Showing posts with label সংখ্যালঘু সমাজবিজ্ঞান. Show all posts
Showing posts with label সংখ্যালঘু সমাজবিজ্ঞান. Show all posts

বর্ণবাদ বা বর্ণবৈষম্যবাদ কী? উপজাতি ও নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর মধ্যে পার্থক্য উল্লেখ কর

 বর্ণবাদ কী? বর্ণবৈষম্যবাদ বলতে কী বুঝ?

ভূমিকা: মানুষের যে ধারা, পার্থক্য ও সংস্কৃতিগত বৈষম্যের মূলে দৈহিক বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্য হলো বর্ণবৈষম্যবাদ। অন্যভাবে বলা যায়, বর্ণবৈষম্যবাদ বলতে মানুষের জৈবিক বা দৈহিক কারণে কাউকে ছোট বা বড় অথবা কাউকে যোগ্য আর কাউকে অযোগ্য, কাউকে মর্যাদাবান, আর কাউকে অমর্যাদাবান বলে মনে করা হয়।

বর্ণবাদ বা বর্ণবৈষম্যবাদ কী? উপজাতি ও নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর মধ্যে পার্থক্য উল্লেখ কর

বর্ণবাদ/বর্ণবৈষম্যবাদ: Philif Kattak তাঁর 'Anthropology গ্রন্থের Glossary-তে বলেন, জৈবিক কারণে কোনো নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর প্রতি বৈষম্যই হলো বর্ণবৈষম্য। মূলত উনবিংশ শতাব্দীতে মানব ইতিহাসে বর্ণবাদী ব্যাখ্যা প্রমান করা হয়। এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ককেশীয় নরগোষ্ঠীই উচ্চ ও উৎকৃষ্ট নৃগোষ্ঠী। বাদবাকি সবাই নীচ ও নিকৃষ্ট। বর্ণবাদীদের মতে, সভ্যতা উৎকৃষ্ট নৃগোষ্ঠীই বেশি অবদান রেখেছে। কারণ তারা জৈবিক ও দৈহিক দিক থেকে উন্নত। অন্যদিকে, নিকৃষ্টরা দৈহিক দিক থেকে অনুন্নত এবং সভ্যতায় তাদের কোনো ভূমিকা নেই। বর্ণবাদ বা বর্ণবৈষম্যকে দুটি পর্যায়ে বিভক্ত করা যায়-

১. ব্যক্তিগত পর্যায়: ব্যক্তিগত পর্যায়ে ধারণা হলো কতিপয় বর্ণগোষ্ঠী প্রকৃতভাগেই আগামী এবং অপররা পশ্চাদগামী। এ পর্যায়ে ২টি সমসাময়িক বিদ্যার ওপর ভিত্তি করে গড়ে তোলা হয়েছে।

২. প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়: এ পর্যায়ে এটি এক ধরনের বৈষম্য নীতি এবং তার অনুশীলনের সাথে সম্পৃক্ত। এর ফলে বিভিন্ন বর্ণগোষ্ঠী সদস্যদের মধ্যে অসমতা সূচিত হয়।

পরিশেষে বলা যায় যে, বর্ণবৈষম্যবাদ বিজ্ঞানভিত্তিক বিশ্লেষণে টিকে না। ফলে এটি ভ্রান্ত বলে পরিত্যক্ত হয়েছে। আধুনিক নৃবিজ্ঞানীদের মতে, সংস্কৃতি নৃগোষ্ঠীর ওপর নির্ভর না করে নিরপেক্ষতাবে কাজ করে


Race এবং Ethnicity বা  উপজাতি ও নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর মধ্যে পার্থক্য উল্লেখ কর।

আমরা বিভিন্ন দেশে এথনিক কিংবা উপজাতিদের বসবাস দেখতে পাই। এথনিক গ্রুপ এমন কিছু জনসংখ্যার সমষ্টি, যার সদস্যরা একে অপরের সাথে অভিন্ন কোনো সৃষ্টি ঐতিহ্যের কারণে পরিচিত।

Ethnicity এবং Race বা  উপজাতি ও নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী মধ্যে পার্থক্য: নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী ও উপজাতি সম্প্রদায় উভয়ই মানব সম্প্রদায়। তথাপি উভয়ের মধ্যে কতিপয় পার্থক্য লক্ষ করা যায়। নিম্নে নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী ও উপজাতির মধ্যে পার্থক্য উল্লেখ করা হলো-

১. যেসব জনগোষ্ঠী প্রাচীন কাল থেকে তাদের পূর্ব সমাজের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা বজায় রেখে আসছে এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের শক্তিশালী যোগসূত্র রয়েছে তাদেরকে উপজাতি বলে। অন্যদিকে, নৃগোষ্ঠী বলতে মানব প্রজাতির এমন এক উপবিভাগকে বোঝায়, যারা কতকগুলো ভিন্ন ভিন্ন দৈহিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী এবং নির্দিষ্ট ভাষায় কথা বলে।

২. উপজাতিদের দৈহিক ধরন গোত্রভেদে এক না, কিন্তু নরগোষ্ঠীর দৈহিক ধরন প্রায়ই একই রকম। 

৩. উপজাতিরা সাধারণত পাহাড়িয়া এলাকায় প্রাকৃতিক পরিবেশে বাসস্থান স্থাপন করে। অপরদিকে, মানবগোষ্ঠী সমতল ভূমিতে যান্ত্রিক পরিবেশে বসবাস করে।

৪. উপজাতিদের মূল বৈশিষ্ট্য হলো তারা প্রাচীদকে আঁকড়ে ধরে রাখে। কিন্তু নৃগোষ্ঠী আধুনিকতার দিকে এগিয়ে যায়।

৫. উপজাতিদের বিভাজন দৈহিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে করা যায় না। কিন্তু নরগোষ্ঠীর বিভাজন দৈহিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে করা যায়।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, মানুষের দৈহিক আকার-আকৃতির উৎপত্তি সম্পর্কে আমাদের ধারণা সুস্পষ্ট যে, ১১টি নৃগোষ্ঠী পরস্পরের সংমিশ্রণে আরো নতুন নৃগোষ্ঠীর বিস্তৃতি ঘটাচ্ছে। অর্থাৎ, এসব নৃগোষ্ঠীর জিন পরিবাহিত হয়ে নতুন নতুন নৃগোষ্ঠীর উদ্ভব হচ্ছে। এ ছাড়া নৃগোষ্ঠীর রয়েছে আধুনিক ও ভৌগোলিক শ্রেণিবিভাজন।

জাতীয়তাবাদ কী? এথনিক গ্রুপের সাথে জাতি এবং জাতীয়তাবাদের সম্পর্ক কী?

জাতীয়তাবাদ কী? এথনিক গ্রুপের সাথে জাতি এবং জাতীয়তাবাদের সম্পর্ক আলোচনা কর

ভূমিকা: স্বায়ত্তশাসিত রাজনৈতিক মর্যাদা ছিল কিংবা উদ্ধার করতে চায় তাদেরকে বলা হয় জাতীয়তা। আর জাতীয়তা যাদের মধ্যে বিরাজ করে তখন একটি আদর্শ বিরাজ করে আর এই আদর্শই মূলত জাতীয়তাবাদ।

জাতীয়তাবাদ কী? এথনিক গ্রুপের সাথে জাতি এবং জাতীয়তাবাদের সম্পর্ক কী?

জাতীয়তাবাদ: জাতীয়তাবাদ হচ্ছে একটি আধুনিক ধারণা। এটি একটি আদর্শ (ideology) বা একাত্মবোধের নাম। আধুনিক বিশ্বের প্রায় সকল জাতিরাষ্ট্র জাতীয়তাবাদী চেতনা দ্বারা পরিচিত যয়ে থাকে। একটি রাষ্ট্রে এমন কিছু সাধারণ কৃষ্টি, সংস্কৃতি বা অনুসরণীয় বিষয় থাকে যাকে আশ্রয় করে রাষ্ট্রের নাগরিকদের মধ্যে ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ, দেশপ্রেম ইত্যাদি সুদৃঢ় হয়।

Prof. Zimmern-এর মতে, "কোনো নির্দিষ্ট আবাস ভূমির সাথে সংশ্লিষ্ট সংঘবদ্ধভাবে বিশেষ অজরই গুরুত্বপূর্ণ এক মর্যাদাযুক্ত অনুভূতির প্রকাশই হলো জাতীয়তাবাদ।"

হ্যাশ কোন-এর মতে, জাতীয়তা হলো প্রথম এবং চূড়ান্ত পর্যায়ের এক মানসিক অবস্থা ও এক ধরনের সচেতনতা।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হায়েস এর মতে, 'একটি জাতীয় জনসমাজ ঐক্যবদ্ধ হয়ে সার্বভৌম স্বাধীনতা অর্জন করে জাতীয়তা সৃষ্টি করে। এটা চিরকাল স্থায়ী থাকে না। সময়ের বিষর্তনের হারিয়ে যায়।।

বর্তমানে মানুষ রাজনৈতিক স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক স্বয়ংসম্পূর্ণভা আইনগত অধিকার ইত্যাদি লাভের লক্ষ্যে একটি নির্দিষ্ট এলাকায় বা ভূখণ্ডে সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই যে তীব্র আগ্রহ প্রকাশ করে তা দ্বারা জাতীয়তা পুরোপুরি সার্থকতা অর্জন করে। আর এই জাতীয়তায় আদর্শ হলো জাতীয়তাবাদ।


এথনিক গ্রুপের সাথে জাতি এবং জাতীয়তাবাদের সম্পর্ক

ভূমিকা: আমরা বিভিন্ন দেশে এথনিক কিংবা উপজাতিদের বসবাস দেখতে পাই। এথনিক গ্রুপ হচ্ছে এমন কিছু জনসংখ্যার সমষ্টি, যার সদস্যরা একে অপরের সাথে অভিন্ন কোনো সৃষ্টি ঐতিহ্যের কারণে পরিচিত।

এথনিক গ্রুপের সাথে জাতি এবং জাতীয়তাবাদের সম্পর্ক: বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আমরা নানা জাতিগোষ্ঠী ও এথনিক বা নৃগোষ্ঠীর উপস্থিতি দেখতে পাই। এথনিক গ্রুপ বলতে বোঝায় এমন একটি জনসংখ্যার সমষ্টিকে, যারা অভিন্ন ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ভাষা, ধর্ম কিংবা বংশগত পরিচয়ের ভিত্তিতে নিজেদের আলাদা পরিচয়ে চিহ্নিত করে। তারা সাধারণত একটি অভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অনুসরণ করে, যা তাদের একত্রিত করে।

একসময় "জাতি" শব্দটি মূলত গোষ্ঠী, গোত্র বা এথনিক গ্রুপ বোঝাতে ব্যবহৃত হতো। তবে আধুনিক কালে জাতির ধারণা পরিবর্তিত হয়েছে। এখন জাতি বলতে বোঝানো হয় এমন একটি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক একককে, যার রয়েছে নিজস্ব ভূখণ্ড, কেন্দ্রীয় সরকার এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রাষ্ট্রীয় কাঠামো। বর্তমান বিশ্বে রাষ্ট্র এবং জাতি প্রায় সমার্থক হয়ে উঠেছে। যখন একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সত্তা একীভূত হয়, তখনই তা একটি জাতিরাষ্ট্রে পরিণত হয়। যেমন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স বা জাপান।

তবে বাস্তবতা হচ্ছে, অধিকাংশ রাষ্ট্রে একটি একক এথনিক গোষ্ঠীর একচ্ছত্র আধিপত্য নেই। যুদ্ধ, উপনিবেশবাদ ও অভিবাসনের ফলে অধিকাংশ দেশেই বহু জাতিগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। ১৯৭২ সালে কনর (Connor) দেখিয়েছেন, ১৩২টি জাতিরাষ্ট্রের মধ্যে মাত্র ১২টিতে (প্রায় ৯%) সাংগঠনিক নৃগোষ্ঠীগত ঐক্য ছিল। পরবর্তীতে ১৯৮৫ সালে নেলসন (Nelsson) গবেষণা করে দেখান, ১৬৪টি রাষ্ট্রের মধ্যে মাত্র ৪৫টি রাষ্ট্রে একটি একক এথনিক গোষ্ঠী ৯৫% জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে।

এই বৈচিত্র্যের মধ্যেও জাতীয়তাবাদের মাধ্যমে জনগণকে একত্রিত করা সম্ভব। অভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ভিত্তি হতে পারে বংশগত পরিচয়, ইতিহাস, ভাষা, ধর্ম, আত্মীয়তার বন্ধন কিংবা শারীরিক বৈশিষ্ট্য। এথনিক গোষ্ঠীগুলোকে উন্নয়ন ও অংশগ্রহণের মাধ্যমে জাতীয় মূলধারায় সম্পৃক্ত করলে একটি ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী জাতি গঠন করা সম্ভব।

উপসংহার: পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, অভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মূলভিত্তি হতে পারে পূর্বপুরুষ পরিচয়ভিত্তিক বংশগত পরিচয়, ইতিহাস, আত্মীয়তার বন্ধন, ধর্ম, ভাষা, অভিন্ন সীমানা, জাতীয়তা অথবা অভিন্ন কোনো শারীরিক গঠন। আতীয় বৈশিষ্ট। উন্নত ও সমৃদ্ধ করার মাধ্যমে এথনিক গোষ্ঠীগুলোকে ঐক্যবদ্ধ জাতীয় স্রোতধারায় সম্পৃক্ত করা সম্ভব।

বাংলাদেশে এথনিক গোষ্ঠীর উদ্ভব ও বিকাশ সম্পর্কে আলোচনা কর।

বাংলাদেশে এথনিক গোষ্ঠীর উদ্ভব ও বিকাশ সম্পর্কে আলোচনা কর।

অথবা, এথনিক গোষ্ঠীর উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ আলোচনা কর।

অথবা, আদিবাসী সম্প্রদায়ের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ পর্যালোচনা কর।

ভূমিকা: বাংলাদেশে নানারকম উপজাতি বা আদিবাসী সম্প্রদায় বসবাস করে। আর এসব উপজাতি সম্প্রদায়ের এদেশে আবির্ভাব ঘটেছে একেক সময়ে। এরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আমাদের দেশে আগমন করেছে। এদেশে ৩০ টির মতো উপজাতি বসবাস করছে।

বাংলাদেশে এথনিক গোষ্ঠীর উদ্ভব ও বিকাশ সম্পর্কে আলোচনা কর।

বাংলাদেশে এথনিক গোষ্ঠীর উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ 

নিম্নে বাংলাদেশের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের উদ্ভব সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-

১. চাকমা: বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে চাকমা উপজাতিরা বসবাস করে। এদের সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ২০,০০০ হাজার। চাকমা সম্প্রদায়ের উৎপত্তি সম্পর্কে কর্নেল ফায়ার ভাঁর History of Barma গ্রন্থে বলেন, চাকমারা ব্রহ্মদেশ থেকে ব্রিটিশ আমলে বাংলাদেশে আগমন করেছে। নৃবিজ্ঞানী স্যার রিজলি এ ব্যাপারে বলেছেন, ব্রহ্ম ভাষায় 'সার্ক' বা 'সেক' জাতি থেতে চাকমাদের উদ্ভব। আরাকানের প্রাচীন রাজধানী রামাবতী শহরের নিকটবর্তী এলাকায় 'সার্ক' বা 'সেফ' জাতি এক সময় খুব শক্তিশালী ছিল। মগদের মতে, চাকমারা মুঘল বংশধর। চাকমাদের উৎপত্তি সম্পর্কে তারা বলেন, তারা শাক্য বংশোদ্ভূত মধ্যমুদি বুদ্ধের বংশধর।

২. মণিপুরি: বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব সিলেট এবং মৌলভীবাজার অঞ্চলে মণিপুরি উপজাতিরা বসবাস করে। এদের সংখ্যা প্রায় ৪০,০০০। এদের আদিনিবাস ভারতের পূর্বাঞ্চল মণিপুরে। ব্রহ্মবাসীদের চাপে পড়ে উনবিংশ শতাব্দীর ক্যোনা এক সময়ে মণিপুরি এক রাজপুত্র সিলেট পালিয়ে আসে এবং ঐ রাজপুত্রই মণিপুরিদের পূর্বপুরুষ হিসেনে বিবেচিত।

৩. মগ: আরাকানে মাগদের আদিনিবাস। এরা বাংলাদেশের বান্দরবান জেলায় বসবাস করে। প্রাচীন ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, এরা বর্মীদের দ্বারা আক্রান্ত হলে আরাকান থেকে পালিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে আগমন করে।

৪. খাসিয়া: বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলে খাসিয়ারা বসবাস করে। নৃবিজ্ঞানী বেভারেজ এইচ রবার্টন ও মি. স্যাড ওয়েল-এর মতে, খাসিয়াদের আদিনিবাস ব্রহ্মদেশ এবং পরবর্তীতে তারা আসামে এসে বসতি স্থাপন করে। অন্যদিকে, নৃবিজ্ঞানী ড. গিয়ারসন খাসিয়াদের ভাষা বিশ্লেষণ করে জানতে পারেন যে, তারা চীনের পার্বত্য অঞ্চলের বাসিন্দা ছিলেন।

৫. রাখাইন: প্রায় দুইশত বছর পূর্বে রাখাইনরা আরাকান থেকে এসে এদেশে বসবাস শুরু করে। ঐতিহাসিক পক্ষোপটে জানা যায় যে, অষ্টাদশ শতকের শেষার্থে পটুয়াখালী অঞ্চলে এবা বসতি স্থাপন করে। বর্তমানে চট্টগ্রাম, রামু, টেকনাফ ও পটুয়াখালীতে রাখাইন উপজাতি বসবাস করে।

৬. সাঁওতাল: সাঁওতাল হাচ্ছে ভারত মহাদেশের প্রাচীনতম আদিবাসী। সাঁওতালদের উৎপত্তি সম্পর্কে উইলিয়াম হান্টার বলেছেন, সাঁওতালরা পূর্বদিক থেকে বাংলাদেশে এসেছে এবং পরে পশ্চিমদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

৭. হাজং: বাংলাদেশের ময়মনসিংহের গারো পাহাড়ের সমতল এলাকা ও সুনামগঞ্জে হাজংরা বসবাস করে। এয়া ভারতের মেঘালয়সহ পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে বসতি স্থাপন করেছে।

৮. মুরং: বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামেরই আদিবাসী হিসেবে মুররো দাবি করে। অন্যদের মতে, কুকিল্লীম জামা চট্টগ্রামে চালু হওয়ার আগেই মুরংরা এ অঞ্চলে বাস করতো।

৯. গারো: বাংলাদেশের ময়াজনসিংহ জেলায় গারোরা বসবাস করে। নৃবিজ্ঞানীরা মনে করেন গারোরা এ অঞ্চলের নায়। স্যার বিজলির মতে, গায়োদের আধিনিবাস ছিল আসাম প্রদেশে। অন্যদের মতে, দুর্ভিক্ষের কারণে চীন দেশ থেকে ভারতে আসায় এদেশে যেখানে গারো পাহাড় অবস্থিত, সেখানে এরা এসে বসবাস শুরু করে। ১০. রাজবংশী: রাজবংশীরা নিজেদের রাজবংশী হলে পরিচয় দেয়। এয়া বর্তমানে ডাদের সংস্কৃতি ও ভাষা হারিয়ে মুসলমান ও হিন্দুদের সাথে মিশে গেছে।

১১. বাম: আরাকানে বাম উপজাতিদের আদিনিবাস। পেশাগত দিক থেকে এরা সবাই যাবসায়ী।

১২. কুকি: বাংলাদেশের বান্দরবান জেলায় কুকিরা বসবাস করে। কুকিদের আদিনিবাস রাঙামাটি জেলায়।

১৩. তঞ্চ্যঙ্গা: তঞ্চ্যঙ্গা হলো পার্বত্য চট্টগ্রামের আরেক উপজাতির নাম। এরা সংখ্যায় প্রায় ১২,০০০ জন। ভাষাতাত্ত্বিক বিচারে এরা চাকমার উপজাতিদের একটি শাখা। এরা নিজেদের ভাষাকে আজও জীবিত রাখতে পেরেছে।

১৪. কুমি: এদেশে আরাকানের কুমি উপজাতিরা আগমন করেছে। এরা পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাস করে।।

১৫. মিজো: ভারতের মিজোরাম ও ব্রহ্মদ্যেশ মিজো আদিবাসীদের আদিনিবাস। এরা অতীতে এক সময় কর্ণফুলী নদীর তীরে রাজত্ব করতো।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উপজাতিরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। তারা বিভিন্ন এলাকা থেকে বিভিন্ন সময় বংলাদেশে এসেছে এবং বসবাস করছে। বর্তমানে বাংলাদেশের লোকসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হলো এথনিক গোষ্ঠী।

এথনিক অভিযোজন কী? নৃগোষ্ঠী ও এথনিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক প্রকৃতি আলোচনা কর

এথনিক অভিযোজনের ধারণা দাও। নৃগোষ্ঠী ও এথনিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক

ভূমিকা: এথনিক গ্রুপ হচ্ছে এমন একটি সামাজিক গোষ্ঠী যাদের নিজস্ব একটি বিশেষ ভাষা ও সংস্কৃতি রয়েছে, যা অন্যদের থেকে ভিন্ন। এরা কোনো রাষ্ট্রীয় পরিসীমায় নিজস্ব গোত্রীয় স্বাতন্ত্র্য ও স্বকীয়তা নিয়ে বসবাস করে। সংখ্যাগরিষ্ঠদের সাথে তদের যে সামাজিক দূরুত্ব রয়েছে তা কমানোর জন্য অভিযোজন প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হয়।

এথনিক অভিযোজন কী? নৃগোষ্ঠী ও এথনিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক প্রকৃতি আলোচনা কর

এথনিক অভিযোজন: সমগ্র বিশ্বে নৃগোষ্ঠীগত, ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতিগত কারণে মানুষের মধ্যে বৈচিত্র্য দেখা হয়। আর এ বৈচিত্র্যই সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগরিষ্ঠের সৃষ্টি করে। সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগরিষ্ঠের মধ্যে ধর্ম, বর্ণ, মতাদর্শপূর্ণ বিয়োগ থাকলেও তাদের মধ্যে ইতিবাচক মিথস্ক্রিয়ার পথ সুগম করার প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। শুধু তাই নয়, একটি শান্তিপূর্ণ ঐক্য বন্ধুত্বপূর্ণ সহমর্মিতা ও সৌহার্দ্যের পরিবেশ সৃষ্টি করতে সর্বদা চেষ্টা করছে। সংখ্যালঘুদের এই নিরন্তর প্রচেষ্টা অভিযোজন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অব্যাহত থাকে। নিম্নে বাংলাদেশের সংখ্যালয় সম্প্রদায়ের অভিযোজন প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করা হলো।

১. ভাষাগত সমন্বয় সাধন: প্রতিটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিজস্ব ভাষা রয়েছে। তারা নিজেদের গোষ্ঠীর মধ্যে কথোপথনক্যাল তাদের নিজস্ব ভাষা ব্যবহার করলেও বাংলাদেশের অন্যান্য মানুষ গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের সাথে কথা বলাকালে বাংলা ভাষা ব্যবহার করে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বাংলা ভাষাকে গ্রহণ করে অভিযোজন প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে।

২. সামাজিক ঐক্য সাধন: সংখ্যালঘু গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক সমন্বয় সাধনের জন্য নিজেদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি বাংলাদেশে প্রচলিত সংস্কৃতিকে সাদরে গ্রহণ করে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে স্বকীয় অংশগ্রহণ করে।

৩. চেতনা সৃষ্টি: সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী সাধারণ জনগণের সাথে একত্রে পাশাপাশি বসবাস, চলাফেরা করার ফলে খুব সহজেই একেক অন্যকে জানতে পারে। একে অন্যের সাথে নানাভাবে সামাজিক, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহনের ফলে অভিযোজন প্রক্রিয়া দ্রুত বাড়ছে।

৪. ধর্মীয় অবস্থান: প্রতিটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিজস্ব ধর্ম রয়েছে, যা তারা অতি আগ্রহ, নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্যে পালন করে থাকে। অভিযোজন প্রক্রিয়ার ফলে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের পাশাপাশি তারা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করে থাকে।

৫. শিক্ষা: সংখ্যালঘু সম্প্রদায় দিন দিন আধুনিক শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে তাদের অভিযোজন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছে। শিক্ষা অর্জনের ফলে চরম ও বিশৃঙ্খল পরিবেশে অভিযোজন প্রক্রিয়ায় নিজেদেরকে খাপ খাইয়ে নিতে হচ্ছে।

৬. রাজনৈতিক অবস্থান: অভিযোজনের ফলে সংখ্যালঘুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন সাধিত হয়েছে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে। বর্তমানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বাংলাদেশের দুলধারার রাজনৈতিক ধারায় স্বকীয় অংশগ্রহণ করে থাকে।

পরিশেষে বলা যায়, একটি জাতিরাষ্ট্রের অংশ হয়েই এখনিক গোষ্ঠী বেঁচে থাকে। মূলধারার গোষ্ঠীর কাছ থেকে তারা সবসময় অসম অবস্থার স্বীকার হয়। তবুও তাদের কোনো অভিযোগ নেই। তারা তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিতে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ।



নৃগোষ্ঠী ও এথনিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যকার সম্পর্কের প্রকৃতি

নৃগোষ্ঠী ও এথনিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক প্রকৃতি: দু' একটি কথায় নরগোষ্ঠী ও এথনিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্য সম্পর্কের প্রকৃতি ও ধরন বিকৃত করা খুবই কঠিন। এ সম্পর্কে নিম্নে আলোচনা করা হলো-

১. সংখ্যালঘুদের জন্য আইনি প্রতিরক্ষা প্রদান: সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর প্রতি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের মনোভাব নিষেধমূলক ও. শত্রুতামূলক। এসব সমাজে সংখ্যালঘুরা নানারূপ বঞ্চনা, এমনকি দৈহিক নির্যাতনেরও শিকার হয়।

২. আত্তীকরণ: একটি সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক কার্যপ্রক্রিয়া হলো আত্তীকরণ। এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি যা গোষ্ঠী অন্যকোনো বাক্তি বা গোষ্ঠীর মনোভাব, মূল্যবোধ, আচার আচরণ প্রভৃতি গ্রহণ করার মাধ্যমে তাদের জীবনধারার অংশীদার হয়ে পড়ে বা একই সাংস্কৃতিক জীবনের শরিক হয়ে যায়।

৩. সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ: সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘু নির্বিশেষে সকল গোষ্ঠীর মানুষ সংস্কৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন বা সংস্কৃতির সহাবস্থানাক সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ বাল। যে সমাজে সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদের নীতি অনুসৃত হয়, সেখানে প্রভাবশালী গোষ্ঠী সংখ্যালঘুদের নিজস্ব সংস্কৃতি অক্ষুন্ন রাখার ক্ষেত্রে সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করে থাকে।

৪. নির্মূলকরণ: সংখ্যাগুরু প্রভাবশালী ধরনের জনগোষ্ঠী কর্তৃক সংখ্যালঘু দুর্বল জনগোষ্ঠীকে গণহত্যার মাধ্যমে নিশ্চিহ্ন বা নির্মূল করার প্রক্রিয়াকে বোঝায়।

৫. অবিরাম পরাভূতকরণ: এ প্রক্রিয়ায় সংখ্যালঘুদের ন্যায্য দাবিদাওয়া, অধিকার এমনকি মানবিক আবেদন পর্যন্ত প্রত্যাখ্যাত হয় এবং তাদের উপরে চিরকালব্যাপী শাসন-শোষণ নির্যাতিত করে রাখার উদ্দেশ্যে নানা ধরনের নেতিবাচক পন্থা পদ্ধতির আশ্রয় গ্রহণ করা হয়।

৬. বিতাড়িতকরণ বা নির্বাসনে পাঠানো: প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সাথে বা সংখ্যালঘু কোনো গোষ্ঠীর সম্পর্কে মারাত্মক অবনতি ঘটলে বা শত্রুতা সৃষ্টি হলে কিংবা সংখ্যালঘু গোষ্ঠীকে প্রভাবশালী জনগোষ্ঠীর জন্য হুমকিস্বরূপ মনে করলে একমাত্র সমাধান হিসেবে সংখ্যালঘুদের একাধিক স্থানে অথবা দেশের বাইয়ে জোরপূর্বক নির্বাসিত করা হয়।

উপরিউক্ত বিভিন্ন আলোচনার মাধ্যমে বলা যায় যে, প্রভাবশালী গোষ্ঠী ও বিভিন্ন ধরানের সংখ্যালঘু, যা এখনিক অপ্রভাবশালী গোষ্ঠীর মধ্যকার সম্পর্কের একটি চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।

শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান কী? সাঁওতালদের ধর্মবিশ্বাস ও বিবাহপ্রথা লেখ।

শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বলতে কী বুঝায়? সাঁওতালদের ধর্মবিশ্বাস ও বিবাহপ্রথা লিখ

ভূমিকা: সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নৃগোষ্ঠীগত বৈচিত্র্য দেখতে পাওয়া যায়। এসব এথনিক গোষ্ঠী তথা নৃগোষ্ঠীদের মধ্যে ঐক্য ও সৌহার্দ্যের পরিবেশ সুগম হচ্ছে এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলশ্রুতিতে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান আরও সুদৃঢ় হচ্ছে। বিশ্বায়নের ইতিবাচক প্রভাব, সাংস্কৃতিক অভিযোজন, অঙ্গীভূতকরণ, উদ্ভাবন, সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণ, আদান-প্রদান নীতি ও বহু সংস্কৃতিযাদ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ধারণা বেগবান হয়েছে।

শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান কী? সাঁওতালদের ধর্মবিশ্বাস ও বিবাহপ্রথা লেখ।

শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান: ধর্ম, বর্ণ, মতাদর্শপূর্ণ বিরোধ থাকা সত্ত্বেও মানুষ ইতিবাচক নিখক্রিয়ার পথ সুগম করে একটি শান্তিপূর্ণ ঐক্য, সহমর্মিতা ও সৌহার্দ্যের পরিবেশ গড়ে তোলে এবং গড়ে তোলার প্রচেষ্টায় লিপ্ত থাকে। মানুষের এই প্রচেষ্টা নিরন্তর, যা বহুমুখী বিভাজির সাংস্কৃতিকে আপেক্ষিকতার মাধ্যমে একসূত্রে বাঁধার চেষ্টা করে থাকে। সংস্কৃতিগত দ্বন্দ্বের অনুপস্থিতি মানুষকে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বাধ্য করেছে।

প্রতিটি এখনিক জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা রয়েছে। তারা নিজেরা যখন তাদের নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করে তখন তারা তাদের নিজস্ব ভাষার কথা বলে থাকে, কিন্তু যখন তারা অপরাপর জনগোষ্ঠীর সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে তখন তারা বাংলা ভাষায় কথা বলে থাকে। তারা বাংলা ভাষাকে সাদরে গ্রহণ করে ভাষাগত সমন্বয় সাধন করেছে। এথনিক জনগোষ্ঠীরা তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি বাংলাদেশের সমাজে প্রচলিত সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে স্বকীয় অংশগ্রহণ করে থাকে। ফলশ্রুতিতে এথনিক জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতির পাশাপাশি দেশীয় সংস্কৃতিও গতিশীল হয়েছে। এখনিক জনগোষ্ঠীর সাথে সাধারণ জনগণের পাশাপাশি বসবাস একে অন্যকে জানার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। ফলশ্রুতিতে তাদের ভেতরে অসাম্প্রদায়িক মনোভাবের সৃষ্টি হয়েছে এবং সহাবস্থানকে আরও বেশি শান্তিপূর্ণ করেছে। প্রতিটি এথনিক জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ধর্ম রয়েছে এবং তারা তাদের ধর্মীয় কর্মকাণ্ডগুলো স্বাচ্ছন্দ্যে ও নিরাপদে পালন করে থাকে। সাম্প্রতিককালে এথনিক জনগোষ্ঠী তাদের ঐতিহাগত ধর্ম ত্যাগ করে অধিকাংশই খ্রিষ্টান ও হিন্দুধর্ম গ্রহণ করেছে। ফলশ্রুতিতে ধর্মীয় সম্প্রীতি সহাবস্থানকে সুদৃড় করেছে। প্রতিটি এথনিক জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা থাকলেও অনেক এথনিক জনগোষ্ঠীর ভাষা লেখার বর্ণমালা নেই। আবার অনেক এথনিক জনগোষ্ঠীর ভাষা লেখার বর্ণমালা থাকলেও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি নেই। ফলশ্রুতিতে এথনিক জনগোষ্ঠীরা দিন দিন ক্রমাগতভাবে বাংলা ভাষায় শিক্ষা গ্রহণে আকৃষ্ট হচ্ছে। এর ফলে সহাবস্থান আরও সুদৃঢ় হয়েছে। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ফলে এখনিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন হয়েছে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে। বাংলাদেশের মূল রাজনৈতিক ধারার সাথে বিভিন্ন এথনিক জনগোষ্ঠীর লোকেরা বর্তমানে স্বকীয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছে।

পরিশেষে বলা যায়, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মাধ্যমে ভাষাগত সমন্বয় সাধন হচ্ছে। এছাড়াও সাংস্কৃতিক ঐক্য সাধন, অসাম্প্রদায়িক মনোভাব সৃষ্টি, ধর্মীয় সম্প্রীতি, শিক্ষার এই একত্রীকরণ, সামাজিক উন্নয়ন প্রভৃতি ঘটছে। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এথনিক জনগোষ্ঠীর স্বকীয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছে।


সাঁওতালদের ধর্মবিশ্বাস ও বিবাহপ্রথা

বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসরত বিভিন্ন উপজাতির মধ্যে অন্যতম হলো সাঁওতাল। সাঁওতাল উপজাতি উপমহাদেশের প্রাচীন জনগোষ্ঠী। এরা এদেশের অধিবাসী নয়। সাঁওতালরা প্রথম কবে, কোথা থেকে এবং কীভাবে এ উপমহাদেশে এসেছিল, তার সঠিক তথ্য পাওয়া যায় নি। তারপরেও সাঁওতালরা বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করছে এবং এখানে তারা পূর্ণাঙ্গভাবে জীবনযাপন শুরু করে।

সাঁওতালদের ধর্মবিশ্বাস: সাঁওতালদের শিক্ষিত সমাজে হিন্দুদের প্রধান প্রধান দেবদেবীর প্রাধান্য বর্তমান। বেগাভীল, গন্দি, কোল, কোরকা এবং সাঁওতাল প্রভৃতি উপজাতিদের আচার-ধর্ম ও ভাষ্যর সঙ্গে হিন্দুদের আচার-ধর্ম ও ভাষা এমনভাবে অতপ্রোতভাবে জড়িত যে, তাদের বৈশিষ্ট্য অনেকটা পৃথক এবং এজন্য এরা এখনও আদিবাসী তথা উপজাতি হিসেবে পরিগণিত। সাঁওতালদের দেবতার মধ্যে প্রধান হলো 'মারাং বুরো'। গ্রামের বা নিজেদের সকল প্রকার মঙ্গল-অমঙ্গল মারাং বুরোর ইচ্ছায়ই ঘটে থাকে বলে সাঁওতালরা বিশ্বাস করে থাকে। এ কারণে তার উদ্দেশ্যে সাদা মোরগ ও সাদা ছাগল উৎসর্গ করে তাকে সন্তুষ্ট রাখতে হয়। তা ছাড়া কোনো উৎসব উপলক্ষ্যে প্রচুর মদও মারাং বুরোর নামে উৎসর্গ করা হয়।

সাঁওতালদের বিবাহপ্রথা: সাঁওতালদের সমাজে উপগোত্রের মধ্যে বিবাহ নিষিদ্ধ। বর্তমানে তিন ধরনের বিবাহ রীতি প্রচলিত। যথা- আসলি বিবাহ, রাজারাজি ও হরকাটরা বিবাহ। আসলি বিবাহ ছেলে এবং মেয়ের অভিভাবকদের সম্মতিতে হয়। রাজারাজি বা মনোমিলন বিয়ের জন্য যুবক-যুবতীরা হাটে যায় এবং তারা উভয়ে উভয়কে পছন্দ করলে কোনো গণ্যমান্য ব্যক্তির মাধ্যমে বিয়ের কার্য সম্পন্ন হয়। আর জ্বরকাটরা বিয়েতে যুবক-যুবতীতে জোর করে বিয়ে করে। এরূপ বিয়েতে যুবক তার পছন্দনীয় যুবতীকে যে-কোনো উপায়ে সিঁদুর পরিয়ে দেয়। সাঁওতালদের সামাজিক নিয়মে ফোনো যুবতীর কপালে সিঁদুর পরিয়ে দিলে সে মেয়ের আর অন্যত্র বিয়ে হতে পারে না। এরপর নিয়মানুসারে গ্রাম্য পঞ্চায়েতের মাধ্যমে তাদের বিবাহ সম্পন্ন করা হয়।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, বিবাহ ও ধর্মের ক্ষেত্রে তারা ঐতিহ্যবাহী নিয়মকানুন অনুসরণ করে। কিন্তু বর্তমানে শিক্ষার প্রসারের ফলে এদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ করা যায়।

এথনিক অসমতা কী? এথনিক অসমতার কারণগুলো তুলে ধর

এথনিক অসমতা বলতে কী বুঝায়?

ভূমিকা: এথনিক গ্রুপ হচ্ছে এমন একটি সামাজিক গোষ্ঠী যাদের নিজস্ব একটি বিশেষ ভাষা ও সংস্কৃতি রয়েছে যা অন্যদের থেকে ভিন্ন। এরা কোনো রাষ্ট্রীয় পরিসীমায় নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য ও স্বকীয়তা নিয়ে বসবাস করে। সংখ্যাগুরুদের সাথে সংখ্যালঘু বা এখনিক সম্প্রদায়ের ব্যাপক অসমতা ও পার্থক্য লক্ষ করা যায়।

এথনিক অসমতা কী? এথনিক অসমতার কারণগুলো তুলে ধর

এথনিক অসমতা: রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায় সংখ্যালঘু এখনিক সম্প্রদায়ের প্রতি যেসব বৈষনামূলক আচরণ আচার-আচরণ করে থাকে তাকে এথনিক অসমতা বালে। এথনিক গোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, রীতিনীতি সবই বৃহত্তর জনগোষ্ঠী থেকে পৃথক। এখনিক গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য দেখে তাদেরকে চিহ্নিত করা যায়। ব্যক্তির মনোভাব, ব্যক্তিত্ব, মূল্যবোধ, বিশ্বাস, রুচিবোধ ইত্যাদি স্বারা তাদের সমাজ মৌলভাবে প্রভাবিত। কিন্তু সমতলের সংখ্যাগুরু গোষ্ঠী তাদেরকে অসম মনে করে থাকে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্যাভ্যাস, চাকরির সুযোগ প্রভৃতি ক্ষেত্রে আইনে সমতা থাকলেও তা বাস্তবে তেমন একটা দেখা যায় না। তাদের অনেক চড়াই-উতরাই পার করে সবার সাথে অধিক যোগ্যতা প্রমাণ করতে হয়।

এছাড়াও সীমিত সম্পদ ও সুযোগ অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা সৃষ্টির অন্যতম কারণ, যা এথনিক অসমতা সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিগত আমেরিকার নির্বাচনে দৈহিক সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য এখনিক অসমতাকে দৃঢ়ভাবে প্রমাণ করেছে। আমেরিকার শ্বেতকায় ও কৃষ্ণকায় পৃথক স্কুল ও হোটেল তাদের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করেছে।

প্রভাবশালীরা সবসময় এথনিক সম্প্রদায়কে তাদের নিয়ন্ত্রণে রেখে কর্তৃত্ব করে চলতে চেষ্টা করে। এতে অসমতা বেড়ে যায়। এথনিসিটির সাথে যেহেতু নাগরিকত্বের কোনো সম্পর্ক নেই, সেহেতু মূলধারার লোকেরা তাদেরকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য মনে করে এখনিক অসমতা বৃদ্ধি করে থাকে। এথনিক গোষ্ঠী নিজেদেরকে কখনোই জাতীয়তাবাদী মনে করতে পারে না। কারণ তারা মূলত সংখ্যালঘু। এখনিসিটি অত্যন্ত সীমিত পরিসরে কয়েকজন মানুষের মধ্যেও কাজ করতে পারে। এদের মধ্যে যেহেতু কোনো ধরনের দমন, ক্ষমতায়ন বা নেতৃত্বের বিষয় যুক্ত থাকে না, তাই তারা সবসময় নির্যাতিত, শোষিত ও বঞ্চিত হয়ে থাকে।

সর্বশেষ বলা যায়, একটি জাতিরাষ্ট্রের অংশ হয়েই এথনিক গোষ্ঠী বেঁচে থাকে। অন্য গোষ্ঠীর কাছ থেকে তারা সবসময় অসম অবস্থার স্বীকার হয়। তবুও তাদের কোনো অভিযোগ নেই। তারা তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃরিতে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ

এথনিক অসমতার কারণগুলো তুলে ধর।

এথনিক গ্রুপ কোনো না কোনো রাষ্ট্রীয় পরিসীমায় নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য ও স্বকীয়তা নিয়ে বসবাস করে। যেহেতু একটি রাষ্ট্রের নির্দিষ্ট এলাকায় পৃথক জীবনযাপন প্রণালি ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নিয়ে বসবাস করে, সেহেতু এ সম্প্রদায়কে এথনিক গ্রুপ বলা হয়ে থাকে। আদিম সমাজের মানুষ রক্তের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে বসবাস করে। এ ধরনের দলকেই এথনিক গ্রুপ বলা হয়। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই বিভিন্ন ধরনের এথনিক গ্রুপ-এর বসবাস হয়েছে।

এথনিক অসমতার কারণ: এথনিক অসমতা সুদীর্ঘকাল ধরে এথনিক গোষ্ঠী ও নৃ-গোষ্ঠী প্রত্যয়গুলোর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। নানাবিধ অবস্থায় বহুবিধ কারণ দ্বারা এথনিক অসমতার অস্তিত্ব ক্রমশই সুস্পষ্ট হচ্ছে। সমাজবিজ্ঞানী, নৃবিজ্ঞানিশ্বণ নিম্নোক্ত বিষয়াবলির ওপর বিশেষ আলোকপাত করেছেন।

১. ব্যক্তিগত মনোভাব, ব্যক্তিত্ব ও মূল্যবোধ: এথনিক গোষ্ঠীর পরিচিতির সামাজিক ভিত্তি হলো সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য। ব্যক্তির মনোভাব, ব্যক্তিত্ব, মূল্যবোধ, বিশ্বাস, রুচিবোও ইত্যাদি সংস্কৃতি দ্বারা অতিমাত্রায় প্রভাবিত হতে থাকে। আবার ব্যক্তি সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই স্ব-স্ব পরিমণ্ডল, সমাজ ও পরিবারে নিজ নিজ বলয় সৃষ্টি করে থাকে।

ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব, বিশ্বাস, মুল্যবোধ ইত্যাদি সমাজ ও সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত। সমাজে বসবাস করতে গিয়ে ব্যক্তি নিম্ন গোষ্ঠী সম্পর্কে এবং চারপাশের অন্যান্য গোষ্ঠী ও সমাজ সম্পর্কে একটা ধারণা অর্জন করে। সে কারো প্রতি বা বিশেষ গোষ্ঠীর প্রতি বিদ্বেষী, নিরপেক্ষ, উদার বা বন্ধুত্বের মাসাতাৰ ও সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে। কখনও বা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজদেরকে অন্যান্য গোষ্ঠীর চেয়ে উৎকৃষ্ট বা নিকৃষ্ট মান করতে পারে এবং সে অনুযায়ী তার মনোভাব গড়ে ওঠে। এভাবে কারো যধ্যে Superiority comples es Inferiority complex দানা বেঁধে উঠতে পারে। এর ফলে একে অপরের প্রতি বিদ্বেশপূর্ণ মনোভাব ও বৈষম্যমূলক আচরণ করতে পারে। কখন ও বা দেখা যায় অতান্ত কর্তৃত্বব্যঞ্জক ব্যক্তিত্বের লোক যখন তার সমমর্যাদায় কারো সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে বা টিকে থাকতে পারছে না তখন তার অপারগতা বা দুর্বলতা ঢাকার জন্য তার রাগ, ক্ষোভ, অভিমান এমন ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর ওপর প্রকাশ করে যারা তার চেয়ে দুর্বলতার, এভাবেই এথনিক অসমতা তৈরি হয়।

২. এথনিক গোত্রীয় সামাজিক মিথক্রিয়ার প্রকৃতি: সামাজিক মিথস্ক্রিয়া অতিমাত্রায় এথনিক অসমতাকে প্রভাবিত করে থাকে। এই সামগ্রিক প্রক্রিয়া এথনিক নৃগোষ্ঠীর মধ্যে দৃঢ় সামাজিক সংহতি সৃষ্টির মাধ্যমে আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্ক সৃষ্টি করে থাকে, যা নানা প্রকার অসংল্যাভাকে দূরীভূত করতে পারে।

৩. আর্থসামাজিক অবস্থা: বস্তুত সীমিত সম্পদ ও সুযোগ অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা সৃষ্টির অন্যতম প্রধান কারণ, যা এথনিক অসমতা সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। একই সমাজে বসবাসকারী বিভিন্ন এথনিক গোষ্ঠীর সদস্য যখন সীমিত সম্পদ ও সুযোগের জন্য প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়, তখন প্রভাবশালীদের ভূমিকার ওপর নির্ভর করে সমাজে এথনিক অসমতা তৈরি হবে, নাকি সমতার নীতি গৃহীত ও কার্যকর হবে।

মার্কসীয় তাত্ত্বিকরা মনে করেন যে, এথনিক অসমতা হচ্ছে অর্থনৈতিক শোষণের একটি ধরন বা রূপ। অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় শাসক শ্রেণির প্রয়োজন হয় সস্তায় শ্রমের যোগান এবং শাসক শ্রেণি এটাও চায় যে, সন্তায় যারা শ্রম বিক্রি করে সেই শ্রমিক শ্রেণি যেন সংগঠিত হয়ে শাসকদের ক্ষমতা থেকে সরিয়ে না দেয়। শাসক শ্রেণির দৃষ্টিতে অন্য গোষ্ঠীকে আর্থিকভাবে পঙ্গু করে নিম্ন অবস্থানে রাখতে পারলে সুবিধা হয়। বস্তুত দৈহিক ও সাংস্কৃতিক পার্থক্যগুলো প্রভাবশালী-প্রভাবাধীন বা শাসক শাসিতের 'চিহ্ন' হিসেবে কাজ করে। যেমন- আমেরিকায়। কৃষ্ণকায়দের চামড়ার রং সমাজে তাদের নিচে অবস্থানের চিহ্ন বহন করে। এতে করে এমন আদর্শের উদ্ভব ঘটতে পারে, যা সাদা-কালোর ব্যবধানের ভিত্তিতে সামাজিক অসমতা 'স্বাভাবিক' বলে ব্যাখ্যা দিতে সক্ষম।

ট্যাব, গ্লাসকো এবং রেইচ বলেন যে, এক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অন্য গোষ্ঠীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লাগিয়ে দিয়ে শাসক শ্রেণি জনগণকে বিভক্ত করে রাখে, যাতে তারা শাসকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে না পারে। শাসক শ্রেণি যে অর্থনৈতিক সম্পন নিয়ন্ত্রণ করছে সেটা থেকে জনগণের দৃষ্টিকে অন্যদিকে সরিয়ে নেয়ার কাজটিও এভাবে সম্ভব হয়। এমনকি অমার্কসীয় তাব্লিকরাও মনে করেন যে, এথনিক অসমতার অন্যতম কারণ বা উপাদান হলো অর্থনৈতিক শোষণের ফলে সমাজে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উপাদানগুলোর মধ্যে যে জটিল অথচ তাৎপর্যপূর্ণ পারস্পরিক সম্পর্ক বিদ্যমান থাকে, সেটা উপেক্ষিত হয়। ঔপনিবেশিক সম্পর্কের পাঁচটি উপাদানের কথা জানা যায়। এগুলো হলো-

(১) প্রভাবশালী গোষ্ঠীতে অপ্রভাবশালী স্থানীয়দের জোরপূর্বক অন্তর্ভুক্ত। (২) সংস্কৃতিকে নিয়ন্ত্রণ ও তাতে পরিবর্তন আনতে প্রভাবশালীদের প্রয়াস। (৩) রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রয়ণ। (৪) অর্থনৈতিক শোষন এবং (৫) এমন আদর্শ গড়ে তোলা যা প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণকে যথাযথ বলে সমর্থন দেয়। অন্যদের এথনিক গোষ্ঠীর তুলনায় কৃষ্ণকায়, স্থানীয় আমেরিকান এই মেক্সিকান আমেরিকানরা স্বদেশে আর্থরাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে তেমন কোনো সমতা নেই। তাদের অধিকাংশ সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করে বাইরের প্রভাবশালীরা। এসব এথনিক গোষ্ঠীর দু'চার জনকে সরকারি সংস্থায় প্রতিনিধি হিসেবে নেয়া হয় প্রভাবশালীদের স্বর্গ রক্ষার্থেই ঐসব এথনিক গোষ্ঠীর সংস্কৃতিকে নিকৃষ্ট আখ্যা দিয়ে ধ্বংস করার চেষ্টা হয়েছে এবং সেখানে প্রভাবশালীদের সংস্কৃতির উপাদান অনুপ্রবেশের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

৪. দৈহিক সাংস্কৃতিক পার্থক্য: ঐ ব্যক্তির দৈহিক, সাংস্কৃতিক পার্থক্য এথনিক অসমতার অন্যতম কারণ। দৈহিক সাংস্কৃতিক পার্থক্য বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বিগত আমেরিকায় নির্বাচনে দৈহিক, সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য এথনিক অসমতাকে দৃড়ভাবে প্রমাণ করেছে। এথনিক গোষ্ঠীগুলো যদি সামাজিকভাবে পরস্পর বিচ্ছিন্ন থাকে, সামাজিক যোগাযোগ তথ্য সামাজিক মিথস্ক্রিয়া যদি তেমন একটা সংঘটিত না হয়, তাহলে পরস্পরকে কারণে-অকারণে ভুল বোঝাতে থাকে এবং সামাজির সুরত্ব বেড়ে চলে। এভাবে একে অপরের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব গড়ে তোলে, যা বৈষম্যমূলক আচরণের সূত্রপাত করায় পারে। বস্তুত গবেষণায় এটাই প্রমাণিত হয়েছে যে, আমেরিকান সমাজে কৃষ্ণকায় ও শ্বেতকায়দের ভিন্ন ভিন্ন স্কুল, হোটেল ইত্যাদি তাদের মধ্যকার দূরত্ব বৃদ্ধি করেছে, যা এখনিক বৈষম্যকে তাড়িয়ে দেয় এবং আন্তঃনৃগোরী যোগাযোগ ও সম্পর্ক নৃগোষ্ঠীগর বিয়েষের মাত্রা কমিয়ে আনে।

কুট্টি সম্প্রদায় সম্পর্কে লেখ। গারো সমাজের পরিবর্তনের কারণগুলো উল্লেখ কর

কুট্টি সম্প্রদায় কারা? গারো সমাজের পরিবর্তনের কারণগুলো

ভূমিকা: বাংলাদেশে কুট্টি সম্প্রদায়ের আগমন ঘটে বেশি কিছু সময় থেকে। এ সম্প্রদায় ভারতের বিহার  অঞ্চল থেকে আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ে এদেশে আসতে থাকে।

কুট্টি সম্প্রদায় সম্পর্কে লেখ। গারো সমাজের পরিবর্তনের কারণগুলো উল্লেখ কর

কুট্টিদের পরিচয়: কুটি শব্দটির অর্থ হচ্ছে খেদমতকারী। এরা প্রায় সকলে মুঘল আমলে পেয়াদা, বাবুর্চি, আয়া, খানসামা, গাড়োয়ান ছিল। তারা ছিল আজ্ঞাবহ শ্রেণি। অর্থাৎ, তারা মুঘল ও ঢাকাইয়া নবাবদের খেদমত ছাড়া কিছুই বুঝত না।

বাসস্থান: সাধারণত কুট্টিদের আদি বাসস্থান বাংলার বাইরে। এ সম্প্রদায় ভারত থেকে আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ে এদেশে আসতে শুরু করে। কুটি সম্প্রদায় ঢাকার চকবাজার, ইসলামপুর, বাবুবাজার, টিকাটুলি ইত্যাদি এলাকায় বসতি স্থাপন করে।

ভাষা: মুসলিম সম্প্রদায়ভুক্ত কুট্টিদের একটি স্বতন্ত্র ভাষা রয়েছে। এদের ভাথাকে 'খোট্টা' ভাষা বলা হয়। বাংলার সাথে উর্দু ও হিন্দি ভাষার সংমিশ্রণে এ ভাষা গড়ে উঠেছে।

অর্থনীতি: ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর তাদের রাতারাতি ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটে। সাম্প্রদায়িক কারণে পুরাতন ঢাকাকেন্দ্রিক বংশীয় জমিদার পরিবারগুলো যখন ভারতে যেতে শুরু করে, তখন তাদেরই নৃত্য, দারোয়ান এবং বিভিন্ন দেখাশুনার কাজে নিয়োজিত এই কুট্টি তাদের ফেলে যাওয়া সমস্ত সম্পত্তি হস্তগত করে। কুট্টি আর্থিকভাবে অত্যন্ত সবল।

সমাজকাঠামো: কুট্টিদের সমাজ কাঠামো ছিল সর্দার প্রথা ভিত্তিক। সমস্ত এলাকাটিকে তারা ১২টি অঞ্চলে ভাগ করে নিয়েছিল। প্রতিটি অঞ্চল পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট একটি করে পঞ্চায়েত কমিটি থাকত। কমিটির প্রধান ছিল সর্দার। আর সব সর্দার ছিল নবাবের অধীনে। কোনো কোনো সর্দার আবার অত্যন্ত প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিল। তাদের মধ্যে মওলাবখস এবং মাজেদ সরদার ছিলেন অন্যতম। বর্তমানে এই পঞ্চায়েত প্রথার আর প্রচলন দেখা যায় না।

ধর্মীয় অনুষ্ঠান: কুট্টি বছরে বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব পালন করে। ঈদ, রমজান, শবেবরাত প্রস্তুতি তাদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব। বিয়ে এবং বিভিন্ন পারিবারিক অনুষ্ঠানগুলোতে তারা বেশ আয়োজনের সাথেই করে থাকে।

শ্রেণিবিভাগ:  কুট্টিরা তিন শ্রেণিতে বিভক্ত। এই তিন শ্রেণির মধ্যে সামাজিক আদান-প্রদান, মেলামেশা ও বিয়ে-শাদি হয়। কুট্টিদের তিনটি শ্রেণির নাম- (১) পানু কুট্টি, (২) হাত কুট্টি ও - (৩) চুটকি কুট্টি। পানু কুট্টি সংখ্যায় বেশি।

পরিশেষে বলা যায় যে, কুট্টিরা এখন বাংলাদেশে একটি সম্পাসারিত সম্প্রদায়। কিন্তু সার্বিকভাবে এদেশের বাঙালি সমাজ তাদেরকে আজো অশিক্ষিত, নিম্ন সমাজভুক্ত সম্প্রদ হিসেবে দেখতে অভ্যন্ত। তবুও বৃহৎ জনগোষ্ঠীর সাথে মিলেমিদে ধর্মীয় এবং বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানাদি সম্পন্ন করছে এরা সে সাথে বিভিন্ন গোষ্ঠীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছে।


গারো সমাজের পরিবর্তনের কারণসমূহ

বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কারণে গারো সমাজ পরিবর্তিত হচ্ছে। মূলত কৃষিতে নতুন পদ্ধতি গ্রহণ, বাজার অর্থনীতির অনুপ্রবেশ, প্রতিবেশী বাঙালি সমাজের সঙ্গে যোগাযোগ, খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ, আধুনিক শিক্ষা এবং বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক প্রভাব ইত্যাদির ফলে গারো সমাজের পরিবর্তন প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।

গারো সমাজের পরিবর্তনের কারণ: নিম্নে গারো সমাজের পরিবর্তনের কারণসমূহ উল্লেখ করা হলো-

১. পরিবার ও বিবাহ ব্যবস্থার পরিবর্তন: সাধারণভাবে দেখা যায় যে, গারো পরিবারের বিবাহ ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন আসে নি। তবে যতটুকু পরিবর্তন লক্ষ করা যায়, সেটা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। শিক্ষিত গারো মাতৃবাসের বিপরীত রীতি পিতৃবাসে অভ্যস্ত হচ্ছে।

২. শিক্ষার ক্ষেত্রে পরিবর্তন: ১৯ শতকের শেষ দিকে গারো অঞ্চলে খ্রিষ্টান মিশনারি ও ব্যাষ্টিসের আগমন ঘটে। তারা গারোদের কেবল যে খ্রিষ্টধর্মেই দীক্ষিত করেছে তা নয়, সে সাথে গারো এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে। গারোদের শিক্ষার যার আজকাল ২০% ছড়িয়ে গিয়েছে। শিক্ষার প্রসার ঘটার ফলে গারো সমাজে গতিশীলতা বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেকে চাকরি করছে।

৩. অর্থনৈতিক পরিবর্তন: বর্তমানে গারো সমাজে জুমচাষের স্থলে হালকৃষি প্রবর্তিত হয়েছে। এতে বিভিন্ন ধরনের ফসল উৎপাদিত হচ্ছে। ক্ষুদ্র অর্থনীতির প্রচলনের ফলে আর্থিক বৈষম্য ক্রমে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

৪. ধর্মীয় পরিবর্তন: বর্তমান বাংলাদেশে গারোদের ৯০% খ্রিষ্টান ধর্মানুসারী। তবে ঐতিহ্যবাহী ধর্মের স্থলে অনেকেই তাই খ্রিষ্টান ধর্ম অনুসরণ করেছে। খ্রিষ্টীয় চার্চ এখন তাদের ধর্মের অন্যতম আকর্ষণীয় প্রতিষ্ঠান।

৫. রাজনৈতিক পরিবর্তন: এখন গারো সমাজ আর ভিন্ন জনপদ নয়। তারা এখন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় শাসনাধীন।যেখানে বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো এবং রাজনৈতিক অনুষ্ঠান প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। ফলে ঐতিহ্যবাহী গারো গ্রাম প্রধানের গুরুত্ব কমে গিয়েছে।

পরিশেষে বলা যায় যে, গারো সমাজের জরবিন্যাসে শিক্ষা অচিরেই এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে মনে হয়।

নৃগোষ্ঠীর ভৌগোলিক শ্রেণিবিভাগ ও বৈশিষ্ট্য

নৃগোষ্ঠীর ভৌগোলিক শ্রেণিবিভাগ ও বৈশিষ্ট্যসমূহ

ভূমিকা:  যেসব দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে নৃগোষ্ঠীকে শ্রেণীকরণ করা হয়, ভৌগোলিক অবস্থান তার মধ্যে অন্যতম। বস্তুত পৃথিবীর সকল অঞ্চলের ভৌগোলিj অবস্থান একরকম নয়। কেননা আবহাওয়া, জলবায়ু তথা অঞ্চলভেদে সমগ্র ভৌগোলিক অবস্থা ভিন্ন ভিন্ন হয়। যার প্রভাবে অঞ্চলভেদে মানুষের দৈহিক রূপ, প্রকৃতিও ভিন্ন ভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করে।

নৃগোষ্ঠীর ভৌগোলিক শ্রেণিবিভাগ ও বৈশিষ্ট্য

নৃগোষ্ঠীর ভৌগোলিক শ্রেণিবিভাগ: ১৯৫০ সালে নৃবিজ্ঞানী কুন, গার্ণ ও বার্ডগেল তাঁদের Race A Study of Race Formation in Man নামক গবেষণামূলক প্রবন্ধে নৃগোষ্ঠীর গঠন সম্পর্কে আলোচনাপূর্বক এর ভৌগোলিক শ্রেণিবিন্যাস প্রদান করেন। নিম্নে সংক্ষেপে নৃগোষ্ঠীর ভৌগোলিক শ্রেণিবিন্যাস উল্লেখ করা হলো-

১. ভারতীয় ভৌগোলিক নৃগোষ্ঠী: এশিয়ার ভারতীয় উপমহাদেশে এ মানবগোষ্ঠীর সদস্যরা বসবাস করে। কিছু পরিমাণে অধিকতর কালো চামড়া ছাড়া বহু ভারতীয় দেখতে ইউরোপীয়দের মতো। তাদের অনুরূপ চুল ও দা্ড়ি এবং সাহস রয়েছে। যাই হোক, মঙ্গোলীয়দের মতো তাদের মধ্যে B শ্রেণির রক্ত বেশি মাত্রায় দেখতে পাওয়া যায়।

২. অস্ট্রেলীয় ভৌগোলিক নৃগোষ্ঠী: প্রধানত অস্ট্রেলিয়া ও তাসমেনিয়ায় এ নৃগোষ্ঠী দেখতে পাওয়া গেলেও বর্তমানে এ উভয় স্থান থেকে তারা প্রায় বিলুপ্ত হয়েছে। বড় বড় দাঁত, খুব লম্বা সংকীর্ণ খুলি ও কালো চামড়া তাদের বৈশিষ্ট্য। ইউরোপীয়দের মতো কিছু পরিমাণে হালকা ও লালচে চুলবিশিষ্ট অস্ট্রালয়েডও দেখতে পাওয়া যায়।

৩. আমেরিকান ইন্ডিয়ান ভৌগোলিক নৃগোষ্ঠী: চুল, দাঁত এবং চোখের পাতার আকৃতির দিক থেকে আমেরিকার ইন্ডিয়ানরা যথেষ্ট স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন হলেও তারা মঙ্গোলীয়দের অনুরূপ। তাদের মধ্যে 'B' শ্রেণির রক্ত ঘুম কম দেখতে পাওয়া যায় এবং মনে হয় কলম্বাসের আবির্ভাবের আগে এ মহাদেশে B শ্রেণির রক্তবিশিষ্ট মানুষ একেবারেই ছিল না।

৪. পলিনেশিয়ান ভৌগোলিক নৃগোষ্ঠী: দক্ষিণে তুবুয়ই দ্বীপপুঞ্জ থেকে শুরু করে উত্তরে ইস্টার দ্বীপ পর্যন্ত সমগ্র মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপমালা পলিনেশিয়ার অন্তর্গত। বিশাল সাগরের জলরাশি পলিনেশিয়ার দ্বীপগুলোকে বিচ্ছিন্তা করায় এলিনেশীয় নৃগোষ্ঠীর আঞ্চলিক পার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে। দৈহিক গঠন, উচ্চতা, চুলের আকৃতি, মুখমণ্ডলের গঠন, চামড়ার বং নাকের গঠন প্রভৃতি বৈশিষ্ট্যের জন্য পলিনেশীয়রা অন্যান্য নৃগোষ্ঠী থেকে স্বতন্ত্র। এদের দেহ লম্বা, হাড় বড় এবং মাথায় সচরাচর ঢেউ খেলানো চুল দেখতে পাওয়া যায়।

৫. মাইক্রোনেশীয় ভৌগোলিক নৃগোষ্ঠী: পশ্চিম প্রশস্থ মহাসাগরে ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জের পূর্বে মাইক্রোনেশীয় অবস্থিত। অতীতে সংস্কৃতি ও মানবধারা উভয় দিক থেকে মাইক্রোনেশীয়দের প্রায়ই পলিনেশীয়দের সাথে যুক্ত করা হয়। কিন্তু অধুনা অপেক্ষাকৃত কালো চামড়া, খর্ব আকৃতি এবং তরঙ্গায়িত, পেঁচানো এমনকি কুঞ্চিত চুলের জন্য তাদের আলাদা নৃগোষ্ঠী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। নিউজিল্যান্ডের মাউরি উপজাতি এ নৃগোষ্ঠীর অভাতি।

৬. মেলানেশীয় পাগুয়া ভৌগোলিক নৃগোষ্ঠী: মাইক্রোনেশিয়ার দক্ষিণে মেলানেশিয়া অবস্থিত। নিউজিল্যান্ড থেকে ফিজি পর্যন্ত তিন হাজার মাইল জুড়ে এ নৃগোষ্ঠীর বাসভূমি বিস্তৃত। আধুনিক কালের পূর্ব পর্যন্ত পৃথিবীর অন্যান্য স্থান থেকে আপেক্ষিকভাবে বিচ্ছিন্ন এ নরগোষ্ঠীর সদস্যদের চামড়া যথেষ্ট কালো, খুলি আদিম প্রকৃতির এবং চুল কুজিত থেকে তরঙ্গায়িত।

উপর্যুক্ত আলোচনা শেষে বলা যায় যে, নৃগোষ্ঠী হায় জনসংখ্যার সেই এক বিশেষ অংশ, যারা জৈবিক উত্তরাধিকার সূত্রে কতকগুলো নির্দিষ্ট দৈহিক বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। ভৌগোলিক দৃষ্টিকোণ থেকে নৃগোষ্ঠীকে উপযুক্ত ছয়টি শ্রেণিতে বিভক্ত করা যায়।

নৃগোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্যসমূহ উল্লেখ কর।

পৃথিবীতে বিভিন্ন জাতির মানুষের বসবাস। কিন্তু বিজ্ঞানের বিচারে এরা সবাই একই গোষ্ঠীভুক্ত। নৃগোষ্ঠীর মাধ্যমে পৃথিবীর বিভিন্ন মানুষের বংশানুসারে দৈহিক আকৃতিসহ জীবনের বিভিন্ন লক্ষণ শনাক্ত করা যায়। এ ছাড়া এর মাধ্যমে বিভিন্ন মানবজাতির সামাজিক, মানসিক, সাংস্কৃতিক ও সভ্যতাকেন্দ্রিক বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য প্রতিভাত হয়। ফলে নৃগোষ্ঠী বা মানবগোষ্ঠী বয়ে আনে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও স্বতন্ত্র ইতিহাস ধারা।।

নৃগোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্য: নৃগোষ্ঠীর সংজ্ঞাসমূহ বিশ্লেষণ করলে এর বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়। সেগুলি নিম্নরূপ-

১. নৃগোষ্ঠী মাত্রই মানবজাতির একটি উপবিভাগ।

২. ঐ উপবিভাগের সদস্যদের মধ্যে কতকগুলো সাধারন দেহিক বৈশিস্ট্য বিদ্যমান থাকে।

৩. সাধারণ দৈহিক বৈশিষ্ট্যগুলো উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত এবং ঐ বৈশিষ্ট্যাবলি জৈবিক সূত্রে বংশধরদের মধ্যে বর্তিয়ে থাকে।

৪. নৃগোষ্ঠীগুলো একে অন্য থেকে ভিন্নতর।

৫. নৃগোষ্ঠী ইতিহাসের ঘটনাধারায় গড়ে ওঠা একটি জনসমষ্টি।

৬ এদের নিজেদের একই ভাষা ও এরা একই অঞ্চলে বসবাস করে।

৭. এরা এমন জনগোষ্ঠী, যারা যৌগোলিক কারণেও একটু পৃথক।

৮. একই নৃগোষ্ঠীর সবাইকে দেখতে একই রকম লাগে।

নৃগোষ্ঠী মানব প্রজাতির এমন এক দিককে বোঝায়, যার সদস্যবৃন্দ তাদের শারীরিক বৈশিষ্ট্য যা বংশ পরস্পরায় পেয়ে থাকে এবং নৃগোষ্ঠীসমূহের মাধ্য ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান রয়েছে।

বাংলাদেশের প্রধান প্রধান উপজাতি/ আদিবাসী এথনিক গোষ্ঠীর নৃগোষ্ঠীগত পরিচয় আলোচনা কর।

 বাংলাদেশের প্রধান প্রধান উপজাতি/ আদিবাসী এথনিক গোষ্ঠীর নৃগোষ্ঠীগত পরিচয় আলোচনা কর

 অথবা, বাংলাদেশের প্রধান প্রধান এথনিক গোষ্ঠীর নৃতাত্ত্বিক পরিচয় তুলে ধর।


ভূমিকা: বাঙালি জাতির নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ে দেখা যায় বাঙালিরা সংকর জাতি, অর্থাৎ বিভিন্ন নরগোষ্ঠীর সংমিশ্রণ এ বাঙালিদের উৎপত্তি। এজন্যই এদেশের উপজাতি বা আদিবাসীদের নরগোষ্ঠীগত পরিচয়ে সংমিশ্রণ থাকাটাই স্বাভাবিক। উপজাতিরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দেশ থেকে এদেশে এসে বসতি স্থাপন করেছে। নৃবিজ্ঞানীদের মতে, "বিশুদ্ধ নৃগোষ্ঠী একটি অলীক কল্পনা। নৃবিজ্ঞানী বিরাজ শংকর উপমহাদেশের জনগোষ্ঠীকে ছয়টি নরগোষ্ঠীতে ভাগ করেছেন। সেই প্রেক্ষিতে এদেশের উপজাতিদের দ্রাবিড়ীয় আদি অস্ট্রেলীয়, মঙ্গোলীয়, ককেশীয় প্রভৃতি নৃগোষ্ঠীতে বিভক্ত করা হয়েছে।

বাংলাদেশের প্রধান প্রধান উপজাতি/ আদিবাসী এথনিক গোষ্ঠীর নৃগোষ্ঠীগত পরিচয় আলোচনা কর।


বাংলাদেশের প্রধান প্রধান উপজাতি/আধিবাসী/এথনিক গোষ্ঠীর নৃগোষ্ঠীগত পরিচয়:

নিম্নে বাংলাদেশের প্রধান প্রধান উপজাতিসমূহের নৃগোষ্ঠীগত বা নৃতাত্ত্বিক পরিচয় তুলে ধরা হলো-


১. চাকমাদের নৃগোষ্ঠীগত পরিচয়: নৃগোষ্ঠীগত পরিচয়ের ব্যাপারে চাকমাদের মতভেদ রয়েছে। তবে এদের সাথে চীনা মঙ্গোলয়েডদের যথেষ্ট মিল রয়েছে। তাদের দৈহিক উচ্চতা মাঝারি থেকে বেঁটে পর্যন্ত হয়। গায়ের লোমের স্বল্পতা, দৈহিক গড়ন শক্তিশালী, নাক চ্যাপ্টা, ছোট চোখ, নাদুস আঁটসাঁট স্বাস্থ্য। তারা মগদের চেয়ে অধিক পরিষ্কার ও সুন্দর। চাকমাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো মুখমণ্ডল বেশ প্রফুল্ল।

২. গারোদের নৃগোষ্ঠীগত পরিচয়: গারোদের নৃগোষ্ঠীগতভাবে মঙ্গোলয়েড বলা হয়। কেননা এদেরে দেহে মঙ্গোলয়েড নৃগোষ্ঠীর প্রভাব রয়েছে। গারোদের মুখমণ্ডল গোলাকার এবং সমতল। তাদের ক্ষুদ্রাকৃতির নাক চ্যাপ্টা ও প্রশস্ত, ঠোঁট মোটা, চুল কালো কোঁকড়ানো ঢেউ খেলানো, কান বৃহদাকার, পুরুষের মুখে দাঁড়ি পরিমাণ কম এবং পুরুষ মহিলার গড় উচ্চতা পাঁচ ফুট। তারা কর্মঠ এবং দৈহিক গড়ন পাতলা।

৩. সাঁওতালদের নৃগোষ্ঠীদের পরিচয়: সাঁওতালরা আদি আস্ট্রলীয়। আদি অস্ট্রেলীয় গোষ্ঠীর দৈহিক গঠন এবং এদের দৈহিক গঠন প্রায় এক। এদের চেহারা কালো, নাক চ্যাপ্টা এটি মোটা, চুল কোঁকাড়ানো এবং দেহের উচ্চতা মাঝারি ধরণের। এদের দাড়ি গোঁফ মাঝারি ধরনের। এসব কারণে সাওতালদেরকে প্রাক দ্রাবিড়ীয় বলা হয়।

৪. মুরংদের নৃগোষ্ঠীগত পরিচয়: নৃতত্ত্ববিদ স্যার রিজলে (Reisley), ড, গ্রিয়ারসন ও হাটন (Haton) বলেছেন, চেহারাগত বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে মুরংদের রক্তধারায় নৃগোষ্ঠীর আংশিক লক্ষণ বিদ্যমান রয়েছে। তবে দৈহিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে দেখলে দেখা যায়, এরা মঙ্গোলয়েড নরগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। এরা প্রাথমিক পরিবেশে থাকতে ভালোবাসে এবং সভ্যসমাজ থেকে আজও অনেক দূরে।

৫. খাসিয়াদের নৃগোষ্ঠীগত পরিচয়: চীনা বার্মিজদের সাথে খাসিয়াদের মিল রয়েছে। এদেরকে আদি মঙ্গোলয়েড গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত করা যায়। চীনা ও বার্মিজদের মতো এদের গায়ের রং ফর্সা, নাক খাদা, চোখ ছোট, পায়ের গোড়ালি মোটা এবং প্রদেহের উচ্চতা মাঝারি ধরনের। এরা সুঠাম দেহের অধিকারী, মুখে দাড়ি নেই বললেই চলে, তবে গোঁফ ঘন ও দেহের লোম স্বল্পতা রয়েছে।।

৬. মণিপুরিদের নৃগোষ্ঠীগত পরিচয়: মণিপুরি সম্প্রদায়ের চীন ও বার্মিজদের ভাষ্যসহ অনেক দিকেই মিল রয়েছে। এদের গায়ের রং শ্যাম-ফর্সা, ছোট চোখ, নাক কিঞ্চিত খাদা, দেহের উচ্চতা মাঝারি ধরনের এবং পায়ের গোড়ালি মোটা। এসব দিক চিন্তা করে তাদের মঙ্গোলীয় গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত করা যায়।

৭. রাখাইনদের নৃগোষ্ঠীগত পরিচয়: রাখাইন উপজাতিদের মঙ্গোলীয় নৃগোষ্ঠীর একটি অংশ বলে আখ্যায়িত করা হয়। এদের মাথার আকার গোল, চুল সোজা ও কালো, নাক চ্যাপ্টা। রাখাইনরা দেখতে বাঙালিদের থেকে আলাদা, এদের দেখলেই তা বুঝা যায়।

৮. ওঁরাওদের নৃগোষ্ঠীগত পরিচয়ধ: কেউ কেউ ওঁরাওদের প্রাক-দ্রাবিড়ীয় বলে উল্লেখ করেছেন। এদের চেহারা কালো, চুল কোঁকড়ানো, নাক খানা ও চ্যাপ্টা, মাথা গোলাকার এবং দেহের উচ্চতা মাঝারি ধরনের। অন্যদিকে, এদেরকে সাঁওতালদের মতো আদি অস্ট্রেলীয় বলেও কেউ কেউ অভিহিত করেছেন। আবার ড. মিয়ারসন ওঁরাওদের মুণ্ডাসের অন্যতম শাখা বলে উল্লেখ করেছেন।

৯. মগ বা মারমাদের নৃতাত্ত্বিক পরিচয়: স্যার রিজাল মারমাদের দৈহিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বলেছেন, তাদের দেহ লোমহীন, চ্যাপ্টা নাক, মাড়িবিহীন মুখ, চোখ ছোট, সোজা চুল, মাথা গোল, ভারী ভ্র, বাদামি রং প্রভৃতি মঙ্গোলীয় মানবধারার বৈশিষ্ট্য তাদের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। এককথায়, মারমাদের মধ্যে ৮৪.৫ জন মঙ্গোলীয় আকৃতিবিশিষ্ট।

১০ রাজবংশীদের নৃগোষ্ঠীগত পরিচয়: রাজবংশীদের মধ্যে মঙ্গোলীয় প্রভাব লক্ষ করা গেলেও এদেরকে সহজেই দৈহিকভাবে দ্রাবিড়ীয় সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত করা যায়।

১১. টিপরামের নৃগোষ্ঠীগত পরিচয়: বাংলাদেশের দক্ষিন পূর্বাশয় পাহাড়িয়া অঞ্চলে বসবাসকারী টিপরা উপজাতিরা মঙ্গলীয় মানবগোষ্ঠীর তিব্বতি বর্শন উপগোষ্ঠীর অন্যতম শাখা বোরকা-এর অন্তর্ভুক্ত। তাদের আকৃতিই বলে যে মঙ্গলীয় মানবগোষ্ঠীর রক্তধারা এদের মধ্যে প্রবহমান। ভারতের ত্রিপুরায়ও অসংখ্য টিপরা বসবাস করে।

 ১২. কুকিদের নৃগোষ্ঠীগত পরিচয়: কুকি সম্পপ্রদায় মঙ্গলীয় থেকে উদ্ধৃত। এদের দেখতে খাটো, মাদা মেটি, গায়ের রং  কালো, চোখ ছোট, নাক চওড়া, কপাল উঁচু, ঠোঁটের উপরের অংশ লম্বা এবং মুখে দাঁড়ি নেই বললেই চলে। ড. হাটল-এ মতে, কুকিদের মধ্যে নিগ্রোবটুর লক্ষণ বিদ্যমান। হডসন বলেন, কুকিরা আসামের নাগা ও মণিপুরিদের অন্তর্ভুক্ত।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, উপর্যুক্ত নৃগোষ্ঠী বা নরগোষ্ঠীগত পরিচয় বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসরত উপজাতিদের জন্য প্রযোজ্য। এসব উপজাতিরা পৃথিবীর বিভিন্ন নৃগোষ্ঠী থেকে এসেছে। আবার এদের সাথে বাঙালিদের আকৃতিরও কোনো মিল নেই। এদের ভাষা, সংস্কৃতি তথ্য জীবনযাপন পদ্ধতি সবকিছুই ভিন্ন। বাঙালিদের ন্যায় নৃগোষ্ঠীর সন্ধান লাভ অলীক কল্পনা ছাড়া আর কিছুই নয়।

সংখ্যালঘুদের জন্য রাষ্ট্রীয় নীতিমালাগুলো সংক্ষেপে আলোচনা কর।

সংখ্যালঘুদের জন্য রাষ্ট্রীয় নীতিমালাগুলো সংক্ষেপে আলোচনা কর।

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার ও কর্তব্য আলোচনা কর।

ভূমিকা: পৃথিবীর প্রতিটি রাষ্ট্রে একই সাথে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ একত্রে বসবাস করে থাকে। এ সবল সম্প্রদায়ের মধ্যে কোনো সম্প্রদায়ের লোকসংখ্যা কম থাকে আবার কোনো সম্প্রদায়ের লোকসংখ্যা তুলনামূলক বেশি থাকে। একটি দেশের অভ্যন্তরে তুলনামূলক কম লোকসংখ্যা, সম্প্রদায়কে Minority বা সংখ্যালঘু হিসেবে অভিহিত করা হয়। এখানে সম্প্রদায় বলতে বিভিন্ন পেশা, ধর্ম, জাতি, বর্ণ, লিঙ্গ বয়স প্রভৃতিভিত্তিক সম্প্রদায় হতে পারে। বর্তমান বিশ্বে ধর্ম, জাতি, বর্ণ ও লিঙ্গীয় সম্প্রদায় বেশ আলোচিত বিষয়।

সংখ্যালঘুদের জন্য রাষ্ট্রীয় নীতিমালাগুলো সংক্ষেপে আলোচনা কর।

সংখ্যালঘুদের জন্য রাষ্ট্রীয় নীতিমালা: সংখ্যালঘুদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য রাষ্ট্রকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হয়। আর এসব পদক্ষেপের প্রেক্ষাপটেই প্রণয়ন করতে হয় সংখ্যালঘুদের জন্য বিভিন্ন নীতি। এ নীতিগুলো হলো-

১. সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগরিষ্ঠদের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা: মূলত একই রাষ্ট্রের নাগরিক হয়ে একে অপরের সান্নিধ্যে আসা বাঞ্ছনীয়। কেউ ক্ষমতাশালী আবার কেউ ক্ষমতাহীন এ মানসিকতা দূর করতে হবে। সংখ্যায় কম হওয়ায় সংখ্যালঘুকে কোনোক্রমেই অবহেলা করা চলবে না। বাস্তবতার নিরিখে সংখ্যালঘুকেও সামনে আসার সুযোগ দিতে হবে। হেয়প্রতিপন্ন সমতা আনলো করার মনোভাব দূর করায় গোষ্ঠীর মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।

২. কর্মক্ষেত্রে সুযোগ দান: প্রায় সব মানুষই চায় তার যোগ্যতা অনুযায়ী উপযুক্ত পেশায় কাজ করতে। কিন্তু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যকে যোগ্যতা অনুযায়ী পদে বহাল কনরা হয় না * একটাই মাত্র কারণে তারা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য। এ সকল হীনম্মন্যতার হাত থেকে এ সম্প্রদায়কে বাঁচাতে হবে।

৩. শিক্ষার সুযোগ: শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। জাতিকে সঠিকভাবে গড়ে তোলার জন্য রাষ্ট্র শিক্ষাবিস্তার সংক্রান্ত বহুবিধ কাজ করে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে কোনোক্রমেই শিক্ষালাভথেকে বঞ্চিত করা যাবে না। শিক্ষাসংক্রান্ত সকল কাজে সংখ্যালঘুদের সমানাধিকার দিয়ে উৎসাহিত করতে হবে।

৪. জীবনযাপনের নিরাপত্তা দান: কেবল সংখ্যালঘু হবার কারণেই জীবনে চলার পথে পদে পদে উপেক্ষিত হতে হয়। দুর্বলের প্রতি সবলের হামলা কখনো থেমে থাকে নি। ক্ষমতাধরদের হামলায় অনেক সময় জীবন নিতে হচ্ছে নিরীহ সংখ্যালঘুদেরকে। রাষ্ট্রের সহযোগিতায় সংখ্যালঘুদের জীবনযাপনে নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব।

৫. সন্ত্রাসীদের কবল থেকে রক্ষা: বর্তমান বিশ্বের সর্বত্র সংখ্যালঘুদের ওপর জুলুম, নির্যাতন ও নিপীড়ন চলমান অবস্থায় আছে। গণতন্ত্রের জন্য, যারা ঢাকঢোল পিটিয়ে নিজেদেরকে প্রকাশ করে তারা জোনো না কোনোভাবে সংখ্যালঘুদের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করেছে। সংখ্যাগরিষ্ঠের সন্ত্রাসী হামলা কোনো দিন থেমে থাকে নি। তাই প্রয়োজন সন্ত্রাসীদের কবলে থেকে সংখ্যালঘুদের রক্ষা করা।

৬. সম্পদের সংরক্ষণ: আইন প্রণয়ন করে রাষ্ট্র সকলের সম্পদ রক্ষা করে। সংখ্যালঘুরা যেহেতু কম ক্ষমতার অধিকারী তাই দেখা যায় ক্ষমতাধরদের আগমনে তাদের ভিটেমাটি সব হারিয়ে ফেলে। আবার অনেক সময় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার ক্ষমতাধররা সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে থাকে। সংখ্যালঘুরা যাতে তাদের সম্পদ নিয়ে শাড়িতে বাস করতে পারে তার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

৭. জনস্বাস্থ্য সংরক্ষণ: মূলত জনস্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য রাষ্ট্র হাসপাতাল, দাতব্য চিকিৎসালয়, চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন করে। অন্যান্য নাগরিকের মতো সংখ্যালঘুরাও যেন স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত না হয় সেদিকে সজাগ সৃষ্টি রাখতে হবে।

৮. বৈষম্যমূলক আচরণ ত্যাগ করা: ক্ষমতায় দুর্বলতার কারণে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীরা চায় সংখ্যালঘুদেরকে পশ্চাতে ফেলে রাখতে। ক্ষমতার বৈষম্যই উভয় গোষ্ঠীর মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করে। একদিকে ক্ষমতার বাহাদুরি, অপরদিকে ক্ষমতাহীনদের মাথানত করে রাখার প্রবণতা পরস্পরের মধ্যে সম্পর্কের দূরত্ব সৃষ্টি করে। ক্ষমতাবানরা দুর্বলের প্রতি সহনশীল না হলে বৈষম্যের দূরত্ব বাড়তেই থাকবে। রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ ছাড়া এ বৈষমোর দূতত্ব কআনো সম্ভব নয়।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, সংখ্যাগরিষ্ঠের দল সবসময়ই চায় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সংখ্যালঘুদেরকে সুযোগ। সুবিধা থেকে বঞ্চিত করে রাখতে। প্রভাবশালী গোষ্ঠী সবসময়ই সংখ্যালঘুদেরকে আলাদা করে রাখতে চায়।


এথনিক গোষ্ঠী বা এথনিসিটি কি? এখনিক গোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্যসমূহ তুলে ধর

এথনিক গোষ্ঠীর সংজ্ঞা দাও  অথবা, এথনিসিটি বলতে তুমি কী বুঝ?

ভূমিকা:  নৃগোষ্ঠী বলতে আমরা জৈবিক বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে জনগণের শ্রেণিবিভাজনকে বোঝালেও এথনিক গ্রুপ আমরা নির্ধারণ করি সাংস্কিতিক বৈশিষ্ট্যর ভিত্তিতে । নৃবিজ্ঞানীদের পরিভাষাই এথনিক অর্থ হচ্ছে পূর্বপুরুষ ও  সংস্কৃতিক ধারাবাহিকতার ভিত্তিতে দলবদ্ধ একক জনগোষ্ঠী। যাদের রয়েছে নিজস্ব জাতিগত উৎসস্থল, আলাদা খাদ্যাভ্যাস, পোশাক পরিচ্ছদের ধরন, পারিবারিক নাম এবং সম্পর্ক, ভাষা, গানবাজনা, ধর্ম এবং অন্যান্য প্রথাবলি।

এথনিক গোষ্ঠী বা এথনিসিটি কি? এখনিক গোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্যসমূহ তুলে ধর

এথনিক গ্রুপ: এখনিক গ্রুপ হাচ্ছে এমন কিছু জনসংখ্যার সমষ্টি, যার সদস্যরা একে অপরের সাথে অভিন্ন কোনো কৃষ্টি ও ঐতিহ্যের কারণে পরিচিত। এই ঐতিহ্যগত পরিচিতিটি হতে পারে আন্তরিক কিংবা কাল্পনিক। তবে যাই হোক না কেন, এখনিক গ্রুপের মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সাংস্কৃতিক।

ইংরেজি Ethnicity এবং Ethnic group এই দুটি পরিভাষা এসেছে মূলত গ্রিক শব্দ Ethnos থেকে। এখনোস বলতে তখন গ্রিক ভাষায় নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন জাতিকে বোঝানো হতো। যাদের বংশগত পরিচয় একই এবং যাদের ভিন্ন একটি সাধারণ সংস্কৃতি রয়েছে। এথনিক পরিভাষাটিকে পরবর্তীতে ইংরেজিতে ব্যবহৃত হয়।

১৪ শ শতাব্দীতে বহু ঈশ্বরবাদী জনগোষ্ঠীকে কিংবা অবিশ্বাসী জনগোষ্ঠীকে বোঝার জন্য যারা খ্রিষ্টান ধর্মের অন্তর্ভুক্ত নয়।

প্রামাণ্য সংজ্ঞা: বিভিন্ন নৃবিজ্ঞানী বিভিন্নভাবে এথনিক গ্রুপের সংজ্ঞা দিয়েছেন, যা নিম্নে উল্লেখ করা হলো-

Prof William P. Scott তাঁর Dictionary of Sociology (1988)-তে বলেন, এখনিক গোষ্ঠী বলতে এমন এক গোষ্ঠীকে বোঝায়, যাদের একটি সাধারণ সাংস্কৃতিক ঐহিয়া রয়েছে এবং যারা নিজস্ব পরিচিতিসহ বৃহৎ কোনো সমাজের উপগোষ্ঠী হিসেবে বসবাস করে।

Oxford English Dictionary'র সংজ্ঞা অনুযায়ী, "এখনিক গ্রুপ বলতে সাধারণত নির্দিষ্ট কোনো নৃগোষ্ঠীকে বোঝায়, যা বৃহত্তয় জাতিয় সদস্যদের কাছে কিছুটা অদ্ভুত প্রকৃতির মনে হয়। এথনিক, এমনিক গ্রুপের থাকতে পারে অভিন্ন নৃগোষ্ঠী, ধর্মীয় এবং ভাষাগত বৈশিষ্ট্য। তবে সাধারণত বৃহত্তর সামাজিক কিংবা জাতীয় ব্যবস্থায় মাওতায় ভিন্ন কোনো দল কিংবা নৃগোষ্ঠীকেই এথনিক গ্রুপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই জন্যই যুক্তরাষ্ট্রের এখনিক গ্রুপ বলতে ভিনদেশি বিকম্ভুতকিমাকার ব্যক্তি ও তার পরিচয়কে বোঝানো হয়।"

Marcos Banks বলেন, "এথনিক এল্প হচ্ছে এমন কিছু জনসংখ্যার সমষ্টি যার সদস্যরা একে অর্থরের সাথে অভিন্ন কোনো কৃষ্টি ও ঐতিহ্যের কারণে পরিচিত। এই ঐতিহ্যগত পরিচিতি হতে পারে বাস্তবিক কিংবা কাল্পনিক। তবে যাই হোক না কেন, এখনিক গ্রুপের মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সাংস্কৃতিক।"

এথনিক গোষ্ঠীদের সাধারণত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ভুক্ত মনে করা হয়ে থাকে। তাদের আলাদা দৈহিক গঠন ও সাংস্কৃতিক ভিন্নতা রয়েছে। এদের নৃবিজ্ঞানে সাংস্কৃতিক কারণেই এথনিক গ্রুপ বলা হয়। যার সদস্যরা একটি স্বতন্ত্র পরিচয় সম্পর্কে সচেতন এবং যাদের একটা ঐকোর অনুভূতি বিদ্যমান।

 এখনিক গোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্যসমূহ

এথনিক গ্রুপ কিছু ভিন্ন বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন জাতিগোষ্ঠী। তাদের আলাদা দৈহিক গঠন, জাতিগত উৎসস্থল, আলাদা খাদ্যাভ্যাস, পোশাক-পরিচ্ছদের ধরুন, পারিবারিক নাম এবং সম্পর্ক, ভাষা, গানবাজনা, ধর্ম এবংও সাংস্কৃতিক ভিন্নতা রয়েছে। এখনিক গোষ্ঠীর কতকগুলো সাধারণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যেমন-

১. এখনিক গোষ্ঠীর রয়েছে নিজস্ব ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতি।

২. এখনিক গোষ্ঠী একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে বসবাস করে।

৩. এথনিক গোষ্ঠীর মধ্যে ঐক্যের ধারণা বিদ্যমান। ৪.

৪. সাধারণ সংস্কৃতির অংশীদার।

৫. এখনিক গোষ্ঠীর সদস্যদের সাথে অর্থনৈতিক জীবনপ্রণালিতে রয়েছে ঐক্য।

৬. জ্ঞাতিবন্ধন সুদৃঢ় হয়।

৭. এথনিক গোষ্ঠীর সদস্যরা বিশ্বাস করে যে, তারা একই পূর্বপুরুষ থেকে এসেছে।

৮. এথনিক গোষ্ঠী বংশগতভাবে শারীরিক ও সংস্কৃতিতে আলাদা।

জাতির সংজ্ঞা দাও। জাতি গঠনের উপাদানসমূহ কী?

জাতির সংজ্ঞা দাও। জাতি গঠনের উপাদানসমূহ কী?

অথবা, জাতি বলতে কী বোঝ? জাতির স্বরূপ বিশ্লেষণ কর।


ভূমিকা: যে-কোনো সমাজে জাতি চেতনার উন্মেষ ঘটে দ্বিবিধ উপাদান সহযোগে, যথা- ভাবগত উপাদান ও বাহ্যিক উপাদান। ভাবগত উপাদান বলতে বোঝায় সমষ্টিগত পর্যায়ে অভাব-অভিযোগ সম্পর্কে জনসাধারণের ঐক্যবোধ এবং অভিন্ন রাজনৈতিক জীবন প্রতিষ্ঠার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। বাহ্যিক উপানান হলো পরিবেশের ঐক্য ও সমতা। ইতিহাসের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে জাতি গঠনে ভাবগত উপাদানের প্রভাব বেশি।
জাতির সংজ্ঞা দাও। জাতি গঠনের উপাদানসমূহ কী?


জাতি: ল্যাটিন শব্দ natio থেকে Nation শব্দটির উদ্ধৃত হয়েছে। জাতি একটি সত্তা যা জাতীয়তাবোধের ওপর ভিত্তি করে সৃষ্টি হয় এবং জনসমষ্টি যখন একটি ভূখণ্ডে, একই ভাষা, একই ধর্ম, একই ঐতিহ্যে, একই প্রথায়, একই নীতি ও আদর্শ মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে আচার ব্যবহারে লিপ্ত থাকে তখনই তা জাতি হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

গ্রামাণ্য সংজ্ঞা: জাতি সম্পর্কে বিভিন্ন মনীষী বিভিন্নভাবে সংজ্ঞা প্রদান করেছেন, যা নিম্নে উল্লেখ করা হলো-

লর্ড ব্রাইস বলেন, "A nation is a nationality when is has organized it self into a political body either mdependent or desiring to be indepedent"

ড. এমাজউদ্দীন আহমদ-এর মতে, "জাতি বলতে আমরা এক জনসমষ্টিকে বুঝি যারা জাতীয়তাবোধে উদ্‌বুদ্ধ হয়ে এক নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে তাদের নিজস্ব শাসনব্যবস্থা কায়েম করেছে অথবা কায়েম করতে আগ্রহী।"

ব্রাইট-এর মতে, "জাতি বলতে একটি রাষ্ট্রকে বোঝায় যা হবে স্বাধীন, এর থাকবে একটি কেন্দ্রীয়ভাবে সংগঠিত রাজনৈতিক একক যাকে একটি স্বায়ত্তশাসিত রাজনৈতিক সত্তাকে বোঝায়।"

Anderson-এর মতে, "it in an imagined political community and imagined as both inherently limited and sovereign

অধ্যাপক ম্যাকাইভার জাতি সম্পর্কে বলেন, "জাতি হাসা ঐতিহাসিক পরিস্থিতির দ্বারা স্পষ্ট, আধাত্ম্য চেতনার দ্বারা সমর্থিত একত্রে বসবাস করার সংকল্পবদ্ধ সম্প্রদায়গত মনোভাবসম্প জনসমাজ। যারা নিজেদের জন্য সাধারণ সংবিধান রচনা করতে চায়।

জাতি গঠনের উপাদানসমূহ

নিম্নে জাতি গঠনের প্রধান প্রধান উপাদানগুলো উল্লেখ করা হলো-

১. নির্দিষ্ট ভূখণ্ড: কতকগুলো লোক এক নির্দিষ্ট ভূগছে বাস করলে তারা এক জাতিতে পরিণত হয়। নির্দিষ্ট ভূখণ্ড আতি গঠনের পক্ষে উপযোগী। তবে বিভিন্ন ভূখণ্ডে বাস করেও লোকেরা একটি জাতি গঠন করেছে এমনো দৃষ্টান্ত রয়েছে। নির্দিষ্ট ভূখণ্ড জাতি গঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, তবে অপরিহার্য নয়।

২. কুলগত ঐক্য: জাতি গঠনে কুলগত ঐক্যের প্রভাব সুদুরপ্রসারী। রক্তের সম্বন্ধ মানুষকে কাছে টানে, দূরকে নিকট করে এবং একপ্রকার মানসিক ঐক্য সৃষ্টি করে, যার আকর্ষণ দুর্নিবার। জাতি গঠনের জন্য বংশগত ঐক্য বা ফুলগত ঐক্য একটি প্রধান উপাদন। সমস্ত মানুষ যখন একই বংশোদ্ভূত বলে মনে করে, তখনই তদের মধ্যে একান্ততা, ভাব গড়ে ওঠে এবং পরস্পরকে ঐক্যবদ্ধ করতে সাহায্য করে। কিন্তু আধুনিক নৃতত্ত্ববিদগণের গবেষণার ফলে কুলগত ঐক্য কাল্পনিক সম্বন্ধ বলে প্রমাণিত হয়েছে। পৃথিবীর কোনো জাতির মধ্যেই রক্তের বিশুদ্ধতা নেই।

৩. ভাষাগত একতা: ভাষাগত একতা ঐক্য প্রতিষ্ঠার প্রধান সেতুবন্ধন। ভাষাগত ঐক্য জাতি গঠনের অপরিহার্য অঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। সুইজারল্যান্ডে তিনটি ভিন্ন ভাষাভাষী লোক বাস করে কিন্তু তাদের ভাষাগত বিভেদ জাতি গঠনের অন্তরায় হয় নি।

৪. ধর্মের একতা: ধর্মের ঐক্য জাতি গঠনের এক অন্যতম সূত্র। এর ভিত্তিতে এশিয়া ও ইউরোপে অনেক জাতি-রাষ্ট্রের জিব হয়েছে। তবে ধর্মের ঐক্য যে একান্ত প্রয়োজনীয় তা সঠিক নয়। বিভিন্ন ধর্মের লোকদের মধ্যেও জাতি গঠনের প্রয়াস লক্ষণীয়। ধর্মের একতার ভিত্তিতে পাকিস্তান ও ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েলের জন্ম হয়।

৫. অর্থনৈতিক ঐক্য: অর্থনৈতিক অবস্থার সমতা ও জনসাধারণকে জাতি গঠনের আদর্শে অনুপ্রাণিত করে। সকলের অর্থনৈতিক স্বার্থ হলো তারা নিজেদেরকে এক ভাবতে শেখে।

৬. ঐতিহ্যগত ঐক্য: জনগণের মধ্যে এক ঐতিহ্যবোধ থাকলে অতীতের গৌরব যা যৌথ কর্মের প্রেরণা তাদের মহামিলনের সূত্রে আবদ্ধ করে।

৭. ভাবগত ঐক্য: জাতি গঠনের মূল উপাদান সংহতি বোধ এবং মিলনের অসীম আনন্দ। জাতি গঠনের ব্যাহিক উপাদানগুলো সব সময়ে বিশেষ কার্যকরী হয় না। এগুলোর অবর্তমানেও জাতির সৃষ্টি সম্ভব। জাতীয় জনসমাজ বা জাতি গঠন প্রধানত নির্ভর করে জাতির এক বিশেষ মনোভাবের ওপর, যখন জাতীয় জনসমাজের প্রত্যেক ব্যক্তিই তাদের মূল্যবোধগত ঐক্যে একান্ত আস্থাবান হয়ে এক জাতিত্ববোধে অনুপ্রাণিত হয়, তখনই কুলগত, ভাষাগত বা ধর্মগত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও তারা এক জাতিতে পরিণত হয়। ভাবগত ঐক্য একটা মানসিক অনুভূতির ব্যাপার।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, জাতি বলেতে নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে বসবাসকারী এক জনসমষ্টিকে বোঝায়, যারা জাতীয়তাবোধে উদ্‌বুদ্ধ। জাতি স্বাধীনতাকামী হতে পারে অথবা স্বাধীন হতে পারে। বর্তমানে জাতি হলো এমন একটি জনসমতি, যা রাজনৈতিক দিক থেকে সম্পূর্ণভাবে আত্মসচেতন ও সংগঠিত।

বাংলাদেশের উপজাতি গোষ্ঠীর অর্থনৈতিক কাঠামো সম্পর্কে আলোচনা কর।

বাংলাদেশের উপজাতি গোষ্ঠীর অর্থনৈতিক কাঠামো সম্পর্কে আলোচনা কর।

বাংলাদেশের এথনিক গোষ্ঠীর অর্থনৈতিক কাঠামো সম্পর্কে যা জান লেখ।

উত্তর: বাংলাদেশে বসবাসরত উপজাতি সম্প্রদায়ের অর্থনৈতিক কাঠামোতে স্বতন্ত্র ধারা লক্ষ করা যায়। আদিকাল থেকেই তারা উৎপাদনক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব ধারা অনুসরণ করে আসছে। তাদের ঐতিহ্যগত পেশা হচ্ছে জুমচাষ। বর্তমানে জুমচাষ থেকে বেরিয়ে এসে নানা স্থানে নানাভাবে অর্থ উপার্জন করতে শুরু করেছে। বিশেষ করে শিক্ষার ছোঁয়া পাওয়ায় তাদের অর্থনৈতিক কাঠামোতে পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে।

বাংলাদেশের উপজাতি গোষ্ঠীর অর্থনৈতিক কাঠামো সম্পর্কে আলোচনা কর।

বাংলাদেশের উপজাতি গোষ্ঠী/এথনিক গোষ্ঠীর অর্থনৈতিক কাঠামো:

নিম্নে বাংলাদেশের উপজাতি গোষ্ঠী/এথনিক গোষ্ঠীর অর্থনৈতিক কাঠামো সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-

১. জুমচাষ: উপজাতি সম্প্রদায়ের অনেকেরই অর্থনৈতিক কাঠামো অনেকটা কৃষিনির্ভর, বিশেষ করে তারা পাহাড়ি অঞ্চলে পাহাড়ের গায়ে খনন করে চাষাবাদ করে, ফসল উৎপন্ন করে, যা 'জুমচাষ' নামে পরিচিত। এ চাষের ফলে যে খাদ্যদ্রব্য উৎপন্ন হয় তা দ্বারা তাদের জীবন যাত্রা নির্বাহ করে থাকে। তবে জুমচাষ অনেকাংশে প্রকৃতিনির্ভর। তাই উৎপাদন সর্বদা সাফল্যজনক নাও হতে পারে। যেমন- গারোরা জুমচাষের ওপর বেশি নির্ভরশীল।

২. হাল চাষ: উনিবংশ শতাব্দী থেকেই উপজাতিরা বাঙালিদের থেকে হালচাষ পদ্ধতি শিখেছে। দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী সমতল ভূমিতে ধান, গম প্রভৃতি চাষ করে তাদের জীবিকানির্বাহ করে থাকে। তা ছাড়া সরকারি বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে তারা উদ্যান কৃষি বা Horticulture পদ্ধতিতে বিভিন্ন ধরনের ফল যেমন- কাঁঠাল, আনারস, কলা ইত্যাদি উৎপাদন করছে। তা ছাড়া তারা সাম্প্রতিককালে রবার চাষ, কাঠের গাছ লাগানো ইত্যাদি পেশায় নিয়োজিত হচ্ছে।

৩. পশুপালন ও হস্তশিল্প: উপজাতি সম্প্রদায়ের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে পশুপালন ও হস্তশিল্পের মাধ্যমে বিভিন্ন বস্তু তৈরি। তাঁরা হাঁস-মুরগিসহ বিভিন্ন ধরনের পশু পালন করে অর্থনৈতিক সচ্ছলতা আনয়ন করে থাকে। তাছাড়া নানা ধরনের হস্তশিল্পজাত দ্রব্য যেমন- খড়ি, বাঁশ দিয়ে বিভিন্ন ধরনের শিল্পজাত দ্রব্য তৈরির ক্ষেত্রে তাদের জুড়ি নেই। তাছাড়া চাকমা উপজাতিদের কাপড় বেশ বিখ্যাত।

৪. প্রকৃতিনির্ভর অর্থনৈতিক কাঠামো: আদিবাসী সম্প্রদায় প্রত্যন্ত সনাতন পদ্ধতিতে জীবনযাপনে অভ্যন্ত। তারা প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে সবকিছু সমাধা করতে চায়। তাই তাদের অর্থনৈতিক জীবনধারা প্রকৃতিনির্ভর। তাদের অর্থনৈতিক জীবনের প্রধান দিক হলো শিকার ও খাদ্য সংগ্রহ। শিকার করে এবং বনজঙ্গল থেকে বিভিন্ন ধরনের দ্রব্যসামগ্রী সংগ্রহ করে তাদের জীবিকানির্বাহ করে থাকে। যেমন- খড়ি সংগ্রহ করা, পশু শিকার করা ইত্যাদি। মুরংরা বন থেকে কাঠ কেটে বাজারে বিক্রি করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অবদান রাখে।।

৫. প্রধান জীবিকা শিকার: পশু শিকার হলো আদিবাসী সম্প্রাদায়ের অর্থনৈতিক কাঠামোর প্রধান দিক। তারা বিভিন্ন ধরনের শিকার করে খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। খাদ্য ব্যতীত অন্যান্য বিষয়েও তারা জীবজন্তর অপর নির্ভরশীল। পোশাক-পরিচ্ছদ, শিকারের যন্ত্রসহ যাবতীয় সামন্ত্রীর আগাজেও তারা জীবজন্তুর ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল। পশুর মাংস খাদ্য হিসাবে ব্যবহারের পর চামড়া থেকে (পাশাক এবং শিং ও হাড় নিয়ে হাতিয়ার তৈরি করে।

৬. অস্ত্র তৈরি: অস্ত্র তৈরিতে তারা অভ্যস্ত নিপুণ। বিশেষ কার বন্দুক বা অন্যান্য মারণাস্ত্র একমাত্র তাদেরই প্রথম সৃষ্টি। তীর, সড়কি, বর্শা, ডলোয়ার একমাত্র তাদের তৈরি, যা পরবর্তীতে নতুনভাসে সংস্কার করা হয়েছে। কথিত আছে বাংলাদেশের সুরং উপজাতিরাই প্রথম বন্দুকজাতীয় হাতিয়ার তৈরি করে। এগুলোর মাধ্যমে তারা পশুশিকার করে জীবিকানির্বাহ করে।

৭. খাদ্যসংগ্রহ: মূলত খাদ্যসন্তাহের জন্য আরা প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। গাছ থেকে ছাল ও পাতা সংগ্রহ করে তারা খাদ্য ও বাসস্থানের সরঞ্জাম হিসেবে ব্যবহার করে। তা ছাড়া কাঠ দিয়ে শিকারের হাতিয়ারও তৈরি করা হয়। প্রাচীন ফালে তারা গাছের পাতাকে পরিধেয় বস্তু হিসেবে ব্যবহার করত। বর্তমানে তারা আরও উন্নত পদ্ধতি অবলম্বন করতে শিখেছে। খাদ্য হিসেবে তারা চাষাবাদ পেশাকে বেছে নিয়েছে, যার দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করে থাকে।

৮. দ্রব্যাদি বিনিময়: তারা নিজেরা দ্রব্য প্রস্তুত করতেও স্বনির্ভর জীবনযাপন করতে অভান্ত। তাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সহজ-সরল ও সাধারণ প্রকৃতির। তবে তার দ্রব্য বিনিময় প্রথায় আভ্যস্ত। অর্থাৎ নিজেদের মধ্যে দ্রব্য বিনিময় করে নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করার প্রচেষ্টায় তারা অভ্যন্ত।

৯. পাহাড়ি জীবজন্তুর সাথে প্রতিযোগিতামূলক জীবনযাপন: আদিবাসী সম্প্রদায় পাহাড় ও বনজঙ্গলে তাদের বসবাস গড়ে তুলেছে। তারা নিজেদের স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে পাহাড়ি জনগোষ্ঠী হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিয়ে থাকে। আদিম অবস্থা থেকে নিজেরা বিভিন্ন ধরনের জীবজন্তু ও পশুর সাথে মাড়াই করে নিজেদে অস্তিত্বকে টিকিয়ে রেখেছে। তার জন্য তাদেরকে কঠোর পরিশ্রম ও সাহসী হতে হয়েছে। তারা পশুজগতের সাথে প্রতিযোগিতা করে নিজেদের জীবিকানির্বাহ করে থাকে।

১০. বিভিন্ন দ্রব্য উৎপাদন: উপজাতিরা বিভিন্ন ধরনের দ্রবাদি উৎপাদন করে থাকে। যেমন- মারমারা কাপড়, চুরুট ও নকশা করা শাল তৈরি করে।

১১. বাঁশ ও বেত শিল্প: পাহাড়ি অঞ্চলগুলো বাঁশ ও বেতের জন্য বিখ্যাত। পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে প্রচুর পরিমাণে বাঁশ ও বেত হয়। এগুলো দিয়ে উপজাতিরা বিভিন্ন দ্রব্যাদি তৈরি করে। যেমন- বাঁশের ঝুড়ি, বেত দিয়ে শীতল পাটি, বিভিন্ন বয়সের খেলনা ইত্যাদি, যা বাজারে বিক্রি করে উপজাতিতা অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে বিশেষ অবদান রাখে। 

১২. মৎস্য আহরণ: আদিবাসীরা শাহাড়ি অঅ্যাসের মদীগুলো থেকে মাছ শিকার করে থাকে। তারা তাদের আহরণকৃত মাছ স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে অর্থনৈতিক ভিত্তি সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখে।

১৩. ফলমূল চাষ ও সংগ্রহ: পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে প্রাকৃতিকভাবে অনেক ফলমূল জংলু থাকে। আনক আদিবাসী সম্প্রদায় নিজস্ব উদ্যোগে সে ফলমূল সংগ্রহ করে। আবার কিছু কিছু আদিবাসী সম্প্রদায় নিজস্ব উদ্যোগে পাহাড়ি অঞ্চলে রপ্তানিযোগ্য ফলের চাষ করে। যেমন- কমলা, আনারস, বাতাবিলেবু ইত্যাদি। এর মাধ্যমেও আদিবাসী সম্প্রদায় তাদের অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করছে।

১৪. চা চাষ:  বর্তমান কালের আদিবাসী সম্প্রাদায়ের মধ্যে চায়ের বাগানে কাজ করা ও চা চাষের প্রতি ঝুঁকে যেতে দেখা যায়। যেমন- সিলেট ও চট্টগ্রামের উপজাতিদের মধ্যে চা চাষের প্রতি ঝুঁকতে দেখা যায়। তারা সাধারণ চায়ের পাতা সংগ্রহ করে নিজেদের জীবিকানির্বাহ করতে অভ্যস্ত। বিশেষ করে নারীদের মধ্যে এ প্রবণতা বেশি লক্ষণীয়। তাদের সন্তানদের পিঠে বেঁধে নিয়ে চায়ের পাতা সংগ্রহ করে জীবিকানির্বাহ বর্তমান কালের আদিবাসী নারী সম্প্রদায়।

১৫. কর্মসংস্থান: বর্তমানে উপজাতিরা উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে কোটা সুবিধায় বা যোগ্যতার ভিত্তিতে বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি চাকরিতে নিয়োগ পাচ্ছে। বিভিন্ন এনজিও ও সেবামূলভপ্রতিষ্ঠানে নিজেদের সম্পৃক্ত করছে। কেউ কেউ ব্যবসা-বাণিজ্য করছে। আবার কেউ কেউ বিদেশে পাড়ি দিচ্ছে। এভাবেই উপজাতিদের কর্মসংস্থানের মাধ্যমে তাদের অর্থনৈতিক কাঠামোতে পরিবর্তন সূচিত হচ্ছে। শিক্ষার মাধ্যমে তাদের কুসংস্কারও দূর হচ্ছে।

উপসংহার: উপর্যুক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায় যে, আদিবাসী সম্প্রদায় একটি বিশেষ সংস্কৃতি ও ভাষা নিয়ে বাংলাদেশে বসবাস করে আসছে। তাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রকৃতিনির্ভর ও পশুশিকার হলেও বর্তমানে সভ্যতার ছোঁয়ায় কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। তবে তার। তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠা করতে বদ্ধপরিকর। বাংলাদেশের উপজাতিদের জীবনযাত্রা লক্ষ করলে এটি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।

মানবজাতির প্রধান প্রধান নরগোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্যগুলো তুলে ধর।

মানবজাতির প্রধান প্রধান নরগোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্যগুলো তুলে ধর।


ভূমিকা: নৃগোষ্ঠী বা মানবধারা হচ্ছে নৃবিজ্ঞানের প্রধান আলোচ্য বিষয়। নৃগোষ্ঠীর মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন মানবধায়ার বংশানুসারে গায়ের রং মাখার আকৃতি, চুলের রং ও ধরন, মুখাবয়ব, নাসিকার আকৃতি, দৈহিক উচ্চতা প্রভৃতি জীবনের বিভিন্ন প্রলক্ষণ শনাক্ত করা যায়। নৃগোষ্ঠীর মাধ্যমে বিভিন্ন মানবজাতির মানসিক,, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, সভ্যতাকেন্দ্রিক বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য প্রতিভাত হয়। বিভিন্ন Race সাধারণত বয়ে আনে বিভিন্ন সংস্কৃতি ও স্বতন্ত্র ইতিহাস ধারা।
মানবজাতির প্রধান প্রধান নরগোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্যগুলো তুলে ধর


মানবজাতির প্রধান প্রধান নরগোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্য:

মানবজাতির প্রধান প্রধান নরগোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্যসমূহ নিম্নে আলোচনা করা হলো-

(ক) ককেশীয় বা শ্বেতকায়:

১. এদের আবাসস্থল প্রধানত ইউরোপ, আমেরিকা, উত্তর আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার কিছু অঞ্চলব্যাপী।

২. ককেশীয়ানের অধিকাংশের গায়ের রং সাদা বা কালো লালচে। এদের মুখাকৃতি প্রধানত সরু বা লম্বাকৃতির হয়ে থাকে।

৩. ককেশীয়দের নাক প্রধানত উন্নক, চিকন, লম্বা ও সরু। ককেশীয়দের চোখের রং হালকা থেকে কালো-বাদামি। চোখের মণি নীল, ঠোঁট প্রধানত গাড়লা, কান লম্বায় ও প্রশস্তে মাঝারি ধরনের।

৪ ককেশীয়দের চুলের রং বাদামি বা সোনালি। মাথার চুল সরু ও মোটা উভয় ধরনের হয়ে থাকে। এদের মাথার চুল, মুখের দাঁড়ি ও গায়ের লোমের আধিক্য আছে।

৫. অধিকাংশ ককেশীয় দীর্ঘদেহী। তবে উচ্চতায় অনেকেই মধামা। এদের দেহ বলিষ্ঠ শক্তিশালী। এরা সুন্দর ও উন্নত স্বাস্থ্যের অধিকারী।

(খ) মঙ্গোলীয় নরগোষ্ঠী:

১ মধ্য উত্তর এবং পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ইংন্দানেশিয়ার অধিকাংশ মানুষ এবং উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার ইডিয়ান জনগোষ্ঠী মঙ্গোলীয় নরগোষ্ঠীর আওতাযুক্ত।

২. মঙ্গোলীয়দের গায়ের রং হলুদ বা বাদামি ধরনের। মঙ্গোলীয়দের মুখ ককেশীয়দের তুলনায় চওড়া ও কিছুটা সর্বাকৃতির। মুখটি চওড়া গোলাকৃতি এবং সমতল। মঙ্গোলীয়দের মাখার আকৃতি ককেশীয়দের তুলনায় প্রধানত চওড়া ও গোল।

৩. মঙ্গোলীয়দের নাক ককেশীয়দের নাকের তুলনায় কিছুটা ক্ষুদ্রাকৃতির মোটা এবং অনুন্নত। মঙ্গোলীয়দের চোখের রং কল্যে-বাদামি। তবে তা কালো বর্ণেরও হয়ে থাকে।

৪ এদের মাথায় চুল প্রধানত কালো হয়ে থাকে। এদের চুল দীর্ঘ, খাঁড়া ও মোটা। মুখ ও গায়ের লোমের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম।

৫. এদের দৈহিক গঠন মূলত বলিষ্ঠ পর্যায়ের। এদের উচ্চতা মধ্যম মাদের। অনেকের আনার খর্বাকৃতির।

(গ) নিগ্রো বা কৃষ্ণকায়:

১. নিগ্রোদের আবাসস্থল পশ্চিম আফ্রিকার সাহানা অঞ্চল। বর্তমানে আফ্রিকা মহাদেশে বিশেষ করে সাহারা মরুভূমির দক্ষিণে প্রধান আবাসভূমি।

২. নিগ্রো জনগোষ্ঠীর অধিকাংশের মাথা লম্বাকৃতির। কিছু কিছু নিগ্রোর মাথা অবশ্য চওড়া। নিগ্রোদের মুখ লম্বাকৃতির হলেও ককেশীয়দের মতো অত মোটা বাত সরু নয়। নিগ্রোদের কপাল উল্লম্বী প্রকৃতির। 

৩. নিগ্রো জনগোষ্ঠীর চুল কালো বা কালো-বাদামি। তাদের চুল মোটা, ঘন ও পশমিতুল্য কোঁকড়ানো। নিগ্রোদের প গায়ের রং ঘোর কালো বর্ণের।

৪. নিগ্রোদের নাক চওড়া, মাংসল বেশ অনুন্নত। নিগ্রোদের নাক নিচু, মোটা, প্রশস্ত ও ভোঁতা। চোখের রং কালো-বাদামি থেকে কালো। নিগ্রোদের ঠোঁট মোটা, পুরু ও উলটানো প্রকৃতির। নিগ্রোদের কান তুলনামূলকভাবে ছোট এবং প্রশস্ত।

৫. নিগ্রোদের উচ্চতা নানা ধরনের হয়ে থাকে। লম্বাকৃতির, মধ্যমাকৃতির এবং খর্বাকৃতির নিগ্রো দেখতে পাওয়া যায়। তাদের দেহের গঠন শক্ত, সুঠাম ও বলিষ্ঠ।


(ঘ) অস্ট্রালয়েড:

অস্ট্রালয়েডদের দৈহিক বৈশিষ্ট্য হলো গায়ের রং কালো-বাদামি ও চকলেট রঙের। চুল ঢেউ খেলানো, মাথা লম্বাকৃতির, নাক প্রশস্ত ও মাংসল। ঠোঁট মোটা, চোখের গঠন স্বাভাবিক ও রং কালো। মুখাকৃতি লম্বা, উচ্চতা মাঝারি থেকে লম্বা, শরীরে লোমের প্রাচুর্য আছে। বিশেষ দুটি দৈহিক বৈশিষ্ট্য যা অস্ট্রালয়েডদেরকে অন্যদের থেকে বিশেষভাবে পৃথক করেছে। যথা-

১. তাদের কপাল নিচু।

২. চোখের ভ্রূ ও হাড়দ্বয় উঁচু এবং জাতে লোমের প্রাচুর্য।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, মানুষ মূলত একটি প্রজাতি। এ প্রজাতিকে Homosapiance বলা হয়। মানব প্রজাতি অভিন্ন হলেও বিভিন্ন দৈহিক বৈশিষ্ট্যের বিচারে এরা কিন্তু অভিন্ন নয়। অর্থাৎ, দৈহিক বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে এদের মধ্যে ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। ভিন্নতার বিষয়টি অতি স্বচ্ছ এবং সহজেই অনুমেয়।

গোত্র কী? জাতি ও জাতীয়তার মধ্যে পার্থক্য লিখ

গোত্র কী? জাতি ও জাতীয়তার মধ্যে পার্থক্য লিখ

উত্তর: সমাজবদ্ধ মানুষ পরস্পরের সাথে বিভিন্ন সম্পর্কে আবদ্ধ। নানামুখী ও নানা মাত্রিকতার এসব সম্পর্কের ক্ষেত্রে ব্যাপক বৈচিত্র্য পরিলক্ষিত হয়। এসবের মধ্যে রয়েছে রক্তের সম্পর্ক, বৈবাহিক সম্পর্ক, অর্থনৈতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক, সামাজিক বা সাংস্কৃতিক সম্পর্ক। মানবজাতিকে সংঘবদ্ধ বা ঐক্যবদ্ধ করার ক্ষেত্রে এ সকল সম্পর্ক ক্রিয়াশীল ভূমিকা পালন করে থাকে। উল্লিখিত সম্পর্কগুলোর মধ্যে রক্তের সম্পর্কের একটি বিশেষ রূপ হচ্ছে গোত্র বা কৌম।
গোত্র কী? জাতি ও জাতীয়তার মধ্যে পার্থক্য লিখ


গোত্রের সংজ্ঞা: সাধারণ অর্থে গোত্র হচ্ছে এমন একটি গোষ্ঠী, যারা বিভিন্ন আদিপুরুষের বংশধর হিসেবে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে আবদ্ধ হয়ে বসবাস করে। গোত্রের ভিত্তি হচ্ছে অভিন্ন পূর্বপুরুষ এবং এর একক হচ্ছে পরিবার।

গোত্রের সংজ্ঞায় Carol R. Ember Melvin Ember বলেন, "গোত্র হচ্ছে একদল আত্মীয় যারা বিশ্বাস করে তারা একটা সাধারণ পূর্বপুরুষ থেকে এসেছে, যারা পুরুষ হতে পারে আবার মহিলাও হতে পারে। ক্ল্যানের ক্ষেত্রে মাতৃসূত্রীয় বংশধারাকে গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে।"

গোত্রের সংজ্ঞায় ড. রিভার্স বলেছেন, "গোত্র বা কৌম একপাক্ষিক (Unilateral)। বহির্বিবাহকারী এমন সংস্থা যার সদস্যরা কতগুলো ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ। এ বন্ধনের সাথে এক আদি পূর্বপুরুষ বা এক গোত্র দেবতা বা কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চল বা বাসস্থানের প্রত্যক্ষ যোগসূত্র বা সম্বন্ধ বিদ্যমান বলে এর সদস্যরা মনে করে।"

বি. ভূষণ (B. Bhushan) তাঁর 'Dictionary of Sociology' গ্রন্থে বলেছেন, "গোত্র প্রত্যয়টি একসূত্রীয় জ্ঞাতিগোষ্ঠী বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। যার ভিত্তি মাতৃসূত্রীয় হতে পারে, আবার পিতৃসূত্রীয় হতে পারে। গোত্রের সদস্যরা বিশ্বাস করে যে, তারা সাধারণত পূর্বপুরুষের বংশধর।"

অধ্যাপক Hoebel ও Frost বলেন, "গোত্র একটি এক পার্শ্বিক বৃহত্তর আত্মীয়ের দল যারা পৌরাণিক এক পূর্বপুরুষ থেকে উদ্ভূত বলে মনে করে।"

ওয়েবস্টারের মতে, "অনেক পরিবার নিয়ে গোত্র গড়ে ওএবং পরিবারের কর্তারা মনে করে যে তারা এক পূর্বপুরুস হতে উদ্বূত।

জাতি ও জাতীয়তার মধ্যে পার্থক্য:

আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীগণ জাতি ও জাতীয়তার মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করে বলেছেন, "জাতীয়তা হলো সেই জনসমষ্টি, যারা এক ভাষা ও সাহিত্য, বংশ ও ধর্ম, ইতিহাস ও ঐতিহ্য, আশা ও আকাঙ্ক্ষা এবং ভৌগোলিক ঐক্যসূত্রে আবদ্ধ ও লালিত।" কিন্তু জাতি হলো সেই জাতীয় সমাজ যা রাজনৈতিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ এবং স্বাধীন অথবা স্বাধীনতা লাভে আগ্রহী। গভীরভাবে ঐক্যবদ্ধ জনসমাজ হলো জাতীয় জনসমাজ এবং রাজনৈতিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ ও রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত জাতীয় জনসমাজ হলো জাতি। নিম্নে জাতি ও জাতীয়তার মধ্যে পার্থক্য আলোচনা করা হলো-

১. জাতীয়তা একটি মানসিক ধারণা, যা জনসাধারণের মাঝে ঐক্যবদ্ধতার জন্ম দেয় এবং যা দ্বারা একটি জনসমাজ নিজেকে অন্য জনসমাজ থেকে পৃথক বলে ভাবতে শেখে। আর জাতি হচ্ছে কতিপয় জনসমষ্টি, যারা জাতীয়তার চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে নির্দিষ্ট এলাকায় বসবাস করে এবং স্বাধীন।

২. জাতীয়তা একটি মানসিক ধারণা, যা জনসাধারণের মধ্যে ঐক্যানুভূতি গড়ে তোলে। এতে কোনো রাজনৈতিক সংগঠন নেই। কিন্তু জাতি গঠন কখনো রাজনৈতিক সংগঠন ছাড়া হয় না।

৩. জাতি হচ্ছে একটি সংগঠিত জনসমষ্টি, যারা স্বাধীন ও - সার্বভৌম। কিছু জাতীয়তার ধারণায় উদ্বুদ্ধ জনসমষ্টি সর্বদা স্বাধীন নয় আর স্বাধীনতা ব্যতীত সার্বভৌমত্ব চিন্তা করা যায় না।

৪. রাষ্ট্রচিন্তাবিদরা মনে করেন, Plato, Aristotle এর সময় থেকে জাতি সংগঠিত হতে শুরু করে। কিন্তু জাতীয়তাবাদের ধারণা উৎপত্তি হয় ষোড়শ শতকে এক আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার জনক Machiavelli-এর দর্শন থেকে।

৫. জাতীয়তা গঠনের জন্য কতকগুলো সাধারণ সূত্রের মিল থাকতে হয়। যেমন ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস, ঐতিহ্য ইত্যাদি। কিন্তু জাতি গঠনের জন্য প্রয়োজন হয় জাতীয়তাবোধের।

৬. জাতীয়তা হলো জাতি গঠনের প্রাথমিক উপাদান। জাতীয়তার জন্য মানসিক ধারণাই প্রধান ভূমিকা পালন করে। কিন্তু জাতির পরিধি ব্যাপক। জাতি গঠনের জন্য জনসমাজ, মানসিক ঐক্যানুভূতি ও রাজনৈতিক সংগঠন প্রয়োজন।

৭. জাতীয়তা হলো একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ। আর জাতি হলো জাতীয়তার চূড়ান্ত পর্যায়।

৮. জাতীয়তা খুব বেশি সুসংহত নাও হতে পারে। কিন্তু জাতি সুসংহত হবে এবং স্বাধীন কিংবা স্বাধীনতা সংগ্রামে লিপ্ত থাকবে।

৯. জাতীয়তা হচ্ছে একটি চেতনা আর জাতি একটি সার্বভৌম সংগঠন। অর্থাৎ, জাতীয়তা একটি ক্ষুদ্র ধারণা। পক্ষান্তরে, আতি একটি ব্যাপক ধারণা।

১০. জাতীয়তা হচ্ছে একটি মানসিক ধারণা বিশেষ। আজ জাতি হচ্ছে মানসিক ধারণার রাজনৈতিক সংগঠন, স্বাধীন হওয়ার প্রচেষ্টা ইত্যাদির যোগফল।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বৃহত্তর সমাজের একটি অংশ। মূল জনগোষ্ঠী থেকে এয়া আলানা। এদের রয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য, স্বতন্ত্র দৈহিক গঠন ও সংস্কৃতি। এদের নির্ধারণ করা হয় মূলত সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের আলোকে। পূর্বপুরুষ ও সাংস্কৃতিকভাবেই এরা পরিচিত বেশি। উপরিউক্ত আলোচনায় জাতি ও জাতীয়তার পার্থক্য স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। তবে এদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ মিলও রয়েছে। কেননা উভয়েই একে অপরের ওপর নির্ভরশীল।