পরিবেশ দূষণ কি What is Environment pollution পরিবেশ দূষণের ক্ষতিকর প্রভাব
পরিবেশ দূষণ কি? পরিবেশ দূষণের ক্ষতিকর প্রভাব
ভূমিকা:- আধুনিক বিশ্বে অগ্রগতির অন্যতম হাতিয়ার হলো যান্ত্রিকতা। যান্ত্রিতকতা শিল্পায়নকে উন্নতির দিকে ধাবিত করে। শিল্পায়নের ফলে মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হলেও শিল্পকারখানার বিভিন্ন দূষণের ফলে আমাদের চারপাশের পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। পরিবেশ দূষণের শুরু মূলত আদিকাল থেকেই চলছে।আর দিন দিন পরিবেশ দূষণের মাত্রা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি পরিবেশ দূষণের মাত্রাকে প্রকটতর করে তুলছে। এভাবে পরিবেশ দূষণ হতে থাকলে একদিন এ পৃথিবী বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠবে। মানুষের জীবনকে সুস্থ স্বাভাবিক রাখার জন্য নির্মল পরিবেশ বজায় রাখা অপরিহার্য।
পরিবেশ দূষণ
পরিবেশ দূষণের ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো Environment pollution. Environment শব্দটির অর্থ বলতে The natural Condition কে বুঝায়। আর pollution শব্দটি pollute থেকে এসেছে; এর অর্থ হচ্ছে to make a something dirty or no longer pure especially adding harmful অথবা, unpleasant substan to it.
সুতরাং শাব্দিক দিক থেকে বলতে বুঝায় to make a something dirty or no longer pure especially adding harmful unpleasant substaces to the natural conditions example land, air, water in which people animals and plants live.
সাধারণত, পরিবেশের যে রাসায়নিক ও জৈবিক বৈশিষ্ট্যের যে অপরিচিত বা অবাঞ্চিত পরিবর্তন জীবের জীবনধারণকে ক্ষতিগ্রস্ত করে তাকেই পরিবেশ দূষণ বলে। এছাড়া পরিবেশ দূষণ বলতে আমরা মানুষের বসবাস করার জন্য যেসব প্রত্যাশিত ও প্রয়োজনীয় উপাদানের প্রয়োজন সেসব উপাদানের অনুপস্থিত এবং মানুষসহ অন্যান্য প্রাণীকুলের ক্ষতি সাধন করে এমন অবস্থাকে বুঝায়।
আবদুল্লাহ আল মুতী বলেন- ''মাত্রাতিরিক্ত বর্জ্য পদার্থ যদি পরিবেশে মিশে মানুষ, প্রাণী ও উদ্ভিদকে ক্ষতিগ্রস্ত করে তবে তাকে আমরা পরিবেশ দূষণ বলতে পারি।''
এফ এম মনিরুজ্জামান বলেন-''পরিবেশের কোন উপাদান যখন ভৌত রাসায়নিক, জৌবিক তেজস্ক্রিয় পরিবর্তন ঘটে ও মানুষসহ পরিবেশের মধ্যে বসবাসকারীদের উপর নেতিবাচক ও ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে এমতবস্থাকে পরিবেশ দূষণ বলা হয়।''
অর্থাৎ যে প্রক্রিয়ায় মানুষের ব্যবহৃত পরিত্যক্ত দ্রব্যাদি, শিল্পকারখানার বর্জ্য পরিবেশের সাথে মিশে পরিবেশের উপর ক্ষতিকর ও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে মানুষসহ উদ্ভিদ ও প্রাণীজগতের ক্ষতি সাধন করে তাই পরিবেশ দূষণ।
পরিবেশ দূষণের ফলে সৃষ্ট ক্ষতিসমূহ:-
১। মানবস্বাস্থ্যের ক্ষতি:
পরিবেশ দূষণের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে মানুষের স্বাস্থ্যর উপর। বায়ু দূষণের ফলে অ্যাজমা, ব্রংকাইটিস, ফুসফুসের ক্যান্সারসহ বিভিন্ন শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। জল দূষণের কারণে ডায়রিয়া, টাইফয়েড, হেপাটাইটিস ইত্যাদি রোগ ছড়িয়ে পড়ছে।
২। উদ্ভিদ ও প্রাণিকুলের ক্ষতি:
পরিবেশ দূষণের কারণে উদ্ভিদের বৃদ্ধিতে ব্যাঘাত ঘটে এবং ফসল উৎপাদন হ্রাস পায়। জমির উর্বরতা কমে যায় এবং ফলত কৃষির উপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে। পানির দূষণের কারণে জলজ প্রাণী মারা যায়। একইভাবে, বায়ু ও শব্দ দূষণের ফলে বনের জীবজন্তু ও পাখি বিলুপ্তির পথে চলে যাচ্ছে।
৩। প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়া:
পরিবেশ দূষণের ফলে প্রাকৃতিক উপাদানগুলোর মধ্যে ভারসাম্য নষ্ট হয়। গ্লোবাল ওয়ার্মিং, ওজোন স্তরের ক্ষয়, মরুকরণ, বৃষ্টিপাতের অনিয়ম ইত্যাদি ঘটছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীর আবহাওয়ার চরম তারতম্য ঘটছে, যার ফলে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের হার বাড়ছে।
৪। জীববৈচিত্র্যের হ্রাস:
পরিবেশ দূষণ জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। বহু প্রজাতির প্রাণী ও উদ্ভিদ ইতোমধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে এবং অনেক প্রজাতি বিলুপ্তির মুখে। এই প্রক্রিয়া প্রকৃতির ভারসাম্য চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
৫। অর্থনৈতিক ক্ষতি:
দূষণের কারণে কৃষি, মৎস্য ও বনজ সম্পদের উৎপাদন কমে যায়। চিকিৎসা খাতে ব্যয় বেড়ে যায় এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ব্যাহত হয়। শিল্পকারখানার বর্জ্য পরিষ্কারের জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়।
৬। পানীয় জলের সংকট
পরিবেশ দূষণের কারণে ভূগর্ভস্থ ও ভূপৃষ্ঠের পানির উৎস দূষিত হয়ে পড়ে। ফলে নিরাপদ পানীয় জলের সংকট দেখা দেয়, যা মানবস্বাস্থ্য ও দৈনন্দিন জীবনে মারাত্মক প্রভাব ফেলে।
৭। মাটির গুণগত মান নষ্ট হওয়া
রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও শিল্পবর্জ্যের কারণে মাটি দূষিত হয়। এতে মাটির উর্বরতা কমে যায় এবং দীর্ঘমেয়াদে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয়।
৮। শব্দ দূষণের ক্ষতি
অতিরিক্ত শব্দ দূষণের ফলে মানুষ মানসিক চাপ, অনিদ্রা, উচ্চ রক্তচাপ ও শ্রবণশক্তি হ্রাসে আক্রান্ত হয়। শিক্ষার্থী ও কর্মজীবীদের মনোযোগ ব্যাহত হয়।
৯। মানসিক ও সামাজিক সমস্যা
দূষিত পরিবেশ মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। উদ্বেগ, হতাশা, বিরক্তি ও সামাজিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পায়।
১০। নগর জীবন বিপর্যস্ত হওয়া
নগর এলাকায় বায়ু, শব্দ ও বর্জ্য দূষণের কারণে বসবাস অস্বাস্থ্যকর হয়ে ওঠে। যানজট, দুর্গন্ধ ও আবর্জনার স্তূপ নগরজীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে।
১১। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য হুমকি
পরিবেশ দূষণের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বহন করতে হয়। সুস্থ জীবনযাপনের সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়ে এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ঘাটতি দেখা দেয়।
১২। পর্যটন শিল্পের ক্ষতি
দূষণের কারণে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নষ্ট হয়, নদী-সমুদ্র ও বনভূমি আকর্ষণ হারায়। ফলে পর্যটন শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয় কমে যায়।
১৩। পরিবেশগত শরণার্থীর সৃষ্টি
জলবায়ু পরিবর্তন, নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও বন্যার ফলে বহু মানুষ বাসস্থান হারিয়ে পরিবেশগত শরণার্থী হিসেবে স্থানান্তরিত হতে বাধ্য হয়।
সর্বশেষ আমরা বলতে পারি যে পরিবেশ দূষণের ফলে মানুষসহ সকল জীব ও প্রাণীকুলের ক্ষতি সাধন করে। তাই মানুষসহ, অন্যান্য প্রাণীকুলের বসবাসের জন্য সুস্থ স্বাভাবিক ও অনুকুল পরিস্থিতি বজায় রাখার জন্য আমাদের সকলের সমন্বিত উদ্যোগে পরিবেশ দূষণ রোধ করা উচিত।

Comments
Post a Comment