প্রান্তিকীকরণ কি? উন্নয়ন প্রকল্প কীভাবে প্রান্তিকীকরণ ঘটায়

প্রান্তিকীকরণের সংজ্ঞা এবং উন্নয়ন প্রকল্পে প্রান্তিকীকরণ

ভূমিকা: মানবসমাজে সব মানুষ সমান সুযোগ ও সুবিধা ভোগ করতে পারে না। সমাজের একটি অংশ সবসময়ই নানা কারণে পিছিয়ে পড়ে অর্থনৈতিক দারিদ্র্য, শিক্ষার অভাব, সামাজিক বৈষম্য, জাতি, লিঙ্গ, ধর্ম বা রাজনৈতিক বঞ্চনার কারণে। এদেরকে মূলধারার সমাজ থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরিয়ে দেয় সমাজের কাঠামো ও ক্ষমতার সম্পর্ক। এই অবস্থার নামই প্রান্তিকীকরণ।

প্রান্তিকীকরণ কি? উন্নয়ন প্রকল্প কীভাবে প্রান্তিকীকরণ ঘটায়


প্রান্তিকীকরণের সংজ্ঞা:

‘প্রান্তিকীকরণ’ বলতে বোঝায় সমাজের একটি নির্দিষ্ট শ্রেণি বা গোষ্ঠীর মানুষকে ধীরে ধীরে সমাজের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া বা তাদেরকে সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত রাখার প্রক্রিয়া। অর্থাৎ, যখন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সমাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সম্পদ বণ্টন বা উন্নয়নের ধারায় অংশ নিতে পারে না, তখনই তারা প্রান্তিক হয়ে পড়ে। এই প্রক্রিয়ায় সমাজের প্রভাবশালী শ্রেণি নিজেদের ক্ষমতা বজায় রাখে এবং দুর্বল শ্রেণি ক্রমাগতভাবে অবহেলিত হতে থাকে। প্রান্তিকীকরণ সমাজে বৈষম্য ও অন্যায়ের জন্ম দেয়, যা সামাজিক ঐক্য ও সমতার পথে বড় বাধা সৃষ্টি করে

উন্নয়ন প্রকল্প যেভাবে প্রান্তিকীকরণ ঘটায়

উন্নয়ন প্রকল্প প্রান্তিকীকরণ ঘটার বিভিন্ন উপায়গুলো  নিম্নে আলোচনা করা হলো-

১. জোরপূর্বক স্থানান্তকরণের মাধ্যমে প্রান্তিকীকরণ:

উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় যখন ব্যাপকভাবে ভূখণ্ড অধিগ্রহণ করা হয়, তখন জনগোষ্ঠীকে তাদের পুরাতন আবাস থেকে উচ্ছেদ করে জোরপূর্বক স্থানান্তরিত করা হয়। এ স্থানান্তরিত গোষ্ঠী দেশের অভ্যন্তরে নতুন স্থানে যেতে পারে অথবা কখনো সীমান্তবর্তী অঞ্চলে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।

২. ভৌগোলিক প্রান্তিকীকরণ:

উন্নয়ন তাড়নায় বিতাড়িত জনগোষ্ঠী অন্যত্র গিয়ে আবাস স্থাপন করলে অনেক সময় তাদেরকে দেশের মূল ভূখণ্ডে থাকতে দেওয়া হয় না। ফলে তারা সংঘবদ্ধভাবে কোনো প্রান্তিক বা সীমান্তবর্তী স্থানে বসবাস শুরু করে। কিন্তু ঘনবসতিপূর্ণ উন্নয়নশীল নগরগুলোতে এই ভূমি সংকুলান সম্ভব হয় না, যা তাদের প্রান্তিক অবস্থাকে আরও জটিল করে তোলে।

৩. সংখ্যালঘুকরণের মাধ্যমে প্রান্তিকীকরণ:

বিতাড়নের আগে জনগোষ্ঠী নিজেদের এলাকায় সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকলেও উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে স্থানান্তরিত হওয়ার পর নতুন স্থানে তারা সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়। এমনকি ধর্ম, জাতি বা ভাষায় মিল থাকলেও নতুন পরিবেশে তারা সংখ্যালঘু অবস্থায় বাধ্য হয়।

৪. সংস্কৃতি বিচ্ছিন্নকরণ:

উন্নয়ন প্রকল্পায়নের আগে নিজেদের ভূমি ও সংস্কৃতির সঙ্গে জনগোষ্ঠীর একটি নিবিড় সম্পর্ক থাকে। জোরপূর্বক বিতাড়নের ফলে সেই সম্পর্ক ছিন্ন হয় এবং তারা সাংস্কৃতিক শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ফলে নিজেদের সাংস্কৃতিক পরিচয় হারিয়ে ‘সংস্কৃতিবিহীন’ জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়, যা তাদের মধ্যে গভীর প্রান্তিক মানসিকতা সৃষ্টি করে।

৫. প্রজন্ম হতে প্রজন্মে দুষ্টচক্রের প্রান্তিকতা:

ক্যারোলিন কেগান (২০০৩) বলেন, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড দ্বারা বিতাড়িত জনগোষ্ঠী নতুন সংস্কৃতিতে সঠিকভাবে আত্তীকৃত হতে পারে না। এই প্রান্তিক মানসিকতা তারা তাদের পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যেও ছড়িয়ে দেয়। ফলে নতুন প্রজন্মও আত্মীকরণের প্রতি অনীহা প্রকাশ করে এবং এই প্রান্তিক চেতনা প্রজন্মান্তরে আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

৬. অর্থনৈতিক অবস্থার অবনয়নের মাধ্যমে প্রান্তিকীকরণ:

উচ্ছেদ ও স্থানান্তরের ফলে জনগণ তাদের পূর্ববর্তী অর্থনৈতিক ভিত্তি, পেশা ও সম্পদ হারায়। তারা হঠাৎ করেই বেকারত্ব ও দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে যায়। ফলস্বরূপ, নিম্নমানের পেশায় নিযুক্ত হয়ে অর্থনৈতিক প্রান্তিকতায় নিমজ্জিত হয়।

৭. পারিবারিক ও জাতিগত বিচ্ছিন্নতার মাধ্যম:

অ্যানথনি অলিভার স্মিথ (২০০১) দেখিয়েছেন যে, উন্নয়ন প্রকল্প দ্বারা বিতাড়ন পাশ্চাত্য ও অপাশ্চাত্য সমাজে ভিন্নভাবে প্রভাব ফেলে। পাশ্চাত্যে এটি ব্যক্তিক পর্যায়ে ঘটে, কিন্তু অপাশ্চাত্যে পরিবারভিত্তিক সমাজে এটি গোটা জ্ঞাতি কাঠামোকে ভেঙে দেয়। ফলে ঐতিহ্যবাহী পারিবারিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধন বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

৮. রাজনৈতিক প্রক্রিয়া বিনষ্টকরণ:

উন্নয়ন তাড়নে বিতাড়িত জনগোষ্ঠী তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচিতি হারিয়ে ফেলে। নতুন স্থানে টিকে থাকার সংগ্রামে তারা রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। অতীতের রাজনৈতিক সম্পর্ক ও পরিচিতি হারিয়ে ‘ডায়াস্পোরা’ অবস্থায় উপনীত হয়, যা তাদের প্রান্তিক রাজনৈতিক চেতনাকে আরও গভীর করে।

৯. ভাষাগত প্রান্তিকীকরণ:

অনেক সময় বিতাড়িত জনগোষ্ঠীর ভাষা নতুন স্থানের ভাষার সঙ্গে মেলে না। ফলে ভাষাগত প্রতিবন্ধকতার কারণে তাদের যোগাযোগ ব্যাহত হয় এবং তারা সমাজে সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়। এভাবেই ভাষাভিত্তিক প্রান্তিকীকরণও সৃষ্টি হয়।

উপসংহার: পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, উন্নয়ন প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য সমাজের সামগ্রিক উন্নয়ন হলেও বাস্তবে অনেক সময় তা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বঞ্চনা, উচ্ছেদ ও বিচ্ছিন্নতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও সামাজিক ন্যায্যতা নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে উন্নয়ন প্রকল্প নতুন প্রান্তিকীকরণ না ঘটিয়ে প্রকৃত অর্থে সবার কল্যাণ বয়ে আনে।

No comments:

Post a Comment