টার্ম পেপার (term paper) কী? অনার্স ও মাস্টার্স টার্ম পেপার লেখার নিয়ম
ভূমিকা:- "টার্ম পেপার (Term Paper) কী এবং অনার্স ও মাস্টার্স টার্ম পেপার লেখার নিয়ম সম্পর্কে অনেক শিক্ষার্থীরই পরিষ্কার ধারণা নেই। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সমাজবিজ্ঞান বা অন্যান্য কোর্সে টার্ম পেপার, মৌখিক পরীক্ষা কিংবা মাঠ কর্ম (Field Work) পরীক্ষার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।
আমাদের মধ্যে এমন অনেক পরীক্ষার্থী আছেন যারা প্রথমবার টার্ম পেপার তৈরি করতে গিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়েন। আজকের এই পোস্টে আমরা টার্ম পেপার কিভাবে তৈরি করতে হয় এবং এর প্রতিটি ধাপ সহজভাবে আলোচনা করব। আপনি যদি এই পোস্টটি মনোযোগ সহকারে পড়েন, তবে টার্ম পেপার বিষয়ক সকল প্রশ্নের সমাধান পেয়ে যাবেন এবং ইনশাআল্লাহ্ আপনি নিজেই একটি প্রফেশনাল টার্ম পেপার লিখতে পারবেন।"
টার্ম পেপার
টার্ম পেপার হলো বিশ্লেষকমূলক রচনা বা গবেষণামূলক কাজ যা, শিক্ষার্থীদের একাডেমিক বইয়ের সামঞ্জস্য রেখে একটি শিরোনামে তৈরি করতে হয়। যা একটি বিষয়ের শিরোনামের উপর বিশ্লেষণধর্মী ও গবেষণামূলক একটি প্রবন্ধ। যাকে একাডেমিক ভাষায় টার্ম পেপার বলে। ২০১৩-১৪ সেশন হতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্স এ টার্ম পেপার অ্যাড করা হয়। টার্ম পেপার মূলত কলা অনুষদ, ব্যবসা অনুষদ ও সমাজবিজ্ঞান অনুষদের জন্য ৫০ নম্বরের একটি বিশেষ কর্ম।
টার্ম পেপার তৈরি নিয়মাবলি
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অনার্স ও মাস্টার্স শেষ পর্ব (নিয়মিত) শিক্ষার্থীদের টার্ম পেপার (Term Paper) তৈরি করতে হয়। টার্ম পেপার যেহেতু একাডেমিক পেপার তাই এটি লেখার ক্ষেত্রে কিছু নির্দিষ্ট নীতিমালা ফলো করতে হয়। আপনারা যারা টার্ম পেপার তৈরি করতে পারেন না তারা আমার দেখানো এই নিচের নীতিমালাগুলো ফলো করে আপনার টার্ম পেপারটি তৈরি করে নিতে পারেন।
টার্ম পেপার তৈরির নীতিমালা
১. খুব আকর্ষণীয় কভার পৃষ্ঠা থাকতে হবে।
২. আপনার টার্ম পেপার টিতে কমপক্ষে ৩০০০-৩৫০০ শব্দ থাকতে হবে।
৩. একটি আদর্শ টার্ম পেপারে অবশ্যই ২৫-৩০ পৃষ্ঠা লিখতে হবে তবে কমপক্ষে ২৫ পৃষ্ঠা লিখতেই হয়।
৪. টার্ম পেপার অবশ্যই সাদা কাগজ এ ফোর (A4) সাইজের হবে নরমাল কোন ডিস্তা খাতায় লিখলে হবে না।
৫. এ ফোর (A4) সাইজের কাগজের একপাশে লিখবেন (দুইপাশে লেখা যাবে না) এক সাইডে লিখবেন অন্য সাইড খালি থাকবে।
৬. বিভিন্ন কলেজ অনুযায়ী টার্ম পেপার তৈরিকরণ ২ ধরণের হয় যেমন কোন কলেজে সরাসরি হাতে লেখা আবার কোন কলেজে কম্পিউটার কম্পোজে এ লিখে জমা দিতে হয়। এজন্য টার্ম পেপার লেখার আগে শিক্ষকের পরামর্শ নিতে হয়। তবে হাতে লেখাটায় সবচেয়ে ভালো।
৭. সম্পূর্ণ টার্ম পেপারটি পরিষ্কার ও পরিমার্জিত রাখার চেষ্টা করবেন। পেইজে ১‘ ইঞ্চি পরিমাণ জায়গা রাখবেন বা মার্জিন দিবেন অযথা কোন ডিজাইন না করাই ভালো।
৮. সম্পূর্ণ টার্ম পেপারটি অবশ্যই কালো কালির বল পয়েন্ট ব্যবহার করবেন। পয়েন্ট হাইলাইট করতে সবুজ কালি/ পেন্সিল ব্যবহার করতে পারেন।
টার্ম পেপারে যা যা লিখতে হবে
টার্ম পেপার কিভাবে লিখতে হয় সে বিষয়ে আমরা উপরের আলোচনায় জেনেছি এখন আমরা জানবো একটি আদর্শ টার্ম পেপারে কী কী লিখতে হয় সে বিষয়ে-
১. বাংলা ও ইংরেজি সংমিশ্রণ করে লেখা যাবে না। সুন্দর করে বাংলায় লিখতে হবে।
২. টার্ম পেপারের ঘোষণা পত্র বা লেখকের কথা থাকতে হবে।
৩. তত্ত্বাবধায়কের কথা বা প্রত্যয়ন পত্র থাকতে হবে।
৪. কৃতজ্ঞতা স্বীকার থাকবে।
৫. সারসংক্ষেপ লেখা থাকবে।
৬. একটি আদর্শ টার্ম পেপারে অবশ্যই সুন্দর একটি সাজানো সূচিপত্র থাকবে। প্রতিটি শিরোনামের উপর (১০-১৫ টা) পয়েন্টে আলোচনা বিস্তারিত থাকবে। ২৫-৩০ পেইজে (সর্বনিম্ন ২৫ পেইজ) মধ্যে লিখতে হবে যা ৩০০০ শব্দের মত হবে ।
৭. উপসংহার লিখতে হবে।
৮. সর্বশেষ গ্রন্থপঞ্জি বা রেফারেন্স বা তথ্যসূত্রের একটা পেইজ লিখতে হবে।
তবে সকলের মনে রাখতে হবে যে, টার্ম পেপার কারও থেকে অনুলিপি করে লেখা উচিত নয়। নিজের সৃজনশীলতা ও মেধাকে কাজে লাগিয়ে নিজেই আপনার গাইড,বই, নিউজ পেপার, পত্রিকা ও ইন্টারনেট থেকে তথ্য সংগ্রহ করে তৈরি করতে হবে। ফলে আপনার অনেক কিছু শেখা ও জানা হয়ে যাবে।
টার্ম পেপার কভার পেইজ তৈরি নিয়ম
১. জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বা নিজ কলেজের নাম ঠিকানা
২. জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজের লোগো
৩. বিষয় বা শিরোনাম: আপনার যে বিষয়ে টার্ম পেপার লিখতে বলা হয়েছে সেটায় বিষয়/ শিরোনামের স্থানে লিখতে হবে।(উদাহরণস্বরূপ: বাংলাদেশের জনসংখ্যানীতি কী ও তার ঐতিহাসিক বিবর্তন তত্ত্ব আলোচনা কর)
৪. তত্ত্বাবধায়ক বা শিক্ষকের নাম: (যিনি আপনাকে টার্ম পেপার করার জন্য বলেছেন)
৫. তত্ত্বাবধায়ক বা শিক্ষকের পদবী
৬. কলেজের নাম
৭. উপস্থাপনায় (শিক্ষার্থীর নাম: আপনার নিজের নাম)
৮. মাস্টার্স শেষ পর্ব (আপনি আপনার অধ্যয়নরত অবস্থা যেটা সেটা লিখবেন অনার্স/ মাস্টার্স)
৯. শ্রেণী রোল নং-
১০. রেজিস্ট্রেশন নং-
১১. শিক্ষাবর্ষ-
১২. বিভাগের নাম: সমাজবিজ্ঞান (আপনি যে বিষয়ে অধ্যয়নরত সেটা লিখবেন)
১৩. কলেজের নাম:
১৪. জমাদানের তারিখ:
টার্ম পেপার ঘোষণাপত্র লেখার নিয়ম
আমি (আপনার নাম) ঘোষণা করছি যে, শিরোনাম/বিষয় (উদাহরণ- শিরোনাম: বাংলাদেশের জনসংখ্যানীতির ঐতিহাসিক বিবর্তন তত্ত্ব আলোচনা কর) শীর্ষক টার্ম পেপারটি সম্পূর্ণরূপে আমার নিজস্ব, একক ও মৌলিক গবেষণা কর্ম। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচি অনুযায়ী মাস্টার্স শেষ বর্ষের (আপনি যেটায় অধ্যয়নরত) জন্য দাখিলকৃত এছাড়া এই টার্ম পেপারেটি অন্য কোন প্রকাশনার জন্য উপস্থাপন করিনি।
শিক্ষার্থীর নাম: আপনার নিজের নাম
মাস্টার্স শেষ বর্ষ (আপনি যেটায় অধ্যয়নরত)
ক্লাস রোল:
শিক্ষাবর্ষ:
বিভাগ: সমাজবিজ্ঞান (আপনি যে বিষয়ে পড়েন)
কলেজের নাম:
টার্ম পেপার প্রত্যয়নপত্র লেোর নিয়ম
এই মর্মে প্রত্যয়ন করা যাচ্ছে যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর ডিগ্রি প্রাপ্তির লক্ষ্যে (কলেজের নাম) (বিভাগের/ডিপারমেন্ট নাম) এর দাখিলকৃত শিরোনাম (উদাহরণ: বাংলাদেশের জনসংখ্যানীতির ঐতিহাসিক বিবর্তন তত্ত্ব আলোচনা কর) এই টার্ম পেপারটি আমার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে লিখিত/ সম্পাদন করা হয়েছে। আমি এই টার্ম পেপারটি পাঠ করেছি ও মাস্টার্স ডিগ্রি লাভের উদ্দেশ্য উপস্থাপন করতে অনুমোদন করেছি।
উপস্থাপক বা শিক্ষকের নাম:
পদবী:
বিভাগের নাম:
কলেজের নাম:
টার্ম পেপার কৃতজ্ঞতা স্বীকার পেইজ লেখার নিয়ম
সর্বপ্রথম, আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি পরম করুণাম সৃষ্টিকর্তার নিকট যিনি আমাকে এ গবেষণা কর্মটি সম্পন্ন করার জন্য ধৈর্য ও শক্তি দিয়েছেন। আরও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি আমার (নিজ ডিপার্টমেন্ট নাম) সমাজবিজ্ঞান বিভাগের (শিক্ষকের নাম বা যিনি তত্তাবধায়ক) আমাকে এই গবেষণা কর্মটি সম্পন্ন করতে বিভিন্ন দিকনির্দেশনা এবং পরামর্শ প্রদান করেছেন। আমি বিশ্বাস করি তত্বাবধায়ক স্যারের দিকনির্দেশনা আমার টার্ম পেপার কর্মটি সম্পন্ন করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। অসংখ্য ধন্যবাদ স্যারকে আমাকে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করার জন্য। আমি স্যারের সর্বময় মঙ্গল কামনা করছি।
শিক্ষার্থীর নাম: আপনার নিজের নাম
মাস্টার্স শেষ বর্ষ (আপনি যেটায় অধ্যয়নরত)
ক্লাস রোল:
শিক্ষাবর্ষ:
বিভাগ: সমাজবিজ্ঞান (আপনি যে বিষয়ে পড়েন)
কলেজের নাম:
সারসংক্ষেপে যা লিখবেন
সারসংক্ষেপ বলতে আমরা বুঝি সংক্ষিপ্ত বিবরণকে। এই অংশে আপনার টার্ম পেপারের পুরো বিষটির একটি সারসংক্ষেপ লিখতে হবে। অর্থাৎ আপনার সম্পূর্ণ টার্ম পেপারটির সারসংক্ষেপ তুলে ধরতে হবে, যেন আপনার সুপারভাইজার/ তত্ত্বধায়ক খুব সহজেই পুরো বিষয়টি বুঝতে পারেন আপনি কোন বিষয়ের উপর আপনার টার্ম পেপারটি সম্পন্ন করেছেন। এতে আপনার পুরো প্রবন্ধটি খুব সহজেই একটি ধারণা পাওয়া যাবে।
সূচিপত্র লেখার নিয়ম
সূচিপত্রে আপনি উপরে বর্ণিত সকল বিষয় এক এক পেইজ রোমান সংখ্যায় প্রকাশ করবেন।যেমন- (i, ii, iii, iv) তারপর ক্রমিক নং ১, ২, ৩, ৪ এভাবে ‘ভূমিকা’ পেইজ হতে শুরু করে ‘উপসংহার’ পর্যন্ত এবং সর্বশেষ পেইজে ‘তথ্যসূত্র’ লিখে ও তার পেইজ নম্বর সূচিপত্রে ক্রমিকভাবে সাজাতে হবে।
গ্রন্থপঞ্জি বা তথ্যসূত্র লেখার নিয়ম
টার্ম পেপারে বর্ণিত সকল তথ্য আপনি কোথা থেকে সংগ্রহ করেছেন সে বিষয়ে এ পেইজে লিখতে হবে।
গ্রন্থাকারের নাম বা লেখকের নাম (লেখকের শেষ নাম তারপর প্রথম নাম)। উদাহরণ- হোসেন মুহাম্মদ
গ্রন্থের শিরোনাম (সামাজিক সমস্যা ও প্রতিকার)। ঢাকা: দিকদর্শন প্রকাশনী, ২০২১, ৫৬।
আপনার বইয়ের শেষে গ্রন্থপঞ্জি পেয়ে যাবেন যেখান থেকে নিয়ম দেখতে পারেন এছাড়া শিক্ষকের সহায়তা নিতে পারেন কিভাবে গ্রন্থপঞ্জি লিখবেন।
%20%E0%A6%95%E0%A6%BF.webp)