বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে ভূমি অধিগ্রহণ বিষয়ক বাস্তবতা আলোচনা
ভূমিকা: উন্নয়নশীল দেশগুলোতে উন্নয়ন প্রেক্ষিতে ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়। তবে বাংলাদেশে উন্নয়নের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ করা হলেও অনুন্নয়নও পাশাপাশি তৈরি হয়। অবশ্য এ বিষয়ে কারও তেমন ত্রুক্ষেপ থাকে না। তবে বাংলাদেশে এক্ষেত্রে বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই।
ভূমি অধিগ্রহণ:
সাধারণত কোনো সরকারি বা বেসরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার জন্য যে ভূমির প্রয়োজন হয়। তার সঠিক সংকুলানের নিমিত্তে এক সময়ে ভূমিতে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীকে তাদের বসতবাড়ি হতে উচ্ছেদ করে সেখানে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। যেই স্থান হতে মানুষকে বিতাড়ন করা হয় সেই ভূমি আগে থেকে রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি হতে পারে বা অন্য সাধারণ জনগণের সম্পত্তি হতে পারে। এই সমগ্র প্রক্রিয়াকে ভূমি অধিগ্রহণ বলা হয়ে থাকে।
মূলত ভূমি অধিগ্রহণের জন্য এ ভূমিতে বসবাসকারী জনগণকে তিনভাবে সরাসরি আক্রান্ত করা হয়। যথা-
- ১. তাদের আবাসন বিনষ্ট করার মাধ্যমে
২. তারা ভূমিনির্ভর উৎপাদক সম্প্রদায় বা কৃষিজীবী হলে তাদের কৃষি ভূমি কেড়ে নেওয়ার মাধ্যমে।
৩. অধিকৃত ভূমিকে অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করার মাধ্যমে
বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে ভূমি অধিগ্রহণ বিষয়ক বাস্তবতা
বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে এর নেতিবাচক প্রভাব বেশি। তবুও উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য এর বাস্তবতা অনস্বীকার্য। এ সম্পর্কে নিচে আলোচনা করা হলো-
১. কাপ্তাই প্রকল্প:
বিদ্যুৎ উৎপাদনের বাঁধ নির্মাণের জন্য বাংলাদেশে সর্ববৃহৎ ভূমি, অধিগ্রহণ হয় ১৯৬২ সালে। কাপ্তাই অঞ্চলের উন্নয়ন প্রকল্প দ্বারা উদ্ভূত জলাশয় কাপ্তাই লেক পৃথিবীর সর্ববৃহৎ মানবসৃষ্ট হ্রদ। তখন ঐ অঞ্চলের বহু জনগোষ্ঠীকে বিতরণ করা হয়েছে। ফলে ঐ অঞ্চলের ব্যাপক প্রতিবেশগত পরিবর্তন ঘটেছে, যা মানুষের সমগ্র জীবনযাপন প্রক্রিয়া বদলে নিয়েছে।
২. কৃষি উন্নয়নে ভূমি অধিগ্রহণ:
বাংলাদেশে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধরনের কৃষিভিত্তিক উন্নয়নের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। যেমন- রাবার চাষ, তামাক যায় ইত্যাদি। এক্ষেত্রে কৃষিভূমি অধিগ্রহগের ফলে কৃষিভূমির অনুপাত কমে যায়। বৃহৎ জনগোষ্ঠীর উৎপাদিত খাদ্যশস্যে ঘাটতি পড়ে।
৩. জোরপূর্বক স্থানান্তর:
এদেশের বড় বড় স্থাপনা যেমন বিমানবন্দর তৈরি, নদীবন্দর তৈরি ইত্যাদির জন্য ভূমি অধিগ্রহণ ঘটছে। এক্ষেত্রে রাজনৈতিকভাবে প্রচুর মানুষ বিভিন্ন সময়ে ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় জোরপূর্বক স্থানান্তরে বাধ্য হয়। ফলে দেশে অভ্যন্তরীণ স্থানান্তর বৃদ্ধি পায়।
৪. দারিদ্র্যকরণ সৃষ্টি:
অধীগ্রহণ প্রক্রিয়ায় জনগোষ্ঠীর জীবনে বিভিন্ন সময়ে ব্যাপক দারিদ্র্যকরণ ঘটেছে। ফলে পরবর্তীতে তাদের জীবনে পুষ্টিহীনতা, চিকিৎসাহীনতা এবং অন্যান্য সমস্যা দেখা দিয়েছে। এ সময় ক্ষতিগ্রস্থদের প্রকৃত অর্থমূল্য দেওয়া হয় না।
৫. বনাঞ্চল তৈরি:
বিভিন্ন ধরনের সংরক্ষিত বনাঞ্চল তৈরির জন্য ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। যেমন- টাঙ্গাইলের মধুপুরের শালবন তৈরির জন্য বিশাল আকারের তুমি অধিগ্রহণ
৬. জনগোষ্ঠীর প্রান্তিকীকরণ:
ভূমি অধিগ্রহণের ফলে সব সম্পদ, পুঁজি এবং জীবিকা নির্বাহের অবলম্বন হারিয়ে ফেলার মাধ্যমে নতুনভাবে অর্থনৈতিক প্রান্তিকীকরণ সৃষ্টি হয়। এতে দেশে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়তে থাকে।
৭. সরকার ও জনগণের দূরত্ব বৃদ্ধি:
রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ উন্নয়নের স্বার্থে যখন জনগণকে বিতাড়ন করে ভূমি অধিগ্রহণ করতে থাকে তখন তাদের প্রতি জনগণ আস্থা হারিয়ে ফেলে। ফলে রাজনৈতিক সরকার ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব বেড়ে যায়।
৮. অসামাজিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি:
উৎপাটিত জনগণের জীবনে কর্মহীনতা এবং শ্রমের অবমূল্যায়ন ঘটে। ফলে তারা বিভিন্ন ধরনের অসামাজিক কর্মকান্ড যেমন চুরি, ডাকাতি, ছিনতাইয়ে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।
৯. সড়ক স্থাপন:
বাংলাদেশে সড়ক নির্মাণ এবং সড়ক প্রশস্তকরণের জন্য বিভিন্ন সময়ে ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। যেমন- পদ্মা সেতু নির্মাণের সময় আশেপাশের এলাকার অনেক ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। এ সময় জনদুর্ভোগ অনেক বেশি হারে দেখা যায়।
১০. শিল্প স্থাপন:
বাংলাদেশে EPZ সমুহ নির্মাণের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। এতে বহু মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। বর্তমানেও বৃহৎ প্রকল্পের আওতাধীন অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা হচ্ছে। সরকার ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে। এসব কাজ চলমান হয়েছে। এতে ভূমি অধিগ্রহাণ জনগোষ্ঠীর ব্যাপক অংশ ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।
১৯. ইকোপার্ক তৈরি:
বাংলাদেশে গাজীপুরসহ অন্যান্য ভূমন্ডলে ইকোপার্ক তৈরির জন্য প্রচুর ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। এসব ভূমিতে বসবাসরত উন্নয়নতাড়িত গোষ্ঠী স্থান্তরিত হয়ে শহরমুখী হয় ফলে শহরে বস্তি সমস্যার সৃষ্টি হযেছে। ভূমি অধিগ্রহণ প্রকৃতপক্ষে তাদেরকে অর্থনৈতিকভাবে অসমর্থ করে তুলছে।
১২. পরিবেশ শরণার্থীকরণ:
বাংলাদেশে ভূমি অধিগ্রহণ ভূমিতে বসবাসরত জনগোষ্ঠীকে পরিবেশ শরণার্থীতে পরিণত করে থাকে। ফলে স্থানান্তরে বাধ্য জনগোষ্ঠীর শিশুমৃত্যু, মাতৃমৃত্যু, অপুষ্টি এবং স্বাস্থ্যহীনতা বেড়ে যায়, বেকারত্ব বেড়ে যায়, পেশায় পরিবর্তন ঘটে থাকে।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, বাংলাদেশে ভূমি অধিগ্রহণের বাস্তবতা অনেকটাই অনুন্নয়নের সমর্থক। তবুও উন্নয়নের প্রেক্ষিতে এ কার্যক্রম থাকবেই। তারা এ সুযোগ না উপভোগ করতে পারলেও না পরবর্তী প্রজন্ম এর সুফল ভোগ করে থাকে। তবে এর ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় দিকই রয়েছে। তাই জনগণের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে দ্রুত উন্নয়ন কাজ সমাধান করা উচিত।

No comments:
Post a Comment