বাংলা শব্দের উৎপত্তি কিভাবে? বাংলাদেশের অবস্থান, আয়তন ও জনসংখ্যা সম্পর্কে বর্ণণা কর

বঙ্গ বা বাংলা শব্দের উৎপত্তি এবং বাংলাদেশের অবস্থান, আয়তন ও জনসংখ্যা আলোচনা

ভূমিকা:- বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি জনবহুল রাষ্ট্র। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমির এই বাংলাদেশের ভূখণ্ডে রয়েছে সুদীর্ঘকালের গৌরবময় ইতিহাস। ৩০ লক্ষ শহিদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয় এই বাংলাদেশ। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে পাকিস্তানের হাত থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে দেশটি বিশ্ব মানচিত্রে নিজেকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্থান করে নেই।

বাংলা শব্দের উৎপত্তি কিভাবে? বাংলাদেশের অবস্থান ও জনসংখ্যা

বঙ্গ বা বাংলা শব্দের উৎপত্তি

“বাংলা” বা ‘বংগালা’ শব্দটির উৎপত্তি সম্পর্কে সঠিক তথ্য অজানা। বিভিন্ন ঐতিহাসিকদের মধ্যে বঙ্গ নামের উৎপত্তি নিয়ে মত পার্থক্য রয়েছে। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পূর্ব পর্যন্ত বাঙালির আবাসভূমিকে বলা হতো 'বঙ্গদেশ' ইংরেজিতে বলা হতো বেঙ্গল। বেঙ্গল নামটা দিয়েছিল ইংরেজরা, তারা এটি নিয়েছিল পর্তুগিজের দেওয়া 'বেঙ্গলা' শব্দ থেকে। 'বেঙ্গলা' শব্দটি মুসলমানদের দেওয়া 'বঙ্গালই' শব্দের রূপান্তর মাত্র। ১৫২৮ খ্রিষ্টাব্দ প্রথম পাঠান সুলতানগণই 'বঙ্গালই' শব্দের ব্যবহার শুরু করেন। নিম্নে বাংলা নামের উৎপত্তি সম্পর্কে বিভিন্ন তাত্ত্বিকদের মতামত তুলে ধরা হলো:

১. আবুল ফজলের মতে আবুল ফজল তার আইন-ই-আকবরি গ্রন্থে বাংলা নামের উৎপত্তি সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা করেন। তিনি মনে করেন, 'বংগ'-এর সাথে বাঁধ অর্থজ্ঞাপক 'আল' যুক্ত হয়েই 'বাংগাল' শব্দের উৎপত্তি হয়েছে। অন্যদিকে সেমিটিক ভাষায় 'আল' অর্থ আওলাদ, সন্তান-সন্ততি ও বংশধর। তাই 'বং'-এর বংশধর অর্থ (বাং আল) বঙ্গাল বা বাংগাল শব্দের উৎপত্তিটাকে নেহায়েত উড়িয়ে দেওয়া যায় না। 'বংগ' শব্দটি গংগ' শব্দে রূপান্তর বলেও আবার কেউ কেউ যুক্তি দেখিয়েছেন। 'বঙ্গ'-শব্দজাত 'বঙ্গাল' শব্দটি একাদশ-দ্বাদশ শতাব্দী থেকে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

২. ড. নীহার রঞ্জন রায়ের মতে "বাঙালির ইতিহাস আদিপর্ব রচয়িতা ড. নীহার রঞ্জন রায়ের মতে, "রাজতন্ত্রের নিঃসংশয় প্রমাণ ও পরিচয় পাওয়া যায় খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে গ্রিক-ইতিহাস কথিত গঙ্গারাষ্ট্রের বিবরণের মধ্যে।"

৩. সুকুমার সেনের মতে জলময় দেশে যারা পূর্বাপর বাস করে তারা 'বঙ্গ' এবং তাদের নিবাস-ভূমি 'বঙ্গ-দেশ এইরূপ মত প্রকাশ করেছেন সুকুমার সেন।

৪. দ্বাদশ শতাব্দীর অনুশাসন মতে দ্বাদশ শতাব্দীর এক অনুশাসনে বঙ্গাল বল (অর্থাৎ বাঙাল রাজার সৈন্য) কর্তৃক নালন্দার একটি বিহার ধ্বংসের কথা উল্লেখ আছে। এ সময়ে এক কবিও 'বঙ্গাল' নামে পরিচিত ছিলেন। কেউ কেউ মনে করেন, 'বঙ্গ' নামটির। মূলে ছিল চীন-তিব্বতি-গোষ্ঠীর কোনো শব্দ। বাঙ্গালা নামটি মুসলিম অধিকার কালের শুরুর দিকেই প্রচলিত হয়। ফরাসি 'বঙ্গালহ' হতে পর্তুগিজ Bengala ও ইংরেজি Bengla এর উৎপত্তি।

৫. কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র: খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকের কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে বঙ্গের 'শ্বেত স্নিগ্ধ' সুতিবস্ত্রের নাম বলা হয়েছে। এটা সুকুমার সেনের মতকে সমর্থন করে। সুকুমার সেনের মতে, অনেক তুলা উৎপাদন হতো বিধায় এ অঞ্চলের নাম 'বঙ্গ' হয়েছে।

৬. রমেশচন্দ্র মজুমদারের মতামত- রমেশচন্দ্র মজুমদার বলেন, প্রাচীনকাল থেকেই 'বঙ্গ' ও 'বাঙ্গাল' দুটি পৃথক দেশ ছিল। বাঙ্গাল দেশের নাম হতেই কালক্রমে সমগ্র দেশের নাম বাংলা নামকরণ করা হয়। বর্তমানকালে, বাংলাদেশের অধিবাসীদের যে 'বাঙ্গাল' বলা হয় তা সেই প্রাচীন 'বাঙ্গাল' দেশের স্মৃতি বহন করে।

বাংলাদেশের অবস্থান ও জনসংখ্যা

নিম্নে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও আয়তন সম্পর্কে আলোচনা করা হলো:

বাংলাদেশের অবস্থান:

বাংলাদেশ সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা ও সবুজের সমারোহ পূর্ণ একটি দেশ।এদেশের প্রায় চারপাশে রয়েছে সৌন্দর্য ঘেরা। ভৌগোলিকভাবে পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপের সিংহভাগ অঞ্চল জুড়ে বাংলাদেশ ভূখণ্ড অবস্থিত। প্রায় ১৭ কোটিরও অধিক জনসংখ্যা নিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম জনবহুল দেশ। ২০°৩৪′ উত্তর অক্ষরেখা থেকে ২৬°৩৮′ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৮°০১′ থেকে ৯২°৪১′ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ পর্যন্ত বাংলাদেশের বিস্তৃতি। বাংলাদেশের মধ্যভাগ দিয়ে অতিক্রম করেছে কর্কটক্রান্তি রেখা। নদীমাতৃক বাংলাদেশ ভূখণ্ডের উপর দিয়ে বয়ে গেছে ৫৭টি আন্তর্জাতিক নদী। অবস্থানের দিক দিয়ে বাংলাদেশের তিন দিকে স্থল এবং একদিকে জল দ্বারা বেষ্টিত (একদিকে সাগর অন্যদিকে ভারত ও মায়ানমার রাষ্ট্র)। বাংলাদেশের পশ্চিমে ভারত এর পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও মেঘালয় রাজ্য, বাংলাদেশের পূর্বে ভারতের আসাম ও ত্রিপুরা রাজ্য, দক্ষিণ উপকুলে বঙ্গোপসাগর এছাড়া উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ- পূর্ব দিকে টারশিয়ারি যুগের পাহাড় এবং বিশ্বের বিখ্যাত ম্যানগ্রোভ বন প্রাকৃতির সুন্দার্য ভরা সুন্দরবন অবস্থিত। বাংলাদেশ প্রকৃতির সুন্দর গুনের অধিকারী সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার অবস্থিত। বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। নদী এদেশের এক অপরুপ সুন্দার্য।

বাংলাদেশের আয়তন:

বাংলাদেশের মোট আয়তনের মধ্যে নদ-নদী অঞ্চলের আয়তন প্রায় ৯৩৮০ বর্গ কিলোমিটার। বনাঞ্চলের আয়তন ২২,৫৮৪ বর্গ কিলোমিটার। বাংলাদেশের মোট আয়তন ১,৪৭,৫৭০ বর্গকিলোমিটার। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমুদ্রসীমা ১২ নটিক্যাল মাইল এবং অর্থনৈতিক সমুদ্রসীমা ২০০ নটিক্যাল মাইল। আয়তনের দিক দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বের ৯৫তম।

বাংলাদেশের সীমারেখা:

বাংলাদেশের সর্বমোট সীমান্ত দৈর্ঘ্য ৫১৩৮ কি.মি.। এর মধ্যে বাংলাদেশের সাথে ভারত সমারেখার দৈর্ঘ্য ৪১৪৪ কিলোমিটার। বাংলাদেশের সাথে সীমারেখার সীমারেখা দৈর্ঘ্য ২৮৩ কিলোমিটার এবং বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলের দৈর্ঘ্য ৭১১ কিলোমিটার।

প্রান্তীয় অবস্থান:

সমুদ্র হতে দূরত্ব এবং সমুদ্রের অবস্থান অনুসারে বিভিন্ন দেশের অবস্থান মহাদেশীয় প্রান্তীয়, উপদ্বীপীয় হয়ে থাকে। বাংলাদেশের অবস্থান প্রান্তীয়। এরূপ অবস্থানের জন্য এর দক্ষিণে ভগ্ন উপকূলে সমুদ্র বন্দর গড়ে উঠেছে। এ কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাথে সুলভ জলপথে বাংলাদেশের ব্যবসায়-বাণিজ্য গড়ে উঠেছে।

ভূ-প্রকৃতির বৈশিষ্ট্য:

বিশ্বের যতগুলো ব-দ্বীপ রয়েছে এর মধ্যে অন্যতম হলো বাংলাদেশ। অর্থাৎ বাংলাদেশ পৃথিবীর একক বৃহত্তম ব-দ্বীপ। পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা নদী পশ্চিম-উত্তর ও উত্তর-পূর্ব দিক থেকে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে একযোগে এ সুবিশাল ব-দ্বীপের সৃষ্টি করেছে। সীমিত উচ্চভূমি ছাড়া সমগ্র দেশ এক বিস্তীর্ণ সমভূমি এদেশের ভূ-খণ্ড উত্তর-পশ্চিম থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে ক্রমশ ঢালু। ফলে প্রবাহিত সব নদ-নদী এবং এদের উপনদী-শাখা নদীগুলো উত্তরদিক হতে দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর অভিমুখে প্রবাহিত হয়েছে।

বাংলাদেশের জনসংখ্যা

বাংলাদেশের আদমশুমারী জুন, ২০২২ সাল পর্যন্ত ১৬ কোটি ৫১ লক্ষ ৫৮ হাজার ৬১৬ জন। যা বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশ হিসেবে পরিচিত। বর্তমানে জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গ কিলোমিটারে প্রায় ১,১১৯ জন যা সারা পৃথিবীতে সর্বোচ্চ (কিছু দ্বীপ ও নগর রাষ্ট্র বাদে)। বর্তমানে বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১ দশমিক ৩৭%। বাংলাদেশে পুরুষ ও নারীর অনুপাত হার ১০০.৩ঃ১০০। শিশু ও তরুণ বয়সী (শূন্য-পঁচিশ বছর পর্যন্ত) বয়সসীমা মোট জনসংখ্যার শতকরা ৬০% এবং ৬৫ বছরের বেশি বয়সের জনসংখ্যা মাত্র ৬%। বর্তমানে বাংলাদেশের পুরুষ ও মহিলাদের গড় আয়ু ৭২.৩ বছর। জাতিগতভাবে বাংলাদেশের ৯৮% মানুষ বাঙালি। বাকি ২% মানুষ বিহারি বংশোদ্ভূত অথবা বিভিন্ন উপজাতির সদস্য।পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় ১৩ উজাতি রয়েছে। এদের মধ্য চাকমা জাতি অন্যতম এছাড়াগারো, সাওতাল বসবাস করে থাকে।

২০২২ সালের আদমশুমারি প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা ১৬,৫১,৫৮,৬১৬ (১৬ কোটি ৫১ লক্ষ ৫৮ হাজার ৬১৬) জন। যার মধ্য মোট পুরুষের সংখ্যা ৮,১৭,১২,৮২৪ (৮ কোটি ১৭ লক্ষ ১২ হাজার ৮২৪) জন। নারীর সংখ্যা ৮,৩৩,৪৭,২০৬ (৮ কোটি ৩৩ লক্ষ ৪৭ হাজার ২০৬) জন এবং ৩য় লিঙ্গের সংখ্যা ১২,৬২৯ (১২ হাজার ৬২৯) জন। ২০২২ সালের জনশুমারিতে ১৭৫০৭ টি থানার ৮৫৯৫৭ গ্রামের তথ্য পাওয়া গেছে। মোট জনসংখ্যা ও লিঙ্গভিত্তিক জনসংখ্যার মধ্যে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। এছাড়া প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশে সর্বমোট বাসগৃহের সংখ্যা ৩,৫৯,৯০,৯৫১ টি যার মধ্যে পল্লী এলাকায় ২,৭৮,১১,৬৬৭ টি এবং শহর এলাকায় ৮১,৭৯,২৮৪ টি। সর্বাধিক বাসগৃহের সংখ্যা ঢাকা বিভাগে (৮১,১৯,২০৫ টি) ও সর্বনিম্ন সিলেট বিভাগে (১৮,৮৫,০১৭ টি)।

আদমশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২ সাল অনুযায়ী দেশের মোট জনসংখ্যার ৯১.৪% মুসলমান, ৭.৯৫% হিন্দু, ০.৬১% বৌদ্ধ, ০.৩০% খ্রিস্টান এবং ০.১২% অন্যান্য ধর্মাবলম্বী। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী জনসংখ্যা মোট জনসংখ্যার সর্বোচ্চ ১.০০%। পুরুষের ক্ষেত্রে হার ১.০১% ও মহিলার ক্ষেত্রে ০.৯৯% । বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বিভাগের মোট জনসংখ্যার ২.৯৯% ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসবাস যা সকল বিভাগের মধ্যে সর্বোচ্চ অন্যদিকে বরিশাল বিভাগে ০.০৫% যা সর্বনিম্ন।

আদমশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২ অনুযায়ী বাংলাদেশে বর্তমানে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী রয়েছে ৫০ টির মত। এদের মধ্য-

দেশের বৃহত্তম ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী=চাকমা।

দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী= গারো।

তৃতীয় বৃহত্তম ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী= মারমা।

চতুর্থ বৃহত্তম ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী=সাওতাল।

Md Belal Hossain

আমি মোঃ বেলাল হোসাইন, বাংলাদেশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে মাস্টার্স/স্নাতকোত্তর (M.S.S) ডিগ্রী অর্জন করেছি এবং Shikhaprotidin-এর প্রতিষ্ঠাতা। Shikhaprotidin একটি শিক্ষামূলক প্ল্যাটফর্ম যেখানে আমি সমাজবিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলোকে উপস্থাপন করি ও শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষামূলক দিকনির্দেশনা প্রদান করি।

নবীনতর পূর্বতন