জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত নারী উন্নয়ন কার্যক্রমসমূহের বিবরণ
ভূমিকা: বিভিন্ন দেশ, দেশীয় সংস্থা, NGO এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা নারী উন্নয়নে বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করছে এবং তা বাস্তবায়নের জন্য নিরলসভাবে কাজ কয়ে যাচ্ছে। আর তাই স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বের অভিভাবক সংস্থা, জাতিসংঘ ও নারী উন্নয়নের বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে চিহ্নিত করে, নায়ী উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন নীতিমালা প্রবর্তন ও কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
নারী উন্নয়ন ও জাতিসংঘ:
নারী উন্নয়ন বলতে সাধারণত নারীকে তার হীন অবস্থা থেকে বের করে মানুষ হিসেবে তার মৌলিক চাহিদা পূরণের নিশ্চয়তা প্রদান করাকে বোঝায়। তাই নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত সমগ্র কর্মকান্ডকেই নারী উন্নয়নে জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত নীতিমালা বা পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
নারী উন্নয়নে জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত নীতিমালা ও পদক্ষেপসমূহ
নিম্নে নারী সমাজের উন্নতিকল্পে জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত নীতিমালা ও পদক্ষেপসমূহের বিবরণ তুলে ধরা হলো-
১. মানবালিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র প্রদান:
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র (UDHR) জারি করে, যা সকল মানুষের মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতার একটি সাধারণ মানদণ্ড নির্ধারণ করে। যেখানে প্রত্যেকেরই সমান সুযোগ পাওয়ার কথা, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও নিরাপত্তার কথা, সকল বৈষম্যের অবস্থানসহ এমন সব বিষয়ের উল্লেখ আছে যা নারীর মৌলিক অধিকার সংরক্ষণে রক্ষাকবচ হিসেবে বিবেচিত।
২. রাজনৈতিক অধিকার অনুমোদন:
১৯৫২ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ নারীর রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কিত সনদ অনুমোদন করে। এ সনদে প্রথমবারের মতো নারীর ভোটারাধিকারসহ অন্যান্য রাজনৈতিক অধিকারের স্বীকৃতি প্রদান কর। বয়
৩. বিবাহসম্পর্কিত বিধান প্রণয়ন:
১৯৬২ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ কর্তৃক বিয়ের ব্যাপারে সম্মতি, বয়স নির্ধারণ এবং বিবাহ রেজিস্ট্রিকরণ বিষয়ক সনদ অনুমোদন লাভ করে।
৪. সকল বৈষম্যের অবসান ঘোষণা:
১৯৬৭ সালের ৭ নভেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ নারীর প্রতি সকল ধরনের বৈষমা দূরীকরণ সম্পর্কিত ঘোষণা অনুমোদন করে।
৫. প্রথম বিশ্ব নারী সম্মেলন:
১৯৭৫ সালে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে মেক্সিকোতে প্রথম বিশ্ব নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনের স্লোগান ছিল সমতা, উন্নয়ন ও শান্তি। বিশ্বব্যাপী নারীনির্যাতন, অনুন্নয়ন ও অসমতার বিরুদ্ধে এ সম্মেলন সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জনায় এবং পরবর্তী ১০ বছরকে প্রথম বিশ্ব নারী দশক হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
৬. নারী প্রগতির জন্য আন্তর্জাতিক গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা:
১৯৭৬ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ কর্তৃক নারী দশকের জন্য স্বেচ্ছাসেবামূলক তহবিল ও নারীর অগ্রগতির জন্য জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হয়।
৭. নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ গ্রহণ:
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ কর্তৃক ১৯৭৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর সকল ক্ষেত্রে নারী পুরুষের সমতা অর্জনের লক্ষ্যে নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ কনভেনশন CEDAW গৃহীত হয়। এতে মোট ৩০টি ধারা আছে। এটি নারীর আন্তর্জাতিক বিল অব রাইটস হিসেবে খ্যাত।
৮. দ্বিতীয় বিশ্ব নারী সম্মেলন:
জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে ১৯৮০ সালের ১৪ থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনে দ্বিতীয় বিশ্ব নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনেও নারী অধিকার আদায়ে বিভিন্ন প্রস্তাব গৃহীত হয়।
৯. তৃতীয় বিশ্ব নারী সম্মেলন:
১৯৮৫ সালের ১৫-২৬ জুলাই কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবিতে তৃতীয় বিশ্বনারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনে পূর্বের দুটি সম্মেলনে গৃহীত পদক্ষেপসমূহ বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা ও আরও নতুন পদক্ষেপ গৃহীত হয়।
১০. নারীর প্রতি সহিংসতা দূরীকরণ সম্পর্কিত ঘোষণা:
১৯৯৩ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ নারীর প্রতি সহিংসতা দূরীকরণের ঘোষণা অনুমোদন করে এবং নারীর অধিকারকে মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে।
১১. চতুর্থ বিশ্ব নারী সম্মেলন:
১৯৯৫ সালের ৪-১৫ সেপ্টেম্বর বেইজিং-এ অনুষ্ঠিত চতুর্থ বিশ্ব নারী সম্মেলনে গৃহীত ঐতিহাসিক বেইজিং ঘোষণা ও কর্মপরিকল্পনা (Beijing Declaration and Platform for Action) ছিল নারীর অধিকার ও ক্ষমতায়নের পথে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ, যা লিঙ্গ সমতা, উন্নয়ন ও শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১২টি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে (যেমন: দারিদ্র্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সহিংসতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ইত্যাদি) কর্মপন্থা নির্ধারণ করে। এই ঘোষণাপত্রে নারীর অধিকারকে মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং পুরুষ ও নারীর সমান অংশীদারিত্ব ও সমন্বয় নিশ্চিত করার উপর জোর দেওয়া হয়, যা বিশ্বব্যাপী জেন্ডার সমতার এজেন্ডায় একটি মূল নীতিমালার পরিণত হয়েছে।
১২. বেইজিং প্লাস ফাইভ সম্মেলন:
২০০০ সালে আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরে জাতিসংঘের এক সভায় লিঙ্গ, সমতা, উন্নয়ন ও শান্তি শীর্ষক আলোচনা হয়, যা বেইজিং গ্লাস ফাইভ নামে পরিচিত। এ সভায় পূর্ববর্তী ১০ বছরের (১৯৯৫-২০০০) অগ্রগতির পর্যালোচনা করা হয়েছিল এবং এটি জাতিসংঘের নারীর মর্যাদা বিষয়ক কমিশনের (CSW) একটি অংশ ছিল
উপসংহার: উপর্যুক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, জাতিসংঘ নারীর অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছে। বার ইস্যুজে বৈশ্বিক রূপদানে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সর্বোপরি নারীর হীন অবস্থা উত্তরণে বহুমুখী ও বিবিধ কার্যক্রন গ্রহণ ও পরিচালনা করেছে।

No comments:
Post a Comment