নারীর ক্ষমতাহীনতার কারণসমূহ আলোচনা কর

নারীর ক্ষমতাহীনতার কারণসমূহ চিহ্নিত ও ব্যাখ্যা

ভূমিকা: বাংলাদেশের নারীসমাজের দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায়, নারীসমাজ ক্ষমতাহীন। নারীর এই ক্ষমতাহীনতার পেছনে অনেকগুলো কারণ রয়েছে। যেমন- অর্থনৈতিক কারণ, সামাজিক কারণ ও রাজনৈতিক কারণও বিদ্যমান রয়েছে। নিম্নে কারণগুলো আলোচনা করা হলো-

নারীর ক্ষমতাহীনতার কারণ

নারীর ক্ষমতাহীনতার অর্থনৈতিক কারণ:

১. সম্পত্তির মালিকানাহীনতা:

নারী ক্ষমতাহীনতায় অন্যতম প্রধান কারণ হলো সম্পত্তিতে নারীদের মালিকানাহীনতা। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে বংশ নির্ধারিত হয় পুরুষের বা পিতার দিক থেকে। সকল সম্পত্তির মালিকানা নিয়ন্ত্রণ এবং উত্তরাধিকার নাজ থাকে পুরুষের ওপর শিতার দিক থেকে। বিভিন্ন ধর্মে সম্পত্তির বণ্টন বিভিন্নভাবে দেয়া হয়েছে। তবে পুরুষের চেয়ে নারীদের মালিকানা বাস আবার কখনো নেই।

২. কর্মসংস্থানের অভাব:

নারীরা উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পত্তির মালিকানা থেকে বঞ্চিত হয়। ক্ষমতাহীনতার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হালা কর্মসংস্থানের অভাব। চাকরি, সম্পদ, প্রযুক্তি তথ্য, কারিগরি সহায়তা, প্রশিক্ষণ কোনোটিতেই নারীর অংশগ্রহণের সুযোগ নেই। প্রাচীনকাল থেকেই নারীর কর্মসংস্থান গৃহস্থালির গড়ির মধ্যেই বন্দি। বর্তমানে অনেক কাজের সাথে নারীরা সম্পৃক্ত হচ্ছে কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ গ্রামীণ নাতীরা এ সুযোগ হতে বঞ্চিত।

৩. পুরুষের উপর নির্ভরশীলতা:

আমাদের দেশের নারীদের ক্ষমতাহীনতার আরও একটি কারণ হচ্ছে পুরুষের উপর নির্ভরশীলতা অধিক মাত্রায় বেশি। লিঙ্গভিত্তিক শ্রমবিভাজনের ফলে পুরুষরা ঘরের বাইরে এবং নারীরা গৃহস্থালির কাজে নিয়োজিত থাকে। নারীয় কাজের কোনো অর্থনৈতিক মূল্যায়ন করা হয় না। অধিকাংশ নারীকে তার ভরণপোষণ প্রয়োজন, বিনোদন ইত্যাদির জন্য পরিবারের গৃহকর্তা বাবা, স্বামী ভাই অর্থাৎ পুরুষ সদস্যের উপর নির্ভরশীল হতে হয়।

নারীর ক্ষমতাহীনতার সামাজিক কারণ:

১. ত্রুটিপূর্ণ সামাজিকীকরণ:

সামাজিকীকরণের জন্য বিশেষ করে গ্রামীণ নারীদের ক্ষমতাহীনতার অন্যতম একটি কারণ। পরিবার, পাড়া-প্রতিবেশী, সামাজিক সংস্থা, আত্মীয়স্বজন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, প্রচারমাধ্যম, বিয়ে ইত্যাদি সামাজিকীকরণের মাধ্যম। পুরুষতন্ত্র নির্ধারিত সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ায় নারীকে শৈশব থেকেই শেখানো হয় নারী দুর্বল সমাজজীবনে মেলামেশা তাদের জন্য নয়। এসব কারণে মেয়েরা তাদের মনোবল হারিয়ে ফেলে এবং ক্ষমতাহীন হয়ে থাকে।

২. ধর্ম ও মৌলবাদ:

আমাদের দেশের ধর্মীয় বিশ্বাসের জন্য নারীরা ক্ষমতাহীনতায় ভোগে। পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে প্রচলিত ধর্মীয় রীতিনীতি আচার-অনুষ্ঠানের জন্য নারীরা তাদের মনোজগৎকে তৈরি করে ক্ষমতাহীনভাবে। ধর্মীয় বিধিবিধানগুলো নারীর পক্ষে নয়, এগুলো পুরুষতান্ত্রিকতার পক্ষে কাজ করে। ধর্মীয় বিষয়গুলো নারীর মধ্যে হীনম্মন্যতার সৃষ্টি করে।।

৩. অশিক্ষা:

নারী ক্ষমতাহীনতার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নারীদের অশিক্ষা, যা জাতীয় জীবনেও প্রভাববিস্তার করে। কেননা উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি হলো শিক্ষা। শিক্ষা পারিবারিক ও সামাজিক ভূমিকা সম্পর্কে ব্যক্তিকে সচেতন করে তোলে এবং তা পালনে যত্নশীল হতে অনুপ্রাণিত করে। শিক্ষা মানুষের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি করে। বাংলাদেশে গ্রাম এলাকায় শিক্ষা সুবিধা তুলনামূলকভাবে অনেক কম।

৪. পুরুষতন্ত্র:

পুরুষতান্ত্রিকতা নারীদের কখনো ক্ষমতা প্রধান করে না। সমাজে পুরুষের আধিপত্য বেশি। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় বংশ নির্ধারণ হয় পিতার পরিচয়ে, সম্পত্তির মালিকানা পুরুষ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। পরিবারের নারী সদস্য হোটবেলা থেকেই বঞ্চনার শিকার হয়ে আসে। যার কারণে তারা ক্ষমতাহীন থেকে যাই।

৫. দুর্বল গণমাধ্যম:

সচেতনতার একটি মাধ্যম হলো অসমাধান আর আমাদের দেশের গণমাধ্যম দূর্বল প্রকৃতির। বাংলাদেশে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সচেতনতা তৈরিতে গণমাধ্যমগুলোর ভূমিকা নগণ্য।

নারীর ক্ষমতাহীনতার রাজনৈতিক কারণ:

১. রাজনৈতিক দলের অনীহা:

রাজনৈতিকভাবে নারী ক্ষমতাহীন করে রাখার অন্যতম কারণ হলো বড় বড় রাজনৈতিক সলের অনীহা। বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ কিংবা রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে রাজনৈতিক দলগুলোই বাধা হিসেবে কাজ করে। কোনো রাজনৈতিক দলই নারী এজেন্ডাকে গুরুত্ব দেয় না। যার ফলে রাজনৈতিকভাবে নারীদের ক্ষমতায়ন সম্ভব হয় না।

২. রাজনীতিতে সীমিত অংশগ্রহণ:

বাংলাদেশে রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ খুব সীমিত, যা নারী ক্ষমতায়নো জন্য বাধাস্বরূপ। বাংলাদেশের দুটি রাজনৈতিক দলের প্রধান নায়ী বিন্তু সার্বিকভাবে নারী অংশগ্রহণ খুব সীমিত। দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থা কোনোটিই নারীর অনুকূলে নয়। নারীরা ভোট কেন্দ্রে ভোট দিতে যায় কিন্তু দেখা যায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা নিজেদের পছন্দমতো ভোট দিতে পারে না।

৩. রাজনৈতিক সন্ত্রাস:

নারীরা এমনিতেই পরিবারের এডি থেকে বের হতে চায় না। আবার অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সন্ত্রাস বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। এতে নারীরা আরও বেশি নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করতে। রাজনৈতিক দলগুলোতে সুস্থ সংস্কৃতির অভাবে কালো টাকা, মাস্তান ও সন্ত্রাসী সঞ্চার প্রবণতা রয়েছে। এগুলো জনমতে ভীতির সঞ্চার করে এবং নারীদেরও নিরাপত্তাহীন মনোভাব তৈরি করে।

উপসংহার: নারীদের ক্ষমতাহীনতার জন্য অনেক কারণ বিদ্যমান। এই কারণগুলো থেকে বেরিয়ে এসে বর্তমানে আমাদের দেশে নারীদের ক্ষমতায়ন হচ্ছে। তবে সমাজে অনেক উপাদান রয়েছে যেগুলো নামীকে তার প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে।

আরও জানুন- বাংলাদেশে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনীতিতে নারীর অবস্থান

shikhaprotidin

I have a Master's degree in Sociology from the National University and I run my sociology and education platform Shikhaprotidin.com to help students.

নবীনতর পূর্বতন