পিটার ব্লাউ-এর বৃহৎ কাঠামো তত্ত্ব আলোচনা
ভূমিকা: পিটার মাইকেল ব্লাউ অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় জন্মগ্রহণকারী একজন মার্কিন সমাজবিজ্ঞানী ও তাত্ত্বিক ছিলেন। এই সমাজবিজ্ঞানী ও তাত্ত্বিক প্রণালিবদ্ধ সমাজবিজ্ঞানের (Organizational sociology) অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। ব্লাউ-এর প্রধান আগ্রহের বিষয় ছিল বৃহৎ সমাজবিজ্ঞান (Macro sociology), সমাজ কাঠামোর স্বরবিন্যাস, আমলাতন্ত্র এবং বিনিময় তত্ত্ব (Exchange theory)। সামাজিক প্রপঞ্চের বিভিন্ন দিক যেমন- উর্ধ্বমুখী গতিশীলতা, পেশাগত সুযোগ-সুবিধা, এবং অসমস্বত্বতা ইত্যাদি বিষয়ে তত্ত্ব নির্মাণ করেন। এছাড়া মানবীয় আচরণের উপর কিভাবে সমাজ কাঠামো প্রভাব বিস্তার করে এ সম্পর্কে তিনি তত্ত্ব প্রদান করেছেন। আজ পিটার ব্লাউয়ের (The Theory of Macro-Structure) বৃহৎ কাঠামো তত্ত্ব সমর্কে আলোচনসা করব।
ব্লাউ-এর বৃহৎ কাঠামো তত্ত্ব (The Theory of Macro-Structure)
পিটার ব্লাউ সমাজতাত্ত্বিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। সমাজবিজ্ঞানে তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদাণের মধ্যে বৃহৎ কাঠামো তত্ত্ব বা Macro Structural Theory টি অন্যতম। ব্লাউ মূলত ক্ষুদ্র পরিসরে বিনিময় তত্ত্ব বিনির্মাণে প্রচেষ্টা গ্রহণ করেন এবং তা বৃহৎ পরিসরে সমাজ কাঠামোতে প্রয়োগ করেন। এখান থেকেই ব্রাউ এর Maczo Structural Theory এর উদ্ভব ও বিকাশ।
ব্লাউ-এর মতে, সামাজিক কাঠামো সামাজিক সম্পর্কের মাধ্যমে গঠিত, যা সমাজের বিভিন্ন স্তরের মধ্যকার মিথস্ক্রিয়াকে নির্দেশ করে। তিনি ধারণা করেন যে, সমাজ কাঠামোর সূচনা হয় যখন থেকে সমাজের মানুষের সামাজিকভাবে কিছু প্রাসঙ্গিক স্বতন্ত্রতার মাধ্যমে অভিন্ন গোষ্ঠী নিজেদের মধ্যে শ্রেণিবিন্যাস করতে থাকে। তাঁর মতে, সামাজিক কাঠামো সম্পর্কে বলার অর্থই হলো সমাজের মানুষের মধ্যকার পার্থক্য সম্পর্কে আলোকপাত করা। সমাজিকভাবে প্রাসঙ্গিক স্বতন্ত্রতা বলতে ব্লাউ সামাজিক বৈশিষ্ট্য দ্বারা নির্ধারিত হয় এবং এগুলো নির্ধারণ করে সমাজকে কার সাথে কিভাবে যোগাযোগ করবে। কতকগুলো প্রাসঙ্গিক সামাজিক নির্ধারক সমাজের মানুষের শ্রেণিবিন্যাসও তাদের সম্পর্ক বুঝাতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ব্লাউ সামাজিক কাঠামোর নির্ধারককে দুইভাগে বিভক্ত করেছেন।
আংশিক বা Graduated, (i) nominal বা বিশেষ্যমূলক। Simmels-এর ধারণা আধুনিক সমাজের স্বরূপ উন্মোচনের ক্ষেত্রে এবং ব্লাউ এর সমাজে কাঠামো বুঝতে অনেকটা সহায়তা করে।
Simmel বলেছেন, "A multiplicity of social relevant position বা প্রাসঙ্গিক সামাজিক অবস্থানের বহুমুখিতা এবং That these position were connected to one another in complex and sometimes mutually contradictory ways, resulting in cross-cutting soical cirele." এর অবস্থানগুলো একে অন্যের সাথে সম্পর্কিত এবং কখনো পারস্পরিক বিপরীত উপায়ে উদ্ভব হয় সমাজের মধ্যে cross-cutting social cirele.
Simmel's-এর অবস্থান দুটি পরস্পর বিপরীতভাবে সম্পর্কিত যেখানে একটির সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি পেলে স্বাভাবিকভাবে আরেকটি স্বতন্ত্র গোষ্ঠীর সাথে যোগাযোগ হ্রাস পায়। সমাজের অবস্থানগুলো পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তিতে শক্তিশালী হয়ে ওঠে যেখানে এক গোষ্ঠীর সাথে যোগাযোগ অন্যান্য আরো অনেক স্বতন্ত্র গোষ্ঠীর সাথে যোগাযোগ বা সম্পর্ক স্থাপনের সম্ভাবনা বৃদ্ধি করে।
ব্লাউ-এর মতে, সমাজের বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যকার সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল হলো তা সমাজের মানুষকে বিভিন্ন অবস্থানে বিভক্ত করে। এভাবে সমাজে মানুষের অবস্থানের বিন্যাস উচ্চ ও 'নিম্ন-শ্রেণির আন্তঃগোষ্ঠীয় যোগাযোগকে প্রভাবিত করে, যা ব্যক্তিগত পর্যায়ের যোগাযোগ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। ব্লাউ এ ধরনের আস্তাগোষ্ঠীর সামাজিক সম্পর্ককে কাঠামোগত প্রভাব হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এভাবে সামাজিক স্বতন্ত্রতার মাধ্যমে এবং আন্তঃগোষ্ঠীর সম্পর্কের ভিত্তিতে ব্লাউ তাঁর বৃহৎ কাঠামো তত্ত্ব ব্যাখ্যার প্রচেষ্টা করেছেন।
Blau এবং Schwariz বৃহৎ কাঠামো তত্ত্বকে পরীক্ষা করেন যেখানে এই তত্ত্বের বিভিন্ন প্রস্তাবনাগুলো তত্ত্বের যাচাই করা হয়। ১৯৮৪ সালে ব্লাউ তাঁর তত্ত্বের প্রথম পরীক্ষণটি করেন এবং পরবর্তীতে ১৯৯৪ সালে তাঁর তত্ত্বের শেষ পরীক্ষণের মাধ্যমে তত্ত্বটির পরিমাণও পুনঃপরীক্ষণ করেন। কর্মজীবনের শেষদিকে তিনি তাঁর গবেষণার বিভিন্ন ক্ষেত্রে আংশিকভাবে সফল হলেও সম্পূর্ণরূপে এক্ষেত্রে সফল হতে পারেনি। যার কারণে পূর্ণাঙ্গ Macro structual theory- তার ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।
উপসংহার: উপরোক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, ব্লাউ যদিও পূর্ণাঙ্গ ও বৃহৎ কাঠামো তত্ত্ব তৈরিতে সফল হতে পারেননি তবুও সমাজবিজ্ঞানের গবেষণায় তাঁর এই তত্ত্বটির অবদান অনস্বীকার্য। Fararo এবং SU varetz ব্লাউ-এর ধারণা গ্রহণ করে তাদের তাত্ত্বিক আলোচনা প্রদান করেন। বিভিন্ন তাত্ত্বিকদের জন্য তাত্ত্বিক ভিত্তি প্রদান এবং অন্যান্যভাবে ব্লাউ-এর সমাজ কাঠামোবিষয়ক Foundational ideas সমসাময়িক সমাজবিজ্ঞানের গবেষণা ও বিকাশে এক যুগান্তকারী অবদান রেখেছে।
