ট্যাক্স ও ভ্যাট কী? পার্থক্য, প্রশ্নোত্তরসহ বিস্তারিত আলোচনা

ট্যাক্স ও ভ্যাট কী? পার্থক্যসহ বিস্তারিত আলোচনা

ভূমিকারাষ্ট্র পরিচালনা, উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সরকারের একটি প্রধান উৎস হলো রাজস্ব (Revenue)। এই রাজস্বের অন্যতম প্রধান অংশ আসে নাগরিকদের কাছ থেকে আদায় করা ট্যাক্স (Tax) ও ভ্যাট (VAT) এর মাধ্যমে।

ট্যাক্স ও ভ্যাট কী? পার্থক্য, প্রশ্নোত্তরসহ বিস্তারিত আলোচনা

ট্যাক্স ও ভ্যাট উভয়ই সরকারের নির্ধারিত আইন অনুযায়ী জনগণের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থ, তবে দু’টির প্রকৃতি ও প্রয়োগ ভিন্ন।

এই প্রবন্ধে আজ আমরা ট্যাক্স ও ভ্যাটের সংজ্ঞা, পার্থক্য, প্রযোজ্যতা, প্রদানের নিয়ম, করমুক্ত সীমা এবং সম্পর্কিত সব প্রশ্নোত্তর বিশদভাবে আলোচনা করা হলো।

ট্যাক্সের (Tax) সংজ্ঞা

ট্যাক্স শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ taxare থেকে, যার অর্থ “মূল্যায়ন করা” বা “অর্থ আদায় করা।”

সরলভাবে বলতে গেলে “ট্যাক্স হলো এমন একটি বাধ্যতামূলক আর্থিক অবদান যা সরকার নাগরিকদের কাছ থেকে আদায় করে, রাষ্ট্রীয় ব্যয়ভার মেটানোর উদ্দেশ্যে।”

ট্যাক্সের মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ দিয়ে সরকার রাস্তা-ঘাট নির্মাণ, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, প্রশাসনিক কাজ, সরকারি কর্মচারীর বেতন ইত্যাদি পরিচালনা করে।

উদাহরণ: আয়কর (Income Tax), সম্পদ কর (Wealth Tax), ভূমি কর (Land Tax) ইত্যাদি

ভ্যাটের (VAT) সংজ্ঞা

ভ্যাট (Value Added Tax) অর্থাৎ “মূল্য সংযোজন কর” হলো পণ্য বা সেবার বিক্রয়মূল্যের উপর আরোপিত একটি পরোক্ষ কর।

অর্থাৎ, কোনো পণ্য বা সেবা যখন উৎপাদন থেকে বিক্রয় পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে মূল্য সংযোজন হয়, তখন প্রতিটি ধাপে সরকার নির্ধারিত হারে ভ্যাট আদায় করা হয়।

সহজ ভাষায়: যখন আপনি দোকান থেকে একটি মোবাইল, পোশাক, বা খাবার কেনেন তখন তার মূল্যের মধ্যে একটি অংশ ভ্যাট হিসেবে সরকারের কাছে যায়।

উদাহরণ: মনে করেন আপনি কোনো দোকান থেকে কোন পণ্য কিনলেন ১০ হাজার টাকায়। তার মধ্যে হয়তো ১৫% ভ্যাট অন্তর্ভুক্ত আছে। যেটা দোকানদার সরকারকে ভ্যাট হিসেবে জমা দেয়।

ট্যাক্স ও ভ্যাটের মধ্যে পার্থক্য

বিষয়:                 ট্যাক্স (Tax)                     ভ্যাট (VAT)

অর্থ                    : সরকারের রাজস্বের জন্য নাগরিকদের কাছ থেকে নেওয়া বাধ্যতামূলক অর্থই ট্যাক্স।                               পণ্য ও সেবার বিক্রয়মূল্যের উপর ধার্য করা মূল্য সংযোজন করই ভ্যাট।

প্রকৃতি                 : সরাসরি কর (Direct Tax)    -     পরোক্ষ কর (Indirect Tax)

প্রদানকারী           : আয় বা সম্পদ অর্জনকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান    -     পণ্য বা সেবা ক্রেতা

আদায়কর্তা          : সরকার সরাসরি আদায় করে    - ব্যবসায়ী সরকারের পক্ষে আদায় করে

দায়ভার              : করদাতা নিজেই বহন করে    - শেষ পর্যন্ত ক্রেতাই বহন করে

উদাহরণ             : আয়কর, সম্পদ কর    - পণ্য ক্রয়ে ১৫% ভ্যাট প্রযোজ্য

কর ফাঁকি দিলে    : শাস্তিযোগ্য অপরাধ    - শাস্তিযোগ্য, ব্যবসা লাইসেন্স বাতিল হতে পারে

কাদের উপর ট্যাক্স প্রযোজ্য:

বাংলাদেশে আয়কর অধ্যাদেশ, ১৯৮৪ অনুযায়ী যাদের বার্ষিক আয় নির্দিষ্ট সীমার বেশি, তাদের ট্যাক্স দিতে হয়। এই সীমাকে বলা হয় “করমুক্ত আয়সীমা”।

২০২৪–২৫ অর্থবছরে করমুক্ত আয়সীমা:

করদাতার ধরন বার্ষিক করমুক্ত সীমা

সাধারণ পুরুষ    -    ৩,৫০,০০০ টাকা

নারী ও ৬৫ বছরের বেশি বয়সী    - ৪,০০,০০০ টাকা

প্রতিবন্ধী ব্যক্তি    - ৪,৭৫,০০০ টাকা

মুক্তিযোদ্ধা (প্রথম সারির)    - ৫,০০,০০০ টাকা

অর্থাৎ, যদি আপনার আয় এই সীমার উপরে হয়, তাহলে আপনাকে আয়কর দিতে হবে।

এর নিচে হলে ট্যাক্স দিতে হয় না, তবে অনেক ক্ষেত্রে e-TIN (Tax Identification Number) নেওয়া বাধ্যতামূলক হয় (যেমন: ব্যাংক হিসাব, পাসপোর্ট, জমি রেজিস্ট্রি ইত্যাদি দিতে)।

ট্যাক্সের ধরণসমূহ

১. সরাসরি কর (Direct Tax):  করদাতা সরাসরি সরকারকে ট্যাক্স প্রদান করে। উদাহরণ: আয়কর, সম্পদ কর।

২. পরোক্ষ কর (Indirect Tax): ব্যবসায়ী বা প্রতিষ্ঠান পণ্যের দামে ট্যাক্স যুক্ত করে, পরে সরকারকে দেয়। উদাহরণ: ভ্যাট, শুল্ক কর।

ট্যাক্সের হার (২০২৪–২৫)

বাংলাদেশে ব্যক্তিগত আয়কর হার নিম্নরূপ:

আয়সীমা   _____      করহার

প্রথম ৩,৫০,০০০ টাকা    -    করমুক্ত

পরবর্তী ১,০০,০০০ টাকা    - ৫%

পরবর্তী ৩,০০,০০০ টাকা    - ১০%

পরবর্তী ৪,০০,০০০ টাকা    - ১৫%

পরবর্তী ৫,০০,০০০ টাকা    - ২০%

৫,০০,০০০ এর বেশি আয়    - ২৫%

কাদের উপর ভ্যাট প্রযোজ্য:

ভ্যাট মূলত ক্রেতা প্রদান করে, কিন্তু ব্যবসায়ী সেটি সরকারের কাছে জমা দেয়।

অর্থাৎ, দোকানদার বা সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সরকার জনগণের কাছ থেকে ভ্যাট সংগ্রহ করে।

✅ যারা ভ্যাট প্রদান করে:

দোকান, রেস্টুরেন্ট, হোটেল, ক্লিনিক, শপিং মল, অনলাইন সেবা, মোবাইল অপারেটর ইত্যাদির পণ্য বা সেবা গ্রহণ করলে।

যেকোনো ব্যবসায়ী যার বার্ষিক টার্নওভার (বিক্রয়) ৫০ লক্ষ টাকার বেশি, তাকে ভ্যাট নিবন্ধন (BIN) নিতে হয়।

সাধারণ ভ্যাট হার:

বাংলাদেশে সাধারণভাবে ১৫% ভ্যাট কার্যকর রয়েছে।

তবে কিছু পণ্য ও সেবায় কম হারে (৫%, ৭.৫%, ১০%) ভ্যাট নির্ধারিত।

 ট্যাক্স ও ভ্যাট প্রদান পদ্ধতি 

ট্যাক্স প্রদানের পদ্ধতি:

1. e-TIN নিবন্ধন করতে হয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) ওয়েবসাইটে।

2. প্রতিবছর আয়কর রিটার্ন জমা দিতে হয় অনলাইনে বা হাতে।

3. অনলাইন পোর্টাল: https://www.incometax.gov.bd

4. ব্যাংক বা অনলাইন পেমেন্টের মাধ্যমে ট্যাক্স জমা দেওয়া যায়।

ভ্যাট প্রদানের পদ্ধতি:

1. ব্যবসায়ীর BIN (Business Identification Number) নিতে হয়।

2. প্রতিমাসে বিক্রয় অনুযায়ী নির্ধারিত হারে ভ্যাট হিসাব করতে হয়।

3. ভ্যাট অনলাইন বা ব্যাংকের মাধ্যমে সরকারকে জমা দিতে হয়।

4. ভ্যাট চালান ইস্যু করতে হয় প্রতিটি বিক্রির সময়।

কাদেরকে ট্যাক্স বা ভ্যাট দিতে হয় না

ট্যাক্স না দেওয়ার যোগ্য:

  • যাদের আয় করমুক্ত সীমার নিচে।
  • ছাত্রছাত্রী, বেকার, গৃহিণী যারা কোনো আয় করেন না।
  • এনজিও বা দাতব্য প্রতিষ্ঠান যদি করমুক্ত অনুমোদন থাকে।


ভ্যাট না দেওয়ার যোগ্য:

  • যারা পণ্য/সেবা বিক্রি করে না।
  • ক্ষুদ্র ব্যবসা (বার্ষিক বিক্রয় ৫০ লক্ষ টাকার নিচে)।
  • কৃষিজাত পণ্যের অনেক ক্ষেত্রে ভ্যাটমুক্ত।

ট্যাক্স বা ভ্যাট না দিলে কী হয়ঃ

ট্যাক্স না দিলে:

জরিমানা (নূন্যতম ১০% পর্যন্ত)।

ব্যাংক লেনদেন, পাসপোর্ট, ট্রেড লাইসেন্সে জটিলতা।

আদালত মামলা বা সম্পদ জব্দ হতে পারে।


ভ্যাট না দিলে:

ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সিলগালা হতে পারে।

লাইসেন্স বাতিল, জরিমানা ও মামলা হতে পারে।

ইলেকট্রনিক চালান না দিলে কর ফাঁকি মামলা হতে পারে।


উপসংহার: রাষ্ট্র পরিচালনায় ট্যাক্স ও ভ্যাট অপরিহার্য। ট্যাক্স সরকারের অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করে, আর ভ্যাট রাজস্বের স্থায়ী উৎস তৈরি করে। একজন সৎ নাগরিক হিসেবে কর প্রদান কেবল আইনি দায়িত্ব নয়, এটি সামাজিক দায়িত্বও।

যদি সবাই নিয়মিত ট্যাক্স ও ভ্যাট প্রদান করে, তাহলে দেশের উন্নয়ন, অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থান ব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটবে।

তাই বলা যায়-

“ট্যাক্স ও ভ্যাট দেওয়া শুধু কর্তব্য নয়, এটি দেশপ্রেমেরও প্রতীক।”

Vat and Tax Helpline- 📱16555

উপজাতি কী? বাংলাদেশের উপজাতিসমূহের জীবনধারা পরিবর্তনের কারণসমূহ আলোচনা কর

উপজাতির সংজ্ঞা ও বাংলাদেশে বসবাসরত উপজাতি গোষ্ঠীর জীবনধারা পরিবর্তনের কারণসমূহ আলোচনা

ভূমিকা: সামাজিক নৃবিজ্ঞানের অন্যতম আলোচিত প্রতায় হলো ট্রাইব বা উপজাতি-গোষ্ঠী। বিশ্বের প্রায় সবদেশেই উপজাতি গোষ্ঠীর উপস্থিতি কমবেশি লক্ষ করা যায়। আমাদের দেশেরও মোট জনসংখ্যার ১.৮ ভাগ উপজাতি। এদের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ। মোট উপজাতি সম্প্রদায়ের সংখ্যা ৪৫টি। আর উপজাতি হচ্ছে এমন একটি গোষ্ঠী যেখানে অসংখ্য কৌমগোষ্ঠী, জাতিগোষ্ঠী ও ক্ষুদ্র অন্তজগোষ্ঠীর অস্তিত্ব লক্ষ করা যায়।

উপজাতি কী? বাংলাদেশের উপজাতিসমূহের জীবনধারা পরিবর্তনের কারণসমূহ


উপজাতির সংজ্ঞা:

উপজাতি বলতে এমন একটি জনসমষ্টি বা সামাজিক গোষ্ঠীভুক্ত দলকে বোঝায়, যাদের রয়েছে একটি নিজস্ব বিশেষ ভাষা এবং সংস্কৃতি। সকল উপজাতীয় সমাজ অবশ্য কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অধীনে সংগঠিত নয়।

প্রামাণ্য সংজ্ঞা:

উপজাতি সম্পর্কে বিভিন্ন মনীষী বিভিন্ন মন্তব্য করেছেন। নিম্নে সেগুলো উল্লেখ করা হলো-

ড. খুরশীদ আলম সাগর বলেন, "মানবধারার যেই অংশ আজো নিজেদেরকেই একই পুরুষের উত্তরাধিকার মনে করে এবং যারা আধুনিক শিক্ষা, শিল্প, সাহিত্যচর্চা, সংস্কৃতি ও সভ্যতার পরিমন্ডলে থেকে অনেক দূরে রয়েছে, তাদেরকে উপজাতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক টেইলর বলেন, "উপজাতি বলতে বোঝায় এমন একটি জনগোষ্ঠী যারা মোটামুটিভাবে একটি অঞ্চলে সংগঠিত এই তাদের মধ্যে রয়েছে সাংস্কৃতিক ঐক্য এবং যার সদস্যরা মনে না যে তারা একই সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের আওতাভুক্ত।

উপজাতি সম্পর্কে নৃবিজ্ঞানী কোহেন ও ইয়ামস বলেন, উপজাতি বলতে এমন এক জনগোষ্ঠীকে বোঝায়, যারা তাদের জীবিকার জন্য খাদ্য সংগ্রহ, উদ্যান, কৃষি ও পশুপালনের উপর নির্ভর।

সমাজবিজ্ঞানী EA Hostel-এর মতে, "উপজাতি হচ্ছে এমন একটি সামাজিক গোষ্ঠী, যারা একটি বিশেষ ভাষায় কথা বলে এবং বিশেষ সংস্কৃতির অংশীদার, যা তাদের অন্য জনগোষ্ঠী থেকে পৃথক করে রাখে। তবে এরা সাধারণত রাজনৈতিকভাবে সুসংগঠিত নয়।

বোগারডাসের মতে, "উপজাতি-গোষ্ঠী রক্তের সম্পর্ক ও অভিন্ন ধর্মের উপর নির্ভরশীল।"

নৃবিজ্ঞানী রিভার্স (Revers) বলেন, "উপজাতি হচ্ছে একটি সরল প্রকৃতির সামাজিক গোষ্ঠী, যার সদস্যরা একই ভাষায় কথা বলে এবং যুদ্ধ-বিগ্রহ ও অন্যান্য সমরূপী জীবনসংগ্রামে যৌথভাবে কাজ করে।"

উইলিয়াম জে.পেরি (William J.Perry)-এর ভাষায়, 'উপজাতি হচ্ছে এমন মানবগোষ্ঠী যারা একই সাথে বসবাস করে এবং একই ভাষায় কথা বলে।"

বাংলাদেশের উপজাতি-গোষ্ঠীর জীবনধারা পরিবর্তনের কারণসমূহ

কোনো সমাজ ও সভ্যতাতে আপনা-আপনি পরিবর্তন আসে না। বরং প্রতিটি পরিবর্তনের অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। তেমনি আমাদের দেশে বসবাসরত উপজাতি-গোষ্ঠীর জীবনধারাতে পরিবর্তনের যে সূত্রপাত হয়েছে, তার পিছনেও কিছু উপাদান ক্রিয়াশীল অর্থাৎ কিছু কারণ বিদ্যমান আছে। বাংলাদেশের উপজাতি গোষ্ঠীর জীবনপ্রণালিতে পরিবর্তনের কারণসমূহ নিম্নে তুলে ধর হালা-

১ শিক্ষার প্রসার:

আমাদের দেশে বসবাসরত উপজাতি গোষ্ঠীর নতুন প্রজন্ম অন্য যে কোনো সময়ের তুলনায় অধিকহারে বিদ্যালয়ে গমন করছে। পূর্বের যে কোনো সময়ের তুলনায় উপজাতি গোষ্ঠীর মধ্যে শিক্ষার হার বর্তমানে বেশি। উপজাতি গোষ্ঠীর শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে সরকার কর্তৃক সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে উপজাতিদের জন্য বিশেষ কোটা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। যা উপজাতি গোষ্ঠেীদেরকে অধিক হারে শিক্ষাগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করছে। ফলশ্রুতিতে উপজাতি গোষ্ঠীদের মধ্যে শিক্ষার প্রসার ঘটছে। আর উপজাতি জনগোষ্ঠীর এ শিক্ষিত অংশ উপজাতি সমাজের পরিবর্তনে নেতৃত্ব দিচ্ছে।

২. এনজিওদের কার্যক্রম:

বাংলাদেশের উপজাতি-গোষ্ঠীর দুরবস্থা দূরীকরণে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সাম্বা (NGO) নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এসব NGO-এর বিভিন্ন ও বহুমুখী কল্যাণমূলক কার্যক্রম উপজাতি-গোষ্ঠীর জীকণধারাতে পরিবর্তনের সূত্রপাত ঘটিয়েছে।

৩. আত্মসচেতনতা তৈরি:

উন্নতির জন্য আগে চাই নিজের হীন অবস্থা সম্পর্কে ধারণা অর্জন অর্থাৎ আত্মসচেতনতা ছাড়া উন্নতি বা পরিবর্তন কোনোটাই আশা করা যায় না। আর শিক্ষার প্রসার উপজাতি-গোষ্ঠীর একটা অংশের মধ্যে আত্মসচেতনতার বীজ বপন করতে পেরেছে। এ আত্মসচেতনয়া অংশ ঐ সমাজের পরবর্তনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।

৪. শিল্পায়ন ও নগরায়ণের প্রভাব:

শিল্পায়ন ও নগরায়ণের ব্যাপকতার যে প্রভাব তার ছোয়া উপজাতি সমাজেও কম বেশি গিয়ে পড়েছে।

৫. বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতি:

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভূতপূর্ব উন্নতি সমাজ ও সভ্যতাকে যেমন বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে, তেমনি উপজাতি সমাজেও সে পরিবর্তনেয় ছোঁয়া লেগেছে। যেমন- উপজাতি-গোষ্ঠীর লোকেরা আনেকে ঐতিহ্যবাহী চাষাবাদ পদ্ধতি বাদ দিয়ে আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করছে।

উপসংহার: উপরিউক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, উপজাতি-গোষ্ঠী হলো যে কোনো দেশের মোট জনসংখ্যার সেই আংশ যারা স্বতন্ত্র ভাষা, সংস্কৃতি তথ্য জীবনপ্রণালির চর্চা করে আর ঐতিহ্যবাহী রীতি-নীতি, প্রথা-আচার হলো ঐ সমাজের। চালিকাশক্তি। এছাড়া উল্লিখিত কারণসমূহের দরুনই উপজাতি জীবনপ্রণালিতে পরিবর্তনের সূত্রপাত ঘটেছে একথা অনস্বীকার্য।

বাংলাদেশে উপজাতিদের সমস্যাসমূহ আলোচনা কর

বাংলাদেশে উপজাতিদের সমস্যাসমূহ আলোচনা

ভূমিকা: পৃথিবীতে বেশিরভাগ আদিবাসী গোষ্ঠীগুলো পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্নভাবে প্রান্তিক অঞ্চলে বসবাস করে। এর কারণ নিজস্ব সামাজিক, সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের স্বকীয়তার জন্য তারা নিজেরা যেমন পৃথকভাবে থাকতে চায় আবার বিভিন্ন দেশের মূলধারার জনগোষ্ঠীও এক ধরনের ইচ্ছাকৃতভাবে এদের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে চায়। বাংলাদেশে নানা কারণে অধিবাসী বা জনগোষ্ঠী অথবা উপজাতিরা নানা সমস্যায় জর্জরিত। অর্থনৈতিক, কপরিবেশগত ও রাজনৈতিক কারণে তাদের এ সমস্যার উদ্ভব হচ্ছে।

বাংলাদেশে উপজাতিদের সমস্যাসমূহ


বাংলাদেশে আদিবাসী/উপজাতি জনগোষ্ঠীর বিদ্যমান সমস্যাসমূহ

নিম্নে বাংলাদেশের উপজাতি জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন সমস্যাসমূহ আলোচনা করা হলো- 

১. নিরাপত্তার অভাব:

আদিবাসীদের নিরাপরাহীনতার জন্য বাঙালিদের দায়ী করা হয়। কেননা বাঙালিরা তাদের নিরপত্তার ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। এ পর্যন্ত অনেক বাঙালিরা অদিবাসীদের জানমাল বিনষ্ট করেছে। তাই জানমালসহ অন্যান্য নিরাপত্তার অভাব আদিবাসীদের একটি মারাত্মক সমস্যা।

২. ভূমিজনিত সমস্যা:

আদিবাসীদের অন্যতম সমস্যা হলো ভূমিজনিত সমস্যা। ভূমিকে কেন্দ্র করে বাঙালিদের সাথে জটিলতার সুযোগ নিয়ে প্রায়ই মনমালিন্যহয়।বাঙালিরা ভূমি আইনের জটিলতার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে প্রায়ই আদিবাসীদের ভূমি দখল করে থাকে। 

৩. অধিকার বঞ্চিত:

অধিকার বঞ্চিত হলো আদিবাসীদের আরেকটি সমস্যা। তাদের মৌলিক অধিকার ভোগ করার কথা সংবিধানে উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে তারা তা পরিপূর্ণভাবে ভোগ করতে পারে না।

৪. বাঙালিদের সাথে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় প্রতিবন্ধকতা

বাঙালিদের জীবনযাপন পদ্ধতি আধুনিক। অন্যদিকে, অধিবাসীদের জীবন-যাপন সনাতন পদ্ধতিতে পরিচালিত। ফলে বাঙালিদের সাথে তাদের সুসম্পর্ক বা সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা সম্ভব হচ্ছে না।

৫. শিক্ষার সুযোগ-সুবিধার অভাব:

মূলত আদিবাসীদের আধুনিক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ-সুবিধা কম। আধুনিক শিক্ষা না থাকার ফলে তাদের জীবনমান ও দৃষ্টিভঙ্গির তেমন পরিবর্তন হচ্ছে না।

৬. আধিপত্য ও বৈষম্য:

আধিপত্য ও বৈষম্যগত সমস্যা হচ্ছে আদিবাসীদের আরেকটা সমস্যা। তাদের বিভিন্ন গোত্র বা সম্প্রদায়ের মধ্যে এ বৈষম্য খুবই প্রকট।

৭. চিকিৎসার সুযোগ-সুবিধার স্বল্পতা:

আদিবাসী সমাজে আধুনিক চিকিৎসার সুযোগ-সুবিধা খুবই কম। তারা প্রায়ই প্রাচীন চিকিৎসাপদ্ধতি ব্যবহার করে থাকে।

৮. খাদ্যসংকট:

আদিবাসীদের আরেকটি অন্যতম সমস্যা হালা খাদ্যসকেট। তাদের জমি সম্পূর্ণভাবে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেই। ফলে তারা ঠিকভাবে ফসল উৎপাদন করতে পারে না।।

৯. বাসস্থান সংকট:

বাসস্থান সংকট আদিবাসীদের খুবই তীব্র। স্থানীয় নেতারা আদিবাসীদের জমি জোরপূর্বক দখল করে এবং তা বিক্রি করে। জমি দখলের কোন্দলের ফলে চাষাবাদের উপরও এর প্রভাব পড়ে। ফলে তাদের জীবন বিপন্ন হয়।

১০. সামঞ্জস্যহীনতা:

আদিবাসীরা আদিম পদ্ধতিতে জীবনযাপন করতে পছন্দ করে। ফলে আদিম অনেক রিতি-নীতি এখনও তাদের মধ্যে বলবৎ রয়েছে। ফলে তাদের এ মানসিকতায় বাঙালিদের সাথে চলতে গিয়ে আদিবাসীরা সামঞ্জস্যহীনতায় ভোগে।

১১. অত্যাচার ও নির্যাতন:

প্রায়ই স্থানীয় জনগণ কর্তৃক আদিবাসীরা অত্যাচার ও নির্যাতনের শিকার হন। তাদেরকে ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়, আয়ের পথ বন্ধ করা হয়, এমনকি শারীরিকভাবেও নির্যাতন করা হয়। আর এটি তাদের জন্য একটি ভয়াবহ সমস্যা। 

১২. অজ্ঞতা ও কুসংস্কার:

বিজ্ঞান মনস্কতা ও প্রগতিশীল মানসিকতার অভাবে আদিবাসীরা অজ্ঞতা ও কুসংস্কারে নিমজ্জিত রয়েছে। আদিবাসীরা নিজেদের কুসংস্কারগুলোকে বিশ্বাস করে এবং এরা এর পরিবর্তন চায় না। তাদের চিরায়ত ধ্যানধারণা নিজস্ব গতিতে চলে।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, বর্তমানে বাংলাদেশের আদিবাসী বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সমস্যা অনেক। আর এসব সমস্যা দীর্ঘদিন যাবৎ তারা সয়ে যাচ্ছে। তবে এগুলোর মধ্যে কিছু সমস্যা তাদের নিজস্ব সৃষ্টি এবং কিছু পরিবেশগত।

প্রান্তিকীকরণ কি? উন্নয়ন প্রকল্প কীভাবে প্রান্তিকীকরণ ঘটায়

প্রান্তিকীকরণের সংজ্ঞা এবং উন্নয়ন প্রকল্পে প্রান্তিকীকরণ

ভূমিকা: মানবসমাজে সব মানুষ সমান সুযোগ ও সুবিধা ভোগ করতে পারে না। সমাজের একটি অংশ সবসময়ই নানা কারণে পিছিয়ে পড়ে অর্থনৈতিক দারিদ্র্য, শিক্ষার অভাব, সামাজিক বৈষম্য, জাতি, লিঙ্গ, ধর্ম বা রাজনৈতিক বঞ্চনার কারণে। এদেরকে মূলধারার সমাজ থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরিয়ে দেয় সমাজের কাঠামো ও ক্ষমতার সম্পর্ক। এই অবস্থার নামই প্রান্তিকীকরণ।

প্রান্তিকীকরণ কি? উন্নয়ন প্রকল্প কীভাবে প্রান্তিকীকরণ ঘটায়


প্রান্তিকীকরণের সংজ্ঞা:

‘প্রান্তিকীকরণ’ বলতে বোঝায় সমাজের একটি নির্দিষ্ট শ্রেণি বা গোষ্ঠীর মানুষকে ধীরে ধীরে সমাজের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া বা তাদেরকে সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত রাখার প্রক্রিয়া। অর্থাৎ, যখন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সমাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সম্পদ বণ্টন বা উন্নয়নের ধারায় অংশ নিতে পারে না, তখনই তারা প্রান্তিক হয়ে পড়ে। এই প্রক্রিয়ায় সমাজের প্রভাবশালী শ্রেণি নিজেদের ক্ষমতা বজায় রাখে এবং দুর্বল শ্রেণি ক্রমাগতভাবে অবহেলিত হতে থাকে। প্রান্তিকীকরণ সমাজে বৈষম্য ও অন্যায়ের জন্ম দেয়, যা সামাজিক ঐক্য ও সমতার পথে বড় বাধা সৃষ্টি করে

উন্নয়ন প্রকল্প যেভাবে প্রান্তিকীকরণ ঘটায়

উন্নয়ন প্রকল্প প্রান্তিকীকরণ ঘটার বিভিন্ন উপায়গুলো  নিম্নে আলোচনা করা হলো-

১. জোরপূর্বক স্থানান্তকরণের মাধ্যমে প্রান্তিকীকরণ:

উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় যখন ব্যাপকভাবে ভূখণ্ড অধিগ্রহণ করা হয়, তখন জনগোষ্ঠীকে তাদের পুরাতন আবাস থেকে উচ্ছেদ করে জোরপূর্বক স্থানান্তরিত করা হয়। এ স্থানান্তরিত গোষ্ঠী দেশের অভ্যন্তরে নতুন স্থানে যেতে পারে অথবা কখনো সীমান্তবর্তী অঞ্চলে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।

২. ভৌগোলিক প্রান্তিকীকরণ:

উন্নয়ন তাড়নায় বিতাড়িত জনগোষ্ঠী অন্যত্র গিয়ে আবাস স্থাপন করলে অনেক সময় তাদেরকে দেশের মূল ভূখণ্ডে থাকতে দেওয়া হয় না। ফলে তারা সংঘবদ্ধভাবে কোনো প্রান্তিক বা সীমান্তবর্তী স্থানে বসবাস শুরু করে। কিন্তু ঘনবসতিপূর্ণ উন্নয়নশীল নগরগুলোতে এই ভূমি সংকুলান সম্ভব হয় না, যা তাদের প্রান্তিক অবস্থাকে আরও জটিল করে তোলে।

৩. সংখ্যালঘুকরণের মাধ্যমে প্রান্তিকীকরণ:

বিতাড়নের আগে জনগোষ্ঠী নিজেদের এলাকায় সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকলেও উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে স্থানান্তরিত হওয়ার পর নতুন স্থানে তারা সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়। এমনকি ধর্ম, জাতি বা ভাষায় মিল থাকলেও নতুন পরিবেশে তারা সংখ্যালঘু অবস্থায় বাধ্য হয়।

৪. সংস্কৃতি বিচ্ছিন্নকরণ:

উন্নয়ন প্রকল্পায়নের আগে নিজেদের ভূমি ও সংস্কৃতির সঙ্গে জনগোষ্ঠীর একটি নিবিড় সম্পর্ক থাকে। জোরপূর্বক বিতাড়নের ফলে সেই সম্পর্ক ছিন্ন হয় এবং তারা সাংস্কৃতিক শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ফলে নিজেদের সাংস্কৃতিক পরিচয় হারিয়ে ‘সংস্কৃতিবিহীন’ জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়, যা তাদের মধ্যে গভীর প্রান্তিক মানসিকতা সৃষ্টি করে।

৫. প্রজন্ম হতে প্রজন্মে দুষ্টচক্রের প্রান্তিকতা:

ক্যারোলিন কেগান (২০০৩) বলেন, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড দ্বারা বিতাড়িত জনগোষ্ঠী নতুন সংস্কৃতিতে সঠিকভাবে আত্তীকৃত হতে পারে না। এই প্রান্তিক মানসিকতা তারা তাদের পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যেও ছড়িয়ে দেয়। ফলে নতুন প্রজন্মও আত্মীকরণের প্রতি অনীহা প্রকাশ করে এবং এই প্রান্তিক চেতনা প্রজন্মান্তরে আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

৬. অর্থনৈতিক অবস্থার অবনয়নের মাধ্যমে প্রান্তিকীকরণ:

উচ্ছেদ ও স্থানান্তরের ফলে জনগণ তাদের পূর্ববর্তী অর্থনৈতিক ভিত্তি, পেশা ও সম্পদ হারায়। তারা হঠাৎ করেই বেকারত্ব ও দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে যায়। ফলস্বরূপ, নিম্নমানের পেশায় নিযুক্ত হয়ে অর্থনৈতিক প্রান্তিকতায় নিমজ্জিত হয়।

৭. পারিবারিক ও জাতিগত বিচ্ছিন্নতার মাধ্যম:

অ্যানথনি অলিভার স্মিথ (২০০১) দেখিয়েছেন যে, উন্নয়ন প্রকল্প দ্বারা বিতাড়ন পাশ্চাত্য ও অপাশ্চাত্য সমাজে ভিন্নভাবে প্রভাব ফেলে। পাশ্চাত্যে এটি ব্যক্তিক পর্যায়ে ঘটে, কিন্তু অপাশ্চাত্যে পরিবারভিত্তিক সমাজে এটি গোটা জ্ঞাতি কাঠামোকে ভেঙে দেয়। ফলে ঐতিহ্যবাহী পারিবারিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধন বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

৮. রাজনৈতিক প্রক্রিয়া বিনষ্টকরণ:

উন্নয়ন তাড়নে বিতাড়িত জনগোষ্ঠী তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচিতি হারিয়ে ফেলে। নতুন স্থানে টিকে থাকার সংগ্রামে তারা রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। অতীতের রাজনৈতিক সম্পর্ক ও পরিচিতি হারিয়ে ‘ডায়াস্পোরা’ অবস্থায় উপনীত হয়, যা তাদের প্রান্তিক রাজনৈতিক চেতনাকে আরও গভীর করে।

৯. ভাষাগত প্রান্তিকীকরণ:

অনেক সময় বিতাড়িত জনগোষ্ঠীর ভাষা নতুন স্থানের ভাষার সঙ্গে মেলে না। ফলে ভাষাগত প্রতিবন্ধকতার কারণে তাদের যোগাযোগ ব্যাহত হয় এবং তারা সমাজে সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়। এভাবেই ভাষাভিত্তিক প্রান্তিকীকরণও সৃষ্টি হয়।

উপসংহার: পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, উন্নয়ন প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য সমাজের সামগ্রিক উন্নয়ন হলেও বাস্তবে অনেক সময় তা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বঞ্চনা, উচ্ছেদ ও বিচ্ছিন্নতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও সামাজিক ন্যায্যতা নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে উন্নয়ন প্রকল্প নতুন প্রান্তিকীকরণ না ঘটিয়ে প্রকৃত অর্থে সবার কল্যাণ বয়ে আনে।

বাংলাদেশের চাকমা উপজাতির আর্থসামাজিক ও সংস্কৃতিক জীবনধারা

বাংলাদেশে বসবাসকারী চাকমা সমাজের আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনধারা আলোচনা

ভূমিকা: ভৌগোলিক পরিবেশের তারতম্যের কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের মধ্যে বিভিন্ন রকম বৈচিত্র্য লক্ষ করা যায়। আর এ বৈচিত্র্যের কারণে নৃবিজ্ঞানীরা সমগ্র মানবজাতিকে বিভিন্ন বিভাগে ও উপবিভাগে বিভক্ত করেন। বাংলাদেশে নানান জনগোষ্ঠীর মধ্যে উপজাতীয় জনগোষ্ঠী অন্যতম। আমাদের দেশের বিভিন্ন উপজাতি বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা অন্যান্য উপজাতির মতোই অশিক্ষিত। এসব উপজাতির জীবনধারার মধ্যে কিছু কিছু পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী চাকমা উপজাতি বাংলাদেশের বিভিন্ন উপজাতির মধ্যে অন্যতম।

বাংলাদেশের চাকমা উপজাতির আর্থসামাজিক ও সংস্কৃতিক জীবনধারা


চাকমা সমাজের আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনধারা

নিম্নে বাংলাদেশের চাকমা উপজাতির আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনধারা আলোচনা করা হলো।

১। বাসস্থান:

বাংলাদেশের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলের পার্বত্য অঞ্চল হিসেবে পরিচিত তিনটি জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবান। বাংলাদেশের এ তিনটি জেলাতেই চাকমারা বসবাস করে। তবে এ তিনটির মধ্যে রাঙামাটি জেলায় সবচেয়ে বেশি চাকমার বাস। আমাদের প্রতিবেশি রাষ্ট্র ভারতেও বেশ কিছু সংখ্যক চাকমা বসবাস করে।।

২. নামকরণ:

বয়স্ক শিক্ষিত চাকমাগণ নিজেদের জন্য চাকমা নামটিই ব্যবহার করেন। অপরপক্ষে, চাকমা সমাজের বৃহত্তর গ্রামীণ জনগোষ্ঠী চাকমা নামেই নিজেদের পরিচয় দেন। বর্তমান শিক্ষিত যুবক চাকমাদের অনেকেই চাকমার চেয়ে ‘চাঙমা’ নামটি ব্যবহারে পক্ষপাতি।

৩. জনগণ:

জনসংখ্যার দিক থেকে চাকমারা বাংলাদেশের সবচেয়ে বৃহত্তম উপজাতি। ১৯৯১ সালের লোক গণনার হিসেবে বাংলাদেশের রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবান এ তিন জেলায় চাকমা জনসংখ্যা ছিল সর্বমোট প্রায় ৩ লক্ষ। চাকমারা মোট ট্রাইবাল জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক।

৪. ভাষা:

বর্তমানে চাকমারা একটি বাংলা উপভাষায় কথা কলে। ভাষাগতভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় চাকমারা আগে ‘টিবোটা’ বার্মী ভাষা পরিবারভুক্ত আরাকানি ভাষায় কথা বলত। পরবর্তীতে তারা ইংন্দো-ইউরোপীয় পরিবারের অন্তর্ভুক্ত প্রতিবেশী বাংলা ভাষা গ্রহণ করে। চাকমাদের নিজস্ব লিপি আছে। তাতে আরাকানি অক্ষরের প্রাধান্যই বেশি। তবে চাকমারা লেখার কাজে বাংলা হরফ ব্যবহার করে।

৫. নরগোষ্ঠীগত পরিচয়:

চাকমাদের মধ্যে মঙ্গোলীয় নরগোষ্ঠীর প্রভাব সমতলবাসী বাঙালিদের তুলনায় অনেক বেশি। চাকমাদের সাথে চীনা মঙ্গোলয়েডদের যথেষ্ট মিল। তারা উচ্চতায় মাঝারি থেকে বেঁটে। দৈহিক গড়নেও এরা বেশ শক্তিশালী।

৬. ধর্ম:

চাকমারা হীনযানপন্থি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। চাকমারা বৌদ্ধ ধর্মের বিভিন্ন অনুষ্ঠান পালন করে। চাকমাদের গ্রাম্য এলাকায় বৌদ্ধ মন্দির ক্যাং দেখতে পাওয়া যায়। চাকমারা গোজেন নামের ঈশ্বরকে খুবই ভক্তি শ্রদ্ধা করে।

৭. চাকমা সমাজের গড়ন:

চাকমা সমাজের ক্ষুদ্র সংগঠন হলো পরিবার। এরপর রয়েছে গোত্তি বা গোজা। এর চেয়ে বৃহৎ আয়তনের সামাজিক একক হলো আদাম বা পাড়া। তার চেয়ে অধিক আয়তন হলো গ্রাম বা মৌজা। মৌজার পরে বৃহত্তর চাকমা সমাজ সংগঠন হলো চাকমা সার্কেল বা চাকমা ট্রাইবাল সংগঠন।

৮. পরিবার:

চাকমা পরিবার পিতৃতান্ত্রিক। পরিবারের ক্ষমতা স্বামীর হাতে বা বয়স্ক পুরুষের হাতে ন্যস্ত। সম্পত্তি বা বংশপরিচয় পিতা থেকে পুত্রে উত্তরাধিকারসূত্রে বর্তায়। বিয়ের পর চাকমা দম্পত্তি স্বামীর পিতৃগৃহে বা পিতার গ্রামে বসবাস করে। অর্থাৎ পিতৃবাস এবং নয়াবাস রীতি অনুসৃত হয়।

৯. বিবাহ:

চাকমাসমাজে Cross cousin বিবাহ প্রচলিত আছে। অর্থাৎ মামাতো ভাই-বোন যা ফুফাতো ভাই বোনদের মধ্যে বিবাহ হয়ে থাকে। তাদের মাঝে প্যারালাল কাজিন বিবাহও সীমিত অর্থে প্রচলিত। তবে আপন চাচাতো ভাই-বোনের মধ্যে বিয়ে অনুষ্ঠানে সামাজিক বাঁধা নিষেধ রয়েছে।

১০. বিবাহবিচ্ছেদ:

চাকমাসমাজে খুব কমই বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। বিবাহ বিচ্ছেদ একান্ত জরুরি হলে গ্রামে সালিস বসে। স্ত্রী দোষী হলে স্বামী-স্ত্রীকে দেয়া পোশাক ও গহনাপত্র দাবি করতে পারে। অপরপক্ষে, স্বামী দোষী হলে তাকে জরিমানা দিতে হয়। এভাবে সালিশের মাধ্যমে বিবাহবিচ্ছেন ঘটে।

১১. নেতৃত্ব:

আদামের নেতৃত্বে কারবারি, মৌজার নেতৃত্বে হডম্যান এবং চাকমা উপজাতি তথা সার্কেলের নেতৃত্বে চাকমা রাজার ব্যবস্থা এখনো রয়েছে। তবে বর্তমানে নেতৃত্বে কিছু প্ররিবর্তন লক্ষ করা যায়।

১২. খাদ্য ও বাসস্থান:

চাকমাদের প্রধান আহার্য দ্রব্য হলো ভাত ও মদ। মদ এরা নিজেরাই তৈরি করে নেয়। তারা মাটি থেকে প্রায় ছয় ফুট উচুতে মাচার উপর ঘর তৈরি করে সেখানে বাস করে। ঘরটিকে কয়েকটি কামরায় ভাগ করা হয়ে থাকে।

১৩. পোশাক-পরিচ্ছদ:

চাকমা পুরুষদের পরিধেয় বস্ত্রের মধ্যে ধুতি পাঞ্জাবি উল্লেখযোগ্য। নারীদের ব্যবহার্য পোশাক পরিচ্ছেদ হলো পিন্দন, খাদি, খালাং ইত‍্যাদি। আজকাল শিক্ষিত নারীরা শাড়ি ও ব্লাউজ পরিধান করে।

১৪. শিল্প ও সংস্কৃতি:

চাকমাদের শিল্প সংস্কৃতির বৈচিত্র্যময়। বাংলা লোকসাহিত্য সমৃদ্ধশালী করার ক্ষেত্রে তাদের অবদান কম নয়। আধুনিক শিক্ষা গ্রহণের ফলে চাকমাদের জীবনযাপন পদ্ধতিতে এসেছে পরিবর্তনের ঢেউ।

১৫. অর্থনীতি:

চাকমারা জুম চাষের উপর বেশি নির্ভরশীল। তাদের জন্য ব্যক্তি মালিকানায় জমি বরাদ্দ দেয়া আছে। বর্তমান চাকমারা হালচাষ পদ্ধতি শিখছে। দুই পাহাড়ের সমতল অংশে চাকমারা ধান চাষ করে থাকে। তারা রাবার চাষ ও কাঠের গাছ চাষ করে থাকে।

১৬. চাকমাদের শিক্ষা:

অন্যান্য উপজাতির তুলনায় চাকমার বেশি শিক্ষিত। তারা বাংলা ও ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করেছে অধিকহারে। বর্তমানে উচ্চশ্রেণিতে ভর্তির ক্ষেত্রে উপজাতীয় কোঁটা পদ্ধতিতে এরা সুযোগ পাচ্ছে। তারা সভ্যসমাজের লোকদের মত চাকরি এবং অন্যান্য পেশায় নিয়োজিত।

১৭. খেলাধুলা:

চাকমাদের মধ্যে হা-ডু-ডু খেলা ফার খেলা, লাটিম খেলা, কুস্তি, রশি টানাটানি, সাঁতার ও দৌড় প্রতিযোগিতা প্রচলিত ছিল। ছেলেদের প্রিয় খেলা ছিল পাটি খেলা, গিলা খেলা প্রভৃতি।

১৮. কুসংস্কার:

অনেকের মতে চাকমা সমাজে অনেক কুসংস্কার প্রচলিত ছিল। কারণ তাদের মধ্যে দৈত্য দানবে বিশ্বাস প্রচলিত রয়েছে। রোগ মুক্তির জন্য তারা ঝাঁড় ফুঁকে বিশ্বাস করত, যা আধুনিক সমাজব্যবস্থার সাথ পুরোপুরি অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

১৯. অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া:

চাকমা সমাজে মৃতদেহ আগুনে পোড়ানো হয়। তবে, সাত বছরের কম বয়সিদের কবর দেয়া হয়। মৃত্যুর সাত দিন পর মৃতের বিদেহী আত্মার উদ্দেশ্য সাতদিন্যা নামের এক অনুষ্ঠান পালন করা হয়। এ অনুষ্ঠানে মৃতের আত্তার জন্য খাদ্য, মদ, অর্থ, কাপড় ইত্যাদি উৎসর্গ করা হয়।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, পরিবর্তনে তথা সমাজ ও সরকারের বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির সাথে চাকমাদের আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থার পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। বর্তমানে চাকমা বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছে। ধর্মের পরিবর্তদের ক্ষেত্রে এক জাগরণ এসেছে। শিক্ষার প্রসারের ফলে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এ কথা সত্য যে, ভবিষ্যতে চাকমারা সভ্যসমাজে আসতে সক্ষম হবে।