রাষ্ট্রের উৎপত্তি সংক্রান্ত কার্ল মার্কসের তত্ত্ব আলোচনা কর

রাষ্ট্রের উৎপত্তি সংক্রান্ত কার্ল মার্কসের তত্ত্ব

ভূমিকা:- সভ্যতার বিকাশে মানুষ যত রকম সংঘ গঠন করেছে তার মধ্যে সর্বোচ্চ এবং শক্তিশালী সংঘ হচ্ছে রাষ্ট্র। রাষ্ট্র হচ্ছে একটি বাস্তব রাজনৈতিক সংগঠন। সমাজজীবনের একপর্যায়ে মানুষ তার জীবনের নিরাপত্তা ও সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য একটি সার্বভৌম ক্ষমতার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। কালের বিবর্তনে মানুষের এ প্রয়োজনীয়তা থেকেই রাষ্ট্র নামের রাজনৈতিক সংগঠনের জন্ম হয়। মূলভ মানবসমাজের আদি সংগঠন পরিবারের বিস্তৃত ও পরিবর্তিত রূপ হচ্ছে রাষ্ট্র।

রাষ্ট্রের উৎপত্তি সংক্রান্ত কার্ল মার্কসের তত্ত্ব

রাষ্ট্র উৎপত্তি সংক্রান্ত মার্কসের তত্ত্ব

রাষ্ট্রের উৎপত্তি সম্পর্কে মার্কসীয় মতবাদ রাষ্ট্রচিন্তার জগৎকে ব্যাপকভাবে আলোড়িত করে। কেননা মার্কসের পূর্বে রাষ্ট্রকে শাশ্বত প্রতিষ্ঠান হিসেবে গণ্য করা হতো না। তখন রাষ্ট্রকে মনে করা হতো ঈশ্বরের সৃষ্টি আর মার্কসীয় মতবাদ অনুসারে রাষ্ট্র হলো শ্রেণিশোষণের হাতিয়ার। মূলত রাষ্ট্র সম্পর্কে, মার্কসীয় মতবাদ উঠেছে ঐতিহাসিক বস্তুবাদের ওপর ভিত্তি করে। এ ব্রেকাপটে রাষ্ট্রের উৎপত্তিতে মার্কসীয় বক্তব্য সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-

(i) বিশেষ রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে রাষ্ট্র:

ঐতিহাসিক বস্তুবাদের তত্ত্ব অনুযায়ী বলা যায়, রাষ্ট্র হলো একটি বিশেষ ধরনের রাজনৈতিক সংগঠন, যার আধিপত্য সমাজজীবনের অন্য সকল প্রকার সংগঠনের কর্তৃত্ব থেকে সম্পূর্ণ আলানা। রাষ্ট্রের মূল প্রকৃতি হলো রাষ্ট্রীয় আধিপত্য একান্তই পীড়ন ও বল প্রয়োগের উপকরণ বিশেষ, যা উৎপীড়নের মাধ্যমে নিজের কর্তৃত্বকে বহাল রাখে। এই বল প্রয়োগের জন্য রাষ্ট্রের হাতে ন্যস্ত থাকে দমন নীড়নের জন্য সৃষ্ট একাধিক সংস্থা। যেমন- পুলিশ, সেনাবাহিনী, গোয়েন্দা বাহিনী, আমলাতন্ত্র ইত্যাদি। রাষ্ট্রের এই কর্তৃত্ব সার্বভৌম ও চূড়ান্ত, যা ব্যক্তি-বর্ণ নির্বিশেষে গোটা সমাজ তথ্য রাষ্ট্রে প্রতিটি সদস্যের জন্যই প্রযোজ্য।

(ii) ব্যক্তিগত সম্পত্তির ধারণা ও রাষ্ট্রের উদ্ভব:

আদিম সাম্যবাদী সমাজে উৎপাদিকাশক্তির বিকাশের ফলে যে শ্রেণিভিত্তিক উৎপাদন সম্পর্কের জন্ম হয়েছিল, যা থেকে উৎপত্তি হয়েছিল ব্যক্তিগত সম্পত্তি। কারণ উৎপাদিকাশক্তির বিকাশের ফলে উদ্বৃত্ত সম্পদের সৃষ্টি হয়। আর এই উদ্বৃত্ত সম্পদের সৃষ্টি হওয়ার সাথে সাথে যে সম্পদের সৃষ্টি হয় সেই সম্পদকে নিজের অধিকার বলে ব্যক্তিগত মালিকানা সৃষ্টির প্রবণতা এবং তার জন্য প্রয়োজন হয় উৎপাদন উপকরণের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার। এভাবেই আদিম সাম্যবাদী সমাজের সংহতি ভেঙে পড়ে উৎপত্তি হয় দ্বন্দ্বসংঘাতের। আদিম সাম্যবাদী সমাজব্যবস্থায় যারা গোত্রাধিপতি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিলেন তারা সংখ্যায় সীমিত হলেও সম্পত্তির ওপর ব্যক্তিগত মালিকানা প্রতিষ্ঠা করতে চাইলেন। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল, সমাজের উৎপাদন ব্যবস্থাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে এনে সামাজিক সম্পদকে পূর্ণমাত্রাগ ভোগ করা। শ্রেণিবিভাজনের পূর্বে সমাজব্যবস্থায় যে সামগ্রিক ঐক্য বিদ্যমান ছিল, বাক্তিগত সম্পত্তির উদ্ভবের ফলে সে ঐক্য বহাল থাকলেও তাকে সুনিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন দেখা দেয়। বলপ্রয়োগের ফলে পূর্বে যেখানে সামগ্রিক প্রয়োজনে সমাজব্যবস্থার ঐক্য প্রতিষ্ঠিত ছিল বর্তমানে সেখানে মুষ্টিমেয় কিছু ব্যক্তি উৎপাদনব্যবস্থাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে সংখ্যাগরিষ্ঠ ও সংখ্যালঘিষ্ঠের শ্রমশক্তিকে নিজেদের স্বার্থে নিয়োজিত করার জন্য ভীতি প্রদর্শন, উৎপীড়ন ও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে উৎপাদন উপকরণের ওপর নিজেদের কর্তৃত্ব বজায় রাখতে সচেষ্ট হলো। ফলে দেখা দিল-

১. রাজনৈতিক সম্পর্কের প্রতিষ্ঠা এবং যে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা হয় সংখ্যাগরিষ্ঠের মধ্যে।

২. দমন-পীড়নের যন্ত্ররূপে রাষ্ট্রশক্তির আবির্ভাৎ মালা।

এই অসম বৈরী সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য প্রয়োজন দেখা দিল রাজনৈতিক কর্তৃত্বের, আর এরই কেন্দ্রবিন্দুরূপে সৃষ্টি হয় রাষ্ট্রের। তাই বলা যায়, শোষকশ্রেণির অর্থনৈতিক লিন্সা চরিতার্থ করার ও সমগ্র উৎপাদনব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণাধীন রাখার প্রয়োজনের ফলশ্রুতিতেই উন্নত হয় রাষ্ট্রের।

(ii) শ্রেণিস্বার্থ রক্ষার নিমিত্তে রাষ্ট্রে:

সমাজে শ্রেণিসম্পর্কের উদ্ভব, রাজনীতির বিকাশ ও রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা পরস্পর অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। সমাজব্যবস্থায় বৈরী উৎপাদন সম্পর্কের আবির্ভাবের ফলে সৃষ্টি হয় সংঘাতমূলক শ্রেণীদ্বন্দ্বের। এই শ্রেণিদ্বন্দ্ব জন্ম দেয় উদ্বৃত্ত সম্পদের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য উভয় শ্রেণির মধ্যে বিরোধমূলক সম্পর্ক, যার অপর নাম রাজনৈতিক সম্পর্ক। কিন্তু সংখ্যালঘুর শ্রেণিস্বার্থ বজায় রাখার জন্য প্রয়োজন পড়ে এক দমনমূলক যন্ত্রের, যার নাম রাষ্ট্র। তাহলে বলা যায়, রাষ্ট্রের আবির্ভাব হয়েছে সমাজের সামগ্রিক স্বার্থে নয়। বরং মুষ্টিমেয় শ্রেণির স্বার্থ রক্ষার জন্য।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, আবহমানকাল থেকে রাষ্ট্র ছিল না। রাষ্ট্রের উৎপত্তি হয়েছে সমাজ বিকাশের একটি বিশেষ পর্যায়ে ও শোষকশ্রেণির স্বার্থে। অতএব, সমাজে শাসক ও শোষিতশ্রেণির বৈরী সম্পর্ক যতদিন বজায় থাকবে অর্থাৎ উৎপাদন সম্পর্কের মধ্যে যতদিন দ্বন্দ্ব-সংঘাত হবে, ততদিন শাসকশ্রেণির স্বার্থে রাষ্ট্রের অস্তিত্বও টিকে থাকবে।

Md Belal Hossain

আমি মোঃ বেলাল হোসাইন, বাংলাদেশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে মাস্টার্স/স্নাতকোত্তর (M.S.S) ডিগ্রী অর্জন করেছি এবং Shikhaprotidin-এর প্রতিষ্ঠাতা। Shikhaprotidin একটি শিক্ষামূলক প্ল্যাটফর্ম যেখানে আমি সমাজবিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলোকে উপস্থাপন করি ও শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষামূলক দিকনির্দেশনা প্রদান করি।

নবীনতর পূর্বতন