বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র (NID Card) সংশোধন ও হারানো কার্ড পুনরুদ্ধারের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া

বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র (NID Card) সংশোধন ও হারানো কার্ড পুনরুদ্ধারের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া

বাংলাদেশের প্রত্যেক নাগরিকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়পত্র হলো জাতীয় পরিচয়পত্র (National ID Card বা NID)।জাতীয় পরিচয়পত্র শুধু একটি কার্ড নয়।এটি বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে আপনার আইনগত পরিচয় ও অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতীক ও ভোটদান, পাসপোর্ট, ব্যাংক একাউন্ট খোলা, মোবাইল সিম নিবন্ধনসহ প্রতিটি সরকারি-বেসরকারি কাজের অপরিহার্য দলিল। তাই এটি সংরক্ষণ, তথ্য হালনাগাদ ও প্রয়োজনে পুনরুদ্ধার করা প্রত্যেক নাগরিকের নিজ দায়িত্ব।

জাতীয় পরিচয়পত্র (NID Card) সংশোধন ও হারানো কার্ড পুনরুদ্ধারের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া


আজ আমরা সে সম্পর্কে জানবো

  •  NID কার্ডে ভুল তথ্য সংশোধন করার নিয়ম
  •  হারানো NID কার্ড পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া
  •  অনলাইনে NID সংক্রান্ত আবেদন করার ধাপসমূহ


 ১. জাতীয় পরিচয়পত্রের ধরন

বর্তমানে বাংলাদেশে দুটি ধরণের NID কার্ড প্রচলিত রয়েছে:

  1. স্মার্ট কার্ড (Smart NID Card): চিপযুক্ত, প্লাস্টিকের কার্ড যা বায়োমেট্রিক ডেটা ধারণ করে।
  2. লেমিনেটেড NID কার্ড (Old NID): পূর্বের কাগজ-ভিত্তিক লেমিনেটেড কার্ড, যা এখন ধীরে ধীরে স্মার্ট কার্ডে রূপান্তর করা হচ্ছে।


২. NID কার্ডে ভুল তথ্য সংশোধনের নিয়ম

অনেক সময় আমাদের নাম, জন্মতারিখ, ঠিকানা বা অন্যান্য তথ্য ভুলভাবে রেকর্ড হতে পারে। এই ভুলগুলো সংশোধন করার প্রয়োজন হয় যা বর্তমানে অনলাইন অথবা উপজেলা/সিটি কর্পোরেশন অফিসের মাধ্যমে ঠিক করতে হয়।

অনলাইনে সংশোধনের প্রক্রিয়া:

  • ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন: https://services.nidw.gov.bd
  • Account তৈরি বা লগইন করুন: আপনার NID নম্বর, জন্মতারিখ ও মোবাইল নম্বর দিয়ে অ্যাকাউন্ট তৈরি করুন। (একটি OTP কোড আপনার মোবাইলে যাবে, সেটি দিয়ে ভেরিফাই করুন।)
  • "Edit Information" বা "তথ্য সংশোধন" অপশন নির্বাচন করুন।
  • যে তথ্য পরিবর্তন করতে চান তা নির্বাচন করুন। যেমন – নাম, জন্মতারিখ, ঠিকানা, পিতামাতা/স্বামী-স্ত্রীর নাম ইত্যাদি।
  • প্রয়োজনীয় দলিল আপলোড করুন: যেমন – জন্মনিবন্ধন সনদ, SSC সার্টিফিকেট, পাসপোর্ট, বিয়ের সনদ, বা অন্যান্য প্রমাণপত্র।
  • ফি পরিশোধ করুন: সংশোধনের ধরন অনুযায়ী টাকা পরিশোধ করুন।
  • পেমেন্ট পদ্ধতি: বিকাশ, নগদ, রকেট বা ব্যাংক পেমেন্ট।
  • আবেদন সাবমিট করুন।
  • আপনার আবেদন যাচাইয়ের পর সংশ্লিষ্ট ইসি (Election Commission) অফিস থেকে আপডেট অনুমোদন করা হবে।


⚙️ অফলাইনে (ম্যানুয়ালি) সংশোধন:

যদি অনলাইনে আবেদন করতে না চান, তাহলে নিকটস্থ উপজেলা নির্বাচন অফিস বা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন অফিসে গিয়ে সংশোধনের আবেদন ফর্ম পূরণ করতে পারেন।

সঙ্গে নিতে হবে:

  • পুরনো NID কার্ডের ফটোকপি
  • প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্র
  • পাসপোর্ট সাইজ ছবি (সাম্প্রতিক)
  • আবেদন ফি


৩. হারানো NID কার্ড পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া

যদি আপনার জাতীয় পরিচয়পত্র হারিয়ে যায় বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে নতুন কার্ডের জন্য আবেদন করতে পারেন।

  • অনলাইন প্রক্রিয়া: https://services.nidw.gov.bd সাইটে যান।
  • আপনার একাউন্টে লগইন করুন।
  • “Reissue NID” বা “হারানো কার্ডের জন্য আবেদন” অপশন নির্বাচন করুন।
  • হারানোর কারণ উল্লেখ করুন (যেমন – হারানো, চুরি, ক্ষতিগ্রস্ত ইত্যাদি)।
  • একটি জিডি (General Diary) করতে হবে নিকটস্থ থানায় এবং জিডির স্ক্যান কপি আপলোড করতে হবে।
  • অনলাইন ফি প্রদান করুন
  • আবেদন সাবমিট করুন।
  • আবেদন অনুমোদিত হলে ইসি অফিস থেকে নতুন কার্ড সংগ্রহ করতে পারবেন, অথবা পরবর্তীতে স্মার্ট কার্ড ইস্যুর সময় সেটি পাবেন।


৪. অনলাইন অ্যাকাউন্ট থেকে NID ডাউনলোড করার নিয়ম

অনেকেই নতুন NID বা হারানো কার্ডের ডিজিটাল কপি পেতে চান।তার জন্য ইসি অনলাইন সার্ভিসে লগইন করে আপনি PDF আকারে Smart NID Copy Download করতে পারবেন।

ধাপগুলো:

  • লগইন করুন services.nidw.gov.bd
  • “Download NID” অপশনে ক্লিক করুন।
  • আপনার পরিচয় যাচাইয়ের পর একটি Digital NID Copy (PDF) পাবেন।

এটি প্রিন্ট করে প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারেন (তবে অফিসিয়াল কার্ডের বিকল্প নয়)।


৫. প্রয়োজনীয় দলিলপত্র (Documents Required)

সংশোধন বা পুনরুদ্ধারের সময় নিচের যেসকল দলিলপত্র/ কাগজ লাগতে পারে:

  • জন্মনিবন্ধন সনদ
  • SSC বা সমমানের সার্টিফিকেট
  • পাসপোর্ট কপি
  • বিয়ের সনদ (বিবাহিত হলে)
  • জিডির কপি (কার্ড হারানোর ক্ষেত্রে)
  • ছবি ও স্বাক্ষর


৬. কোথায় যোগাযোগ করবেন?

যেকোনো প্রশ্ন বা সমস্যা হলে যোগাযোগ করুন:

ইলেকশন কমিশন (EC) হেল্পলাইন: 105 (টোল ফ্রি)

ইমেইল: [email protected]

ওয়েবসাইট: https://nidw.gov.bd


⚡ কিছু গুরুত্বপূর্ণ টিপস:

আবেদন করার সময় অবশ্যই সঠিক মোবাইল নম্বর ব্যবহার করুন।

ভুল তথ্য প্রদান করলে আবেদন বাতিল হতে পারে।

আবেদন সম্পন্নের পর Application Tracking Number সংরক্ষণ করুন।

অফিসে যাওয়ার আগে অনলাইনে Appointment নেওয়া সুবিধাজনক।


 

বর্তমানে ইসি (Election Commission) অনলাইন সার্ভিসের মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়াটিই সহজ, স্বচ্ছ ও দ্রুত করেছে। আপনি ঘরে বসেই কয়েক মিনিটে সংশোধন, হারানো কার্ড পুনরুদ্ধার ও প্রিন্ট কপি পেতে পারেন।

জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) সংশোধন ও পুনরুদ্ধার গাইড

উৎস: বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন – nidw.gov.bd

১। প্রশ্নঃ আমি যথা সময়ে ভোটার হিসেবে রেজিস্ট্রেশন করতে পারিনি। এখন কি করা যাবে?

উত্তরঃ আপনি যে কোন সময়ে রেজিস্ট্রেশনের জন্য অনলাইনে আবেদন করতে পারবেন।

২। প্রশ্নঃ আমি বিদেশে অবস্থানের কারণে ভোটার রেজিস্ট্রেশন করতে পারিনি, এখন কিভাবে করতে পারবো?

উত্তরঃ আপনি যে কোন সময়ে রেজিস্ট্রেশনের জন্য অনলাইনে আবেদন করতে পারবেন।

৩। প্রশ্নঃ আমি ২০০৭/২০০৮ অথবা ২০০৯/২০১০ সালে ভোটার রেজিস্ট্রেশন করেছি কিন্তু সেই সময় আইডি কার্ড গ্রহণ করিনি। এখন কিভাবে আইডি কার্ড পেতে পারি?

উত্তরঃ উপজেলা/থানা নির্বাচন অফিস থেকে আপনার কার্ড সংগ্রহ করতে পারবেন। যদি সেখানেও না পাওয়া যায় তাহলে অনলাইনে রিইস্যু করার জন্য আবেদন করতে পারবেন। আবেদন অনুমোদিত হওয়ার পর আপনার মোবাইল অথবা ইমেইলে বার্তা পাঠানো হবে। এরপর অনলাইন থেকে আপনার এনআইডি কার্ড এর কপি ডাউনলোড করে নিন।

৪। প্রশ্নঃ ভোটার তালিকার নামের সাথে বিভিন্ন খেতাব, পেশা, ধর্মীয় উপাধি, পদবী ইত্যাদি যুক্ত করা যাবে কিনা?

উত্তরঃ ভোটার তালিকার ডাটাবেজে শুধুমাত্র নাম সংযুক্ত করা হয়, কোন উপাধি বা অর্জিত পদবী তাতে সংযুক্ত করার অবকাশ নাই।

৫। প্রশ্নঃ কোথা হতে আইডি কার্ড সংগ্রহ করা যাবে?

উত্তরঃ অনলাইন থেকে ডাউনলোড করতে পারবেন অথবা যে এলাকায় ভোটার রেজিস্ট্রেশন করেছেন সেই এলাকার উপজেলা/থানা নির্বাচন অফিস থেকে আইডি কার্ড সংগ্রহ করা যাবে।

৬। প্রশ্নঃ আমি বিদেশে চলে যাব। আমার কার্ড কি অন্য কেউ উত্তোলন করতে পারবে?

উত্তরঃ অনলাইন থেকে ডাউনলোড করতে পারবেন।

৭। প্রশ্নঃ কার্ডে ইচ্ছাকৃত ভুল তথ্য দিলে কি হবে?

উত্তরঃ জেল বা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারে।

৮। প্রশ্নঃ জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ১৩ আবার কারো ১৭ কেন?

উত্তরঃ ২০০৮ এর পরে যত আইডি কার্ড প্রিন্ট করা হচ্ছে বা পুনঃ তৈরি হচ্ছে, সে সকল কার্ডের নম্বর ১৭ ডিজিট হয়ে থাকে।

৯। প্রশ্নঃ বিভিন্ন দলিলে আমার বিভিন্ন বয়স/নাম আছে। কোনটা ভোটার রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে?

উত্তরঃ এসএসসি অথবা সমমানের পরীক্ষার সনদে উল্লেখিত বয়স ও নাম প্রযোজ্য হবে। ভবিষ্যতে ৫ম/৮ম সমাপনী পরীক্ষার সনদও গ্রহণযোগ্য হবে। লেখাপড়া না জানা থাকলে জন্ম সনদ, পাসপোর্ট বা ড্রাইভিং লাইসেন্স দিয়েও আবেদন করা যাবে।

১০। প্রশ্নঃ আঙ্গুলের ছাপ দিয়ে কি ডুপ্লিকেট এন্ট্রি সনাক্ত করা সম্ভব?

উত্তরঃ হ্যাঁ, সনাক্ত করা সম্ভব।

১১। প্রশ্নঃ এক ব্যক্তির পক্ষে কি একাধিক নামে ও বয়সে একাধিক কার্ড পাওয়া সম্ভব?

উত্তরঃ না। একজন একটি মাত্র কার্ড করতে পারবেন। তথ্য গোপন করে একাধিক স্থানে ভোটার হলে কেন্দ্রীয় সার্ভারে আঙুলের ছাপ দ্বারা তা ধরা পড়বে এবং তার বিরুদ্ধে মামলা হবে।

১২। প্রশ্নঃ নতুন ভোটার হওয়ার ক্ষেত্রে কি কি কাগজ পত্রাদি প্রয়োজন?

উত্তরঃ জন্ম নিবন্ধন সনদ, এসএসসি বা সমমানের পরীক্ষা পাসের সনদ (যদি থাকে), ঠিকানা প্রমাণের জন্য ইউটিলিটি বিল, নাগরিক সনদ, পিতা-মাতা বা স্বামী/স্ত্রীর এনআইডি কার্ডের ফটোকপি, পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স বা টিআইএন নম্বর (যদি থাকে)।

১৩। প্রশ্নঃ আমি খুব দরিদ্র ও বয়স ১৮ বছরের কম। মানবিক কারণে কি আইডি কার্ড করা যাবে?

উত্তরঃ না। ১৮ বছর পূর্ণ না হলে আইডি কার্ড পাওয়া যাবে না। মানবিক বিবেচনার কোন সুযোগ নেই।

১৪। প্রশ্নঃ আমি ভুলে দু’বার রেজিস্ট্রেশন করে ফেলেছি এখন কি করবো?

উত্তরঃ দ্রুত সংশ্লিষ্ট জেলা নির্বাচন অফিসে লিখিতভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। বর্তমানে ফিঙ্গারপ্রিন্ট ম্যাচিং কার্যক্রম চলছে, ফলে ডুপ্লিকেট এন্ট্রি সনাক্ত হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

১৫। প্রশ্নঃ আইডি কার্ড আছে কিন্তু ভোটার তালিকায় নাম ছিল না। কী করবো?

উত্তরঃ অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট উপজেলা/জেলা নির্বাচন অফিসে যোগাযোগ করুন।

১৬। প্রশ্নঃ একজনের কার্ড অন্যজন সংগ্রহ করতে পারবে কিনা?

উত্তরঃ অনলাইন থেকে ডাউনলোড করা যাবে।

১৭। প্রশ্নঃ বিভিন্ন ফর্ম কোথায় পাওয়া যাবে?

উত্তরঃ এখন সব আবেদন অনলাইনে করা যায় এবং প্রয়োজনীয় ফর্ম অনলাইন থেকেই সংগ্রহ করা যাবে।

১৮। প্রশ্নঃ এই ফর্মগুলোর জন্য কোন মূল্য দিতে হয় কি না?

উত্তরঃ না।

১৯। প্রশ্নঃ আইডি কার্ড হারিয়ে গিয়েছে, কিভাবে নতুন কার্ড পাবো?

উত্তরঃ অনলাইনে পুনর্মুদ্রণ (Reissue) এর জন্য আবেদন করুন। আবেদন অনুমোদিত হলে মোবাইল/ইমেইলে বার্তা পাবেন এবং অনলাইন থেকে কার্ডের কপি ডাউনলোড করতে পারবেন।

২০। প্রশ্নঃ হারানো কার্ড বা সংশোধনের জন্য কি ফি দিতে হয়?

উত্তরঃ হ্যাঁ, ফি দিতে হয়। আবেদন জমা দেওয়ার সময় ফি প্রদানের নির্দেশনা দেওয়া থাকে।

২১। প্রশ্নঃ হারানো ও সংশোধন একই সাথে করা যায় কি?

উত্তরঃ না। আগে হারানো কার্ড তুলতে হবে, পরে সংশোধনের জন্য আবেদন করা যাবে।

২২। প্রশ্নঃ কার্ডের তথ্য কিভাবে সংশোধন করা যায়?

উত্তরঃ অনলাইন/উপজেলা/থানা/জেলা নির্বাচন অফিসে ভুল তথ্য সংশোধনের জন্য আবেদন করতে হবে। প্রমাণপত্র সংযুক্ত করতে হবে।

No comments:

Post a Comment