বাংলাদেশে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য কী কী পদক্ষেপ নেয়া যায়? আলোচনা কর

বাংলাদেশে নারীদের ক্ষমতায়নের কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায় বলে তুমি মনে কর

ভূমিকা: নারীর ক্ষমতায়ন একটি বহুমাত্রিক প্রক্রিয়া। বর্তমান বিশ্বে সর্বাধিক আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হচ্ছে নারীর ক্ষমতায়ন। কেবল মানবেতর অবস্থা থেকে নায়ীর মুক্তি বা নারী উন্নয়নের জন্য নয়, সকল সমস্যার সমাধানে প্রধান ও প্রথম ধাপ হিসেবে নারীর ক্ষমতায়নকে প্রয়োজনীয় বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। রিওডিতে ধরিত্রী সম্মেলন, ভিয়েনায় মানবাধিকার সম্মেলন, কায়রোতে জনসংখ্যা সম্মেলন, কোপেনহেগেনে সামাজিক শীর্ষ সম্মেলন এবং বেইজিংয়ে নারী শীর্ষ সম্মেলনে নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়টি বারবার এসেছে।

নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের পদক্ষেপ

নারীর ক্ষমতায়নের জন্য করণীয়  বা পদক্ষেপসমূহ:

বাংলাদেশের নারীর ক্ষমতায়নের জন্য নিম্নোক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়-

১. পুরুষতন্ত্রের উচ্ছেদ সাধন:

নারীর ক্ষমতায়নের জন্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো, পুরুষতন্ত্র হতে নারীকে বের করে আনা। কারণ পুরুষতন্ত্র নারীকে ক্ষমতাহীন করে এবং ক্ষমতায়নের পথে মারাত্মক প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে। পুরুষতন্ত্র উচ্ছেদসাধনে নারীবাদী আন্দোলন অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে। এক্ষেত্রে বিভিন্ন সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতে পারে। এভাবেই পুরুষতন্ত্রের উচ্ছেদসাধনের মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন করা যেতে পারে।

২. সচেতনতা বৃদ্ধি:

অধিকার সচেতন মানুষ পারিবারিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে ক্ষমতা চর্চা করতে পারে। নারীকে তার ভেতর থেকে সচেতন হতে হবে। নারীর সচেতনতা তৈরিতে শিক্ষা ও গণমাধ্যমগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এ ছাড়াও গ্রাম বা শহরের গণ্যমান্য ও প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীগুলোও নারীর অধিকার সচেতনতার বিষয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এতে নারী মর্যাদাবান হবে, ঘরে বাইরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।

৩. ধর্মীয় অপব্যাখ্যা রোধ:

প্রত্যেক ধর্মই শক্তিকামী কিন্তু আমাদের দেশে বহু নারী কতিপয় স্বার্থান্বেষী ব্যক্তির ফতোয়াবাজির শিকার। তাই ধর্মের অপব্যাখ্যার ফতোয়াবাজিকে কঠোরভাবে প্রতিহত করা জরুরি। এক্ষেত্রে গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন ইত্যাদি অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে।

৪. সম্পদের ওপর মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ:

নারীর ক্ষমতায়নের জন্য সম্পদের ওপর অধিকার ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। পরিবারের স্থাবর সম্পত্তিতে নারীর ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনে উত্তরাধিকার নীতিয় পরিবর্তন করা যেতে পারে। সম্পত্তিতে মালিকানা প্রাপ্তির সুবাদে নারীর হীনম্মন্যতা দূর হবে এবং তানের ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।

৫. শিক্ষার প্রসার:

সচেতন জনগোষ্ঠী গড়ে তোলার ক্ষেত্রে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। তাই নারীকে শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হবে। নারীশিক্ষার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর পরিবারগুলোকে প্রয়োজনে আর্থিক অনুদানও প্রদান করা যেতে পারে। এতে পরিবার থেকে তাগিদ অনুভূত হবে, যা প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য প্রয়োজন।

৬. কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি:

নারীর জনা উপার্জনশীল কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে। তাদেরকে দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করার জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষণ প্রদান করাও জরুরি। সর্বোপরি নারীর কর্মসংস্থানের লক্ষ্যকে সামনে রেখে সংশ্লিষ্ট সকল আইন ও নীতিমালার কার্যকর সংস্কারসাধন এবং বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করতে হবে। কেননা স্বনির্ভর উপার্জনশীপ নারীই পারে ঘরে বাইরে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে অংশ নিতে।

৭. আইনগত অধিকার প্রসারণ:

নারীয় অধিকার প্রয়োগের জন্য প্রয়োজন যথাযথ আইন ও আইনের সঠিক বাস্তবায়ন। আমাদের দেশে নারী অধিকারের সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করা সত্ত্বেও বাস্তবে এর প্রয়োগ নেই বললেই চলে। তাই নারীর জন্য রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত আইনগত অধিকারের প্রসারণ এবং স্বীকৃত আইনের যথাযথ প্রয়োগ বাঞ্ছনীয়। কেননা, আইনের বাস্তবায়ন ছাড়া কেবল লিখিত অধিকার প্রদানের ফোনোই যৌক্তিকতা দেই।

৮. নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন:

নারীর ক্ষমতায়ন ও অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন অতি জরুরি। কেননা যাজনৈতিক ক্ষমতা হচ্ছে সরল ক্ষমতায় মূল। সংসদ, ক্যাবিনেট, রাজনৈতিক দল, আমলাতন্ত্র, স্থানীয় সংস্থাসমূহে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। প্রত্যেক ক্ষেত্রে নারী যেন কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে সেই সুযোগ তাকে সৃষ্টি করে দিতে হবে।

৯. গণমাধ্যমের প্রসার:

গণমাধ্যমগুলোর ইতিবাচক কার্যক্রম ও প্রসার নারীর ক্ষমতায়নের জন্য অপরিহার্য শর্ত। কেননা দেশের সিংহভাগ নারীই গণমাধ্যমের সুবিধা থেতে বঞ্চিত। কাজেই এ সুযোগ নারীর কাছে পৌছে দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তারা খুব সহজেই রেডিও, টেলিভিশনের মতো জনপ্রিয় প্রচারমাধ্যমের খুব কাছাকাছি আসতে পারে। পাশাপাশি প্রচারমাধ্যমগুলোও নারীসমাজকে অধিকতর সচেতন করে তুলতে বাস্তবসম্মত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

১০. পারিবারিক আইন সংশোধন:

নারীর ক্ষমতায়নের জন্য প্রয়োজন গতানুগতিক পারিবারিক আইনের সংশোধন ও সমতাভিত্তিক আইন প্রণয়ন। আমাদের দেশে পারিবারিক আইন ধর্মভিত্তিক। বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার, অভিভাবকত সবই ধর্মীয় বিধান দ্বারা পরিচালিত হয়। এসব ক্ষেত্রে ধর্ম নারীকে অধস্তন করে রেখেছে।

১১. জাতীয় নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন:

জাতীয় নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন নারী উন্নয়নের লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা, পারিবারিক আইন, চাকরি, ব্যবসা ইত্যাদি ক্ষেত্রে নারীর উন্নয়নের লক্ষ্যে সমন্বিত জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন ও কার্যকর করা যেতে পারে। জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে সামাজিক কাঠামোয় বিদ্যমান নারী পুরুষের অসমতা দূর করে সমানাধিকার প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে

১২. ইতিবাচক সামাজিকীকরণ

নারীর ক্ষমতায়নের জন্য প্রয়োজন নারীর প্রতি পরিবার ও সমাজের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে শৈশব থেকে নারীর মধ্যে যে অধস্তনতাবোধ তৈরি হয়, তা দূর করতে হবে। জন্মলগ্ন থেকে যে কন্যা শিশুটি ইতিবাচক সামাজিক দৃষ্টিকোণ গড়ে উঠবে, ভবিষ্যতে সেই হবে অধিকার সচেতন।

১৩. এনজিও কর্মকাণ্ড প্রসারণ:

নারীর আত্মনির্ভরশীলতার জন্য পুঁজি প্রয়োজন। এক্ষেত্রে প্রাথমিক পুঁজি জোগান দিতে পারে বেসরকারি সংস্থাগুলো। ইতোমধ্যেই এনজিওগুলো নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যাপকভাবে ঋণ সহায়তা প্রদান করছে। একইভাবে এনজিওর উদ্যোগে নারীদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে যাতে তারা দক্ষতার সাথে স্ব-স্ব কাজ সম্পাদন করতে পারে।

উপসংহার: উপরিউক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, উল্লিখিত পদক্ষেপগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়ন সম্ভব হবে। স্থানীয় পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির জন্য যেমন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে তেমনি জাতীয় পর্যায়েও ব্যবস্থা গ্রহণ ক্ষতে হবে। সর্বত্র মতামত প্রদান ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে পারলে দারিদ্র, মৌলবাদ, এমনকি নারীনের অক্ষমতাও নারীর ক্ষমতায়নের কোনো বাঁধা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না।

No comments:

Post a Comment