ট্যাক্স ও ভ্যাট কী? পার্থক্য, প্রশ্নোত্তরসহ বিস্তারিত আলোচনা

ট্যাক্স ও ভ্যাট কী? পার্থক্যসহ বিস্তারিত আলোচনা

ভূমিকা: রাষ্ট্র পরিচালনা, উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সরকারের একটি প্রধান উৎস হলো রাজস্ব (Revenue)। এই রাজস্বের অন্যতম প্রধান অংশ আসে নাগরিকদের কাছ থেকে আদায় করা ট্যাক্স (Tax) ও ভ্যাট (VAT) এর মাধ্যমে।

ট্যাক্স ও ভ্যাট কী? পার্থক্য, প্রশ্নোত্তরসহ বিস্তারিত আলোচনা

ট্যাক্স ও ভ্যাট উভয়ই সরকারের নির্ধারিত আইন অনুযায়ী জনগণের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থ, তবে দু’টির প্রকৃতি ও প্রয়োগ ভিন্ন।

এই প্রবন্ধে আজ আমরা ট্যাক্স ও ভ্যাটের সংজ্ঞা, পার্থক্য, প্রযোজ্যতা, প্রদানের নিয়ম, করমুক্ত সীমা এবং সম্পর্কিত সব প্রশ্নোত্তর বিশদভাবে আলোচনা করা হলো।

ট্যাক্সের (Tax) সংজ্ঞা

ট্যাক্স শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ taxare থেকে, যার অর্থ “মূল্যায়ন করা” বা “অর্থ আদায় করা।”

সরলভাবে বলতে গেলে “ট্যাক্স হলো এমন একটি বাধ্যতামূলক আর্থিক অবদান যা সরকার নাগরিকদের কাছ থেকে আদায় করে, রাষ্ট্রীয় ব্যয়ভার মেটানোর উদ্দেশ্যে।”

ট্যাক্সের মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ দিয়ে সরকার রাস্তা-ঘাট নির্মাণ, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, প্রশাসনিক কাজ, সরকারি কর্মচারীর বেতন ইত্যাদি পরিচালনা করে।

উদাহরণ: আয়কর (Income Tax), সম্পদ কর (Wealth Tax), ভূমি কর (Land Tax) ইত্যাদি

ভ্যাটের (VAT) সংজ্ঞা

ভ্যাট (Value Added Tax) অর্থাৎ “মূল্য সংযোজন কর” হলো পণ্য বা সেবার বিক্রয়মূল্যের উপর আরোপিত একটি পরোক্ষ কর।

অর্থাৎ, কোনো পণ্য বা সেবা যখন উৎপাদন থেকে বিক্রয় পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে মূল্য সংযোজন হয়, তখন প্রতিটি ধাপে সরকার নির্ধারিত হারে ভ্যাট আদায় করা হয়।

সহজ ভাষায়: যখন আপনি দোকান থেকে একটি মোবাইল, পোশাক, বা খাবার কেনেন তখন তার মূল্যের মধ্যে একটি অংশ ভ্যাট হিসেবে সরকারের কাছে যায়।

উদাহরণ: আপনি দোকান থেকে মোবাইল কিনলেন ১০,০০০ টাকায়।তার মধ্যে হয়তো ১৫% ভ্যাট অন্তর্ভুক্ত আছে। দোকানদার সরকারকে সেই ভ্যাট জমা দেয়।

ট্যাক্স ও ভ্যাটের মধ্যে পার্থক্য

বিষয়:                 ট্যাক্স (Tax)                     ভ্যাট (VAT)

অর্থ                    : সরকারের রাজস্বের জন্য নাগরিকদের কাছ থেকে নেওয়া বাধ্যতামূলক অর্থই ট্যাক্স।                               পণ্য ও সেবার বিক্রয়মূল্যের উপর ধার্য করা মূল্য সংযোজন করই ভ্যাট।

প্রকৃতি                 : সরাসরি কর (Direct Tax)    -     পরোক্ষ কর (Indirect Tax)

প্রদানকারী           : আয় বা সম্পদ অর্জনকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান    -     পণ্য বা সেবা ক্রেতা

আদায়কর্তা          : সরকার সরাসরি আদায় করে    - ব্যবসায়ী সরকারের পক্ষে আদায় করে

দায়ভার              : করদাতা নিজেই বহন করে    - শেষ পর্যন্ত ক্রেতাই বহন করে

উদাহরণ             : আয়কর, সম্পদ কর    - পণ্য ক্রয়ে ১৫% ভ্যাট

কর ফাঁকি দিলে    : শাস্তিযোগ্য অপরাধ    - শাস্তিযোগ্য, ব্যবসা লাইসেন্স বাতিল হতে পারে

কাদের উপর ট্যাক্স প্রযোজ্য:

বাংলাদেশে আয়কর অধ্যাদেশ, ১৯৮৪ অনুযায়ী যাদের বার্ষিক আয় নির্দিষ্ট সীমার বেশি, তাদের ট্যাক্স দিতে হয়। এই সীমাকে বলা হয় “করমুক্ত আয়সীমা”।

২০২৪–২৫ অর্থবছরে করমুক্ত আয়সীমা:

করদাতার ধরন বার্ষিক করমুক্ত সীমা

সাধারণ পুরুষ    -    ৩,৫০,০০০ টাকা

নারী ও ৬৫ বছরের বেশি বয়সী    - ৪,০০,০০০ টাকা

প্রতিবন্ধী ব্যক্তি    - ৪,৭৫,০০০ টাকা

মুক্তিযোদ্ধা (প্রথম সারির)    - ৫,০০,০০০ টাকা

অর্থাৎ, যদি আপনার আয় এই সীমার উপরে হয়, তাহলে আপনাকে আয়কর দিতে হবে।

এর নিচে হলে ট্যাক্স দিতে হয় না, তবে অনেক ক্ষেত্রে e-TIN (Tax Identification Number) নেওয়া বাধ্যতামূলক হয় (যেমন: ব্যাংক হিসাব, পাসপোর্ট, জমি রেজিস্ট্রি ইত্যাদি দিতে)।

ট্যাক্সের ধরণসমূহ

১. সরাসরি কর (Direct Tax):  করদাতা সরাসরি সরকারকে ট্যাক্স প্রদান করে। উদাহরণ: আয়কর, সম্পদ কর।

২. পরোক্ষ কর (Indirect Tax): ব্যবসায়ী বা প্রতিষ্ঠান পণ্যের দামে ট্যাক্স যুক্ত করে, পরে সরকারকে দেয়। উদাহরণ: ভ্যাট, শুল্ক কর।

ট্যাক্সের হার (২০২৪–২৫)

বাংলাদেশে ব্যক্তিগত আয়কর হার নিম্নরূপ:

আয়সীমা   _____      করহার

প্রথম ৩,৫০,০০০ টাকা    -    করমুক্ত

পরবর্তী ১,০০,০০০ টাকা    - ৫%

পরবর্তী ৩,০০,০০০ টাকা    - ১০%

পরবর্তী ৪,০০,০০০ টাকা    - ১৫%

পরবর্তী ৫,০০,০০০ টাকা    - ২০%

৫,০০,০০০ এর বেশি আয়    - ২৫%

কাদের উপর ভ্যাট প্রযোজ্য:

ভ্যাট মূলত ক্রেতা প্রদান করে, কিন্তু ব্যবসায়ী সেটি সরকারের কাছে জমা দেয়।

অর্থাৎ, দোকানদার বা সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সরকার জনগণের কাছ থেকে ভ্যাট সংগ্রহ করে।

✅ যারা ভ্যাট প্রদান করে:

দোকান, রেস্টুরেন্ট, হোটেল, ক্লিনিক, শপিং মল, অনলাইন সেবা, মোবাইল অপারেটর ইত্যাদির পণ্য বা সেবা গ্রহণ করলে।

যেকোনো ব্যবসায়ী যার বার্ষিক টার্নওভার (বিক্রয়) ৫০ লক্ষ টাকার বেশি, তাকে ভ্যাট নিবন্ধন (BIN) নিতে হয়।

সাধারণ ভ্যাট হার:

বাংলাদেশে সাধারণভাবে ১৫% ভ্যাট কার্যকর রয়েছে।

তবে কিছু পণ্য ও সেবায় কম হারে (৫%, ৭.৫%, ১০%) ভ্যাট নির্ধারিত।

 ট্যাক্স ও ভ্যাট প্রদান পদ্ধতি 

ট্যাক্স প্রদানের পদ্ধতি:

1. e-TIN নিবন্ধন করতে হয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) ওয়েবসাইটে।

2. প্রতিবছর আয়কর রিটার্ন জমা দিতে হয় অনলাইনে বা হাতে।

3. অনলাইন পোর্টাল: https://www.incometax.gov.bd

4. ব্যাংক বা অনলাইন পেমেন্টের মাধ্যমে ট্যাক্স জমা দেওয়া যায়।

ভ্যাট প্রদানের পদ্ধতি:

1. ব্যবসায়ীর BIN (Business Identification Number) নিতে হয়।

2. প্রতিমাসে বিক্রয় অনুযায়ী নির্ধারিত হারে ভ্যাট হিসাব করতে হয়।

3. ভ্যাট অনলাইন বা ব্যাংকের মাধ্যমে সরকারকে জমা দিতে হয়।

4. ভ্যাট চালান ইস্যু করতে হয় প্রতিটি বিক্রির সময়।

কাদেরকে ট্যাক্স বা ভ্যাট দিতে হয় না

ট্যাক্স না দেওয়ার যোগ্য:

যাদের আয় করমুক্ত সীমার নিচে।

ছাত্রছাত্রী, বেকার, গৃহিণী যারা কোনো আয় করেন না।

এনজিও বা দাতব্য প্রতিষ্ঠান (যদি করমুক্ত অনুমোদন থাকে)।


ভ্যাট না দেওয়ার যোগ্য:

যারা পণ্য/সেবা বিক্রি করে না।

ক্ষুদ্র ব্যবসা (বার্ষিক বিক্রয় ৫০ লক্ষ টাকার নিচে)।

কৃষিজাত পণ্যের অনেক ক্ষেত্রে ভ্যাটমুক্ত।

ট্যাক্স বা ভ্যাট না দিলে কী হয়ঃ

ট্যাক্স না দিলে:

জরিমানা (নূন্যতম ১০% পর্যন্ত)।

ব্যাংক লেনদেন, পাসপোর্ট, ট্রেড লাইসেন্সে জটিলতা।

আদালত মামলা বা সম্পদ জব্দ হতে পারে।


ভ্যাট না দিলে:

ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সিলগালা হতে পারে।

লাইসেন্স বাতিল, জরিমানা ও মামলা হতে পারে।

ইলেকট্রনিক চালান না দিলে কর ফাঁকি মামলা হতে পারে।


উপসংহার: রাষ্ট্র পরিচালনায় ট্যাক্স ও ভ্যাট অপরিহার্য। ট্যাক্স সরকারের অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করে, আর ভ্যাট রাজস্বের স্থায়ী উৎস তৈরি করে। একজন সৎ নাগরিক হিসেবে কর প্রদান কেবল আইনি দায়িত্ব নয়, এটি সামাজিক দায়িত্বও।

যদি সবাই নিয়মিত ট্যাক্স ও ভ্যাট প্রদান করে, তাহলে দেশের উন্নয়ন, অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থান ব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটবে।

তাই বলা যায়-

“ট্যাক্স ও ভ্যাট দেওয়া শুধু কর্তব্য নয়, এটি দেশপ্রেমেরও প্রতীক।”

Vat and Tax Helpline- 📱16555

No comments:

Post a Comment