খাসিয়াদের বর্তমান আর্থসামাজিক জীবনধারা আলোচনা কর।
ভূমিকা: আমাদের দেশে বসবাসরত উপজাতি-গোষ্ঠীয় মধ্যে 'খাসিয়া' অন্যতম একটি উপজাতি। সিলেটের সীমান্তবর্তী অঞ্চল খাসিয়া জৈন্তিয়া পাহাড়, তামাবিল ও সুনামগঞ্জ জেলায় খাসিয়ারা বাস করে। ঐতিহাসিকদের মতে, খাসিয়ারা সিলোট এসে বসতি স্থাপস করে প্রায় পাঁচশো বছর আগে। ড. গ্রিয়ারসন উল্লেখ করেন, খাসিয়ারা চীনের হোয়াংহো ও ইয়াংসি নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলে বাস করত। গত্রে উক্ত নদীপথে এরা ভারতীয় উপমহাদেশে আসে। নৃবিজ্ঞানী এইচ রবার্টস-এর মতে, আসলে ব্রাহ্মদেশে বাস করত। পরবর্তীকালে এরা আসামে আসে।
খাসিয়া সমাজের আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনধারা:
নিম্নে খাসিয়া উপজাতিদের আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনধারা আলোচনা করা হলো-
১. নামকরণ:
গারো পাহাড়ের অধিবাসীরা যেমন গারো, লুসাই পার্বত্য অঞ্চলের অধিবাসীয়া যেমন লুসাই নামে পরিচিত, তেমনি খাসিয়া পার্বত্য অঞ্চলের আদিম সমাজভুক্ত লোকও খাসিয়া নামে পরিচিত। তবে খাসিয়া নামকরণ সম্পর্কে কোনো সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় না এবং এদের নামকরণ নিয়ে যথেষ্ট মতভেদ রয়েছে। অনেকে মনে করেন, এদের আদিবাস আসামের আসিয়া 'জয়ন্তিয়া' পাহাড়ে হওয়ার কারণে তাদের খাসিয়া বলা হয়।
২. আবাসস্থল:
খাসিয়াদের আদি রাসস্থান ভারতের আসাম প্রদেশের খাসিয়া জৈন্তিয়া পার্বত্য অঞ্চলে। তবে বাংলাদেশে খাসিয়ারা সিলেটের তামাবিল, জৈয়ন্তাপুর, জাফলং, সুনামগঞ্জ, মহকুমার খাসিয়া, জৈন্তিয়া পাহাড়ের সীমান্তবর্তী অঞ্চল এবং বৃহত্তর টাঙ্গাইল জেলায় বসবাস করতে দেখা যায়।
৩. নরগোষ্ঠীগত পরিচয়:
খাসিয়ায়া প্রোটো মঙ্গোলয়েড নরগোষ্ঠীর অন্তর্গত। এদের মুখমণ্ডল ফর্সাকৃতির নাক চ্যাপ্টা, উচ্চতা মধ্যমাকৃতির, চোখ ছোট, মুখাকৃতি গোলাকার, দাড়ি-গোঁফের প্রাচুর্য কম এবং পায়ের গোঁড়ালি সরু।
৪. জনসংখ্যা:
২০০১ সালের আদমশুমারির তথ্য অনুযায়ী এদেশে খাসিয়া উপজাতির সংখ্যা প্রায় ১০০০০ এর মতো এর মধ্যে সিলেটে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক খাসিয়া বসবাস করে। বর্তমানে খাসিয়াদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ।
৫. গোত্র-বিভাগ:
খাসিয়াদের মধ্যেও গোত্র বিভাগ রয়েছে। এরা প্রধানত ছয়টি গোত্রে বিভক্ত। গোত্রগুলো হাচ্ছে-মিনতেং, পনার, রিনগ্যাম, ভুইবার, লাংগুই। গোত্রগুলো একই নারী বংশধর দিয়ে গঠিত। বড় বড় গোত্র আবার একাধিক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গোত্রে বিভক্ত। এসব গোত্রের প্রত্যেকটি মানুষই একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা-সহনশীল ও সহানুভূতিশীলতার মনোভাব পোষণ করে।
৬. ভাষা:
খাসিয়াদের ব্যবহৃত ভাষার সাথে মালাক্কা, নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের অধিবাসীদের ভাষার মিল আছে।
৭. পরিবার ও বিবাহব্যবস্থা:
খাসিয়াসের পরিবার প্রধানত মাতৃতান্ত্রিক। সন্তানদের পরিচয়, সম্পতির উত্তরাধিকার ও মালিকানা সবকিছুই মাতৃসূত্রীয়ভাবে বর্তায়। খাসিয়া সমাজে নারীরাই পরিবারের প্রধান এবং পরিবারের কর্তৃত্ব তাদের উপর থাকে। খাসিয়া সমাজে বিয়ের পর স্বামীকে স্ত্রীর মায়ের বাড়িতে বসবাস করতে হয়। এখানে স্বগোত্র এবং একসাথে দু্ইবোনকে বিবাহ করা নিষিদ্ধ।
৮. অর্থনীতি:
খাসিয়ারা কৃষিকর্মের উপর নির্ভরশীল। তবে জুম চাষও এদের মধ্যে দেখা যায়। এদের কৃষিকাজে ব্যবহার যন্ত্রের মধ্যে লাঙ্গল, কোদাল এবং দা প্রধান। কৃষিকর্ম ছাড়াও এরা ব্যবসায় বাণিজ্য, দিনমজুর ও কুলির কাজও করে থাকে।
৯. ধর্ম:
অদৃশ্য শক্তির উদ্দেশ্য পূজাপার্বণ এবং উৎসর্গই খাসিয়া ধর্মের মূলনীতি। এরা বিশ্বাস করে যে, বিশ্বব্রক্ষান্ড সৃষ্টির অন্তরালে সর্বশক্তিমান সৃষ্টিকর্তা আর প্রকৃতির অন্তরালে দেবতা কিংবা অপদেবতার অস্তিত্ব বিরাজমান। খাসিয়ারা পূর্ব পুরুষ পূজা ও প্রস্তর পুজা করে থাকে। এছাড়া খাসিয়ারা পুনর্জন্মের বিশ্বাসী।
১০. পূজাপার্বণ ও নৃত্য:
খাসিয়া সমাজে পূজাপার্বণের সংখ্য অগণিত। এদের প্রত্যেক পুজায় ছাগল ও মোরগ উৎসর্গ করা হয়। মুরগি ও মোরগ খাসিয়া সমাজে খুবই পবিত্র বলে বিবেচিত হয়। পূজায় মোরগ উৎসর্গের মাধ্যমে দেবতা সে পূজা গ্রহণ করলো কিনা তার পরীক্ষা করার একটি বিশেষ বাবস্থা বা নিয়ম তাদের মধ্যে রয়েছে। এছাড়া নৃত্যগীত তাদের পূজা পার্বন বিয়ের অনুষ্ঠান, শবদাহ ইত্যাদি প্রত্যেকটি ব্যাপারেই গুরুত্ব বহন করে।
১১. খাদ্যদ্রব্য:
তাদের প্রধান খাদ্য ভাত ও মদ। মদকে তারা কা-ইয়াদা, পুদকা বলে।তারা নিজেরাই ভাত, মহুয়া নির্যাস থেকে মদ তৈরি করে। মদ ছাড়া কোনে অনুষ্ঠাই সম্পন্ন হয় না। মাংস তাদের খুব প্রিয় খাদ্য। তবে কুকুরের মাংস তারা ভক্ষন করে না। খাসিয়াদের নিকট পান, সুপারি খুবই পবিত্র বস্তু।
১২. পোশাক-পরিচ্ছদ:
তাদের পোশাক পরিচ্ছেদ খুবই সাধারণ। মেয়েরা নিজেদের তৈরি এক প্রকার ব্লাউজ ব্যবহার করে থাকে যাকে কাজিম পিন বলা হয়। তাছাড়াও ‘কাজৈন সেন’ নায়ক সিল্কের তৈরি লুঙ্গির মতো একপ্রকার কাপড় পরে। এছাড়াও মেয়েরা এক ধরনের কাপড়ের বেল্ট পরিধান করে।
১৩. শিল্পকলা:
শিল্পকলার ক্ষেত্রে খাসিয়াদের একটি বিশেষ ঐতিহ্য রয়েছে। খাসিয়ারা বাঁশের সাহায্যে কি কনুপ (মাথাল) কি কোহ (ঝুড়ি), কা শানাম' (বাক্সস) এবং কি ‘সিন্নার' (কাঁথা) তৈরি করে থাকে।
১৫. পেশা:
খাসিয়ারা মূলত কৃষিজীবী। তবে কিছু কিছু খাসিয়াকে ব্যবসায় বাণিজ্য করতেও দেখা যায়। তারা পান চাষ করে ও বিক্রি করে। খাসিয়ারা জঙ্গল থেকে মধু সংগ্রহ করে তা বাজারে বিক্রি করে। অনেকে বাড়িতে মৌমাছি পালন করে।। এদের ঘরের বারান্দায় ও ঘরের মধ্যে মৌমাছি চাক বানায়।
১৫. আন্তাষ্টিক্রিয়া:
খাসিয়াদের মধ্যে কেউ মারা গেলে পুড়িয়ে ফেলা হয়। মৃত স্বাক্তিকে স্নান করিয়ে নানান আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে মৃতদেহকে পোড়ানো হয়। মৃতদেহ পোড়ানোর পর মৃতব্যক্তির ছাই ও হাড় কুড়ানোর রীতি খাসিয়াদের মধ্যে বর্তমান। যেমন- স্বামীর মৃত্যু হলে খাসিয়া রমণীরা হাড় কুড়িয়ে মালা বানিয়ে গলায় পরিবান করে। এ মালা পরিধানের পর সেই রমণী আর অবৈধ কাজে লিপ্ত হতে পারে না এবং সর্বদা স্বামীর চিন্তায় ব্যস্ত থাকে।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে খাসিয়াদের জীবনপ্রণালি ও পারিবারিক কাঠামো ব্যাপক বৈচিত্র্যময়। মাতৃপ্রধান পরিবার হওয়ায় সমাজে নারীদের প্রভাব বেশি। তাছাড়া পারিবারিক কাঠামোতে সমাজের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।

No comments:
Post a Comment