ষেত্রবিশেষে এই ধরনের প্রকল্পায়নের জন্য স্থানীয় বা জাতীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত পরিমান খাদ্যশস্যের অভার ঘটে। ফলে দেশে দুর্ভিক্ষও দেখা যেতে পারে। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও ভূমি অধিগ্রহণ প্রভাবে পরোক্ষভাবে খাদ্য অনিশ্চয়তার কারণ হিসেবে কাজ করে।

৫. পরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি:

অনেক সময়ে এসব জনগোষ্ঠী তাদের নিজস্ব পরিবেশ নির্ভর জীবিকায়নের জন্য এমন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে, যা পক্ষান্তরে পরিবেশের উন্নয়ন এবং পরিবেশ সুরক্ষায়নে সহায়ক হয়।কিন্তু এই জনগোষ্ঠীকে সরিয়ে দেয়ার ফলে একদিকে যেমন পরিবেশে শূন্যতা তৈরি হয় তেমন উন্নয়নকেন্দ্রিক বিভিন্ন সামগ্রী আনয়ন এবং অনুষ্ঠানিক  বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিবেশের বিভিন্ন প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংস করে। অনেক সময় এভাবে পরিবেশের যে ক্ষতিসাধন হয় তা আর কখনোই পুশিয়ে নেয়া সম্ভব হয় না। এভাবে পরিবেশের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ ও উচ্ছেদকরণ সরাসরি একটি নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করে।

৬. দারিদ্র্যকরণ:

Michael Karhea তার আলোচনায় দেখান যে, উন্নয়ন প্রকল্পের কতগুলো ফলাফল বিশাল জনগণের দারিদ্রকরণে ভূমিকা রাখে। তার মতে, বিশাল এলাকার ভূমি অধিগ্রহণ করায় কৃষি ভূমি বিনষ্ট হয়, বেকারত্ব সৃষ্টি হয় খাদ্যনিরাপত্তা বিনষ্ট হয় এবং নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়। এই প্রতিটি বিষয় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জনগণের জীবাস দারিদ্র ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। বেশিরভাগ সময়ে এই ধরনের ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় যে ন্যূনতম ক্ষতিপূরণ দেবার ব্যবস্থা হয় তা বিভিন্ন ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা ভোগ করেন। আবার উন্নয়ন কাজের সময় কিছু মধ্যস্বত্বভোগী সম্প্রদায় উদ্বৃত হন যারা মূলত উন্নয়ন কর্মকর্তা এবং জনগোষ্ঠীর মাধ্যম হিসেবে কাজ করে নিজের অর্থবিত্তের মালিক হবার চেষ্টা করেন। ফলে তারা সাধারন জনগণকে বেশি দারিদ্র্য করতে সরাসরি ভূমিকা পালন করেন।

Koeng (1991) দেখান যে, অনেক সময়ে ভূমি অধিকগ্রহণ করার পর উৎপাটিত জনগোষ্ঠীর মধ্য হতে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড নিয়োগ দেয়া হয়। এই প্রকার নিয়োগ দেয়ার ফলে তার কর্ম তৈরি হলেও যেহেতু তার আবাসন উৎপাটন করা হয়েছে, নতুন বাসস্থান আর নিকটবর্তী থাকে না। হয়তো তা অন্য জেলা ব অনেক বেশি দূরত্বে থাকে তখন তার পক্ষে প্রতিদিন কর্মক্ষেত্র আগমন সম্ভব হয় না, ফলে তার পক্ষে চাকরি চালানো সম্ভব হয় না।  এভাবে উন্নয়ন বিতাড়নের ক্ষতিপূরণ হিসেবে চাকরি দেয়া হলেও কার্যত তা জনগণের বেকারত্ব রোধে খুব বেশি ভূমিকা পালন করতে পারে না।

৭. খাদ্য নিরাপত্তা বিনষ্ট:

উন্নয়ন পরিকল্পনার নাম ব্যাপকায়ন কৃষিভূমি অধিগ্রহণ এর ফলে খাদ্য উৎপাদনের জন প্রয়োজনীয় ভূখণ্ড হ্রাস পায়। ফলে খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকির সম্মুধীন হয়। আবার হঠাৎ উৎখাত হওয়া পরিবারগুলোর মধ্যে বেকারত্ব এবং অন্যান্য বিভিন্ন সমস্যার তীব্রতা দেখা যায়, যা তাদের খাদ্য ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ফলে ক্রয়ক্ষমতার অভাবে নূন্যতম প্রয়োজনীয় খাদ্যের সংকুলান করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না।

৮. নারী ও শিশুর অবস্থা বিপর্যয়:

নারী ও শিশু প্রায় প্রতিটি সমাজে একধরনের ঝুঁকির অবস্থায় থাকে। হাস অধিগ্রহণের ফলে যে তীব্র খাদ্য ঝুঁকি এবং বেকারত্বের ঝুঁকি উদ্বৃত দারিদ্র্যকরণ প্রক্রিয়া শুরু হয়। তার সরাসরি প্রতিফলন ঘটে নারী ও শিশুর অবস্থা বিপর্যয়ের মধ্যে। অনেক সময় নারীরা বিভিন্ন ধরনের নিপীড়ন  নির্যাতনের শিকার হন। হঠাৎ গৃহহীন এবং নির্ভরতাহীন হয়ে পড়ায় এসব নারী অনেক গ্রাম্য দালাল-ফড়িয়াদের সহজ শিকারে পরিণত হন।

৯. সার্বিক মানবিক বিপর্যয়:

খাদ্যবস্তু, বাসস্থান শিক্ষাকে ন্যূনতম মানবিক চাহিনা মনে করা হয়। এই চার চাহিদার পুরণ নাগরিকদের জন্য করা রাষ্ট্র এবং সরকারের অন্যতম দায়বোধের মধ্যে পড়ে। বেশির ভাগ সময়ে সমগ্র উন্নয়ন প্রক্রিয়া রাষ্ট্র এবং সরকারের নিয়ন্ত্রণে হয়। বেসরকারি পর্যায়ে উন্নয়ন হলেও তা রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধায়নে পরিচালিত হয়। অধিগ্রহণ এর স্থানের মানুষদের সবধরনের মানবিক দাবিকে রাষ্ট্র নিজেই অস্বীকার করে এবং কেউ এই দাবি তুললে তাদেরও দাবিয়ে রাখার চেষ্টা করে। একদিকে দারিদ্র্যকরণ, অন্যদিকে দারিদ্র্যকরণ প্রক্রিয়াকে অস্বীকার করায় রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়া তীব্র মানবিক বিপর্যয়কে অবশ্যম্ভাবী করে তোলে।

১০. সাধারণ মানুষের মনস্তাত্ত্বিক বিপর্য:

গৃহহীনতা, দারিদ্র্য এই বিষয়গুলো উৎপাটিত মানুষের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক নিরাপত্তাহীনতা, নির্ভরতাহীনতা, অবিশ্বাস এবং হতাশা বোধ তৈরী করে। ফলে সমাজের মধ্যে থেকেও এদের মধ্য স্ববিরোধী বিচ্ছিন্নতাবোধ ধীরে ধীরে বিকশিত হতে থাকে, যার ফলে এই জনপদের অনেক মানুষ ধীরে ধীরে নিজেকে সমাজ বহির্ভূত অংশ হিসেবে ভাবতে থাকে এরা নানা ধরনের অসামাজিক কাজ করেন। অর্থাভাব ও বেকারত্ব থেকে বাঁচার জন্যও বিভিন্ন ধরনের অসামাজিক কাজে জড়িয়ে পড়েন।

১১. উন্নয়নের সার্বিক প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধকরণ:

সমাজে যারা অবনত এবং খারাপ অবস্থায় আছে তাদের অবস্থা আলো করার জন্যই উন্নয়ন প্রকল্পগুলো প্রণীত হয়। যেমন- কর্মসুযোগ সৃষ্টি, জীবন,সুযোগ সৃষ্টি, শিক্ষায়ন ইত্যাদির জন্য উন্নয়ন প্রকল্প করা হয়। কিন্তু উৎপাটন বা উচ্ছেদকরণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বিপুল সংখ্যক জনগণের মধ্যে বেকারত্ব সৃষ্টি, দারিদ্র্যকরণ এবং সমাজ বিচ্ছিন্নকরন ঘটানো হয়। ঐ থেকে প্রশ্ন হয় আদৌ এই উন্নয়ন দরিদ্র বা অবনত অংশের উন্নয়ন নাকি মোটামুটি সাচ্চল অংশের দরিদ্রকরণ।

উপসংহার: উপরিউক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, যত বেশি উন্নয়ন প্রক্রিয়া অগ্রসর হয় তত বেশি বিভিন্ন কারণে আরো বেশি ভূমির প্রয়োজন হতে থাকে। ফলে অধিগ্রহণকৃত ভূমির আশপাশের স্থানগুলোও ধীরে ধীরে আরো বেশি করে উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত হতে থাকে। ফলে সেসব এলাকার মানুষ স্থানান্তকরণে বাধ্য করা হয়। এভাবে ভূমি অধিকগ্রহণ আরো ব্যাপকতর প্রভাবে সমাজকে প্রভাবান্বিত করতে থাকে।

উপজাতি কী? বাংলাদেশের উপজাতিসমূহের জীবনধারা পরিবর্তনের কারণসমূহ আলোচনা কর

উপজাতির সংজ্ঞা ও বাংলাদেশে বসবাসরত উপজাতি গোষ্ঠীর জীবনধারা পরিবর্তনের কারণসমূহ আলোচনা

ভূমিকা: সামাজিক নৃবিজ্ঞানের অন্যতম আলোচিত প্রতায় হলো ট্রাইব বা উপজাতি-গোষ্ঠী। বিশ্বের প্রায় সবদেশেই উপজাতি গোষ্ঠীর উপস্থিতি কমবেশি লক্ষ করা যায়। আমাদের দেশেরও মোট জনসংখ্যার ১.৮ ভাগ উপজাতি। এদের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ। মোট উপজাতি সম্প্রদায়ের সংখ্যা ৪৫টি। আর উপজাতি হচ্ছে এমন একটি গোষ্ঠী যেখানে অসংখ্য কৌমগোষ্ঠী, জাতিগোষ্ঠী ও ক্ষুদ্র অন্তজগোষ্ঠীর অস্তিত্ব লক্ষ করা যায়।

উপজাতি কী? বাংলাদেশের উপজাতিসমূহের জীবনধারা পরিবর্তনের কারণসমূহ


উপজাতির সংজ্ঞা:

উপজাতি বলতে এমন একটি জনসমষ্টি বা সামাজিক গোষ্ঠীভুক্ত দলকে বোঝায়, যাদের রয়েছে একটি নিজস্ব বিশেষ ভাষা এবং সংস্কৃতি। সকল উপজাতীয় সমাজ অবশ্য কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অধীনে সংগঠিত নয়।

প্রামাণ্য সংজ্ঞা:

উপজাতি সম্পর্কে বিভিন্ন মনীষী বিভিন্ন মন্তব্য করেছেন। নিম্নে সেগুলো উল্লেখ করা হলো-

ড. খুরশীদ আলম সাগর বলেন, "মানবধারার যেই অংশ আজো নিজেদেরকেই একই পুরুষের উত্তরাধিকার মনে করে এবং যারা আধুনিক শিক্ষা, শিল্প, সাহিত্যচর্চা, সংস্কৃতি ও সভ্যতার পরিমন্ডলে থেকে অনেক দূরে রয়েছে, তাদেরকে উপজাতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক টেইলর বলেন, "উপজাতি বলতে বোঝায় এমন একটি জনগোষ্ঠী যারা মোটামুটিভাবে একটি অঞ্চলে সংগঠিত এই তাদের মধ্যে রয়েছে সাংস্কৃতিক ঐক্য এবং যার সদস্যরা মনে না যে তারা একই সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের আওতাভুক্ত।

উপজাতি সম্পর্কে নৃবিজ্ঞানী কোহেন ও ইয়ামস বলেন, উপজাতি বলতে এমন এক জনগোষ্ঠীকে বোঝায়, যারা তাদের জীবিকার জন্য খাদ্য সংগ্রহ, উদ্যান, কৃষি ও পশুপালনের উপর নির্ভর।

সমাজবিজ্ঞানী EA Hostel-এর মতে, "উপজাতি হচ্ছে এমন একটি সামাজিক গোষ্ঠী, যারা একটি বিশেষ ভাষায় কথা বলে এবং বিশেষ সংস্কৃতির অংশীদার, যা তাদের অন্য জনগোষ্ঠী থেকে পৃথক করে রাখে। তবে এরা সাধারণত রাজনৈতিকভাবে সুসংগঠিত নয়।

বোগারডাসের মতে, "উপজাতি-গোষ্ঠী রক্তের সম্পর্ক ও অভিন্ন ধর্মের উপর নির্ভরশীল।"

নৃবিজ্ঞানী রিভার্স (Revers) বলেন, "উপজাতি হচ্ছে একটি সরল প্রকৃতির সামাজিক গোষ্ঠী, যার সদস্যরা একই ভাষায় কথা বলে এবং যুদ্ধ-বিগ্রহ ও অন্যান্য সমরূপী জীবনসংগ্রামে যৌথভাবে কাজ করে।"

উইলিয়াম জে.পেরি (William J.Perry)-এর ভাষায়, 'উপজাতি হচ্ছে এমন মানবগোষ্ঠী যারা একই সাথে বসবাস করে এবং একই ভাষায় কথা বলে।"

বাংলাদেশের উপজাতি-গোষ্ঠীর জীবনধারা পরিবর্তনের কারণসমূহ

কোনো সমাজ ও সভ্যতাতে আপনা-আপনি পরিবর্তন আসে না। বরং প্রতিটি পরিবর্তনের অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। তেমনি আমাদের দেশে বসবাসরত উপজাতি-গোষ্ঠীর জীবনধারাতে পরিবর্তনের যে সূত্রপাত হয়েছে, তার পিছনেও কিছু উপাদান ক্রিয়াশীল অর্থাৎ কিছু কারণ বিদ্যমান আছে। বাংলাদেশের উপজাতি গোষ্ঠীর জীবনপ্রণালিতে পরিবর্তনের কারণসমূহ নিম্নে তুলে ধর হালা-

১ শিক্ষার প্রসার:

আমাদের দেশে বসবাসরত উপজাতি গোষ্ঠীর নতুন প্রজন্ম অন্য যে কোনো সময়ের তুলনায় অধিকহারে বিদ্যালয়ে গমন করছে। পূর্বের যে কোনো সময়ের তুলনায় উপজাতি গোষ্ঠীর মধ্যে শিক্ষার হার বর্তমানে বেশি। উপজাতি গোষ্ঠীর শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে সরকার কর্তৃক সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে উপজাতিদের জন্য বিশেষ কোটা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। যা উপজাতি গোষ্ঠেীদেরকে অধিক হারে শিক্ষাগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করছে। ফলশ্রুতিতে উপজাতি গোষ্ঠীদের মধ্যে শিক্ষার প্রসার ঘটছে। আর উপজাতি জনগোষ্ঠীর এ শিক্ষিত অংশ উপজাতি সমাজের পরিবর্তনে নেতৃত্ব দিচ্ছে।

২. এনজিওদের কার্যক্রম:

বাংলাদেশের উপজাতি-গোষ্ঠীর দুরবস্থা দূরীকরণে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সাম্বা (NGO) নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এসব NGO-এর বিভিন্ন ও বহুমুখী কল্যাণমূলক কার্যক্রম উপজাতি-গোষ্ঠীর জীকণধারাতে পরিবর্তনের সূত্রপাত ঘটিয়েছে।

৩. আত্মসচেতনতা তৈরি:

উন্নতির জন্য আগে চাই নিজের হীন অবস্থা সম্পর্কে ধারণা অর্জন অর্থাৎ আত্মসচেতনতা ছাড়া উন্নতি বা পরিবর্তন কোনোটাই আশা করা যায় না। আর শিক্ষার প্রসার উপজাতি-গোষ্ঠীর একটা অংশের মধ্যে আত্মসচেতনতার বীজ বপন করতে পেরেছে। এ আত্মসচেতনয়া অংশ ঐ সমাজের পরবর্তনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।

৪. শিল্পায়ন ও নগরায়ণের প্রভাব:

শিল্পায়ন ও নগরায়ণের ব্যাপকতার যে প্রভাব তার ছোয়া উপজাতি সমাজেও কম বেশি গিয়ে পড়েছে।

৫. বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতি:

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভূতপূর্ব উন্নতি সমাজ ও সভ্যতাকে যেমন বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে, তেমনি উপজাতি সমাজেও সে পরিবর্তনেয় ছোঁয়া লেগেছে। যেমন- উপজাতি-গোষ্ঠীর লোকেরা আনেকে ঐতিহ্যবাহী চাষাবাদ পদ্ধতি বাদ দিয়ে আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করছে।

উপসংহার: উপরিউক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, উপজাতি-গোষ্ঠী হলো যে কোনো দেশের মোট জনসংখ্যার সেই আংশ যারা স্বতন্ত্র ভাষা, সংস্কৃতি তথ্য জীবনপ্রণালির চর্চা করে আর ঐতিহ্যবাহী রীতি-নীতি, প্রথা-আচার হলো ঐ সমাজের। চালিকাশক্তি। এছাড়া উল্লিখিত কারণসমূহের দরুনই উপজাতি জীবনপ্রণালিতে পরিবর্তনের সূত্রপাত ঘটেছে একথা অনস্বীকার্য।

বাংলাদেশে উপজাতিদের সমস্যাসমূহ আলোচনা কর

বাংলাদেশে উপজাতিদের সমস্যাসমূহ আলোচনা

ভূমিকা: পৃথিবীতে বেশিরভাগ আদিবাসী গোষ্ঠীগুলো পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্নভাবে প্রান্তিক অঞ্চলে বসবাস করে। এর কারণ নিজস্ব সামাজিক, সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের স্বকীয়তার জন্য তারা নিজেরা যেমন পৃথকভাবে থাকতে চায় আবার বিভিন্ন দেশের মূলধারার জনগোষ্ঠীও এক ধরনের ইচ্ছাকৃতভাবে এদের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে চায়। বাংলাদেশে নানা কারণে অধিবাসী বা জনগোষ্ঠী অথবা উপজাতিরা নানা সমস্যায় জর্জরিত। অর্থনৈতিক, কপরিবেশগত ও রাজনৈতিক কারণে তাদের এ সমস্যার উদ্ভব হচ্ছে।

বাংলাদেশে উপজাতিদের সমস্যাসমূহ


বাংলাদেশে আদিবাসী/উপজাতি জনগোষ্ঠীর বিদ্যমান সমস্যাসমূহ

নিম্নে বাংলাদেশের উপজাতি জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন সমস্যাসমূহ আলোচনা করা হলো- 

১. নিরাপত্তার অভাব:

আদিবাসীদের নিরাপরাহীনতার জন্য বাঙালিদের দায়ী করা হয়। কেননা বাঙালিরা তাদের নিরপত্তার ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। এ পর্যন্ত অনেক বাঙালিরা অদিবাসীদের জানমাল বিনষ্ট করেছে। তাই জানমালসহ অন্যান্য নিরাপত্তার অভাব আদিবাসীদের একটি মারাত্মক সমস্যা।

২. ভূমিজনিত সমস্যা:

আদিবাসীদের অন্যতম সমস্যা হলো ভূমিজনিত সমস্যা। ভূমিকে কেন্দ্র করে বাঙালিদের সাথে জটিলতার সুযোগ নিয়ে প্রায়ই মনমালিন্যহয়।বাঙালিরা ভূমি আইনের জটিলতার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে প্রায়ই আদিবাসীদের ভূমি দখল করে থাকে। 

৩. অধিকার বঞ্চিত:

অধিকার বঞ্চিত হলো আদিবাসীদের আরেকটি সমস্যা। তাদের মৌলিক অধিকার ভোগ করার কথা সংবিধানে উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে তারা তা পরিপূর্ণভাবে ভোগ করতে পারে না।

৪. বাঙালিদের সাথে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় প্রতিবন্ধকতা

বাঙালিদের জীবনযাপন পদ্ধতি আধুনিক। অন্যদিকে, অধিবাসীদের জীবন-যাপন সনাতন পদ্ধতিতে পরিচালিত। ফলে বাঙালিদের সাথে তাদের সুসম্পর্ক বা সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা সম্ভব হচ্ছে না।

৫. শিক্ষার সুযোগ-সুবিধার অভাব:

মূলত আদিবাসীদের আধুনিক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ-সুবিধা কম। আধুনিক শিক্ষা না থাকার ফলে তাদের জীবনমান ও দৃষ্টিভঙ্গির তেমন পরিবর্তন হচ্ছে না।

৬. আধিপত্য ও বৈষম্য:

আধিপত্য ও বৈষম্যগত সমস্যা হচ্ছে আদিবাসীদের আরেকটা সমস্যা। তাদের বিভিন্ন গোত্র বা সম্প্রদায়ের মধ্যে এ বৈষম্য খুবই প্রকট।

৭. চিকিৎসার সুযোগ-সুবিধার স্বল্পতা:

আদিবাসী সমাজে আধুনিক চিকিৎসার সুযোগ-সুবিধা খুবই কম। তারা প্রায়ই প্রাচীন চিকিৎসাপদ্ধতি ব্যবহার করে থাকে।

৮. খাদ্যসংকট:

আদিবাসীদের আরেকটি অন্যতম সমস্যা হালা খাদ্যসকেট। তাদের জমি সম্পূর্ণভাবে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেই। ফলে তারা ঠিকভাবে ফসল উৎপাদন করতে পারে না।।

৯. বাসস্থান সংকট:

বাসস্থান সংকট আদিবাসীদের খুবই তীব্র। স্থানীয় নেতারা আদিবাসীদের জমি জোরপূর্বক দখল করে এবং তা বিক্রি করে। জমি দখলের কোন্দলের ফলে চাষাবাদের উপরও এর প্রভাব পড়ে। ফলে তাদের জীবন বিপন্ন হয়।

১০. সামঞ্জস্যহীনতা:

আদিবাসীরা আদিম পদ্ধতিতে জীবনযাপন করতে পছন্দ করে। ফলে আদিম অনেক রিতি-নীতি এখনও তাদের মধ্যে বলবৎ রয়েছে। ফলে তাদের এ মানসিকতায় বাঙালিদের সাথে চলতে গিয়ে আদিবাসীরা সামঞ্জস্যহীনতায় ভোগে।

১১. অত্যাচার ও নির্যাতন:

প্রায়ই স্থানীয় জনগণ কর্তৃক আদিবাসীরা অত্যাচার ও নির্যাতনের শিকার হন। তাদেরকে ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়, আয়ের পথ বন্ধ করা হয়, এমনকি শারীরিকভাবেও নির্যাতন করা হয়। আর এটি তাদের জন্য একটি ভয়াবহ সমস্যা। 

১২. অজ্ঞতা ও কুসংস্কার:

বিজ্ঞান মনস্কতা ও প্রগতিশীল মানসিকতার অভাবে আদিবাসীরা অজ্ঞতা ও কুসংস্কারে নিমজ্জিত রয়েছে। আদিবাসীরা নিজেদের কুসংস্কারগুলোকে বিশ্বাস করে এবং এরা এর পরিবর্তন চায় না। তাদের চিরায়ত ধ্যানধারণা নিজস্ব গতিতে চলে।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, বর্তমানে বাংলাদেশের আদিবাসী বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সমস্যা অনেক। আর এসব সমস্যা দীর্ঘদিন যাবৎ তারা সয়ে যাচ্ছে। তবে এগুলোর মধ্যে কিছু সমস্যা তাদের নিজস্ব সৃষ্টি এবং কিছু পরিবেশগত।

প্রান্তিকীকরণ কি? উন্নয়ন প্রকল্প কীভাবে প্রান্তিকীকরণ ঘটায়

প্রান্তিকীকরণের সংজ্ঞা এবং উন্নয়ন প্রকল্পে প্রান্তিকীকরণ

ভূমিকা: মানবসমাজে সব মানুষ সমান সুযোগ ও সুবিধা ভোগ করতে পারে না। সমাজের একটি অংশ সবসময়ই নানা কারণে পিছিয়ে পড়ে অর্থনৈতিক দারিদ্র্য, শিক্ষার অভাব, সামাজিক বৈষম্য, জাতি, লিঙ্গ, ধর্ম বা রাজনৈতিক বঞ্চনার কারণে। এদেরকে মূলধারার সমাজ থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরিয়ে দেয় সমাজের কাঠামো ও ক্ষমতার সম্পর্ক। এই অবস্থার নামই প্রান্তিকীকরণ।

প্রান্তিকীকরণ কি? উন্নয়ন প্রকল্প কীভাবে প্রান্তিকীকরণ ঘটায়


প্রান্তিকীকরণের সংজ্ঞা:

‘প্রান্তিকীকরণ’ বলতে বোঝায় সমাজের একটি নির্দিষ্ট শ্রেণি বা গোষ্ঠীর মানুষকে ধীরে ধীরে সমাজের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া বা তাদেরকে সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত রাখার প্রক্রিয়া। অর্থাৎ, যখন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সমাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সম্পদ বণ্টন বা উন্নয়নের ধারায় অংশ নিতে পারে না, তখনই তারা প্রান্তিক হয়ে পড়ে। এই প্রক্রিয়ায় সমাজের প্রভাবশালী শ্রেণি নিজেদের ক্ষমতা বজায় রাখে এবং দুর্বল শ্রেণি ক্রমাগতভাবে অবহেলিত হতে থাকে। প্রান্তিকীকরণ সমাজে বৈষম্য ও অন্যায়ের জন্ম দেয়, যা সামাজিক ঐক্য ও সমতার পথে বড় বাধা সৃষ্টি করে

উন্নয়ন প্রকল্প যেভাবে প্রান্তিকীকরণ ঘটায়

উন্নয়ন প্রকল্প প্রান্তিকীকরণ ঘটার বিভিন্ন উপায়গুলো  নিম্নে আলোচনা করা হলো-

১. জোরপূর্বক স্থানান্তকরণের মাধ্যমে প্রান্তিকীকরণ:

উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় যখন ব্যাপকভাবে ভূখণ্ড অধিগ্রহণ করা হয়, তখন জনগোষ্ঠীকে তাদের পুরাতন আবাস থেকে উচ্ছেদ করে জোরপূর্বক স্থানান্তরিত করা হয়। এ স্থানান্তরিত গোষ্ঠী দেশের অভ্যন্তরে নতুন স্থানে যেতে পারে অথবা কখনো সীমান্তবর্তী অঞ্চলে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।

২. ভৌগোলিক প্রান্তিকীকরণ:

উন্নয়ন তাড়নায় বিতাড়িত জনগোষ্ঠী অন্যত্র গিয়ে আবাস স্থাপন করলে অনেক সময় তাদেরকে দেশের মূল ভূখণ্ডে থাকতে দেওয়া হয় না। ফলে তারা সংঘবদ্ধভাবে কোনো প্রান্তিক বা সীমান্তবর্তী স্থানে বসবাস শুরু করে। কিন্তু ঘনবসতিপূর্ণ উন্নয়নশীল নগরগুলোতে এই ভূমি সংকুলান সম্ভব হয় না, যা তাদের প্রান্তিক অবস্থাকে আরও জটিল করে তোলে।

৩. সংখ্যালঘুকরণের মাধ্যমে প্রান্তিকীকরণ:

বিতাড়নের আগে জনগোষ্ঠী নিজেদের এলাকায় সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকলেও উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে স্থানান্তরিত হওয়ার পর নতুন স্থানে তারা সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়। এমনকি ধর্ম, জাতি বা ভাষায় মিল থাকলেও নতুন পরিবেশে তারা সংখ্যালঘু অবস্থায় বাধ্য হয়।

৪. সংস্কৃতি বিচ্ছিন্নকরণ:

উন্নয়ন প্রকল্পায়নের আগে নিজেদের ভূমি ও সংস্কৃতির সঙ্গে জনগোষ্ঠীর একটি নিবিড় সম্পর্ক থাকে। জোরপূর্বক বিতাড়নের ফলে সেই সম্পর্ক ছিন্ন হয় এবং তারা সাংস্কৃতিক শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ফলে নিজেদের সাংস্কৃতিক পরিচয় হারিয়ে ‘সংস্কৃতিবিহীন’ জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়, যা তাদের মধ্যে গভীর প্রান্তিক মানসিকতা সৃষ্টি করে।

৫. প্রজন্ম হতে প্রজন্মে দুষ্টচক্রের প্রান্তিকতা:

ক্যারোলিন কেগান (২০০৩) বলেন, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড দ্বারা বিতাড়িত জনগোষ্ঠী নতুন সংস্কৃতিতে সঠিকভাবে আত্তীকৃত হতে পারে না। এই প্রান্তিক মানসিকতা তারা তাদের পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যেও ছড়িয়ে দেয়। ফলে নতুন প্রজন্মও আত্মীকরণের প্রতি অনীহা প্রকাশ করে এবং এই প্রান্তিক চেতনা প্রজন্মান্তরে আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

৬. অর্থনৈতিক অবস্থার অবনয়নের মাধ্যমে প্রান্তিকীকরণ:

উচ্ছেদ ও স্থানান্তরের ফলে জনগণ তাদের পূর্ববর্তী অর্থনৈতিক ভিত্তি, পেশা ও সম্পদ হারায়। তারা হঠাৎ করেই বেকারত্ব ও দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে যায়। ফলস্বরূপ, নিম্নমানের পেশায় নিযুক্ত হয়ে অর্থনৈতিক প্রান্তিকতায় নিমজ্জিত হয়।

৭. পারিবারিক ও জাতিগত বিচ্ছিন্নতার মাধ্যম:

অ্যানথনি অলিভার স্মিথ (২০০১) দেখিয়েছেন যে, উন্নয়ন প্রকল্প দ্বারা বিতাড়ন পাশ্চাত্য ও অপাশ্চাত্য সমাজে ভিন্নভাবে প্রভাব ফেলে। পাশ্চাত্যে এটি ব্যক্তিক পর্যায়ে ঘটে, কিন্তু অপাশ্চাত্যে পরিবারভিত্তিক সমাজে এটি গোটা জ্ঞাতি কাঠামোকে ভেঙে দেয়। ফলে ঐতিহ্যবাহী পারিবারিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধন বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

৮. রাজনৈতিক প্রক্রিয়া বিনষ্টকরণ:

উন্নয়ন তাড়নে বিতাড়িত জনগোষ্ঠী তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচিতি হারিয়ে ফেলে। নতুন স্থানে টিকে থাকার সংগ্রামে তারা রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। অতীতের রাজনৈতিক সম্পর্ক ও পরিচিতি হারিয়ে ‘ডায়াস্পোরা’ অবস্থায় উপনীত হয়, যা তাদের প্রান্তিক রাজনৈতিক চেতনাকে আরও গভীর করে।

৯. ভাষাগত প্রান্তিকীকরণ:

অনেক সময় বিতাড়িত জনগোষ্ঠীর ভাষা নতুন স্থানের ভাষার সঙ্গে মেলে না। ফলে ভাষাগত প্রতিবন্ধকতার কারণে তাদের যোগাযোগ ব্যাহত হয় এবং তারা সমাজে সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়। এভাবেই ভাষাভিত্তিক প্রান্তিকীকরণও সৃষ্টি হয়।

উপসংহার: পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, উন্নয়ন প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য সমাজের সামগ্রিক উন্নয়ন হলেও বাস্তবে অনেক সময় তা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বঞ্চনা, উচ্ছেদ ও বিচ্ছিন্নতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও সামাজিক ন্যায্যতা নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে উন্নয়ন প্রকল্প নতুন প্রান্তিকীকরণ না ঘটিয়ে প্রকৃত অর্থে সবার কল্যাণ বয়ে আনে।

বাংলাদেশের চাকমা উপজাতির আর্থসামাজিক ও সংস্কৃতিক জীবনধারা

বাংলাদেশে বসবাসকারী চাকমা সমাজের আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনধারা আলোচনা

ভূমিকা: ভৌগোলিক পরিবেশের তারতম্যের কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের মধ্যে বিভিন্ন রকম বৈচিত্র্য লক্ষ করা যায়। আর এ বৈচিত্র্যের কারণে নৃবিজ্ঞানীরা সমগ্র মানবজাতিকে বিভিন্ন বিভাগে ও উপবিভাগে বিভক্ত করেন। বাংলাদেশে নানান জনগোষ্ঠীর মধ্যে উপজাতীয় জনগোষ্ঠী অন্যতম। আমাদের দেশের বিভিন্ন উপজাতি বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা অন্যান্য উপজাতির মতোই অশিক্ষিত। এসব উপজাতির জীবনধারার মধ্যে কিছু কিছু পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী চাকমা উপজাতি বাংলাদেশের বিভিন্ন উপজাতির মধ্যে অন্যতম।

বাংলাদেশের চাকমা উপজাতির আর্থসামাজিক ও সংস্কৃতিক জীবনধারা


চাকমা সমাজের আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনধারা

নিম্নে বাংলাদেশের চাকমা উপজাতির আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনধারা আলোচনা করা হলো।

১। বাসস্থান:

বাংলাদেশের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলের পার্বত্য অঞ্চল হিসেবে পরিচিত তিনটি জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবান। বাংলাদেশের এ তিনটি জেলাতেই চাকমারা বসবাস করে। তবে এ তিনটির মধ্যে রাঙামাটি জেলায় সবচেয়ে বেশি চাকমার বাস। আমাদের প্রতিবেশি রাষ্ট্র ভারতেও বেশ কিছু সংখ্যক চাকমা বসবাস করে।।

২. নামকরণ:

বয়স্ক শিক্ষিত চাকমাগণ নিজেদের জন্য চাকমা নামটিই ব্যবহার করেন। অপরপক্ষে, চাকমা সমাজের বৃহত্তর গ্রামীণ জনগোষ্ঠী চাকমা নামেই নিজেদের পরিচয় দেন। বর্তমান শিক্ষিত যুবক চাকমাদের অনেকেই চাকমার চেয়ে ‘চাঙমা’ নামটি ব্যবহারে পক্ষপাতি।

৩. জনগণ:

জনসংখ্যার দিক থেকে চাকমারা বাংলাদেশের সবচেয়ে বৃহত্তম উপজাতি। ১৯৯১ সালের লোক গণনার হিসেবে বাংলাদেশের রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবান এ তিন জেলায় চাকমা জনসংখ্যা ছিল সর্বমোট প্রায় ৩ লক্ষ। চাকমারা মোট ট্রাইবাল জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক।

৪. ভাষা:

বর্তমানে চাকমারা একটি বাংলা উপভাষায় কথা কলে। ভাষাগতভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় চাকমারা আগে ‘টিবোটা’ বার্মী ভাষা পরিবারভুক্ত আরাকানি ভাষায় কথা বলত। পরবর্তীতে তারা ইংন্দো-ইউরোপীয় পরিবারের অন্তর্ভুক্ত প্রতিবেশী বাংলা ভাষা গ্রহণ করে। চাকমাদের নিজস্ব লিপি আছে। তাতে আরাকানি অক্ষরের প্রাধান্যই বেশি। তবে চাকমারা লেখার কাজে বাংলা হরফ ব্যবহার করে।

৫. নরগোষ্ঠীগত পরিচয়:

চাকমাদের মধ্যে মঙ্গোলীয় নরগোষ্ঠীর প্রভাব সমতলবাসী বাঙালিদের তুলনায় অনেক বেশি। চাকমাদের সাথে চীনা মঙ্গোলয়েডদের যথেষ্ট মিল। তারা উচ্চতায় মাঝারি থেকে বেঁটে। দৈহিক গড়নেও এরা বেশ শক্তিশালী।

৬. ধর্ম:

চাকমারা হীনযানপন্থি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। চাকমারা বৌদ্ধ ধর্মের বিভিন্ন অনুষ্ঠান পালন করে। চাকমাদের গ্রাম্য এলাকায় বৌদ্ধ মন্দির ক্যাং দেখতে পাওয়া যায়। চাকমারা গোজেন নামের ঈশ্বরকে খুবই ভক্তি শ্রদ্ধা করে।

৭. চাকমা সমাজের গড়ন:

চাকমা সমাজের ক্ষুদ্র সংগঠন হলো পরিবার। এরপর রয়েছে গোত্তি বা গোজা। এর চেয়ে বৃহৎ আয়তনের সামাজিক একক হলো আদাম বা পাড়া। তার চেয়ে অধিক আয়তন হলো গ্রাম বা মৌজা। মৌজার পরে বৃহত্তর চাকমা সমাজ সংগঠন হলো চাকমা সার্কেল বা চাকমা ট্রাইবাল সংগঠন।

৮. পরিবার:

চাকমা পরিবার পিতৃতান্ত্রিক। পরিবারের ক্ষমতা স্বামীর হাতে বা বয়স্ক পুরুষের হাতে ন্যস্ত। সম্পত্তি বা বংশপরিচয় পিতা থেকে পুত্রে উত্তরাধিকারসূত্রে বর্তায়। বিয়ের পর চাকমা দম্পত্তি স্বামীর পিতৃগৃহে বা পিতার গ্রামে বসবাস করে। অর্থাৎ পিতৃবাস এবং নয়াবাস রীতি অনুসৃত হয়।

৯. বিবাহ:

চাকমাসমাজে Cross cousin বিবাহ প্রচলিত আছে। অর্থাৎ মামাতো ভাই-বোন যা ফুফাতো ভাই বোনদের মধ্যে বিবাহ হয়ে থাকে। তাদের মাঝে প্যারালাল কাজিন বিবাহও সীমিত অর্থে প্রচলিত। তবে আপন চাচাতো ভাই-বোনের মধ্যে বিয়ে অনুষ্ঠানে সামাজিক বাঁধা নিষেধ রয়েছে।

১০. বিবাহবিচ্ছেদ:

চাকমাসমাজে খুব কমই বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। বিবাহ বিচ্ছেদ একান্ত জরুরি হলে গ্রামে সালিস বসে। স্ত্রী দোষী হলে স্বামী-স্ত্রীকে দেয়া পোশাক ও গহনাপত্র দাবি করতে পারে। অপরপক্ষে, স্বামী দোষী হলে তাকে জরিমানা দিতে হয়। এভাবে সালিশের মাধ্যমে বিবাহবিচ্ছেন ঘটে।

১১. নেতৃত্ব:

আদামের নেতৃত্বে কারবারি, মৌজার নেতৃত্বে হডম্যান এবং চাকমা উপজাতি তথা সার্কেলের নেতৃত্বে চাকমা রাজার ব্যবস্থা এখনো রয়েছে। তবে বর্তমানে নেতৃত্বে কিছু প্ররিবর্তন লক্ষ করা যায়।

১২. খাদ্য ও বাসস্থান:

চাকমাদের প্রধান আহার্য দ্রব্য হলো ভাত ও মদ। মদ এরা নিজেরাই তৈরি করে নেয়। তারা মাটি থেকে প্রায় ছয় ফুট উচুতে মাচার উপর ঘর তৈরি করে সেখানে বাস করে। ঘরটিকে কয়েকটি কামরায় ভাগ করা হয়ে থাকে।

১৩. পোশাক-পরিচ্ছদ:

চাকমা পুরুষদের পরিধেয় বস্ত্রের মধ্যে ধুতি পাঞ্জাবি উল্লেখযোগ্য। নারীদের ব্যবহার্য পোশাক পরিচ্ছেদ হলো পিন্দন, খাদি, খালাং ইত‍্যাদি। আজকাল শিক্ষিত নারীরা শাড়ি ও ব্লাউজ পরিধান করে।

১৪. শিল্প ও সংস্কৃতি:

চাকমাদের শিল্প সংস্কৃতির বৈচিত্র্যময়। বাংলা লোকসাহিত্য সমৃদ্ধশালী করার ক্ষেত্রে তাদের অবদান কম নয়। আধুনিক শিক্ষা গ্রহণের ফলে চাকমাদের জীবনযাপন পদ্ধতিতে এসেছে পরিবর্তনের ঢেউ।

১৫. অর্থনীতি:

চাকমারা জুম চাষের উপর বেশি নির্ভরশীল। তাদের জন্য ব্যক্তি মালিকানায় জমি বরাদ্দ দেয়া আছে। বর্তমান চাকমারা হালচাষ পদ্ধতি শিখছে। দুই পাহাড়ের সমতল অংশে চাকমারা ধান চাষ করে থাকে। তারা রাবার চাষ ও কাঠের গাছ চাষ করে থাকে।

১৬. চাকমাদের শিক্ষা:

অন্যান্য উপজাতির তুলনায় চাকমার বেশি শিক্ষিত। তারা বাংলা ও ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করেছে অধিকহারে। বর্তমানে উচ্চশ্রেণিতে ভর্তির ক্ষেত্রে উপজাতীয় কোঁটা পদ্ধতিতে এরা সুযোগ পাচ্ছে। তারা সভ্যসমাজের লোকদের মত চাকরি এবং অন্যান্য পেশায় নিয়োজিত।

১৭. খেলাধুলা:

চাকমাদের মধ্যে হা-ডু-ডু খেলা ফার খেলা, লাটিম খেলা, কুস্তি, রশি টানাটানি, সাঁতার ও দৌড় প্রতিযোগিতা প্রচলিত ছিল। ছেলেদের প্রিয় খেলা ছিল পাটি খেলা, গিলা খেলা প্রভৃতি।

১৮. কুসংস্কার:

অনেকের মতে চাকমা সমাজে অনেক কুসংস্কার প্রচলিত ছিল। কারণ তাদের মধ্যে দৈত্য দানবে বিশ্বাস প্রচলিত রয়েছে। রোগ মুক্তির জন্য তারা ঝাঁড় ফুঁকে বিশ্বাস করত, যা আধুনিক সমাজব্যবস্থার সাথ পুরোপুরি অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

১৯. অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া:

চাকমা সমাজে মৃতদেহ আগুনে পোড়ানো হয়। তবে, সাত বছরের কম বয়সিদের কবর দেয়া হয়। মৃত্যুর সাত দিন পর মৃতের বিদেহী আত্মার উদ্দেশ্য সাতদিন্যা নামের এক অনুষ্ঠান পালন করা হয়। এ অনুষ্ঠানে মৃতের আত্তার জন্য খাদ্য, মদ, অর্থ, কাপড় ইত্যাদি উৎসর্গ করা হয়।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, পরিবর্তনে তথা সমাজ ও সরকারের বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির সাথে চাকমাদের আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থার পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। বর্তমানে চাকমা বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছে। ধর্মের পরিবর্তদের ক্ষেত্রে এক জাগরণ এসেছে। শিক্ষার প্রসারের ফলে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এ কথা সত্য যে, ভবিষ্যতে চাকমারা সভ্যসমাজে আসতে সক্ষম হবে।

ভূমি অধিগ্রহণ কী? বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে ভূমি অধিগ্রহণ বিষয়ক বাস্তবতা আলোচনা কর

বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে ভূমি অধিগ্রহণ বিষয়ক বাস্তবতা আলোচনা

ভূমিকা: উন্নয়নশীল দেশগুলোতে উন্নয়ন প্রেক্ষিতে ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়। তবে বাংলাদেশে উন্নয়নের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ করা হলেও অনুন্নয়নও পাশাপাশি তৈরি হয়। অবশ্য এ বিষয়ে কারও তেমন ত্রুক্ষেপ থাকে না। তবে বাংলাদেশে এক্ষেত্রে বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই।

বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে ভূমি অধিগ্রহণ বিষয়ক বাস্তবতা আলোচনা

ভূমি অধিগ্রহণ:

সাধারণত কোনো সরকারি বা বেসরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার জন্য যে ভূমির প্রয়োজন হয়। তার সঠিক সংকুলানের নিমিত্তে এক সময়ে ভূমিতে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীকে তাদের বসতবাড়ি হতে উচ্ছেদ করে সেখানে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। যেই স্থান হতে মানুষকে বিতাড়ন করা হয় সেই ভূমি আগে থেকে রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি হতে পারে বা অন্য সাধারণ জনগণের সম্পত্তি হতে পারে। এই সমগ্র প্রক্রিয়াকে ভূমি অধিগ্রহণ বলা হয়ে থাকে।

মূলত ভূমি অধিগ্রহণের জন্য এ ভূমিতে বসবাসকারী জনগণকে তিনভাবে সরাসরি আক্রান্ত করা হয়। যথা-

১. তাদের আবাসন বিনষ্ট করার মাধ্যমে

২. তারা ভূমিনির্ভর উৎপাদক সম্প্রদায় বা কৃষিজীবী হলে তাদের কৃষি ভূমি কেড়ে নেওয়ার মাধ্যমে।

৩. অধিকৃত ভূমিকে অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করার মাধ্যমে

বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে ভূমি অধিগ্রহণ বিষয়ক বাস্তবতা

বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে এর নেতিবাচক প্রভাব বেশি। তবুও উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য এর বাস্তবতা অনস্বীকার্য। এ সম্পর্কে নিচে আলোচনা করা হলো-

১. কাপ্তাই প্রকল্প:

বিদ্যুৎ উৎপাদনের বাঁধ নির্মাণের জন্য বাংলাদেশে সর্ববৃহৎ ভূমি, অধিগ্রহণ হয় ১৯৬২ সালে। কাপ্তাই অঞ্চলের উন্নয়ন প্রকল্প দ্বারা উদ্ভূত জলাশয় কাপ্তাই লেক পৃথিবীর সর্ববৃহৎ মানবসৃষ্ট হ্রদ। তখন ঐ অঞ্চলের বহু জনগোষ্ঠীকে বিতরণ করা হয়েছে। ফলে ঐ অঞ্চলের ব্যাপক প্রতিবেশগত পরিবর্তন ঘটেছে, যা মানুষের সমগ্র জীবনযাপন প্রক্রিয়া বদলে নিয়েছে।

২. কৃষি উন্নয়নে ভূমি অধিগ্রহণ:

বাংলাদেশে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধরনের কৃষিভিত্তিক উন্নয়নের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। যেমন- রাবার চাষ, তামাক যায় ইত্যাদি। এক্ষেত্রে কৃষিভূমি অধিগ্রহগের ফলে কৃষিভূমির অনুপাত কমে যায়। বৃহৎ জনগোষ্ঠীর উৎপাদিত খাদ্যশস্যে ঘাটতি পড়ে।

৩. জোরপূর্বক স্থানান্তর:

এদেশের বড় বড় স্থাপনা যেমন বিমানবন্দর তৈরি, নদীবন্দর তৈরি ইত্যাদির জন্য ভূমি অধিগ্রহণ ঘটছে। এক্ষেত্রে রাজনৈতিকভাবে প্রচুর মানুষ বিভিন্ন সময়ে ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় জোরপূর্বক স্থানান্তরে বাধ্য হয়। ফলে দেশে অভ্যন্তরীণ স্থানান্তর বৃদ্ধি পায়।

৪. দারিদ্র্যকরণ সৃষ্টি:

অধীগ্রহণ প্রক্রিয়ায় জনগোষ্ঠীর জীবনে বিভিন্ন সময়ে ব্যাপক দারিদ্র্যকরণ ঘটেছে। ফলে পরবর্তীতে তাদের জীবনে পুষ্টিহীনতা, চিকিৎসাহীনতা এবং অন্যান্য সমস্যা দেখা দিয়েছে। এ সময় ক্ষতিগ্রস্থদের প্রকৃত অর্থমূল্য দেওয়া হয় না।

৫. বনাঞ্চল তৈরি:

বিভিন্ন ধরনের সংরক্ষিত বনাঞ্চল তৈরির জন্য ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। যেমন- টাঙ্গাইলের মধুপুরের শালবন তৈরির জন্য বিশাল আকারের তুমি অধিগ্রহণ

৬. জনগোষ্ঠীর প্রান্তিকীকরণ:

ভূমি অধিগ্রহণের ফলে সব সম্পদ, পুঁজি এবং জীবিকা নির্বাহের অবলম্বন হারিয়ে ফেলার মাধ্যমে নতুনভাবে অর্থনৈতিক প্রান্তিকীকরণ সৃষ্টি হয়। এতে দেশে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়তে থাকে।

৭. সরকার ও জনগণের দূরত্ব বৃদ্ধি:

রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ উন্নয়নের স্বার্থে যখন জনগণকে বিতাড়ন করে ভূমি অধিগ্রহণ করতে থাকে তখন তাদের প্রতি জনগণ আস্থা হারিয়ে ফেলে। ফলে রাজনৈতিক সরকার ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব বেড়ে যায়।

৮. অসামাজিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি:

উৎপাটিত জনগণের জীবনে কর্মহীনতা এবং শ্রমের অবমূল্যায়ন ঘটে। ফলে তারা বিভিন্ন ধরনের অসামাজিক কর্মকান্ড যেমন চুরি, ডাকাতি, ছিনতাইয়ে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।

৯. সড়ক স্থাপন:

বাংলাদেশে সড়ক নির্মাণ এবং সড়ক প্রশস্তকরণের জন্য বিভিন্ন সময়ে ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। যেমন- পদ্মা সেতু নির্মাণের সময় আশেপাশের এলাকার অনেক ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। এ সময় জনদুর্ভোগ অনেক বেশি হারে দেখা যায়।

১০. শিল্প স্থাপন:

বাংলাদেশে EPZ সমুহ নির্মাণের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। এতে বহু মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। বর্তমানেও বৃহৎ প্রকল্পের আওতাধীন অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা হচ্ছে। সরকার ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে। এসব কাজ চলমান হয়েছে। এতে ভূমি অধিগ্রহাণ জনগোষ্ঠীর ব্যাপক অংশ ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।

১৯. ইকোপার্ক তৈরি:

বাংলাদেশে গাজীপুরসহ অন্যান্য ভূমন্ডলে ইকোপার্ক তৈরির জন্য প্রচুর ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। এসব ভূমিতে বসবাসরত উন্নয়নতাড়িত গোষ্ঠী স্থান্তরিত হয়ে শহরমুখী হয় ফলে শহরে বস্তি সমস্যার সৃষ্টি হযেছে। ভূমি অধিগ্রহণ প্রকৃতপক্ষে তাদেরকে অর্থনৈতিকভাবে অসমর্থ করে তুলছে।

১২. পরিবেশ শরণার্থীকরণ:

বাংলাদেশে ভূমি অধিগ্রহণ ভূমিতে বসবাসরত জনগোষ্ঠীকে  পরিবেশ শরণার্থীতে পরিণত করে থাকে। ফলে স্থানান্তরে বাধ্য জনগোষ্ঠীর শিশুমৃত্যু, মাতৃমৃত্যু, অপুষ্টি এবং স্বাস্থ্যহীনতা বেড়ে যায়, বেকারত্ব বেড়ে যায়, পেশায় পরিবর্তন ঘটে থাকে।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, বাংলাদেশে ভূমি অধিগ্রহণের বাস্তবতা অনেকটাই অনুন্নয়নের সমর্থক। তবুও উন্নয়নের প্রেক্ষিতে এ কার্যক্রম থাকবেই। তারা এ সুযোগ না উপভোগ করতে পারলেও না পরবর্তী প্রজন্ম এর সুফল ভোগ করে থাকে। তবে এর ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় দিকই রয়েছে। তাই জনগণের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে দ্রুত উন্নয়ন কাজ সমাধান করা উচিত।

বাংলাদেশের খাসিয়া উপজাতির আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনধারা আলোচনা কর

খাসিয়াদের বর্তমান আর্থসামাজিক জীবনধারা আলোচনা কর।

ভূমিকা: আমাদের দেশে বসবাসরত উপজাতি-গোষ্ঠীয় মধ্যে 'খাসিয়া' অন্যতম একটি উপজাতি। সিলেটের সীমান্তবর্তী অঞ্চল খাসিয়া জৈন্তিয়া পাহাড়, তামাবিল ও সুনামগঞ্জ জেলায় খাসিয়ারা বাস করে। ঐতিহাসিকদের মতে, খাসিয়ারা সিলোট এসে বসতি স্থাপস করে প্রায় পাঁচশো বছর আগে। ড. গ্রিয়ারসন উল্লেখ করেন, খাসিয়ারা চীনের হোয়াংহো ও ইয়াংসি নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলে বাস করত। গত্রে উক্ত নদীপথে এরা ভারতীয় উপমহাদেশে আসে। নৃবিজ্ঞানী এইচ রবার্টস-এর মতে, আসলে ব্রাহ্মদেশে বাস করত। পরবর্তীকালে এরা আসামে আসে।

বাংলাদেশের খাসিয়া উপজাতির আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনধারা


খাসিয়া সমাজের আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনধারা:

নিম্নে খাসিয়া উপজাতিদের আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনধারা আলোচনা করা হলো-

১. নামকরণ:

গারো পাহাড়ের অধিবাসীরা যেমন গারো, লুসাই পার্বত্য অঞ্চলের অধিবাসীয়া যেমন লুসাই নামে পরিচিত, তেমনি খাসিয়া পার্বত্য অঞ্চলের আদিম সমাজভুক্ত লোকও খাসিয়া নামে পরিচিত। তবে খাসিয়া নামকরণ সম্পর্কে কোনো সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় না এবং এদের নামকরণ নিয়ে যথেষ্ট মতভেদ রয়েছে। অনেকে মনে করেন, এদের আদিবাস আসামের আসিয়া 'জয়ন্তিয়া' পাহাড়ে হওয়ার কারণে তাদের খাসিয়া বলা হয়।

২. আবাসস্থল:

খাসিয়াদের আদি রাসস্থান ভারতের আসাম প্রদেশের খাসিয়া জৈন্তিয়া পার্বত্য অঞ্চলে। তবে বাংলাদেশে খাসিয়ারা সিলেটের তামাবিল, জৈয়ন্তাপুর, জাফলং, সুনামগঞ্জ, মহকুমার খাসিয়া, জৈন্তিয়া পাহাড়ের সীমান্তবর্তী অঞ্চল এবং বৃহত্তর টাঙ্গাইল জেলায় বসবাস করতে দেখা যায়।

৩. নরগোষ্ঠীগত পরিচয়:

খাসিয়ায়া প্রোটো মঙ্গোলয়েড নরগোষ্ঠীর অন্তর্গত। এদের মুখমণ্ডল ফর্সাকৃতির নাক চ্যাপ্টা, উচ্চতা মধ্যমাকৃতির, চোখ ছোট, মুখাকৃতি গোলাকার, দাড়ি-গোঁফের প্রাচুর্য কম এবং পায়ের গোঁড়ালি সরু।

৪. জনসংখ্যা:

২০০১ সালের আদমশুমারির তথ্য অনুযায়ী এদেশে খাসিয়া উপজাতির সংখ্যা প্রায় ১০০০০ এর মতো এর মধ্যে সিলেটে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক খাসিয়া বসবাস করে। বর্তমানে খাসিয়াদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ।

৫. গোত্র-বিভাগ:

খাসিয়াদের মধ্যেও গোত্র বিভাগ রয়েছে। এরা প্রধানত ছয়টি গোত্রে বিভক্ত। গোত্রগুলো হাচ্ছে-মিনতেং, পনার, রিনগ্যাম, ভুইবার, লাংগুই। গোত্রগুলো একই নারী বংশধর দিয়ে গঠিত। বড় বড় গোত্র আবার একাধিক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গোত্রে বিভক্ত। এসব গোত্রের প্রত্যেকটি মানুষই একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা-সহনশীল ও সহানুভূতিশীলতার মনোভাব পোষণ করে।

৬. ভাষা:

খাসিয়াদের ব্যবহৃত ভাষার সাথে মালাক্কা, নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের অধিবাসীদের ভাষার মিল আছে।

৭. পরিবার ও বিবাহব্যবস্থা:

খাসিয়াসের পরিবার প্রধানত মাতৃতান্ত্রিক। সন্তানদের পরিচয়, সম্পতির উত্তরাধিকার ও মালিকানা সবকিছুই মাতৃসূত্রীয়ভাবে বর্তায়। খাসিয়া সমাজে নারীরাই পরিবারের প্রধান এবং পরিবারের কর্তৃত্ব তাদের উপর থাকে। খাসিয়া সমাজে বিয়ের পর স্বামীকে স্ত্রীর মায়ের বাড়িতে বসবাস করতে হয়। এখানে স্বগোত্র এবং একসাথে দু্ইবোনকে বিবাহ করা নিষিদ্ধ।

৮. অর্থনীতি:

খাসিয়ারা কৃষিকর্মের উপর নির্ভরশীল। তবে জুম চাষও এদের মধ্যে দেখা যায়। এদের কৃষিকাজে ব্যবহার যন্ত্রের মধ্যে লাঙ্গল, কোদাল এবং দা প্রধান। কৃষিকর্ম ছাড়াও এরা ব্যবসায় বাণিজ্য, দিনমজুর ও কুলির কাজও করে থাকে।

৯. ধর্ম:

অদৃশ্য শক্তির উদ্দেশ্য পূজাপার্বণ এবং উৎসর্গই খাসিয়া ধর্মের মূলনীতি। এরা বিশ্বাস করে যে, বিশ্বব্রক্ষান্ড সৃষ্টির অন্তরালে সর্বশক্তিমান সৃষ্টিকর্তা আর প্রকৃতির অন্তরালে দেবতা কিংবা অপদেবতার অস্তিত্ব বিরাজমান। খাসিয়ারা পূর্ব পুরুষ পূজা ও প্রস্তর পুজা করে থাকে। এছাড়া খাসিয়ারা পুনর্জন্মের বিশ্বাসী।

১০. পূজাপার্বণ ও নৃত্য:

খাসিয়া সমাজে পূজাপার্বণের সংখ্য অগণিত। এদের প্রত্যেক পুজায় ছাগল ও মোরগ উৎসর্গ করা হয়। মুরগি ও মোরগ খাসিয়া সমাজে খুবই পবিত্র বলে বিবেচিত হয়। পূজায় মোরগ উৎসর্গের মাধ্যমে দেবতা সে পূজা গ্রহণ করলো কিনা তার পরীক্ষা করার একটি বিশেষ বাবস্থা বা নিয়ম তাদের মধ্যে রয়েছে। এছাড়া নৃত্যগীত তাদের পূজা পার্বন বিয়ের অনুষ্ঠান, শবদাহ ইত্যাদি প্রত্যেকটি ব্যাপারেই গুরুত্ব বহন করে।

১১. খাদ্যদ্রব্য:

তাদের প্রধান খাদ্য ভাত ও মদ। মদকে তারা কা-ইয়াদা, পুদকা বলে।তারা নিজেরাই ভাত, মহুয়া নির্যাস থেকে মদ তৈরি করে। মদ ছাড়া কোনে অনুষ্ঠাই সম্পন্ন হয় না। মাংস তাদের খুব প্রিয় খাদ্য। তবে কুকুরের মাংস তারা ভক্ষন করে না। খাসিয়াদের নিকট পান, সুপারি খুবই পবিত্র বস্তু।

১২. পোশাক-পরিচ্ছদ:

তাদের পোশাক পরিচ্ছেদ খুবই সাধারণ। মেয়েরা নিজেদের তৈরি এক প্রকার ব্লাউজ ব্যবহার করে থাকে যাকে কাজিম পিন বলা হয়। তাছাড়াও ‘কাজৈন সেন’ নায়ক সিল্কের তৈরি লুঙ্গির মতো একপ্রকার কাপড় পরে। এছাড়াও মেয়েরা এক ধরনের কাপড়ের বেল্ট পরিধান করে।

১৩. শিল্পকলা:

শিল্পকলার ক্ষেত্রে খাসিয়াদের একটি বিশেষ ঐতিহ্য রয়েছে। খাসিয়ারা বাঁশের সাহায্যে কি কনুপ (মাথাল) কি কোহ (ঝুড়ি), কা শানাম' (বাক্সস) এবং কি ‘সিন্নার' (কাঁথা) তৈরি করে থাকে।

১৫. পেশা:

খাসিয়ারা মূলত কৃষিজীবী। তবে কিছু কিছু খাসিয়াকে ব্যবসায় বাণিজ্য করতেও দেখা যায়। তারা পান চাষ করে ও বিক্রি করে। খাসিয়ারা জঙ্গল থেকে মধু সংগ্রহ করে তা বাজারে বিক্রি করে। অনেকে বাড়িতে মৌমাছি পালন করে।। এদের ঘরের বারান্দায় ও ঘরের মধ্যে মৌমাছি চাক বানায়।

১৫. আন্তাষ্টিক্রিয়া:

খাসিয়াদের মধ্যে কেউ মারা গেলে পুড়িয়ে ফেলা হয়। মৃত স্বাক্তিকে স্নান করিয়ে নানান আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে মৃতদেহকে পোড়ানো হয়। মৃতদেহ পোড়ানোর পর মৃতব্যক্তির ছাই ও হাড় কুড়ানোর রীতি খাসিয়াদের মধ্যে বর্তমান। যেমন- স্বামীর মৃত্যু হলে খাসিয়া রমণীরা হাড় কুড়িয়ে মালা বানিয়ে গলায় পরিবান করে। এ মালা পরিধানের পর সেই রমণী আর অবৈধ কাজে লিপ্ত হতে পারে না এবং সর্বদা স্বামীর চিন্তায় ব্যস্ত থাকে।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে খাসিয়াদের জীবনপ্রণালি ও পারিবারিক কাঠামো ব্যাপক বৈচিত্র্যময়। মাতৃপ্রধান পরিবার হওয়ায় সমাজে নারীদের প্রভাব বেশি। তাছাড়া পারিবারিক কাঠামোতে সমাজের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।

বাংলাদেশের সাঁওতাল উপজাতির আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনধারা আলোচনা কর

বাংলাদেশের সাঁওতাল উপজাতিদের জীবনধারা আলোচনা

ভূমিকা: সাঁওতাল বাংলাদেশের একটি অন্যতম উপজাতি। এদেশে সাঁওতাল উপজাতির কীভাবে আগমন ঘটেছিল তার কোনো সঠিক ইতিহাস জানা যায়নি। এদের জনগোষ্ঠীর রয়েছে বিচিত্র জীবনধারা। জীবনধারার বিচিত্রতার কারণে এ উপজাতি অন্যান্য উপজাতি থেকে পৃথক। অন্যান্য উপজাতির মতো সাঁওতাল উপজাতি তেমন শিক্ষিত ও উন্নত নয়।

বাংলাদেশের সাঁওতাল উপজাতির আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনধারা আলোচনা কর।


বাংলাদেশের সাঁওতাল উপজাতিদের জীবনধারা:

নিম্নে বাংলাদেশের সাঁওতাল উপজাতিদের জীবনধারা আলোচনা করা হলো

১. উৎপত্তি ও ইতিহাস:

সাঁওতাল বাংলাদেশের একটি অন্যতম উপজাতি। সাঁওতাল উপজাতি কোথা হতে এবং কীভাবে এ উপমহাদেশে আগমন করেছিল তার কোন সঠিক সূত্র এখনও খুঁজে পাওয়া যায় নি।নৃবিজ্ঞানীদের মতে, এরা এ উপমহাদেশের প্রাচীন জনগোষ্ঠী হলেও এদেশের আদি বাসিন্দা নয়।

২. নামকরণ:

সাঁওতাল নামের উৎপত্তি নিয়ে বিভিন্ন সমাজ ও নৃবিজ্ঞানী বিভিন্ন গবেষণা করলেও কেউই স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি। সাধারণত সাঁওতাল পরগনার অধিবাসী বলে এদেরকে সাঁওতাল বলা হয় বলে অনেকের ধারণা।

৩. সাঁওতালদের বসতি:

সাঁওতালদের আদি বসতি ভারতের ছোটনাগপুর ও সাঁওতাল পরগনায়। বাংলাদেশের রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, বগুড়া ও রংপুর জেলায় সাঁওতালদের দেখা গেলেও এরা প্রধানত দিনাজপুর, সেতাবগঞ্জ, পঞ্চগড় প্রভৃতি অঞ্চলের অধিবাসী।

৪. নরগোষ্ঠীগত পরিচয়:

সাঁওতালদের গায়ের রং কালো ঠোঁট মোটা এবং নাক প্রশস্ত বা চ্যাপ্টা, পুরুষের মুখে দাঁড়ি গোঁফ কম। এদের চুল কোকড়ানো এবং গঠন মাঝারি ধরনের। নৃতাত্ত্বিকগণ এদেরকে আদি অস্ট্রেলীয় মানবগোষ্ঠী বলে মনে করেন।

৫. গোত্র বিভক্তি:

সাঁওতালরা বিশ্বাস করে যে, আদি মানব-মানবী পিলু হড়ম ও পিলু বুড়ির সাত জোড়া সন্তান থেরেই তাদের উদ্ভব। এজন্যই সাঁওতালরা সাতটি গোত্রে বিভক্ত। আমর এ সাতটি গোত্রের নাম হালা- হাঁসদাক, সুরযূ, কিসকু হেসবরোন, মারুদি, সোরেন ও টুডু।

৬. পরিবার:

সাঁওতালদের সমাজ পিতৃতান্ত্রিক। সে সমাজে মায়ের চেয়ে পিতার কর্তৃত্ব বেশি। পুরুষরাই সাঁওতাল সমাজের কর্তৃত্ব গ্রহণ করে থাকে। সাঁওতালদের সমাজে পিতার সম্পত্তিতে পুত্রের সমান উত্তরাধিকার থাকে। কিন্তু ওই সম্পত্তিতে কন্যাদের কোনো অধিকার থাকে না।

৭. প্রচলিত বিশ্বাস:

সাঁওতালদের মধ্যে টোটেম বিশ্বাস প্রচলিত ছিল। প্রতিটি গোত্রই পূর্বপুরুষ কিংবা গাছপালা, জীবজন্ত, পশুপাখি ইত্যাদি নামে পরিচিত। যেমন- হাঁসদাক লোকের বিশ্বাস এদের উদ্ভব হয়েছে হাঁস থেকে।

৮. বিবাহ ও সামাজিক গড়ন:

কোনো সাঁওতাল তার নিজের গোত্রের বা গোত্রের অন্তর্ভুক্ত কোনো উপগোত্রের মধ্যে বিয়ে করতে পারে না। সাঁওতালদের বিয়ের উৎসব অত্যন্ত দীর্ঘ। সাঁওতালদের প্রত্যেক গ্রামেই হাট বসে। হাটে গিয়ে মেয়ে-পুরুষ বিয়ের সাথী খোঁজে। সাঁওতাল মেয়েদের সাথে তাদের একজন গণ্যমান্য ব্যক্তি থাকে সাঁওতালি ভাষায় যাকে যোগসাঝি বলে। একজন মেয়ে তার পছন্দের যুবকের কথা অকপটে যোগসাঝির কাছে প্রকাশ করে। তারপর যোগসাঝি ঘটা করে তার কাজ সমাধা করে। সাঁওতালদের সমাজে নারীদের অবাধ স্বাধীনতা রয়েছে।

৯. বিবাহ-বিচ্ছেন:

সাঁওতাল সমাজে তালাকপ্রথা রযেছে। সংসারধর্ম পালনে অপারগ হলে কিংবা ব্যক্তিগত কারণে যদি স্ত্রীকে কেউ তালাক দিতে চায় তবে থাকে কুড়ি টাকা জরিমানা দিতে হয় এবং পাঁচজন গণ্যমান্য ব্যক্তির সামনে তালাক ঘোষণা করতে হয়।

১০. পোশাক পরিচ্ছেদ:

এদের পোশাক খুবই সাধারণ। পূরুষেরা ধুতি, মেয়েরা শাড়ি পরে। শাড়ি দুটি ভাগে বিভক্ত। শাড়ির একভাগ থাকে শরীরের উপরের অংশে অপর ভাগ থাকে শরীরের নিম্নের অংশে। এরা বেশ অলংকার প্রিয়

১১. খাদ্য:

সাঁওতালদের প্রধান খাদ্য ভাত। এছাড়া শূকর, ইদুর, কাঁকড়া, মাছ, পাখি ইত্যাদি তারা খেয়ে থাকে। এরা মদ্যপানে অভ্যস্ত। উৎসব বা অন্যান্য পূজাপার্বণে তারা মদের আসর জমায়।

১২. আবাসস্থল:

সাঁওতালঙ্কের ঘরগুলো শন বা খড়ের তৈরি এবং আকৃতিতে ছোট। বোঙ্গার ভয়ে তারা ঘরে কোন জানালা রাখে না। তবে তাদের ঘরবাড়ি খুব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। তাদের ব্যবহৃত আসবাবপত্রের মধ্যে দড়ির খাঁটিয়া ও চাটাই, কাঁসার হাটি, মাটির হাঁড়ি ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

১৩. বিনোদন:

সাঁওতালরা খুব পরিশ্রমী, সরল, হাসি খুশি ও আমোদপ্রিয়। কাজের ফাঁকে সামান্য সময় পেলেই তারা আড় বাঁশির সুরে কিংবা রসিকতার মায়াজালে আচ্ছন্ন করে রাখে। এদের দেহাবয়ন যেমন চকচকে, ঘর ও বাড়ি তেমনি ঝকঝকে, তকতকে।

১৪. সংস্কৃতি:

ধর্মীয় ও সামাজিক আচার অনুষ্ঠানে সাঁওতালদের নৃত্য অপরিহার্য। নৃত্য শুধু যে তাদের মনের স্বরঃস্ফূর্ত আনন্দের প্রতীক তাই নয়। এর মধ্যে নিহিত রয়েছে তাদের সংস্কারাবদ্ধ ধর্মীয় বিশ্বাস। তারা মনে করে একমাত্র নৃত্যের মাধ্যমেই অপদেবতা তাড়ানো, রোগ-জরা দূরীকরণ, ক্ষেতে ফসল বৃদ্ধি এবং সাংসারিক জীবনে সকল প্রকার মঙ্গল আনায়ন সম্ভব।

১৫. ভাষা:

সাঁওতালদের নিজস্ব ভাষা আছে। সাঁওতাল ভাষা দুটি উপভাষায় বিভক্ত। যেমন কারমেলি ও মাহলেস। প্রখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ হাডসন উল্লেখ করেছেন যে, সাঁওতাল ভাষা কেনো ভাষার উপভাষা।

১৬. আচার-অনুষ্ঠান:

সাঁওতালরা বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান পালন করে। মাঘ মাসকে তারা কৃষি বছরের শেষ মাস এবং নববর্ষের প্রারম্ভ মনে করে। তাদের প্রধান উৎসবগুলো হালো পৌষ মাসের 'সোহরাব উৎসব', মাঘ মাসের মাঘসিম', ফাগুন মাসের অমাবৎস্যায় 'বসন্তোৎসব', আষাড়ে এরকংসিম ইত্যাদি।

১৭. শিক্ষা:

অন্য উপজাতিদের মতো এরাও আধুনিক শিক্ষার দিকে ঝুঁকে পড়ছে এবং ক্রমেই আধুনিক সভ্যতার আওতায় চলে আসছে। তারা ধীরে ধীরে বাংলাদেশি সমাজের সাথে মিশে যাচ্ছে। আর এ একত্রীকরণ শুরু হয়েছে উন্নত শিক্ষার কারণেই।

১৮. অর্থনৈতিক অবস্থা:

প্রথমদিকে সাঁওতালরা মাঠে- ময়দানে ভূমি কাজ না করলেও বর্তমানে এখন আয়ের প্রধান উৎস হলো কৃষি কাজ। এরা স্ত্রী-পুরুষ সকলেই কর্মঠ এবং মাঠে ময়দানে কাজ করে।

১৯. আন্ত্যষ্টিক্রিয়া:

সাঁওতালদের মৃতদাহ করা হয়। কোনো ব্যক্তির মৃত্যু ঘটলে সঙ্গে সঙ্গে গ্রাম্য প্রধান ও  সেখানে সমবেত হয় এবং মৃতদেহে তেল ও হলুদ মিশিয়ে মালিশ করে। অতঃপর তা উঠানে নিয়ে এসে তাতে পানি ও গোবরের ছিটা দিয়ে পবিত্র করা হয়। তারপর তাকে শ্বশানে নিয়ে গিয়ে মৃতদেহ অগ্নিসংযোগ করে। আর এভাবেই একজন মৃত ব্যক্তির আন্ত্যষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, সাঁওতালদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনধারা একদিকে যেমন সংস্কারমুক্ত, অপরদিকে তা বৈচিত্র্যময়। বর্তমানে এরা শিক্ষার দিকে ঝুঁকে পড়ছে।

বাংলাদেশের গারোদের আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনধারা আলোচনা কর

বাংলাদেশের গারো এথনিক গোষ্ঠীর সামাজিক, সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যসমূহ বিশ্লেষণ

ভূমিকা: বাংলাদেশে প্রায় ৪৫টি উপজাতি সম্প্রদায় রয়েছে। এদের মধ্যে, গারো সম্প্রদায় অন্যতম। এ উপজাতিদের মধ্যে সম্প্রদায় বেশ দৃঢ়। বিভিন্ন প্রতিকুল পরিবেশের মধ্যে বসবাস করে বলে তাদের একতাবোধ বেশ দৃঢ় থাকে। এরা যাযাবর প্রকৃতির। বিভিন্ন প্রয়োজনে তারা প্রতিদিন বিভিন্ন স্থানে গেলেও কাজ শেষে আবার নিজের স্থায়ী আবাসনে ফিরে আসে। প্রতিটি উপজাতিই বৈচিত্র্যপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অধিকারী।

বাংলাদেশের গারোদের আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনধারা


গারোদের আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনধারা:

অন্যান্য উপজাতির মতো গারোদেরও রয়েছে নিজস্ব সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। নিম্নে বাংলাদেশের গারো সমাজের আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনধারা আলোচনা করা হলো-

১. নামকরণ:

গারো পাহাড়ের নামানুস্যায় গারোদের নামকরণ করা হয়েছে। আবার কেউ কেউ বলেন, গারো সম্প্রদায় যে পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাস করে সে অঞ্চলের পাহাড়গুলোর নামকরণ করা হয়েছে তাদেরই নামানুসারে।

২. ভৌগোলিক অবস্থান:

বাংলাদেশের ময়ানমনসিংহ এবং টাঙ্গাইল জেলায় গারোদের বসবাস। এছাড়া ঢাকা জেলার উত্তরাঞ্চল রংপুর জেলার উত্তর পূর্বাঞ্চল এবং সিলেট চা বাগানে সামান্য কিছু গারোদের দেখতে পাওয়া যায়। তবে অধিকাংশ গারোরা থাকে ভারতের আসামের মেঘালয়ে।

৫. জনসংখ্যা:

বর্তমানে বাংলাদেশে গারোদের সংখ্যা প্রায় ৯০ হাজার। এর মধ্যে ময়মনসিংহে ৬০ হাজারের মতো, টাঙ্গাইলের মধুপুর গড় ২০ হাজার গারো বসবাস করে। ঢাকা, রংপুর এবং সিলট অঞ্চলে বাস করে প্রায় ১০ হাজার গারো। এছাড়াও বাংলাদেশ ও ভারতে মোট, গারোর সংখ্যা ৩,১৭,৮৪২ জন।

৪. ভাষা:

গারোদের ভাষার স্থানীয় নাম মান্দিভাষা বা গারো ভাষা। গারোরা যে ভাষায় কথা বলে তা মূলত সিনো টিবেটান ভাষার অন্তর্গত। গারোদের নিজস্ব কোনো লিপি বা অক্ষর নেই। তাব বর্তমানে ভারতের গারোরা আসাম অঞ্চলে রোমান হরফে এবং বাংলাদেশের গারোরা বাংলা হরফে গারো ভাষা লিখছে।

৫. নৃগোষ্ঠীগত পরিচয়:

গারোরা মঙ্গোলয়েড নরগোষ্ঠীর অর্ন্তগত। তাদের মুখাকৃতি গোলাকার এবং চ্যাপ্টা, নাক প্রশস্ত, কপাল ক্ষুদ্রাকৃতি, কান বড় এবং ঠোঁট মোটা। তাদের চুল কালো, কোঁকড়ানো, পুরুষের মুখে দাঁড়ি, গোঁফ কম। তাদের উচ্চতা  ৫ ফুটের বেশি নয়।

৬. ধর্ম:

বর্তমানে বাংলাদেশের ৯০ ভাগ গারোই ধর্মান্তরিত খ্রিস্টান। ২ তাণ মুসলমান ও হিন্দু। বাকি ৮ ভাগ ঐতিহ্যবাহী ধর্মের লোক। গারোদের ঐতিহ্যবাহী ধর্মের নাম সাংসারেক। এরা হিন্দুদের মতো পূজা করে থাকে।

৭. শ্রেণি ও গোত্র বিভাগ:

পারো সম্প্রদায় প্রধানত দুটি শ্রেণিতে বিভক্ত। যথা- আচ্ছিক ও লামদানির। আচ্ছিক শ্রেণিয় গারোদের গারো পাহাড়ের অভ্যন্তরে গহীন অরণ্যে বাস করতে দেখা যায় এবং লামদানি শ্রেণির গারোদেরকে ময়মনসিংহ জেলার নালিতাবাড়ি, হালুয়াঘাট, দুর্গাপুর, কমলাকান্সা, শ্রীবর্দী প্রবৃতি এলাকায় অধিক সংখ্যায় বসবাস করতে দেখা যায়। আচ্ছিকদের তিনটি শ্রেণি হলো অয়, আচেং, দোয়াল। লামদানিদের তিনটি শ্রেণি হলো- সমীন, সারাক, সারগমা।

৮. সামাজিক সংগঠন:

গারো সমাজ প্রধানত মাতৃসূত্রীয়। গারোদের বৃহৎ গোত্রের নাম চাটচি। যার অর্থ আত্মীয় বা জাতি। যারা চাটছি গোত্রভুক্ত তারা সবাই একে অপরের সঙ্গে মাতৃসূত্রীয় রীতিতে সম্পর্কযুক্ত। পাঁচ প্রকার চাটছি গোত্র রয়েছে। যথা- মারাক, মোমিন, মিয়া, সংসা এবং আবেং।

৯. পরিবারপ্রথা:

যেহেতু গারো সমাজ মাতৃতান্ত্রিক তাই সম্পত্তি ও বংশ নাম মাতৃসূত্রীয় ধারায় বর্তায়। বিবাহের পর দম্পতি স্ত্রীর বাবার গৃহে বসবাস করে। তাই গারো পরিবার মাতৃপ্রধান।

১০. বিবাহপ্রথা:

গারো সমাজে Monogamy বা যুগল বা একবিবাহ রীতির প্রচলন আছে। গারো সমাজে প্যারালাল কাজিন বিবাহ নিষিদ্ধ। কিন্তু ক্রস কাজিন বিবাহ অনুমোদিত। গারো বিবাহে কন্যাকে কোনো পণ দিতে হয় না।

১১. বিবাহবিচ্ছেদ:

গারোদের মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদ খুবই কম। বিবাহবিচ্ছেদ যদি ঘটে তবে তা সালিশের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়। বিচ্ছেদে স্বামী স্ত্রীকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। দোষী ব্যক্তির গোষ্ঠীর লোক অন্য পক্ষকে জরিমানা দেয়ার শর্তে বিবাহবিচ্ছেন ঘটে।

১২. খাদ্য:

বাংলাদেশি গারোরা হাঁস, মুরগি, গরু, ছাগল, শুরুর প্রভৃতি খায়। মদ তাদের প্রধান বা অপরিহার্য পানীয়। ধর্মীয় বিধি নিষেধ অনুসারে তারা কখনো বিড়াল ভক্ষণ করে না।

১৩. পোশাক-পরিচ্ছদ:

পোশাক পরিচ্ছেদ বিশেষ বাহুল্য নেই। গারোদের পোশাক-পরিচ্ছদ খুবই সাধারণ। পুরুষেরা ধুতি ব্যবহার করে। মেয়েরা ব্লাউজ বা লুঙ্গির মতো বুকে টুকরো কাপড় পরিধান করে।

১৪. শিক্ষা:

বাংলাদেশের গারোরা বর্তমানে শিক্ষিত হচ্ছে। বিশেষ করে খ্রিস্টান মিশনারির মাধ্যমে এরা ক্রমশ শিক্ষিত হয়ে উঠছে। এদেশের গারোরা বাংলা হরফে গারো ভাষা শিখছে। বর্তমানে শতকরা প্রায় ২৯ ভাগ গারো শিক্ষিত। তবে গারোদের নিজস্ব কোনো লিপি বা বর্ণমালা নেই।

১৫. অর্থনীতি:

জুম চাষই গারোসের প্রধান অর্থনৈতিক কাজ। বর্তমানে সরকারি নিষেধাজ্ঞার কারণে ১৯৫০ সালের পর থেকে জুম চাষ বন্ধ। তার পরিবর্তে বর্তমানে গারোরা হাল চাষে অত্যস্ত হয়ে পড়েছে। তারা কৃষিতে ধান সবজি ও ফল উৎপাদন করে থাকে। পূর্বে পারো সমাজে অর্থনৈতিক বৈষমা ছিল না বললেই চলে।

১৬. বিচারব্যবস্থা, রাজনীতি ও নেতৃত্ব:

গারো সমাজে গণ্যমান্য ব্যক্তিরা বিচার কাজ করে থাকে। তবে একক নেতৃত্ব গারোসমাজে গড়ে ওঠেনি। অবশ্য বর্তমানে গাত্রোসমাজে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় প্রশাসন যন্ত্রের বিকাশ ঘাটছে বিধায় বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদ, গ্রাম সরকার প্রভৃতি গড়ে উঠেছে এবং বিচার আচারেও এসেছে পরিবর্তনের ছোঁয়া।

১৭. সমাজ পরিবর্তন:

আধুনিক সভ্যতার প্রভাবে গারো সমাজেও ব্যাপক পরিবর্তন শুরু হয়েছে। আর পরিবর্তন কেবল সংস্কৃতি নয়। শিক্ষা, অর্থনীতি, রাজনীতি, বিচারব্যবস্থা প্রতিটি ক্ষেত্রেই লক্ষণীয়।

১৮. অন্ত্যষ্টিক্রিয়া:

গারোদের মতে, দেহ থেকে আত্মা বিদায় নিলেই মানুষের মৃত্যু হয়। আত্মা অমর, তাদের বিশ্বাস মৃত্যুর পর আত্মা 'চিকমাং' নামক স্থানে চলে যায়। 'চিকমাং' হালো মৃত্যুর দেশ। তাদের বিশ্বাস গারো পাহাড়ের দক্ষিণ পূর্বে পাহাড়ের চূড়ায় 'চিকমাং' অবস্থিত। তাদের বিশ্বাস চিকমাং এ কেবল মৃতরাই যেতে পারে। জীবিতরা পারে না।

উপসংহার: উপরিউক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, বর্তমানে যদিও গারো সমাজে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে তবু তাদের জীবনপ্রণালি থেকে দেখা যাচ্ছে, তাদের মধ্যে এখনো আদিবাসীদের অস্তিত্ব রয়েছে। অপরাপর উপজাতীয় সমাজের মতো গারো সমাজের শিক্ষা-দীক্ষা, আচার-আচরণ, সংস্কৃতি, রাজনীতি অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপ, ধর্মীয় রীতি-নীতি, বিবাহপদ্ধতি এসব প্রতিটি ক্ষেত্রে পরিবর্তন লক্ষণীয় বস্তুত এসব পরিবর্তনের মূলে রয়েছে গারো সমাজে শিক্ষাদীক্ষার প্রসার।

রাখাইন এথনিক গোষ্ঠীর আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনধারা আলোচনা কর

বাংলাদেশের সমতলে বসবাসরত রাখাইনদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনধারা

ভূমিকা: রাখাইন বাংলাদেশের একটি সমতলে বসবাসরত নৃগোষ্ঠী। 'রাখাইন' শব্দটি ব্যুৎপত্তিগতভাবে আরাকান থেকে এসেছে। তারা নিজেদেরকে বার্মার আরাকান রাজ্যর পূর্বসূতি হিসেবে মনে করে থাকে। এভাবেই রাখাইনদের স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে ওঠেছে।

রাখাইন এথনিক গোষ্ঠীর আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনধারা


বাংলাদেশের সমতলে বসবাসরত রাখাইন নৃগোষ্ঠীর জীবনধারা

এরা উপকূল ও সমতলে বসবাস করে। এদের সম্পর্কে নিচে আলোচনা করা হালা।

১. উৎপত্তির ইতিহাস:

রাখাইনরা দুই শতাধিক বছর আগে আরাকান থেকে এদেশে এসে বসতি স্থাপন করেছিল। রাখাইনরা নিজেরাও তাই মনে করেন। তবে এক্ষেত্রে এটাও লক্ষ রাখা দরকার যে, চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিভিন্ন সময়ে আরাকানি শাসন যা প্রতাব ছিল। প্রাপ্ত ঐতিহাসিক তথ্য অনুসারে, পটুয়াখালী অঞ্চলে রাখাইন বসতি গড়ে উঠেছিল অষ্টাদশ শতকের শেষার্থে। তাবে সংশ্লিষ্টদের অনেকে চট্টগ্রাম ও রামু অঞ্চল থেকে পটুয়াখালী অঞ্চলে এসেছিল। অন্যদিকে ১৭৮৪ সালে ১৫০ পরিবার নিয়ে গঠিত রাখাইনদের একটি বড়সড় দল ৫০টি নৌযানে বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে সরাসরি আরাকান থেকে বর্তমান গলাচিপা থানার অন্তর্গত রাঙাবালি দ্বীপে এসে বসতি গড়েছিল, এমন বিবরণও পাওয়া যায়।

২. জনসংখ্যা ও অবস্থান:

রাখাইনরা বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম, কক্সাবাজর, পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলায় বসবাস করে। ১৯৯১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, বাংলাদেশে বসবাসকারী মোট রাখাইনের সংখ্যা ১৬,৮৩২ জন। তন্মধ্যে ৩,৪১৫ জন বাস করে পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলায়। বাকি ১৩,৫১৭ জন বাস করে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায়। তবে কক্সবাজার জেলার সমুদ্রসৈকত এলাকায় বেশিরভাগ রাখাইন সম্প্রদায় বসবাস করে।

৩. নরগোষ্ঠীগত পরিচয়:

পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যান্য উপজাতি যেমন। চাকমা, মারমা, ত্রিপুয়াদের সাথে রাখাইনদের শারীরিক বৈশিষ্ট্যের মিল রয়েছে। তাই বলা যায়, রাখাইনরাও মঙ্গোলয়েড জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত।

৪. ভাষা:

বাংলাদেশের রাখাইনদের মাতৃভাষা ও মারমাদের ভাষা, যা মঙ্গোলীয় স্রোতধারার ভাষা কোট ব্রহ্ম। এ ভাষা ইন্দো আর্য বা দ্রাবিড়ীয় আর্যভাষা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। যে কারণে বাংলা, সংস্কৃত, হিন্দি ও দক্ষিণ ভারতের ভাষার সাথে এ ভাষার খুব একটা মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। অপরদিকে এদেশে আগত মঙ্গোলীয় নরগোষ্ঠীর লোকদের ভোট ব্রহ্ম ভাষার প্রভাব পড়েছে খুব কম।

৫. ধর্ম:

বাংলাদেশের রাখাইনরা শতকরা একুশ ভাগই বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। বৌদ্ধধর্মের প্রাচীন দু'ধারার যথা- 'মহাযান ও হীনযান এদের মধ্যে এরা 'হীনযান' এর তথা পালি ট্রিপটকে বর্ণিত বৌদ্ধমাতের অনুসারী। প্রতিটি রাখাইন পাড়ায় বৌদ্ধ মন্দির ও বৌদ্ধ মঠ রয়েছে।

৬. আচার-অনুষ্ঠান:

রাখাইনরা নানা ধরনের আচার-অনুষ্ঠান পালন করে থাকে। তাদের প্রধান উৎসবগুলোর মধ্যে রয়েছে গৌতমবুদ্ধের জন্মবার্ষিকী, বৈশাখী পূর্ণিমা, মাঘী পূর্ণিমা, বসন্ত উৎসব ও নবান্ন উৎসব। চৈত্র সংক্রান্তিতে রাখাইনরা সান্দ্রে উৎসব পালন করে। সান্দ্রে উৎসব তিনদিন ধরে চলে। এ সময় তারা নাচ, গান, আনন্দ উৎসবে মেতে উঠে এবং একে অন্যের উদ্দেশ্যে পানি ছিটায়। এটি তাদের সবচেয়ে বড় উৎসব।

৭. পারিবারিক জীবন:

রাখাইনদের পারিবারিক কাঠামো হলো পিতৃতান্ত্রিক। পুরুষরা পরিবারের দায়িত্ব পালন করলেও মেয়েরা অবহেলিত নয়। মেয়ে ও পুরুষের অধিকার সমান। ছেলে ও মেয়ে উভয়েই সম্পত্তির অধিকারী হয়।

৮. বিবাহব্যবস্থা:

রাখাইনদের মাঝে কুলগত অর্থাৎ চাচাতো, ফুপাতো ও খালাতো ভাইবোনের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক নিষিদ্ধ। তবে মামাতো ভাইবোনদের মধ্যে বিয়ে হতে পারে। এ বিয়েতে অবশ্য ধর্মীয় ও আইনগত কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তবে অভিভাবকদের পছন্দেই বেশিরভাগ বিবাহ হয়ে থাকে। সংখ্যালযুতার কারণে রাখাইনরা মিয়ানমার ও ভারতের একই সম্প্রদায়ের লোকদের সাথেও বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছে।

৮. পোশাক-পরিচ্ছদ

পোশাক-পরিচ্ছদে দেখা যায় রাখাইন পুরুষরা লুঙ্গি ও ফতুয়া পড়ে। সাধারণত ফতুয়ার উপরে লুঙিআগ পরিধান করে এরা।মেয়েরাও লুঙ্গি পরিধান করে। মেয়েদের লুঙ্গিতে বিভিন্ন নকশা আঁকা থাকে। লুঙ্গির উপর মেয়েরা ব্লাউজ পরে। এছাড়া ও মেয়েরা হাতে, কানে, গলায়, নাকে, কোমরে ও পায়ে সুক্ষ কারুকাজ খচিত বর্ণাঢ্য নকশার সোনা-রূপার অলংকার পরা ও চুলে বিভিন্ন ধাচের বেনি ও খোঁপা বাঁধা ও খোঁপায় তাজা ফুল গোজা খুব পছন্দ করে। রাখাইন মেয়েরা সাজগোজ করে নিজেকে আকর্ষণীয় করে তুলতে খুবই পছন্দ করে।

১০. অর্থনীতি:

রাখাইনরা মূলজ কৃষিনির্ভর। তারা নানা ধরনের ফসল ফলায়। কক্সবাজার ও পটুয়াখালী সমুদ্র উপকূলের বসবাসকারী রাখাইনরা বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায় বাণিজ্য করে জীবিকা নির্বাহ করে। কেউ কেউ মৎস্য শিক্ষার ও অন্যান্য অকৃষিজ পেশায় নিয়োজিত। পাহাড়িয়া অঞ্চলে বসবাসয়ত রাখাইনরা জুমচাষ, পশুপালন, কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। শিক্ষাদীক্ষায় অনগ্রসরতার কারনে রাখাইনরা চাকরি ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে।

১১. শিক্ষা:

রাখাইন শিশুদের প্রথম শিক্ষা শুরু হয় বৌদ্ধ মন্দিরের পাঠশালায়। এই পাঠশালা 'কিয়ং' নামে অভিহিত। মূলত রাখাইনদের ভাষা শিক্ষা ও বৌদ্ধধর্মের নানা শাস্ত্রীয় শিষ্টাচার বৌদ্ধ মন্দিরের এ পাঠশালাগুলোতে শেখানো হয়। এরপর তারা স্থানীয় স্কুলে লেখাপড়া করে। রাখাইন সমাজে প্রায় সকল নারী-পুরুষ রাখাইন ভাষায় স্বাক্ষর জ্ঞানসম্পন্ন হয়। কক্সবাজার সমুদ্র উপকূলে বসবাসকারী রাখাইনরা শিক্ষাদীক্ষায় অনেক এগিয়ে। পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলায় বসবাসকারী রাখাইনরা শিক্ষায় অনেক পিছিয়ে।

১২. খাদ্যদ্রব্য

কাপ্তাইয়ের বাসর খানা হল একটি ঐতিহ্যবাহী খাবার। তারা বিভিন্ন ধরনের পদ্মাগাদি খায় এবং মদও গ্রহণ করে। যেকোনো অনুষ্ঠানে মদ পান করা তাদের সংস্কৃতির একটি অংশ। এছাড়া, তারা বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি ও মাছও খায়।

১৩. সেবাব্রত গ্রহণ:

রাখাইন শিশু-কিশোরদের ধর্মীয় শিষ্টাচার পালিত হয় বৌদ্ধ পুরুত বা ডিস্কুলের কাছে। ধর্মীয় শিষ্টাচার পালনের সময়, অল্পবয়স্ক ছেলেরা বেশ কিছুদিন মন্দিরে অবস্থান করে। গেরুয়া বসন পরে এবং মাথা ন্যাড়া করে, তারা বৌদ্ধ মন্দিরে অবস্থান করে এবং ভিক্ষুদের কাছ থেকে বৌদ্ধধর্মের দীক্ষা গ্রহণ করে। মেয়েরা সাধারণত গৃহেই ধর্মীয় শিষ্টাচার শুরু করে, তবে তারা পালাগারদে গিয়ে ধর্মীয় আচার পালন করে থাকে। প্রকৃতপক্ষে, এভাবেই তারা সেবাব্রত গ্রহণ করে।

১৪. অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া:

রাখাইনরা মারা গেলে তাদের দেহকে পোড়ানো হয়। পোড়ানার আগে মৃত ব্যক্তিকে সুগন্ধি সাবান ও অন্যান্য উপকরণ দিয়ে গোসল করানো হয়। তারপর শ্বশান এ নিয়ে গিয়ে হিন্দুদের মত চিতায় তুলে পোড়ানো হয়। পোড়ানো শেষে সবাই নদীতে গোসল করে বাড়ি চলে যায়। গোড়ানোর সাত দিন পর নিকট আত্মীয়রা বৌদ্ধ ভিক্ষুকদের ডেকে তার নামে শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান করে এবং গ্রামের লোকদের নিমন্ত্রণ করে খাওয়ায়। নিমন্ত্রণতরা মৃত ব্যক্তির আত্মার শান্তি কামনা করে আহার গ্রহণ করে।

উপসংহার: রাখাইনরা বাংলাদেশের একটি ক্ষুদ্র এথনিক সম্প্রদায়। বাংলাদেশে বসবাসরত অন্যান্য এথনিক সম্প্রদায় থেকে তারা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। কৃষি ছাড়া রাখাইনদের অনেকে ব্যবসা-বাণিজ্যের সাথেও জড়িত। যেহেতু একটি স্বতন্ত্র জীবনধারা রাখাইনদের মধ্য বিদ্যমান, তাই আমরা রাখাইনদেরকে এথনিক গোষ্ঠী হিসেবেই অভিহিত করেছি।

বর্তমান অর্পিত সম্পত্তি আইনের বৈশিষ্ট্য লেখ

অর্পিত সম্পত্তি আইনের মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচনা

ভূমিকা: অর্পিত সম্পত্তি আইন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বহুল আলোচিত আইন। মূলত ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের পর পাকিস্তান সরকার ভারতে চলে যাওয়া নাগরিকদের সম্পত্তিকে “শত্রুসম্পত্তি” হিসেবে ঘোষণা করে, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর “অর্পিত সম্পত্তি” নামে পরিচিত হয়।

বর্তমান অর্পিত সম্পত্তি আইনের বৈশিষ্ট্য লেখ

এই আইনের উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকা সম্পত্তিগুলোর যথাযথ ব্যবস্থাপনা, সংরক্ষণ ও প্রকৃত মালিকদের কাছে ফেরত প্রদান নিশ্চিত করা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আইনটি সংশোধন ও সংস্কারের মাধ্যমে নতুন আঙ্গিকে প্রণীত হয়েছে, যাতে এর প্রয়োগে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও সংখ্যালঘু নাগরিকদের অধিকার সংরক্ষণ করা যায়। বর্তমানে ২০০১ সালের অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন এবং ২০১১ সালের সংশোধিত আইনের মাধ্যমে সরকারের দখলে থাকা ও বেসরকারি দখলে থাকা সম্পত্তির তালিকা প্রণয়ন, সহ-অংশীদারদের অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং জনস্বার্থে সম্পত্তি ব্যবস্থাপনার নিয়মাবলি স্পষ্টভাবে নির্ধারিত হয়েছে।

বর্তমানে অর্পিত সম্পত্তি আইনের বৈশিষ্ট্য:

নিচে বর্তমানে অর্পিত সম্পত্তি আইনের বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচনা করা হলো।

১। 'ক' তফসিলে সরকারের দখলে থাকা সম্পত্তির তালিকা প্রকাশিত হয়েছে এবং 'খ' তফসিলে সয়ফারি তালিকাতে থাকা যেসব সম্পত্তি সরকারের দখলে নেই, ব্যক্তির দখলে আছে, তার তালিকা প্রকাশিত হয়েছে। 'ক' তালিকার সম্পত্তি ফেরত পেতে হলে জেলা জজের সমন্বয়ে গঠিত ট্রাইব্যুনালে আবেদন করা যাবে এবং 'খ' তালিকার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের (রাজস্ব) নেতৃত্বে গঠিত কমিটি বা ট্রাইব্যুনালের কাছে গেজেট বিজ্ঞপ্তির ৩০০ দিনের মধ্যে উক্ত সম্পত্তির অবমুক্তির জন্য আকোন করতে হবে। এবার মালিক এবং সম্পত্তির তালিকা নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে।

২। এখানে সহ-অংশীদারদের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। এমনকি 'জনস্বার্থ বলতে কোন সম্পত্তি বোঝানো হয়েছে। তাও পরিষ্কার করা হয়েছে। জনহিতকর সম্পত্তির ক্ষেত্রে, সম্পত্তিটি দেবোত্তর সম্পত্তি, শ্মশান বা সাতব্য প্রতিষ্ঠান হলে এবং এর কোনো মোহস্ত বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট এলাকার যে কোনো নাগরিককে গেজেট প্রকাশের ৩০০ দিনের মধ্যে জেলা প্রশাসকের কাছে দরখাস্ত করার সুযোগ রাখা হয়েছে। সেই ধরনের কোনো নাগরিক উৎসাহিত না হলে জেলা প্রশাসক একটি পরিচালনা কমিটি গঠন করে তাদের বরাবরে উক্ত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ করবেন।

৩। অতীতের ভুল ত্রুটিগুলো শুধরে নতুন আঙ্গিকে আইনটিকে সাজানো হয়েছে। তালিকাভুক্ত অর্পিত সম্পত্তির মালিকানাসংক্রান্ত বিতর্কের ব্যাপারে সরকার এবং আইন বিভাগকেও মনে হচ্ছে আপাতদৃষ্টিতে আন্তরিক। একই সঙ্গে দেশের সুশীল সমাজও বিষয়টির অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ। করছেন। ভুক্তভোগীদের জন্য এখনই সময় মালিকানার দাবি সঠিক ফোরামে তুলে ধরার। মনে রাখতে হবে, এ আইনের সুফল যাতে বঞ্চিতদের কাছে পৌঁছে দেয়া যায়, সেটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট সবার।

৪। পূর্বের আইনে সহ অংশীদারদের দাবি মানা হলেও একই পরিবারের সদস্য অথচ অংশীদার নন তাদেরকে নামমাত্র মূল্যে/প্রতীকী মূল্যে অর্পিত সম্পত্তি ফেরত দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল। এক্ষেত্রে উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ভাই ভাইয়ের সম্পত্তিরসহ অংশীদার না হলেও এক ভাইয়ের অধিগ্রহণকৃত সম্পত্তি অপর ভাইকে ইজারা বা লিজ দেওয়াতে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কিন্তু এই বিলে সেটি সন্নিবেশিত করা হয় নি। আর তাই ক্ষতিগ্রস্তরা এর সুফল পাবে না।

৫। এখানে উল্লেখ করা হয়েছে যদি কোনো ব্যক্তি অথবা সংস্থাকে স্থায়ীভাবে এসব সম্পত্তির ইজারা দেওয়া হয় তবে সেগুলোর প্রত্যর্পণের দরকার নেই কিন্তু তা যদি না দেওয়া হয় তবে সেগুলো অবশ্যই অংশীদারদের মাঝে ফিরিয়ে দেয়া উচিত।

৬। এই আইনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলো হতে মালিক এবং সম্পত্তির তালিকা নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে।

৭। এই আইনের সুফল যাতে ক্ষতিগ্রস্ত ও বঞ্চিত পায় তারও ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের ১৯৬৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত যেসকল পাকিস্তানি নাগরিক পাকিস্তান ও পূর্ব বাংলা ছেড়ে ভারতে চলে গিয়েছিল পাক সরকার তাদের সম্পত্তিকে শত্রু সম্পত্তি হিসেবে ঘোষণা করেছে। বর্তমানে ২০১১ সালের সংশোধিত আইনের অধীনে ইতোমধ্যেই প্রতিটি জেলায় ছোটি ছোট তফসিল প্রকাশিত হয়েছে। তালিকাভুক্ত অর্পিত সম্পত্তির মালিকানাসংক্রান্ত বিতর্কের ব্যাপারে এবং আইন বিভাগকেও মনে হচ্ছে আপাতদৃষ্টিতে আন্তরিক।