রাখাইন এথনিক গোষ্ঠীর আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনধারা আলোচনা কর

বাংলাদেশের সমতলে বসবাসরত রাখাইনদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনধারা

ভূমিকা: রাখাইন বাংলাদেশের একটি সমতলে বসবাসরত নৃগোষ্ঠী। 'রাখাইন' শব্দটি ব্যুৎপত্তিগতভাবে আরাকান থেকে এসেছে। তারা নিজেদেরকে বার্মার আরাকান রাজ্যর পূর্বসূতি হিসেবে মনে করে থাকে। এভাবেই রাখাইনদের স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে ওঠেছে।

রাখাইন এথনিক গোষ্ঠীর আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনধারা

বাংলাদেশের সমতলে বসবাসরত রাখাইন নৃগোষ্ঠীর জীবনধারা

এরা উপকূল ও সমতলে বসবাস করে। এদের সম্পর্কে নিচে আলোচনা করা হালা।

১. উৎপত্তির ইতিহাস:

রাখাইনরা দুই শতাধিক বছর আগে আরাকান থেকে এদেশে এসে বসতি স্থাপন করেছিল। রাখাইনরা নিজেরাও তাই মনে করেন। তবে এক্ষেত্রে এটাও লক্ষ রাখা দরকার যে, চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিভিন্ন সময়ে আরাকানি শাসন যা প্রতাব ছিল। প্রাপ্ত ঐতিহাসিক তথ্য অনুসারে, পটুয়াখালী অঞ্চলে রাখাইন বসতি গড়ে উঠেছিল অষ্টাদশ শতকের শেষার্থে। তাবে সংশ্লিষ্টদের অনেকে চট্টগ্রাম ও রামু অঞ্চল থেকে পটুয়াখালী অঞ্চলে এসেছিল। অন্যদিকে ১৭৮৪ সালে ১৫০ পরিবার নিয়ে গঠিত রাখাইনদের একটি বড়সড় দল ৫০টি নৌযানে বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে সরাসরি আরাকান থেকে বর্তমান গলাচিপা থানার অন্তর্গত রাঙাবালি দ্বীপে এসে বসতি গড়েছিল, এমন বিবরণও পাওয়া যায়।

২. জনসংখ্যা ও অবস্থান:

রাখাইনরা বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম, কক্সাবাজর, পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলায় বসবাস করে। ১৯৯১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, বাংলাদেশে বসবাসকারী মোট রাখাইনের সংখ্যা ১৬,৮৩২ জন। তন্মধ্যে ৩,৪১৫ জন বাস করে পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলায়। বাকি ১৩,৫১৭ জন বাস করে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায়। তবে কক্সবাজার জেলার সমুদ্রসৈকত এলাকায় বেশিরভাগ রাখাইন সম্প্রদায় বসবাস করে।

৩. নরগোষ্ঠীগত পরিচয়:

পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যান্য উপজাতি যেমন। চাকমা, মারমা, ত্রিপুয়াদের সাথে রাখাইনদের শারীরিক বৈশিষ্ট্যের মিল রয়েছে। তাই বলা যায়, রাখাইনরাও মঙ্গোলয়েড জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত।

৪. ভাষা:

বাংলাদেশের রাখাইনদের মাতৃভাষা ও মারমাদের ভাষা, যা মঙ্গোলীয় স্রোতধারার ভাষা কোট ব্রহ্ম। এ ভাষা ইন্দো আর্য বা দ্রাবিড়ীয় আর্যভাষা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। যে কারণে বাংলা, সংস্কৃত, হিন্দি ও দক্ষিণ ভারতের ভাষার সাথে এ ভাষার খুব একটা মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। অপরদিকে এদেশে আগত মঙ্গোলীয় নরগোষ্ঠীর লোকদের ভোট ব্রহ্ম ভাষার প্রভাব পড়েছে খুব কম।

৫. ধর্ম:

বাংলাদেশের রাখাইনরা শতকরা একুশ ভাগই বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। বৌদ্ধধর্মের প্রাচীন দু'ধারার যথা- 'মহাযান ও হীনযান এদের মধ্যে এরা 'হীনযান' এর তথা পালি ট্রিপটকে বর্ণিত বৌদ্ধমাতের অনুসারী। প্রতিটি রাখাইন পাড়ায় বৌদ্ধ মন্দির ও বৌদ্ধ মঠ রয়েছে।

৬. আচার-অনুষ্ঠান:

রাখাইনরা নানা ধরনের আচার-অনুষ্ঠান পালন করে থাকে। তাদের প্রধান উৎসবগুলোর মধ্যে রয়েছে গৌতমবুদ্ধের জন্মবার্ষিকী, বৈশাখী পূর্ণিমা, মাঘী পূর্ণিমা, বসন্ত উৎসব ও নবান্ন উৎসব। চৈত্র সংক্রান্তিতে রাখাইনরা সান্দ্রে উৎসব পালন করে। সান্দ্রে উৎসব তিনদিন ধরে চলে। এ সময় তারা নাচ, গান, আনন্দ উৎসবে মেতে উঠে এবং একে অন্যের উদ্দেশ্যে পানি ছিটায়। এটি তাদের সবচেয়ে বড় উৎসব।

৭. পারিবারিক জীবন:

রাখাইনদের পারিবারিক কাঠামো হলো পিতৃতান্ত্রিক। পুরুষরা পরিবারের দায়িত্ব পালন করলেও মেয়েরা অবহেলিত নয়। মেয়ে ও পুরুষের অধিকার সমান। ছেলে ও মেয়ে উভয়েই সম্পত্তির অধিকারী হয়।

৮. বিবাহব্যবস্থা:

রাখাইনদের মাঝে কুলগত অর্থাৎ চাচাতো, ফুপাতো ও খালাতো ভাইবোনের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক নিষিদ্ধ। তবে মামাতো ভাইবোনদের মধ্যে বিয়ে হতে পারে। এ বিয়েতে অবশ্য ধর্মীয় ও আইনগত কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তবে অভিভাবকদের পছন্দেই বেশিরভাগ বিবাহ হয়ে থাকে। সংখ্যালযুতার কারণে রাখাইনরা মিয়ানমার ও ভারতের একই সম্প্রদায়ের লোকদের সাথেও বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছে।

৮. পোশাক-পরিচ্ছদ

পোশাক-পরিচ্ছদে দেখা যায় রাখাইন পুরুষরা লুঙ্গি ও ফতুয়া পড়ে। সাধারণত ফতুয়ার উপরে লুঙিআগ পরিধান করে এরা।মেয়েরাও লুঙ্গি পরিধান করে। মেয়েদের লুঙ্গিতে বিভিন্ন নকশা আঁকা থাকে। লুঙ্গির উপর মেয়েরা ব্লাউজ পরে। এছাড়া ও মেয়েরা হাতে, কানে, গলায়, নাকে, কোমরে ও পায়ে সুক্ষ কারুকাজ খচিত বর্ণাঢ্য নকশার সোনা-রূপার অলংকার পরা ও চুলে বিভিন্ন ধাচের বেনি ও খোঁপা বাঁধা ও খোঁপায় তাজা ফুল গোজা খুব পছন্দ করে। রাখাইন মেয়েরা সাজগোজ করে নিজেকে আকর্ষণীয় করে তুলতে খুবই পছন্দ করে।

১০. অর্থনীতি:

রাখাইনরা মূলজ কৃষিনির্ভর। তারা নানা ধরনের ফসল ফলায়। কক্সবাজার ও পটুয়াখালী সমুদ্র উপকূলের বসবাসকারী রাখাইনরা বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায় বাণিজ্য করে জীবিকা নির্বাহ করে। কেউ কেউ মৎস্য শিক্ষার ও অন্যান্য অকৃষিজ পেশায় নিয়োজিত। পাহাড়িয়া অঞ্চলে বসবাসয়ত রাখাইনরা জুমচাষ, পশুপালন, কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। শিক্ষাদীক্ষায় অনগ্রসরতার কারনে রাখাইনরা চাকরি ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে।

১১. শিক্ষা:

রাখাইন শিশুদের প্রথম শিক্ষা শুরু হয় বৌদ্ধ মন্দিরের পাঠশালায়। এই পাঠশালা 'কিয়ং' নামে অভিহিত। মূলত রাখাইনদের ভাষা শিক্ষা ও বৌদ্ধধর্মের নানা শাস্ত্রীয় শিষ্টাচার বৌদ্ধ মন্দিরের এ পাঠশালাগুলোতে শেখানো হয়। এরপর তারা স্থানীয় স্কুলে লেখাপড়া করে। রাখাইন সমাজে প্রায় সকল নারী-পুরুষ রাখাইন ভাষায় স্বাক্ষর জ্ঞানসম্পন্ন হয়। কক্সবাজার সমুদ্র উপকূলে বসবাসকারী রাখাইনরা শিক্ষাদীক্ষায় অনেক এগিয়ে। পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলায় বসবাসকারী রাখাইনরা শিক্ষায় অনেক পিছিয়ে।

১২. খাদ্যদ্রব্য

কাপ্তাইয়ের বাসর খানা হল একটি ঐতিহ্যবাহী খাবার। তারা বিভিন্ন ধরনের পদ্মাগাদি খায় এবং মদও গ্রহণ করে। যেকোনো অনুষ্ঠানে মদ পান করা তাদের সংস্কৃতির একটি অংশ। এছাড়া, তারা বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি ও মাছও খায়।

১৩. সেবাব্রত গ্রহণ:

রাখাইন শিশু-কিশোরদের ধর্মীয় শিষ্টাচার পালিত হয় বৌদ্ধ পুরুত বা ডিস্কুলের কাছে। ধর্মীয় শিষ্টাচার পালনের সময়, অল্পবয়স্ক ছেলেরা বেশ কিছুদিন মন্দিরে অবস্থান করে। গেরুয়া বসন পরে এবং মাথা ন্যাড়া করে, তারা বৌদ্ধ মন্দিরে অবস্থান করে এবং ভিক্ষুদের কাছ থেকে বৌদ্ধধর্মের দীক্ষা গ্রহণ করে। মেয়েরা সাধারণত গৃহেই ধর্মীয় শিষ্টাচার শুরু করে, তবে তারা পালাগারদে গিয়ে ধর্মীয় আচার পালন করে থাকে। প্রকৃতপক্ষে, এভাবেই তারা সেবাব্রত গ্রহণ করে।

১৪. অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া:

রাখাইনরা মারা গেলে তাদের দেহকে পোড়ানো হয়। পোড়ানার আগে মৃত ব্যক্তিকে সুগন্ধি সাবান ও অন্যান্য উপকরণ দিয়ে গোসল করানো হয়। তারপর শ্বশান এ নিয়ে গিয়ে হিন্দুদের মত চিতায় তুলে পোড়ানো হয়। পোড়ানো শেষে সবাই নদীতে গোসল করে বাড়ি চলে যায়। গোড়ানোর সাত দিন পর নিকট আত্মীয়রা বৌদ্ধ ভিক্ষুকদের ডেকে তার নামে শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান করে এবং গ্রামের লোকদের নিমন্ত্রণ করে খাওয়ায়। নিমন্ত্রণতরা মৃত ব্যক্তির আত্মার শান্তি কামনা করে আহার গ্রহণ করে।

উপসংহার: রাখাইনরা বাংলাদেশের একটি ক্ষুদ্র এথনিক সম্প্রদায়। বাংলাদেশে বসবাসরত অন্যান্য এথনিক সম্প্রদায় থেকে তারা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। কৃষি ছাড়া রাখাইনদের অনেকে ব্যবসা-বাণিজ্যের সাথেও জড়িত। যেহেতু একটি স্বতন্ত্র জীবনধারা রাখাইনদের মধ্য বিদ্যমান, তাই আমরা রাখাইনদেরকে এথনিক গোষ্ঠী হিসেবেই অভিহিত করেছি।

নবীনতর পূর্বতন