নারী উন্নয়নে জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত নীতি ও পদক্ষেপসমূহ আলোচনা কর

জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত নারী উন্নয়ন কার্যক্রমসমূহের বিবরণ

ভূমিকা: বিভিন্ন দেশ, দেশীয় সংস্থা, NGO এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা নারী উন্নয়নে বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করছে এবং তা বাস্তবায়নের জন্য নিরলসভাবে কাজ কয়ে যাচ্ছে। আর তাই স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বের অভিভাবক সংস্থা, জাতিসংঘ ও নারী উন্নয়নের বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে চিহ্নিত করে, নায়ী উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন নীতিমালা প্রবর্তন ও কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

নারী উন্নয়নে জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত নীতি ও পদক্ষেপ

নারী উন্নয়ন ও জাতিসংঘ:

নারী উন্নয়ন বলতে সাধারণত নারীকে তার হীন অবস্থা থেকে বের করে মানুষ হিসেবে তার মৌলিক চাহিদা পূরণের নিশ্চয়তা প্রদান করাকে বোঝায়। তাই নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত সমগ্র কর্মকান্ডকেই নারী উন্নয়নে জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত নীতিমালা বা পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

নারী উন্নয়নে জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত নীতিমালা ও পদক্ষেপসমূহ

নিম্নে নারী সমাজের উন্নতিকল্পে জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত নীতিমালা ও পদক্ষেপসমূহের বিবরণ তুলে ধরা হলো-

১. মানবালিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র প্রদান:

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র (UDHR) জারি করে, যা সকল মানুষের মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতার একটি সাধারণ মানদণ্ড নির্ধারণ করে। যেখানে প্রত্যেকেরই সমান সুযোগ পাওয়ার কথা, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও নিরাপত্তার কথা, সকল বৈষম্যের অবস্থানসহ এমন সব বিষয়ের উল্লেখ আছে যা নারীর মৌলিক অধিকার সংরক্ষণে রক্ষাকবচ হিসেবে বিবেচিত।

২. রাজনৈতিক অধিকার অনুমোদন:

১৯৫২ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ নারীর রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কিত সনদ অনুমোদন করে। এ সনদে প্রথমবারের মতো নারীর ভোটারাধিকারসহ অন্যান্য রাজনৈতিক অধিকারের স্বীকৃতি প্রদান কর। বয়

৩. বিবাহসম্পর্কিত বিধান প্রণয়ন:

১৯৬২ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ কর্তৃক বিয়ের ব্যাপারে সম্মতি, বয়স নির্ধারণ এবং বিবাহ রেজিস্ট্রিকরণ বিষয়ক সনদ অনুমোদন লাভ করে।

৪. সকল বৈষম্যের অবসান ঘোষণা:

১৯৬৭ সালের ৭ নভেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ নারীর প্রতি সকল ধরনের বৈষমা দূরীকরণ সম্পর্কিত ঘোষণা অনুমোদন করে।

৫. প্রথম বিশ্ব নারী সম্মেলন:

১৯৭৫ সালে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে মেক্সিকোতে প্রথম বিশ্ব নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনের স্লোগান ছিল সমতা, উন্নয়ন ও শান্তি। বিশ্বব্যাপী নারীনির্যাতন, অনুন্নয়ন ও অসমতার বিরুদ্ধে এ সম্মেলন সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জনায় এবং পরবর্তী ১০ বছরকে প্রথম বিশ্ব নারী দশক হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

৬. নারী প্রগতির জন্য আন্তর্জাতিক গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা:

১৯৭৬ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ কর্তৃক নারী দশকের জন্য স্বেচ্ছাসেবামূলক তহবিল ও নারীর অগ্রগতির জন্য জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হয়।

৭. নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ গ্রহণ:

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ কর্তৃক ১৯৭৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর সকল ক্ষেত্রে নারী পুরুষের সমতা অর্জনের লক্ষ্যে নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ কনভেনশন CEDAW গৃহীত হয়। এতে মোট ৩০টি ধারা আছে। এটি নারীর আন্তর্জাতিক বিল অব রাইটস হিসেবে খ্যাত।

৮. দ্বিতীয় বিশ্ব নারী সম্মেলন:

জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে ১৯৮০ সালের ১৪ থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনে দ্বিতীয় বিশ্ব নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনেও নারী অধিকার আদায়ে বিভিন্ন প্রস্তাব গৃহীত হয়।

৯. তৃতীয় বিশ্ব নারী সম্মেলন:

১৯৮৫ সালের ১৫-২৬ জুলাই কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবিতে তৃতীয় বিশ্বনারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনে পূর্বের দুটি সম্মেলনে গৃহীত পদক্ষেপসমূহ বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা ও আরও নতুন পদক্ষেপ গৃহীত হয়।

১০. নারীর প্রতি সহিংসতা দূরীকরণ সম্পর্কিত ঘোষণা:

১৯৯৩ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ নারীর প্রতি সহিংসতা দূরীকরণের ঘোষণা অনুমোদন করে এবং নারীর অধিকারকে মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে।

১১. চতুর্থ বিশ্ব নারী সম্মেলন:

১৯৯৫ সালের ৪-১৫ সেপ্টেম্বর বেইজিং-এ অনুষ্ঠিত চতুর্থ বিশ্ব নারী সম্মেলনে গৃহীত ঐতিহাসিক বেইজিং ঘোষণা ও কর্মপরিকল্পনা (Beijing Declaration and Platform for Action) ছিল নারীর অধিকার ও ক্ষমতায়নের পথে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ, যা লিঙ্গ সমতা, উন্নয়ন ও শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১২টি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে (যেমন: দারিদ্র্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সহিংসতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ইত্যাদি) কর্মপন্থা নির্ধারণ করে। এই ঘোষণাপত্রে নারীর অধিকারকে মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং পুরুষ ও নারীর সমান অংশীদারিত্ব ও সমন্বয় নিশ্চিত করার উপর জোর দেওয়া হয়, যা বিশ্বব্যাপী জেন্ডার সমতার এজেন্ডায় একটি মূল নীতিমালার পরিণত হয়েছে। 

১২. বেইজিং প্লাস ফাইভ সম্মেলন:

২০০০ সালে আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরে জাতিসংঘের এক সভায় লিঙ্গ, সমতা, উন্নয়ন ও শান্তি শীর্ষক আলোচনা হয়, যা বেইজিং গ্লাস ফাইভ নামে পরিচিত। এ সভায় পূর্ববর্তী ১০ বছরের (১৯৯৫-২০০০) অগ্রগতির পর্যালোচনা করা হয়েছিল এবং এটি জাতিসংঘের নারীর মর্যাদা বিষয়ক কমিশনের (CSW) একটি অংশ ছিল

উপসংহার: উপর্যুক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, জাতিসংঘ নারীর অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছে। বার ইস্যুজে বৈশ্বিক রূপদানে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সর্বোপরি নারীর হীন অবস্থা উত্তরণে বহুমুখী ও বিবিধ কার্যক্রন গ্রহণ ও পরিচালনা করেছে।

বাংলাদেশে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য কী কী পদক্ষেপ নেয়া যায়? আলোচনা কর

বাংলাদেশে নারীদের ক্ষমতায়নের কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায় বলে তুমি মনে কর

ভূমিকা: নারীর ক্ষমতায়ন একটি বহুমাত্রিক প্রক্রিয়া। বর্তমান বিশ্বে সর্বাধিক আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হচ্ছে নারীর ক্ষমতায়ন। কেবল মানবেতর অবস্থা থেকে নায়ীর মুক্তি বা নারী উন্নয়নের জন্য নয়, সকল সমস্যার সমাধানে প্রধান ও প্রথম ধাপ হিসেবে নারীর ক্ষমতায়নকে প্রয়োজনীয় বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। রিওডিতে ধরিত্রী সম্মেলন, ভিয়েনায় মানবাধিকার সম্মেলন, কায়রোতে জনসংখ্যা সম্মেলন, কোপেনহেগেনে সামাজিক শীর্ষ সম্মেলন এবং বেইজিংয়ে নারী শীর্ষ সম্মেলনে নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়টি বারবার এসেছে।

নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের পদক্ষেপ

নারীর ক্ষমতায়নের জন্য করণীয়  বা পদক্ষেপসমূহ:

বাংলাদেশের নারীর ক্ষমতায়নের জন্য নিম্নোক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়-

১. পুরুষতন্ত্রের উচ্ছেদ সাধন:

নারীর ক্ষমতায়নের জন্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো, পুরুষতন্ত্র হতে নারীকে বের করে আনা। কারণ পুরুষতন্ত্র নারীকে ক্ষমতাহীন করে এবং ক্ষমতায়নের পথে মারাত্মক প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে। পুরুষতন্ত্র উচ্ছেদসাধনে নারীবাদী আন্দোলন অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে। এক্ষেত্রে বিভিন্ন সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতে পারে। এভাবেই পুরুষতন্ত্রের উচ্ছেদসাধনের মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন করা যেতে পারে।

২. সচেতনতা বৃদ্ধি:

অধিকার সচেতন মানুষ পারিবারিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে ক্ষমতা চর্চা করতে পারে। নারীকে তার ভেতর থেকে সচেতন হতে হবে। নারীর সচেতনতা তৈরিতে শিক্ষা ও গণমাধ্যমগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এ ছাড়াও গ্রাম বা শহরের গণ্যমান্য ও প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীগুলোও নারীর অধিকার সচেতনতার বিষয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এতে নারী মর্যাদাবান হবে, ঘরে বাইরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।

৩. ধর্মীয় অপব্যাখ্যা রোধ:

প্রত্যেক ধর্মই শক্তিকামী কিন্তু আমাদের দেশে বহু নারী কতিপয় স্বার্থান্বেষী ব্যক্তির ফতোয়াবাজির শিকার। তাই ধর্মের অপব্যাখ্যার ফতোয়াবাজিকে কঠোরভাবে প্রতিহত করা জরুরি। এক্ষেত্রে গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন ইত্যাদি অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে।

৪. সম্পদের ওপর মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ:

নারীর ক্ষমতায়নের জন্য সম্পদের ওপর অধিকার ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। পরিবারের স্থাবর সম্পত্তিতে নারীর ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনে উত্তরাধিকার নীতিয় পরিবর্তন করা যেতে পারে। সম্পত্তিতে মালিকানা প্রাপ্তির সুবাদে নারীর হীনম্মন্যতা দূর হবে এবং তানের ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।

৫. শিক্ষার প্রসার:

সচেতন জনগোষ্ঠী গড়ে তোলার ক্ষেত্রে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। তাই নারীকে শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হবে। নারীশিক্ষার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর পরিবারগুলোকে প্রয়োজনে আর্থিক অনুদানও প্রদান করা যেতে পারে। এতে পরিবার থেকে তাগিদ অনুভূত হবে, যা প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য প্রয়োজন।

৬. কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি:

নারীর জনা উপার্জনশীল কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে। তাদেরকে দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করার জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষণ প্রদান করাও জরুরি। সর্বোপরি নারীর কর্মসংস্থানের লক্ষ্যকে সামনে রেখে সংশ্লিষ্ট সকল আইন ও নীতিমালার কার্যকর সংস্কারসাধন এবং বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করতে হবে। কেননা স্বনির্ভর উপার্জনশীপ নারীই পারে ঘরে বাইরে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে অংশ নিতে।

৭. আইনগত অধিকার প্রসারণ:

নারীয় অধিকার প্রয়োগের জন্য প্রয়োজন যথাযথ আইন ও আইনের সঠিক বাস্তবায়ন। আমাদের দেশে নারী অধিকারের সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করা সত্ত্বেও বাস্তবে এর প্রয়োগ নেই বললেই চলে। তাই নারীর জন্য রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত আইনগত অধিকারের প্রসারণ এবং স্বীকৃত আইনের যথাযথ প্রয়োগ বাঞ্ছনীয়। কেননা, আইনের বাস্তবায়ন ছাড়া কেবল লিখিত অধিকার প্রদানের ফোনোই যৌক্তিকতা দেই।

৮. নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন:

নারীর ক্ষমতায়ন ও অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন অতি জরুরি। কেননা যাজনৈতিক ক্ষমতা হচ্ছে সরল ক্ষমতায় মূল। সংসদ, ক্যাবিনেট, রাজনৈতিক দল, আমলাতন্ত্র, স্থানীয় সংস্থাসমূহে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। প্রত্যেক ক্ষেত্রে নারী যেন কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে সেই সুযোগ তাকে সৃষ্টি করে দিতে হবে।

৯. গণমাধ্যমের প্রসার:

গণমাধ্যমগুলোর ইতিবাচক কার্যক্রম ও প্রসার নারীর ক্ষমতায়নের জন্য অপরিহার্য শর্ত। কেননা দেশের সিংহভাগ নারীই গণমাধ্যমের সুবিধা থেতে বঞ্চিত। কাজেই এ সুযোগ নারীর কাছে পৌছে দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তারা খুব সহজেই রেডিও, টেলিভিশনের মতো জনপ্রিয় প্রচারমাধ্যমের খুব কাছাকাছি আসতে পারে। পাশাপাশি প্রচারমাধ্যমগুলোও নারীসমাজকে অধিকতর সচেতন করে তুলতে বাস্তবসম্মত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

১০. পারিবারিক আইন সংশোধন:

নারীর ক্ষমতায়নের জন্য প্রয়োজন গতানুগতিক পারিবারিক আইনের সংশোধন ও সমতাভিত্তিক আইন প্রণয়ন। আমাদের দেশে পারিবারিক আইন ধর্মভিত্তিক। বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার, অভিভাবকত সবই ধর্মীয় বিধান দ্বারা পরিচালিত হয়। এসব ক্ষেত্রে ধর্ম নারীকে অধস্তন করে রেখেছে।

১১. জাতীয় নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন:

জাতীয় নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন নারী উন্নয়নের লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা, পারিবারিক আইন, চাকরি, ব্যবসা ইত্যাদি ক্ষেত্রে নারীর উন্নয়নের লক্ষ্যে সমন্বিত জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন ও কার্যকর করা যেতে পারে। জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে সামাজিক কাঠামোয় বিদ্যমান নারী পুরুষের অসমতা দূর করে সমানাধিকার প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে

১২. ইতিবাচক সামাজিকীকরণ

নারীর ক্ষমতায়নের জন্য প্রয়োজন নারীর প্রতি পরিবার ও সমাজের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে শৈশব থেকে নারীর মধ্যে যে অধস্তনতাবোধ তৈরি হয়, তা দূর করতে হবে। জন্মলগ্ন থেকে যে কন্যা শিশুটি ইতিবাচক সামাজিক দৃষ্টিকোণ গড়ে উঠবে, ভবিষ্যতে সেই হবে অধিকার সচেতন।

১৩. এনজিও কর্মকাণ্ড প্রসারণ:

নারীর আত্মনির্ভরশীলতার জন্য পুঁজি প্রয়োজন। এক্ষেত্রে প্রাথমিক পুঁজি জোগান দিতে পারে বেসরকারি সংস্থাগুলো। ইতোমধ্যেই এনজিওগুলো নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যাপকভাবে ঋণ সহায়তা প্রদান করছে। একইভাবে এনজিওর উদ্যোগে নারীদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে যাতে তারা দক্ষতার সাথে স্ব-স্ব কাজ সম্পাদন করতে পারে।

উপসংহার: উপরিউক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, উল্লিখিত পদক্ষেপগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়ন সম্ভব হবে। স্থানীয় পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির জন্য যেমন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে তেমনি জাতীয় পর্যায়েও ব্যবস্থা গ্রহণ ক্ষতে হবে। সর্বত্র মতামত প্রদান ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে পারলে দারিদ্র, মৌলবাদ, এমনকি নারীনের অক্ষমতাও নারীর ক্ষমতায়নের কোনো বাঁধা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীর অবস্থান মূল্যায়ন কর

বাংলাদেশের রাজনীতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অংশগ্রহণের প্রকৃতি ও অবস্থান ব্যাখ্যা

ভূমিকা: মূলত বাংলাদেশের বর্তমান প্রধান এবং বিরোধদলীয় নেত্রী উভয়েই নারী, যা বিশ্বে বিরল। কিন্তু রাজনীতির অঙ্গনে দুনেত্রীর প্রাধান্য ও প্রচন্ড দৃশ্যমানতার পাশাপাশি বিরাজ করছে প্রায় নারী শূন্যতা। স্থানীয় পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায় সর্বস্তরে বিশেষ করে কাঠামোগত রাজনীতিতে নারীর অবস্থান মোটেই ব্যাপক, সুসংগঠিত বা সুসংহত নয়।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীর অবস্থান

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীদের অবস্থান:

রাজনৈতিক অংশগ্রহণ শুরু রাজনীতিতে অল্লাহ অনুসন্ধিৎস্য, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ এবং নাগরিকত্বকেই বোঝায় না। এয় কর্মকাজের পরিধি আরও ব্যাপক। তৃতীয় বিশ্বের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ গণআন্দোলনে অংশগ্রহণ করাকেই বোঝায়। সাধারণভাবে, ভোটদান ও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করাকেই রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপ বোঝায়। উপর্যুক্ত পর্যায়গুলো ছাড়া আরো কিছু পর্যায় যারা রাজনীতিকে নারী বাধার সম্মুখীন হয়। এসব বাধার আলোকে রাজনীতিতে বাংলাদেশের নারীদের অবস্থান কীরূপ নিম্নে তা আলোচনা করা হলো-

১. রাজনৈতিক দলে নারী বর্তমানে বাংলাদেশে প্রধান:

দুই দলের প্রধান নেত্রী নারী হলেও রাজনৈতিক দলগুলোতে নারী সদস্য নেই বললেই চলে। এখানে মোট সদস্যের সাথে নারী সদস্যের তুলনা করলে দেখা যায় নারীরা রাজনীতিতে শুধু পিছিয়েই নেই, রাজনৈতিক দলে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কমিটিতেও তাদের সংখ্যা নগণ্য। আর জামায়াতে ইসালামের কমিটিতে নায়ী সদস্য নেয়াই হয় না।

২. জাতীয় সংসদে সাধারণ আসন:

জাতীয় সংসদ থেকে প্রত্যক্ষ নির্বাচদের মাধ্যমে নির্বাচিত ৩০০ আসনের সমন্বয়ে গঠিত। প্রথম সংসদ থেকে সপ্তম সংসদ পর্যন্ত সংরক্ষিত আসনে মোট ১৬৬ জন নারী সদস্য মনোনীত হয়েছেন। ২০০১ সালে সংরক্ষিত আসনের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। এদের মধ্যে একাধিকবার সংসদ সদস্য হয়েছে ৮ জন। ৭ম জাতীয় সংসদে সরাসরি নির্বাচিত নারী সংসদ রয়েছেন ৭ জন। ১৯৯১-র সরাসরি নির্বাচিত নারী ছিলেন ৫ জন। ২০০১ সালে সরাসরি নির্বাচিত নারী ছিলেন ৬ জন।

৩. জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত আসন:

১৯৭২ সালে প্রণীত সংবিধান জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য ১৫টি আসন সংবিধান প্রবর্তনের সময় থেকে ১০ বছরের জন্য সংরক্ষিত রাখে। ১৯৭৯ সালে জাতীয় সংসদ দশম সংশোধনীর মাধ্যমে এ সংখ্যা ৩০ এ উন্নীত হয়। পরবর্তীতে আরেক দফা সংরক্ষিত আসনের মেয়াদ বেড়েছে যা ২০০১ সাল পর্যন্ত কার্যকরী হয়েছে। ২০০১ সালে সংরক্ষিত আসনের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। কিন্তু বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের দাবি সংরক্ষিত আসন বাড়িয়ে ৬৪টি করা হোক। উইমেন ফর উইমেনও অনুরূপ মত ব্যক্ত করেন।

৪. জাতীয় সংসদ নির্বাচনে:

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে রাজনীতিতে সাংগঠটিক ক্রিয়াকলাপে অংশগ্রহণের জন্য যে ধরনের সময়, সুযোগ, গতিশীলতা, যোগসূত্র ও সম্পর্ক স্থাপনের প্রয়োজন তা এদেশের নারীদের নেই। আর যারা রাষ্ট্রের ক্ষমতায় এসেছেন তাদের অধিকাংশ এসেছেন উত্তরাধিকার সূত্রে।

৫. মন্ত্রিসভায় নারী:

বাংলাদেশের মন্ত্রিসভায় নারীদের অবস্থান বিশেষভাবে লক্ষণীয়। সাধারণত গুরুত্বহীন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নারী মন্ত্রীদের নিয়োগ করা হয়। যেমন- সমাজকল্যাণ, মহিলা, সংস্কৃতি, স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা, কো-অপারেটিভ ও স্থানীয় সরকার ইত্যাদি মেয়েলি বিষয়ে তারা নিয়োজিত হয়।

৬. ইউনিয়ন পরিষদে নারী:

ইউনিয়ন পরিষদে নারী ও পুরুষ উভয়ের সমান অংশগ্রহণ ও সঠিক প্রতিনিধিত্ব সৃষ্টির লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালে স্থানীয় সরকার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী প্রবর্তিত নতুন আইন। এতে নারীদের ৩টি সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচনের বিধান করা হয়েছে। নিঃসন্দেহে নারীর ক্ষমতায়নে এটি একটি বিরাট অর্জন। ১৯৯৭ সালে নির্বাচনেই প্রখন মহিলারা প্রত্যক্ষ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অনুযায়ী, রাজনীতিতে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে নারীসের সচেতনতা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নারীদের অংশগ্রহণ আশ্চর্যজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এ কথা সত্য যে, পুরুষরা যদি সারীদেরকে সহযোগিতা না করে এবং সর্বোপরি নারীদের সচেনতা যদি বৃদ্ধি করা না যায়, তবে রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ কখনোই সম্ভব নয়।

নারীর ক্ষমতাহীনতার কারণসমূহ আলোচনা কর

নারীর ক্ষমতাহীনতার কারণসমূহ চিহ্নিত ও ব্যাখ্যা

ভূমিকা: বাংলাদেশের নারীসমাজের দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায়, নারীসমাজ ক্ষমতাহীন। নারীর এই ক্ষমতাহীনতার পেছনে অনেকগুলো কারণ রয়েছে। যেমন- অর্থনৈতিক কারণ, সামাজিক কারণ ও রাজনৈতিক কারণও বিদ্যমান রয়েছে। নিম্নে কারণগুলো আলোচনা করা হলো-

নারীর ক্ষমতাহীনতার কারণ

নারীর ক্ষমতাহীনতার অর্থনৈতিক কারণ: 

১. সম্পত্তির মালিকানাহীনতা:

নারী ক্ষমতাহীনতায় অন্যতম প্রধান কারণ হলো সম্পত্তিতে নারীদের মালিকানাহীনতা। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে বংশ নির্ধারিত হয় পুরুষের বা পিতার দিক থেকে। সকল সম্পত্তির মালিকানা নিয়ন্ত্রণ এবং উত্তরাধিকার নাজ থাকে পুরুষের ওপর শিতার দিক থেকে। বিভিন্ন ধর্মে সম্পত্তির বণ্টন বিভিন্নভাবে দেয়া হয়েছে। তবে পুরুষের চেয়ে নারীদের মালিকানা বাস আবার কখনো নেই।

২. কর্মসংস্থানের অভাব:

নারীরা উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পত্তির মালিকানা থেকে বঞ্চিত হয়। ক্ষমতাহীনতার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হালা কর্মসংস্থানের অভাব। চাকরি, সম্পদ, প্রযুক্তি তথ্য, কারিগরি সহায়তা, প্রশিক্ষণ কোনোটিতেই নারীর অংশগ্রহণের সুযোগ নেই। প্রাচীনকাল থেকেই নারীর কর্মসংস্থান গৃহস্থালির গড়ির মধ্যেই বন্দি। বর্তমানে অনেক কাজের সাথে নারীরা সম্পৃক্ত হচ্ছে কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ গ্রামীণ নাতীরা এ সুযোগ হতে বঞ্চিত।

৩. পুরুষের উপর নির্ভরশীলতা:

আমাদের দেশের নারীদের ক্ষমতাহীনতার আরও একটি কারণ হচ্ছে পুরুষের উপর নির্ভরশীলতা অধিক মাত্রায় বেশি। লিঙ্গভিত্তিক শ্রমবিভাজনের ফলে পুরুষরা ঘরের বাইরে এবং নারীরা গৃহস্থালির কাজে নিয়োজিত থাকে। নারীয় কাজের কোনো অর্থনৈতিক মূল্যায়ন করা হয় না। অধিকাংশ নারীকে তার ভরণপোষণ প্রয়োজন, বিনোদন ইত্যাদির জন্য পরিবারের গৃহকর্তা বাবা, স্বামী ভাই অর্থাৎ পুরুষ সদস্যের উপর নির্ভরশীল হতে হয়।

নারীর ক্ষমতাহীনতার সামাজিক কারণ:

১. ত্রুটিপূর্ণ সামাজিকীকরণ:

সামাজিকীকরণের জন্য বিশেষ করে গ্রামীণ নারীদের ক্ষমতাহীনতার অন্যতম একটি কারণ। পরিবার, পাড়া-প্রতিবেশী, সামাজিক সংস্থা, আত্মীয়স্বজন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, প্রচারমাধ্যম, বিয়ে ইত্যাদি সামাজিকীকরণের মাধ্যম। পুরুষতন্ত্র নির্ধারিত সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ায় নারীকে শৈশব থেকেই শেখানো হয় নারী দুর্বল সমাজজীবনে মেলামেশা তাদের জন্য নয়। এসব কারণে মেয়েরা তাদের মনোবল হারিয়ে ফেলে এবং ক্ষমতাহীন হয়ে থাকে।

২. ধর্ম ও মৌলবাদ:

আমাদের দেশের ধর্মীয় বিশ্বাসের জন্য নারীরা ক্ষমতাহীনতায় ভোগে। পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে প্রচলিত ধর্মীয় রীতিনীতি আচার-অনুষ্ঠানের জন্য নারীরা তাদের মনোজগৎকে তৈরি করে ক্ষমতাহীনভাবে। ধর্মীয় বিধিবিধানগুলো নারীর পক্ষে নয়, এগুলো পুরুষতান্ত্রিকতার পক্ষে কাজ করে। ধর্মীয় বিষয়গুলো নারীর মধ্যে হীনম্মন্যতার সৃষ্টি করে।।

৩. অশিক্ষা:

নারী ক্ষমতাহীনতার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নারীদের অশিক্ষা, যা জাতীয় জীবনেও প্রভাববিস্তার করে। কেননা উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি হলো শিক্ষা। শিক্ষা পারিবারিক ও সামাজিক ভূমিকা সম্পর্কে ব্যক্তিকে সচেতন করে তোলে এবং তা পালনে যত্নশীল হতে অনুপ্রাণিত করে। শিক্ষা মানুষের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি করে। বাংলাদেশে গ্রাম এলাকায় শিক্ষা সুবিধা তুলনামূলকভাবে অনেক কম।

৪. পুরুষতন্ত্র:

পুরুষতান্ত্রিকতা নারীদের কখনো ক্ষমতা প্রধান করে না। সমাজে পুরুষের আধিপত্য বেশি। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় বংশ নির্ধারণ হয় পিতার পরিচয়ে, সম্পত্তির মালিকানা পুরুষ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। পরিবারের নারী সদস্য হোটবেলা থেকেই বঞ্চনার শিকার হয়ে আসে। যার কারণে তারা ক্ষমতাহীন থেকে যাই।

৫. দুর্বল গণমাধ্যম:

সচেতনতার একটি মাধ্যম হলো অসমাধান আর আমাদের দেশের গণমাধ্যম দূর্বল প্রকৃতির। বাংলাদেশে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সচেতনতা তৈরিতে গণমাধ্যমগুলোর ভূমিকা নগণ্য।

নারীর ক্ষমতাহীনতার রাজনৈতিক কারণ:

১. রাজনৈতিক দলের অনীহা:

রাজনৈতিকভাবে নারী ক্ষমতাহীন করে রাখার অন্যতম কারণ হলো বড় বড় রাজনৈতিক সলের অনীহা। বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ কিংবা রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে রাজনৈতিক দলগুলোই বাধা হিসেবে কাজ করে। কোনো রাজনৈতিক দলই নারী এজেন্ডাকে গুরুত্ব দেয় না। যার ফলে রাজনৈতিকভাবে নারীদের ক্ষমতায়ন সম্ভব হয় না।

২. রাজনীতিতে সীমিত অংশগ্রহণ:

বাংলাদেশে রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ খুব সীমিত, যা নারী ক্ষমতায়নো জন্য বাধাস্বরূপ। বাংলাদেশের দুটি রাজনৈতিক দলের প্রধান নায়ী বিন্তু সার্বিকভাবে নারী অংশগ্রহণ খুব সীমিত। দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থা কোনোটিই নারীর অনুকূলে নয়। নারীরা ভোট কেন্দ্রে ভোট দিতে যায় কিন্তু দেখা যায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা নিজেদের পছন্দমতো ভোট দিতে পারে না।

৩. রাজনৈতিক সন্ত্রাস:

নারীরা এমনিতেই পরিবারের এডি থেকে বের হতে চায় না। আবার অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সন্ত্রাস বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। এতে নারীরা আরও বেশি নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করতে। রাজনৈতিক দলগুলোতে সুস্থ সংস্কৃতির অভাবে কালো টাকা, মাস্তান ও সন্ত্রাসী সঞ্চার প্রবণতা রয়েছে। এগুলো জনমতে ভীতির সঞ্চার করে এবং নারীদেরও নিরাপত্তাহীন মনোভাব তৈরি করে।

উপসংহার: নারীদের ক্ষমতাহীনতার জন্য অনেক কারণ বিদ্যমান। এই কারণগুলো থেকে বেরিয়ে এসে বর্তমানে আমাদের দেশে নারীদের ক্ষমতায়ন হচ্ছে। তবে সমাজে অনেক উপাদান রয়েছে যেগুলো নামীকে তার প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে।

বাংলাদেশে নারী উন্নয়নের প্রতিবন্ধকতা ও উত্তরণের উপায় আলোচনা কর

বাংলাদেশে নারী উন্নয়নের প্রতিবন্ধকতাসমুহ ও উত্তরণের উপায় আলোচনা কর

ভূমিকা: নারীর ক্ষমতায়ন হচ্ছে বর্তমান বিশ্বে সর্বাধিক আলোচিত বিষয়সমূহের একটি। সাম্প্রতিক সময়ে উন্নয়নশীল দেশে প্রধান ও প্রথম ধাপ হিসেবে নারীর ক্ষমতায়নকে প্রয়োজনীয় বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। কারণ পৃথিবীর সমস্ত মানবগোষ্ঠীর অর্ধেক নারী এবং একটি দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে নারীর অবদান গুরুত্বপূর্ণ।

নারী উন্নয়নের প্রতিবন্ধকতা ও উত্তরণের উপায়

নারী ক্ষমতায়নের পথে প্রতিবন্ধকতাসমূহ:

বাংলাদেশে নারী উন্নয়নের বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতাসমূহ রয়েছে। নিম্নে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবন্ধকতা আলোচনা করা হলো-

১. পিতৃতান্ত্রিক মূল্যবোধ:

নারীর ক্ষমতায়নের অন্যতম প্রতিবন্ধকতা হলো পিতৃতান্ত্রিক মূল্যবোধ। আমাদের সমাজব্যবস্থা পিতৃতান্ত্রিক। এখানে সবকিছু পরিচালিত হয় পুরুষের আদর্শ ও নিয়ম দ্বারা। নারীকে দেখা হয় সমাজের অধস্তন হিসেবে। তার কোনো সামাজিক মর্যাদা নেই। আর এ মূল্যবোধই নারীর ক্ষমতায়নের পথে বাধায় সৃষ্টি করে।

২. ধর্মীয় মৌলবাদ:

নারীর ক্ষমতায়নের পক্ষে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হলো ধর্মীয় মৌলবাদ। মৌলবাদীরা কখনো চায় না যে, নারীরা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভকরুক। এরা চায় নারীকে সর্বক্ষেত্রে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখতে যাতে তারা ক্ষমতায়ন লাভ করতে না পারে।

৩. বৈষম্যমূলক অবস্থান:

আমাদের সমাজে নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করা হয়। একটি দরিদ্র পরিবারের ছেলে সন্তানের শিক্ষার জন্য যে অর্থ ব্যয় করা হয় মেয়ে সন্তানের ক্ষেত্রে তা করা হয় না।

৪. শিক্ষার প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি:

বিরাট একদল গোষ্ঠী নারী শিক্ষার বিরোধী। এরা হলো মৌলবাদী ও ধর্মান্ত গোষ্ঠী। এরা নারীশিক্ষাকে পাশ বলে গণ্য করে। তারা মেয়েদের লেখাপড়া শেখায় না, তাদের কঠোর পর্দায় রাখে এবং বয়স হওয়ার পূর্বেই বিয়ে দেয়। ফলে শিক্ষার অভাবে নারীরা দরিদ্রতায় ভোগে এবং পুরুষের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

৫. সচেতনতার অভাব:

একজন আদর্শ নারীর ওপর নির্ভর করে আদর্শ জাতি কিন্তু অনেক দেশের নারীরা তাদের অধিকারে সচেতন নয়। ফলে তারা অনেক ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ে।

৬. রাজনৈতিক চেতনার অভাব:

নারীরা রাজনৈতিকভাবে সচেতন নয়। এর কারণ তাদের শিক্ষার অভাব। তা ছাড়া, পিতৃতন্ত্র তাদের ক্ষমতায়নের জন্য বাধা সৃষ্টি করে। ফলে তারা রাজনৈতিকভাবে চেতনা লাভ করতে পারে না।

৭. নারীর দৈহিক দুর্বলতা

নারীগন দৈহিকভাবে দুর্বল ও কম মনোবলের অধিকারী পুরুষের মতো নারীর শক্তিময়া ও   তেজ নেই। তার নিজের নিরাপত্তার জন্য পুরুষের ওপর নির্ভর করতে হয়। এটা ক্ষমতায়নের পক্ষে বাধাস্বরূপ।

৮. রাজনৈতিক কাঠামোর পর্যাপ্ত অংশগ্রহনের অভাব:

বাংলাদেশের নারীর ক্ষমতায়নের আরেকটি প্রতিবন্ধকতা হলো রাজনৈতিক কাঠামোয় তার পর্যাপ্ত অংশগ্রহণের অভাব। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে যে-কোনো ভূমিকা পালন করতে পারে না। এটা তার ক্ষমতায়নের পক্ষে প্রতিবন্ধকতাস্বরূপ।

৯. সম্পত্তির মালিকানায় অভাব:

নারী সম্পত্তির মালিকানা লাভ করতে পারে না। মুসলিম সমাজে নারী পিতৃসম্পত্তির কিয়দংশ পায়। হিন্দু নারী পিতৃসম্পত্তি পায় না। সে জীবন সঙ্গে সম্পত্তি পায়। তার মৃত্যুর পর তার সব সম্পত্তি সপিজে চলে যায়, তাতে নারীর কোনো কল্যাণ হয় না। তাছাড়া, নানাভাবে তার সম্পত্তি হাতিয়ে নেয়া হয়। ফলে সম্পত্তির অভাবে তার ক্ষমতায়ন হয় না।

১০. ধর্মীয় বিধিনিষেধ:

ধর্মীয় বিধিনিষেধ নারীর ক্ষমতায়নের জন্য বড় বাধ্য। এ নিয়ে আলেমদের মধ্যে মততেন আছে। কেউ কেউ বলেন যে, নারী নেতৃত্ব আয়েজ নয়। আবার অনেকে এ ব্যাপারে মুখ খোলেন না। তারা এটা মেনে নেন। অনেকে মনে করেন নারী রাজনৈতিক অঙ্গনে এলে পর্দার সমস্যা হবে। এসব মতামত নারীর ওপর প্রবল প্রতাব বিস্তার করে। এটা তাকে মোটানায় ফেলে। ফলে তার ক্ষমতায়ন সমস্যা সৃষ্টি হয়।

নারীর ক্ষমতায়নের প্রতিবন্ধকতা উত্তরণের উপায়সমূহ:

নারীর ক্ষমতায়নে অনেক প্রতিবন্ধকতা বিদ্যমান। নারীর ক্ষমতায়নের প্রতিবন্ধকতা দূর করার বা নারীর ক্ষমতায়নের উপায়গুলো নিম্নে আলোচনা করা হলো-

১. রাজনৈতিক কাঠামোয় নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি:

বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নের জন্য রাজনৈতিক কাঠামোয় তার অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করতে হবে। এক জন্য নারীর শিক্ষার হার বৃদ্ধি করতে হবে। তার অগ্রহ ও সচেতনতা বাড়াতে হবে এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থায় তার অংশগ্রহণের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করতে হবে। তাহলে নারীর ক্ষমতায়ন ঘটবে।

২. সর্বজনীন পারিবারিক আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন:

নারীর ক্ষমতায়দের জন্য সর্বজনীন পারিবারিক আইন প্রবর্তন করা যেতে পারে। সর্বজনীন পারিবারিক আইন নারী পুরুষ বৈষম্য কমিয়ে দেবে। এটা এদেশের নারী সমাজের দাবি। এ দাবি পূরণ হলে নারী বৈষম্যমূলক আচরণ হতে রক্ষা পাবে এবং তার ক্ষমতায়ন ত্বরান্বিত হবে। এটা যত তাড়াতাড়ি করা যাবে ততই মঙ্গল।

৩. সম্পদের ওপর মালিকানা প্রতিষ্ঠা করা:

সম্পদের ওপর নারীর মালিকানা প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং তার কাজের স্বীকৃতি দিতে হবে। সম্পদ ও কাজের স্বীকৃতি তার ক্ষমতায়নের একটি বড় উপাদান। এটা তার জীবনমান উন্নত করবে এবং তার ক্ষমতায়ন ত্বরান্বিত হবে। কারণ সম্পদের ওপর মালিকানা রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের বড় ভূমিকা পালন করে।

৪. গৃহস্থালি কাজে পুরুষের অংশগ্রহণ করা:

গৃহস্থালি কাজে নারীর পাশাপাশি পুরুষকেও অংশ নিতে হবে। তাহলে নারীরা সকল কাজে অংশ নিতে সময় পাবে। তার আয় বৃদ্ধি পাবে। সে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি লাভ করবে। ফলে তার ক্ষমতায়ন ঘটবে। তা না হলে নারীর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা আরো সংকুচিত হয়ে পড়বে।

৫. নারীর শিক্ষা ও সচেতনতা বাড়ানো:

পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ধর্মীয় গোঁড়ামি ও কুসংস্কারের মাধ্যমে নারীর শিক্ষা ও সচেতনতার পথ রুদ্ধ করে দেয়। নারীরাও এ ফাঁদে পা দেয়। ফলে সে অশিক্ষিতই থেকে যায়। তাই আধুনিক সমাজে তার যথোপযুক্ত ভূমিকা পালনের জন্য ধর্মীয় গোঁড়ামি ও কুসংস্কার পরিত্যাগ করতে হবে। তার শিক্ষা ও সচেতনতা বাড়াতে হবে। এটা সাধিত হলে তার ক্ষমতায়নও ঘটবে।

৬. নারীর দারিদ্র দূরীকরণ:

দরিদ্রতা একটি অভিশাপ। এটা ক্ষমতায়নে একটি উল্লেখযোগ্য বাধ্য। তাই নারীর ক্ষমতায়নের জন্য তার দরিদ্রতা দূর করতে হবে। তাকে বেশি করে আয়বর্ধক কাজে নিয়োগ করতে হবে। তাকে ক্ষুদ্রক্ষণের সুযোগ দিতে হবে। এতে তার কর্মসংস্থান ও আত্মকর্মসংস্থানের সুবিধা হবে এবং তার দরিদ্রতা দূরীভূত হবে। এ ব্যাপারে এনজিও-র কর্মকাণ্ড সম্প্রসারিত করতে হবে।

৭. নারী স্বাধীনতা নিশ্চিত করণ:

নারীর স্বাধীনতার অভাব তার ক্ষমতায়নে বড় বাধা। ধর্মীয় মৌলবাদী-শ্রেণি নারীর স্বাধীনতার বড় বাধা হিসেবে কাজ করে। তারা ধর্মের অপব্যাখ্যা করে নারীকে অন্তঃপুরে আবদ্ধ করে রাখে। তাকে শিক্ষা ও অন্যান্য অধিকার হতে বঞ্চিত করে স্বাধীনতা ক্ষুন্ন করে। তাই নারীর ক্ষমতায়নের জন্য নারী ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।

৮. মৌলবাদী থাবা হতে নারীদের রক্ষা:

আধুনিককালে অনেক উগ্র মৌলবাদী গোষ্ঠীর আবির্ভাব ঘটেছে। এরা নারী প্রগতি ও উন্নতির পথে বড় ব্যথা। এরা ধর্মাছ ও চরমপন্থি। এরা চায় না নারীর ক্ষমতায়ন ঘটুক। এরা নারী নেতৃত্বের বিরোধী। তাই নারীকে অন্তঃপুরে বন্দি করতে চায়। তাই এদের খাবা হতে নারীদের রক্ষা করতে হবে, তা না হলে নারীর ক্ষমতায়ন সুদূর পরাহত।

৯. নারী উন্নয়ন নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন:

নারীর ক্ষমতায়নের জন্য সুষ্ঠু নারী উন্নয়ন নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। নারী উন্নয়ন নীতির মাধ্যমে নারীর অগ্রগতি সাধন করতে হবে। উন্নয়ন নীতিতে থাকবে নারীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ব্যবস্থা, প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, প্রজনন অধিকার ও স্বাধীনতা, আইন, প্রশাসন, বিচার ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তার অংশগ্রহণ সম্পর্কিত পরিকল্পনা, নারী উন্নয়ন নীতি এভাবে তার ক্ষমতায়ন ঘটবে।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ সরকার সেসব পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে, তা অত্যন্ত ইতিবাচক কিন্তু তারপরও নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা যাচ্ছে না, তার একমাত্র কারণ শুধু পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়, বাস্তবায়ন করা হয় না। তাই এসব পদক্ষেপ যদি বাস্তবায়ন করা যায় তাহলে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা যাবে।