বিদেশে পড়াশোনা ও স্কলারশিপ: সম্পূর্ণ গাইড (দেশভিত্তিক স্কলারশিপ তালিকাসহ)

বিদেশে পড়াশোনা ও স্কলারশিপ: সম্পূর্ণ গাইড (দেশভিত্তিক স্কলারশিপ তালিকাসহ)

ভূমিকা: বিদেশে পড়াশোনা আজকের তরুণদের স্বপ্নের বাস্তব রূপ। উন্নত শিক্ষা, আধুনিক গবেষণা সুবিধা, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং গ্লোবাল ক্যারিয়ার এসব কারণে ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, কোরিয়া, তুরস্কসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে উচ্চশিক্ষা নিতে চান অনেকেই।

বিদেশে পড়াশোনা ও স্কলারশিপ: সম্পূর্ণ গাইড

কিন্তু অনেক সময় খরচের কথা ভেবে অনেক শিক্ষার্থী পিছিয়ে যায়। অথচ এখন বিশ্বের প্রায় সব উন্নত দেশই আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য বড় বড় Fully Funded ও Partial Funded Scholarship প্রদান করছে। সঠিক তথ্য ও প্রস্তুতি থাকলে বিদেশে পড়াশোনা করা খুবই সম্ভব।


এই আর্টিকেলে আমরা জানব

✔ বিদেশে পড়াশোনার কারণ

✔ সুবিধা

✔ আবেদন প্রক্রিয়া

✔ যোগ্যতা

✔ জনপ্রিয় দেশ

✔ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বের শীর্ষ স্কলারশিপগুলোর বিস্তারিত তালিকা



বিদেশে পড়াশোনা কেন করবেন?

১. বিশ্বমানের শিক্ষা পাওয়া যায়: উন্নত দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আধুনিক ল্যাব, বিশেষায়িত কোর্স, গবেষণা সুযোগ ও অভিজ্ঞ শিক্ষক রয়েছে। এতে গ্লোবাল মানের স্কিল তৈরি হয়।


২. চাকরির সুযোগ অনেক বেশি: বিদেশি ডিগ্রি আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হওয়ায় দেশে–বিদেশে চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়।


৩. ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্বে উন্নতি: নতুন দেশ, নতুন পরিবেশ, নিজ দায়িত্বে থাকা সব মিলিয়ে আত্মবিশ্বাস ও নেতৃত্ব গুণ অনেক বাড়ে।


৪. আন্তর্জাতিক কানেকশন তৈরি: বিভিন্ন দেশের বন্ধু, শিক্ষক ও রিসার্চারদের সাথে সম্পর্ক ভবিষ্যতের ক্যারিয়ারকে আরও শক্তিশালী করে।



জনপ্রিয় বিদেশি শিক্ষাগন্তব্য

* যুক্তরাষ্ট্র

* কানাডা

* যুক্তরাজ্য

* অস্ট্রেলিয়া

* জাপান

* দক্ষিণ কোরিয়া

* জার্মানি

* নেদারল্যান্ডস

* সুইজারল্যান্ড

* তুরস্ক


স্কলারশিপের ধরন

১. Fully Funded Scholarship: এগুলোতে থাকে- 

✔ টিউশন ফি

✔ বাসস্থান

✔ খাবার

✔ মাসিক ভাতা

✔ বিমানের ভাড়া

✔ স্বাস্থ্যবিমা ফলে কোনো খরচ ছাড়াই পড়াশোনা করা যায়।


২. Partial Scholarship: টিউশন ফি বা থাকার খরচের আংশিক সহায়তা করে।


৩. Merit-based Tuition Waiver: ভালো ফলাফল হলে বিশ্ববিদ্যালয় নিজেই ছাড় দেয়।



স্কলারশিপ পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা:

* ভালো GPA

* ইংরেজি দক্ষতা (IELTS/TOEFL/Duolingo)

* SOP বা Statement of Purpose

* ২–৩টি Recommendation Letter

* প্রফেশনাল Academic CV

* রিসার্চ এক্সপেরিয়েন্স (মাস্টার্স/পিএইচডি এর জন্য)

* কাজের অভিজ্ঞতা (Chevening/DAAD এর ক্ষেত্রে)


স্কলারশিপ পাওয়ার ধাপসমূহ:

1. দেশ ও কোর্স নির্বাচন

2. স্কলারশিপ অনুসন্ধান

3. প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট সংগ্রহ

4. অনলাইন আবেদন (University Portal)

5. ইন্টারভিউ (কিছু স্কলারশিপে)

6. অফার লেটার পাওয়া

7. ভিসা আবেদন


বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় স্কলারশিপগুলোর বিস্তারিত তালিকা:

১. Chevening Scholarship (United Kingdom)

ধরন: Fully Funded

স্তর: মাস্টার্স (১ বছর)

সুবিধা:

* সম্পূর্ণ টিউশন ফি

* মাসিক ভাতা

* বিমান ভাড়া

* UK-তে থাকা ও যাতায়াত ব্যয়

যোগ্যতা:

* ভালো GPA

* কমপক্ষে ২ বছরের কাজের অভিজ্ঞতা

ডেডলাইন: আগস্ট–নভেম্বর


২. Erasmus Mundus Scholarship (Europe):

ধরন: Fully Funded

স্তর: Joint Master’s

সুবিধা:

* সম্পূর্ণ টিউশন

* মাসিক ১১০০–১২০০ ইউরো

* একাধিক দেশে পড়াশোনার সুযোগ

ডেডলাইন: অক্টোবর–জানুয়ারি


৩. Fulbright Scholarship (United States):

ধরন: Fully Funded

স্তর: মাস্টার্স ও পিএইচডি

সুবিধা: 

* টিউশন ফি

* স্টাইপেন্ড

* স্বাস্থ্যবিমা

* বিমান ভাড়া

ডেডলাইন: এপ্রিল–অক্টোবর


৪. MEXT Scholarship (Japan)

ধরন: Fully Funded

স্তর: ব্যাচেলর, মাস্টার্স, পিএইচডি

সুবিধা:

* পুরো ফ্রি পড়াশোনা

* ফ্রি বিমান টিকিট

* মাসিক স্কলারশিপ ভাতা

* ডরমিটরি

ডেডলাইন: এপ্রিল–জুন



৫. Global Korea Scholarship — GKS (South Korea)

ধরন: Fully Funded

স্তর: ব্যাচেলর, মাস্টার্স, পিএইচডি

সুবিধা:

* টিউশন ফি ১০০%

* মাসিক ভাতা

* ১ বছরের ভাষা কোর্স

* বিমান ভাড়া

ডেডলাইন: ফেব্রুয়ারি–মার্চ


৬. DAAD Scholarship (Germany):

ধরন: Fully Funded

স্তর: মাস্টার্স / পিএইচডি

সুবিধা:

* টিউশন ফি ছাড়

* মাসিক স্টাইপেন্ড

* স্বাস্থ্যবিমা

* ভ্রমণ খরচ

ডেডলাইন: আগস্ট–অক্টোবর


7. Australia Awards Scholarship

ধরন: Fully Funded

স্তর: মাস্টার্স

সুবিধা:

* টিউশন

* বিমান ভাড়া

* মাসিক ভাতা

* Establishment allowance

ডেডলাইন: ফেব্রুয়ারি–এপ্রিল


8. Turkiye Burslari Scholarship (Turkey):

ধরন: Fully Funded

স্তর: ব্যাচেলর, মাস্টার্স, পিএইচডি

সুবিধা:

* টিউশন

* বাসস্থান

* মাসিক ভাতা

* টার্কিশ ভাষা কোর্স

ডেডলাইন: জানুয়ারি–ফেব্রুয়ারি


9. Chinese Government Scholarship — CSC (China):

ধরন: Fully Funded

স্তর: ব্যাচেলর, মাস্টার্স, পিএইচডি

সুবিধা:

* ফ্রি টিউশন

* ডরমিটরি

* মাসিক ভাতা

ডেডলাইন: ডিসেম্বর–এপ্রিল


10. Holland Scholarship (Netherlands):

ধরন: Partial Funded

সুবিধা:

এককালীন ৫,০০০ ইউরো

ডেডলাইন: ফেব্রুয়ারি–মে


11. Swiss Government Excellence Scholarship (Switzerland):

ধরন: Fully Funded

স্তর: পিএইচডি / পোস্টডক

সুবিধা:

* সম্পূর্ণ স্টাইপেন্ড

* বাসস্থান সহায়তা

* স্বাস্থ্যবিমা

ডেডলাইন: সেপ্টেম্বর–ডিসেম্বর


12. Commonwealth Scholarship (UK):

ধরন: Fully Funded

স্তর: মাস্টার্স ও পিএইচডি

সুবিধা:

* টিউশন

* স্টাইপেন্ড

* ভ্রমণ ভাতা

ডেডলাইন: আগস্ট–অক্টোবর


সংক্ষেপে আরও কিছু জনপ্রিয় স্কলারশিপ

* Rhodes Scholarship

* Gates Cambridge Scholarship

* Knight-Hennessy (Stanford)

* Joint Japan/World Bank Scholarship

* Aga Khan Foundation Scholarship

* Brunei Darussalam Scholarship


উপসংহার: বিদেশে পড়াশোনা এবং স্কলারশিপ পাওয়া কঠিন নয় যদি সঠিকভাবে পরিকল্পনা করা যায়। ভালো রেজাল্ট, ইংরেজি দক্ষতা, পরিষ্কার SOP এবং সময়মতো আবেদন এসব মিললে যেকোনো শিক্ষার্থী খুব সহজেই বিদেশে উচ্চশিক্ষায় যেতে পারে। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশই এখন মেধাবী শিক্ষার্থীদের স্বাগত জানায় এবং তাদের শিক্ষার পুরো খরচ বহন করে। দিন সাজিয়ে

এথনিক অসমতা কী? এথনিক অসমতার কারণগুলো তুলে ধর

এথনিক অসমতা বলতে কী বুঝায়?

ভূমিকা: এথনিক গ্রুপ হচ্ছে এমন একটি সামাজিক গোষ্ঠী যাদের নিজস্ব একটি বিশেষ ভাষা ও সংস্কৃতি রয়েছে যা অন্যদের থেকে ভিন্ন। এরা কোনো রাষ্ট্রীয় পরিসীমায় নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য ও স্বকীয়তা নিয়ে বসবাস করে। সংখ্যাগুরুদের সাথে সংখ্যালঘু বা এখনিক সম্প্রদায়ের ব্যাপক অসমতা ও পার্থক্য লক্ষ করা যায়।

এথনিক অসমতা কী? এথনিক অসমতার কারণগুলো তুলে ধর

এথনিক অসমতা: রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায় সংখ্যালঘু এখনিক সম্প্রদায়ের প্রতি যেসব বৈষনামূলক আচরণ আচার-আচরণ করে থাকে তাকে এথনিক অসমতা বালে। এথনিক গোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, রীতিনীতি সবই বৃহত্তর জনগোষ্ঠী থেকে পৃথক। এখনিক গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য দেখে তাদেরকে চিহ্নিত করা যায়। ব্যক্তির মনোভাব, ব্যক্তিত্ব, মূল্যবোধ, বিশ্বাস, রুচিবোধ ইত্যাদি স্বারা তাদের সমাজ মৌলভাবে প্রভাবিত। কিন্তু সমতলের সংখ্যাগুরু গোষ্ঠী তাদেরকে অসম মনে করে থাকে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্যাভ্যাস, চাকরির সুযোগ প্রভৃতি ক্ষেত্রে আইনে সমতা থাকলেও তা বাস্তবে তেমন একটা দেখা যায় না। তাদের অনেক চড়াই-উতরাই পার করে সবার সাথে অধিক যোগ্যতা প্রমাণ করতে হয়।

এছাড়াও সীমিত সম্পদ ও সুযোগ অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা সৃষ্টির অন্যতম কারণ, যা এথনিক অসমতা সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিগত আমেরিকার নির্বাচনে দৈহিক সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য এখনিক অসমতাকে দৃঢ়ভাবে প্রমাণ করেছে। আমেরিকার শ্বেতকায় ও কৃষ্ণকায় পৃথক স্কুল ও হোটেল তাদের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করেছে।

প্রভাবশালীরা সবসময় এথনিক সম্প্রদায়কে তাদের নিয়ন্ত্রণে রেখে কর্তৃত্ব করে চলতে চেষ্টা করে। এতে অসমতা বেড়ে যায়। এথনিসিটির সাথে যেহেতু নাগরিকত্বের কোনো সম্পর্ক নেই, সেহেতু মূলধারার লোকেরা তাদেরকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য মনে করে এখনিক অসমতা বৃদ্ধি করে থাকে। এথনিক গোষ্ঠী নিজেদেরকে কখনোই জাতীয়তাবাদী মনে করতে পারে না। কারণ তারা মূলত সংখ্যালঘু। এখনিসিটি অত্যন্ত সীমিত পরিসরে কয়েকজন মানুষের মধ্যেও কাজ করতে পারে। এদের মধ্যে যেহেতু কোনো ধরনের দমন, ক্ষমতায়ন বা নেতৃত্বের বিষয় যুক্ত থাকে না, তাই তারা সবসময় নির্যাতিত, শোষিত ও বঞ্চিত হয়ে থাকে।

সর্বশেষ বলা যায়, একটি জাতিরাষ্ট্রের অংশ হয়েই এথনিক গোষ্ঠী বেঁচে থাকে। অন্য গোষ্ঠীর কাছ থেকে তারা সবসময় অসম অবস্থার স্বীকার হয়। তবুও তাদের কোনো অভিযোগ নেই। তারা তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃরিতে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ

এথনিক অসমতার কারণগুলো তুলে ধর।

এথনিক গ্রুপ কোনো না কোনো রাষ্ট্রীয় পরিসীমায় নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য ও স্বকীয়তা নিয়ে বসবাস করে। যেহেতু একটি রাষ্ট্রের নির্দিষ্ট এলাকায় পৃথক জীবনযাপন প্রণালি ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নিয়ে বসবাস করে, সেহেতু এ সম্প্রদায়কে এথনিক গ্রুপ বলা হয়ে থাকে। আদিম সমাজের মানুষ রক্তের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে বসবাস করে। এ ধরনের দলকেই এথনিক গ্রুপ বলা হয়। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই বিভিন্ন ধরনের এথনিক গ্রুপ-এর বসবাস হয়েছে।

এথনিক অসমতার কারণ: এথনিক অসমতা সুদীর্ঘকাল ধরে এথনিক গোষ্ঠী ও নৃ-গোষ্ঠী প্রত্যয়গুলোর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। নানাবিধ অবস্থায় বহুবিধ কারণ দ্বারা এথনিক অসমতার অস্তিত্ব ক্রমশই সুস্পষ্ট হচ্ছে। সমাজবিজ্ঞানী, নৃবিজ্ঞানিশ্বণ নিম্নোক্ত বিষয়াবলির ওপর বিশেষ আলোকপাত করেছেন।

১. ব্যক্তিগত মনোভাব, ব্যক্তিত্ব ও মূল্যবোধ: এথনিক গোষ্ঠীর পরিচিতির সামাজিক ভিত্তি হলো সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য। ব্যক্তির মনোভাব, ব্যক্তিত্ব, মূল্যবোধ, বিশ্বাস, রুচিবোও ইত্যাদি সংস্কৃতি দ্বারা অতিমাত্রায় প্রভাবিত হতে থাকে। আবার ব্যক্তি সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই স্ব-স্ব পরিমণ্ডল, সমাজ ও পরিবারে নিজ নিজ বলয় সৃষ্টি করে থাকে।

ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব, বিশ্বাস, মুল্যবোধ ইত্যাদি সমাজ ও সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত। সমাজে বসবাস করতে গিয়ে ব্যক্তি নিম্ন গোষ্ঠী সম্পর্কে এবং চারপাশের অন্যান্য গোষ্ঠী ও সমাজ সম্পর্কে একটা ধারণা অর্জন করে। সে কারো প্রতি বা বিশেষ গোষ্ঠীর প্রতি বিদ্বেষী, নিরপেক্ষ, উদার বা বন্ধুত্বের মাসাতাৰ ও সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে। কখনও বা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজদেরকে অন্যান্য গোষ্ঠীর চেয়ে উৎকৃষ্ট বা নিকৃষ্ট মান করতে পারে এবং সে অনুযায়ী তার মনোভাব গড়ে ওঠে। এভাবে কারো যধ্যে Superiority comples es Inferiority complex দানা বেঁধে উঠতে পারে। এর ফলে একে অপরের প্রতি বিদ্বেশপূর্ণ মনোভাব ও বৈষম্যমূলক আচরণ করতে পারে। কখন ও বা দেখা যায় অতান্ত কর্তৃত্বব্যঞ্জক ব্যক্তিত্বের লোক যখন তার সমমর্যাদায় কারো সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে বা টিকে থাকতে পারছে না তখন তার অপারগতা বা দুর্বলতা ঢাকার জন্য তার রাগ, ক্ষোভ, অভিমান এমন ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর ওপর প্রকাশ করে যারা তার চেয়ে দুর্বলতার, এভাবেই এথনিক অসমতা তৈরি হয়।

২. এথনিক গোত্রীয় সামাজিক মিথক্রিয়ার প্রকৃতি: সামাজিক মিথস্ক্রিয়া অতিমাত্রায় এথনিক অসমতাকে প্রভাবিত করে থাকে। এই সামগ্রিক প্রক্রিয়া এথনিক নৃগোষ্ঠীর মধ্যে দৃঢ় সামাজিক সংহতি সৃষ্টির মাধ্যমে আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্ক সৃষ্টি করে থাকে, যা নানা প্রকার অসংল্যাভাকে দূরীভূত করতে পারে।

৩. আর্থসামাজিক অবস্থা: বস্তুত সীমিত সম্পদ ও সুযোগ অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা সৃষ্টির অন্যতম প্রধান কারণ, যা এথনিক অসমতা সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। একই সমাজে বসবাসকারী বিভিন্ন এথনিক গোষ্ঠীর সদস্য যখন সীমিত সম্পদ ও সুযোগের জন্য প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়, তখন প্রভাবশালীদের ভূমিকার ওপর নির্ভর করে সমাজে এথনিক অসমতা তৈরি হবে, নাকি সমতার নীতি গৃহীত ও কার্যকর হবে।

মার্কসীয় তাত্ত্বিকরা মনে করেন যে, এথনিক অসমতা হচ্ছে অর্থনৈতিক শোষণের একটি ধরন বা রূপ। অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় শাসক শ্রেণির প্রয়োজন হয় সস্তায় শ্রমের যোগান এবং শাসক শ্রেণি এটাও চায় যে, সন্তায় যারা শ্রম বিক্রি করে সেই শ্রমিক শ্রেণি যেন সংগঠিত হয়ে শাসকদের ক্ষমতা থেকে সরিয়ে না দেয়। শাসক শ্রেণির দৃষ্টিতে অন্য গোষ্ঠীকে আর্থিকভাবে পঙ্গু করে নিম্ন অবস্থানে রাখতে পারলে সুবিধা হয়। বস্তুত দৈহিক ও সাংস্কৃতিক পার্থক্যগুলো প্রভাবশালী-প্রভাবাধীন বা শাসক শাসিতের 'চিহ্ন' হিসেবে কাজ করে। যেমন- আমেরিকায়। কৃষ্ণকায়দের চামড়ার রং সমাজে তাদের নিচে অবস্থানের চিহ্ন বহন করে। এতে করে এমন আদর্শের উদ্ভব ঘটতে পারে, যা সাদা-কালোর ব্যবধানের ভিত্তিতে সামাজিক অসমতা 'স্বাভাবিক' বলে ব্যাখ্যা দিতে সক্ষম।

ট্যাব, গ্লাসকো এবং রেইচ বলেন যে, এক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অন্য গোষ্ঠীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লাগিয়ে দিয়ে শাসক শ্রেণি জনগণকে বিভক্ত করে রাখে, যাতে তারা শাসকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে না পারে। শাসক শ্রেণি যে অর্থনৈতিক সম্পন নিয়ন্ত্রণ করছে সেটা থেকে জনগণের দৃষ্টিকে অন্যদিকে সরিয়ে নেয়ার কাজটিও এভাবে সম্ভব হয়। এমনকি অমার্কসীয় তাব্লিকরাও মনে করেন যে, এথনিক অসমতার অন্যতম কারণ বা উপাদান হলো অর্থনৈতিক শোষণের ফলে সমাজে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উপাদানগুলোর মধ্যে যে জটিল অথচ তাৎপর্যপূর্ণ পারস্পরিক সম্পর্ক বিদ্যমান থাকে, সেটা উপেক্ষিত হয়। ঔপনিবেশিক সম্পর্কের পাঁচটি উপাদানের কথা জানা যায়। এগুলো হলো-

(১) প্রভাবশালী গোষ্ঠীতে অপ্রভাবশালী স্থানীয়দের জোরপূর্বক অন্তর্ভুক্ত। (২) সংস্কৃতিকে নিয়ন্ত্রণ ও তাতে পরিবর্তন আনতে প্রভাবশালীদের প্রয়াস। (৩) রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রয়ণ। (৪) অর্থনৈতিক শোষন এবং (৫) এমন আদর্শ গড়ে তোলা যা প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণকে যথাযথ বলে সমর্থন দেয়। অন্যদের এথনিক গোষ্ঠীর তুলনায় কৃষ্ণকায়, স্থানীয় আমেরিকান এই মেক্সিকান আমেরিকানরা স্বদেশে আর্থরাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে তেমন কোনো সমতা নেই। তাদের অধিকাংশ সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করে বাইরের প্রভাবশালীরা। এসব এথনিক গোষ্ঠীর দু'চার জনকে সরকারি সংস্থায় প্রতিনিধি হিসেবে নেয়া হয় প্রভাবশালীদের স্বর্গ রক্ষার্থেই ঐসব এথনিক গোষ্ঠীর সংস্কৃতিকে নিকৃষ্ট আখ্যা দিয়ে ধ্বংস করার চেষ্টা হয়েছে এবং সেখানে প্রভাবশালীদের সংস্কৃতির উপাদান অনুপ্রবেশের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

৪. দৈহিক সাংস্কৃতিক পার্থক্য: ঐ ব্যক্তির দৈহিক, সাংস্কৃতিক পার্থক্য এথনিক অসমতার অন্যতম কারণ। দৈহিক সাংস্কৃতিক পার্থক্য বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বিগত আমেরিকায় নির্বাচনে দৈহিক, সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য এথনিক অসমতাকে দৃড়ভাবে প্রমাণ করেছে। এথনিক গোষ্ঠীগুলো যদি সামাজিকভাবে পরস্পর বিচ্ছিন্ন থাকে, সামাজিক যোগাযোগ তথ্য সামাজিক মিথস্ক্রিয়া যদি তেমন একটা সংঘটিত না হয়, তাহলে পরস্পরকে কারণে-অকারণে ভুল বোঝাতে থাকে এবং সামাজির সুরত্ব বেড়ে চলে। এভাবে একে অপরের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব গড়ে তোলে, যা বৈষম্যমূলক আচরণের সূত্রপাত করায় পারে। বস্তুত গবেষণায় এটাই প্রমাণিত হয়েছে যে, আমেরিকান সমাজে কৃষ্ণকায় ও শ্বেতকায়দের ভিন্ন ভিন্ন স্কুল, হোটেল ইত্যাদি তাদের মধ্যকার দূরত্ব বৃদ্ধি করেছে, যা এখনিক বৈষম্যকে তাড়িয়ে দেয় এবং আন্তঃনৃগোরী যোগাযোগ ও সম্পর্ক নৃগোষ্ঠীগর বিয়েষের মাত্রা কমিয়ে আনে।

কুট্টি সম্প্রদায় সম্পর্কে লেখ। গারো সমাজের পরিবর্তনের কারণগুলো উল্লেখ কর

কুট্টি সম্প্রদায় কারা? গারো সমাজের পরিবর্তনের কারণগুলো

ভূমিকা: বাংলাদেশে কুট্টি সম্প্রদায়ের আগমন ঘটে বেশি কিছু সময় থেকে। এ সম্প্রদায় ভারতের বিহার  অঞ্চল থেকে আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ে এদেশে আসতে থাকে।

কুট্টি সম্প্রদায় সম্পর্কে লেখ। গারো সমাজের পরিবর্তনের কারণগুলো উল্লেখ কর

কুট্টিদের পরিচয়: কুটি শব্দটির অর্থ হচ্ছে খেদমতকারী। এরা প্রায় সকলে মুঘল আমলে পেয়াদা, বাবুর্চি, আয়া, খানসামা, গাড়োয়ান ছিল। তারা ছিল আজ্ঞাবহ শ্রেণি। অর্থাৎ, তারা মুঘল ও ঢাকাইয়া নবাবদের খেদমত ছাড়া কিছুই বুঝত না।

বাসস্থান: সাধারণত কুট্টিদের আদি বাসস্থান বাংলার বাইরে। এ সম্প্রদায় ভারত থেকে আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ে এদেশে আসতে শুরু করে। কুটি সম্প্রদায় ঢাকার চকবাজার, ইসলামপুর, বাবুবাজার, টিকাটুলি ইত্যাদি এলাকায় বসতি স্থাপন করে।

ভাষা: মুসলিম সম্প্রদায়ভুক্ত কুট্টিদের একটি স্বতন্ত্র ভাষা রয়েছে। এদের ভাথাকে 'খোট্টা' ভাষা বলা হয়। বাংলার সাথে উর্দু ও হিন্দি ভাষার সংমিশ্রণে এ ভাষা গড়ে উঠেছে।

অর্থনীতি: ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর তাদের রাতারাতি ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটে। সাম্প্রদায়িক কারণে পুরাতন ঢাকাকেন্দ্রিক বংশীয় জমিদার পরিবারগুলো যখন ভারতে যেতে শুরু করে, তখন তাদেরই নৃত্য, দারোয়ান এবং বিভিন্ন দেখাশুনার কাজে নিয়োজিত এই কুট্টি তাদের ফেলে যাওয়া সমস্ত সম্পত্তি হস্তগত করে। কুট্টি আর্থিকভাবে অত্যন্ত সবল।

সমাজকাঠামো: কুট্টিদের সমাজ কাঠামো ছিল সর্দার প্রথা ভিত্তিক। সমস্ত এলাকাটিকে তারা ১২টি অঞ্চলে ভাগ করে নিয়েছিল। প্রতিটি অঞ্চল পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট একটি করে পঞ্চায়েত কমিটি থাকত। কমিটির প্রধান ছিল সর্দার। আর সব সর্দার ছিল নবাবের অধীনে। কোনো কোনো সর্দার আবার অত্যন্ত প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিল। তাদের মধ্যে মওলাবখস এবং মাজেদ সরদার ছিলেন অন্যতম। বর্তমানে এই পঞ্চায়েত প্রথার আর প্রচলন দেখা যায় না।

ধর্মীয় অনুষ্ঠান: কুট্টি বছরে বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব পালন করে। ঈদ, রমজান, শবেবরাত প্রস্তুতি তাদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব। বিয়ে এবং বিভিন্ন পারিবারিক অনুষ্ঠানগুলোতে তারা বেশ আয়োজনের সাথেই করে থাকে।

শ্রেণিবিভাগ:  কুট্টিরা তিন শ্রেণিতে বিভক্ত। এই তিন শ্রেণির মধ্যে সামাজিক আদান-প্রদান, মেলামেশা ও বিয়ে-শাদি হয়। কুট্টিদের তিনটি শ্রেণির নাম- (১) পানু কুট্টি, (২) হাত কুট্টি ও - (৩) চুটকি কুট্টি। পানু কুট্টি সংখ্যায় বেশি।

পরিশেষে বলা যায় যে, কুট্টিরা এখন বাংলাদেশে একটি সম্পাসারিত সম্প্রদায়। কিন্তু সার্বিকভাবে এদেশের বাঙালি সমাজ তাদেরকে আজো অশিক্ষিত, নিম্ন সমাজভুক্ত সম্প্রদ হিসেবে দেখতে অভ্যন্ত। তবুও বৃহৎ জনগোষ্ঠীর সাথে মিলেমিদে ধর্মীয় এবং বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানাদি সম্পন্ন করছে এরা সে সাথে বিভিন্ন গোষ্ঠীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছে।


গারো সমাজের পরিবর্তনের কারণসমূহ

বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কারণে গারো সমাজ পরিবর্তিত হচ্ছে। মূলত কৃষিতে নতুন পদ্ধতি গ্রহণ, বাজার অর্থনীতির অনুপ্রবেশ, প্রতিবেশী বাঙালি সমাজের সঙ্গে যোগাযোগ, খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ, আধুনিক শিক্ষা এবং বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক প্রভাব ইত্যাদির ফলে গারো সমাজের পরিবর্তন প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।

গারো সমাজের পরিবর্তনের কারণ: নিম্নে গারো সমাজের পরিবর্তনের কারণসমূহ উল্লেখ করা হলো-

১. পরিবার ও বিবাহ ব্যবস্থার পরিবর্তন: সাধারণভাবে দেখা যায় যে, গারো পরিবারের বিবাহ ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন আসে নি। তবে যতটুকু পরিবর্তন লক্ষ করা যায়, সেটা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। শিক্ষিত গারো মাতৃবাসের বিপরীত রীতি পিতৃবাসে অভ্যস্ত হচ্ছে।

২. শিক্ষার ক্ষেত্রে পরিবর্তন: ১৯ শতকের শেষ দিকে গারো অঞ্চলে খ্রিষ্টান মিশনারি ও ব্যাষ্টিসের আগমন ঘটে। তারা গারোদের কেবল যে খ্রিষ্টধর্মেই দীক্ষিত করেছে তা নয়, সে সাথে গারো এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে। গারোদের শিক্ষার যার আজকাল ২০% ছড়িয়ে গিয়েছে। শিক্ষার প্রসার ঘটার ফলে গারো সমাজে গতিশীলতা বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেকে চাকরি করছে।

৩. অর্থনৈতিক পরিবর্তন: বর্তমানে গারো সমাজে জুমচাষের স্থলে হালকৃষি প্রবর্তিত হয়েছে। এতে বিভিন্ন ধরনের ফসল উৎপাদিত হচ্ছে। ক্ষুদ্র অর্থনীতির প্রচলনের ফলে আর্থিক বৈষম্য ক্রমে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

৪. ধর্মীয় পরিবর্তন: বর্তমান বাংলাদেশে গারোদের ৯০% খ্রিষ্টান ধর্মানুসারী। তবে ঐতিহ্যবাহী ধর্মের স্থলে অনেকেই তাই খ্রিষ্টান ধর্ম অনুসরণ করেছে। খ্রিষ্টীয় চার্চ এখন তাদের ধর্মের অন্যতম আকর্ষণীয় প্রতিষ্ঠান।

৫. রাজনৈতিক পরিবর্তন: এখন গারো সমাজ আর ভিন্ন জনপদ নয়। তারা এখন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় শাসনাধীন।যেখানে বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো এবং রাজনৈতিক অনুষ্ঠান প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। ফলে ঐতিহ্যবাহী গারো গ্রাম প্রধানের গুরুত্ব কমে গিয়েছে।

পরিশেষে বলা যায় যে, গারো সমাজের জরবিন্যাসে শিক্ষা অচিরেই এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে মনে হয়।

নৃগোষ্ঠীর ভৌগোলিক শ্রেণিবিভাগ ও বৈশিষ্ট্য

নৃগোষ্ঠীর ভৌগোলিক শ্রেণিবিভাগ ও বৈশিষ্ট্যসমূহ

ভূমিকা:  যেসব দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে নৃগোষ্ঠীকে শ্রেণীকরণ করা হয়, ভৌগোলিক অবস্থান তার মধ্যে অন্যতম। বস্তুত পৃথিবীর সকল অঞ্চলের ভৌগোলিj অবস্থান একরকম নয়। কেননা আবহাওয়া, জলবায়ু তথা অঞ্চলভেদে সমগ্র ভৌগোলিক অবস্থা ভিন্ন ভিন্ন হয়। যার প্রভাবে অঞ্চলভেদে মানুষের দৈহিক রূপ, প্রকৃতিও ভিন্ন ভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করে।

নৃগোষ্ঠীর ভৌগোলিক শ্রেণিবিভাগ ও বৈশিষ্ট্য

নৃগোষ্ঠীর ভৌগোলিক শ্রেণিবিভাগ: ১৯৫০ সালে নৃবিজ্ঞানী কুন, গার্ণ ও বার্ডগেল তাঁদের Race A Study of Race Formation in Man নামক গবেষণামূলক প্রবন্ধে নৃগোষ্ঠীর গঠন সম্পর্কে আলোচনাপূর্বক এর ভৌগোলিক শ্রেণিবিন্যাস প্রদান করেন। নিম্নে সংক্ষেপে নৃগোষ্ঠীর ভৌগোলিক শ্রেণিবিন্যাস উল্লেখ করা হলো-

১. ভারতীয় ভৌগোলিক নৃগোষ্ঠী: এশিয়ার ভারতীয় উপমহাদেশে এ মানবগোষ্ঠীর সদস্যরা বসবাস করে। কিছু পরিমাণে অধিকতর কালো চামড়া ছাড়া বহু ভারতীয় দেখতে ইউরোপীয়দের মতো। তাদের অনুরূপ চুল ও দা্ড়ি এবং সাহস রয়েছে। যাই হোক, মঙ্গোলীয়দের মতো তাদের মধ্যে B শ্রেণির রক্ত বেশি মাত্রায় দেখতে পাওয়া যায়।

২. অস্ট্রেলীয় ভৌগোলিক নৃগোষ্ঠী: প্রধানত অস্ট্রেলিয়া ও তাসমেনিয়ায় এ নৃগোষ্ঠী দেখতে পাওয়া গেলেও বর্তমানে এ উভয় স্থান থেকে তারা প্রায় বিলুপ্ত হয়েছে। বড় বড় দাঁত, খুব লম্বা সংকীর্ণ খুলি ও কালো চামড়া তাদের বৈশিষ্ট্য। ইউরোপীয়দের মতো কিছু পরিমাণে হালকা ও লালচে চুলবিশিষ্ট অস্ট্রালয়েডও দেখতে পাওয়া যায়।

৩. আমেরিকান ইন্ডিয়ান ভৌগোলিক নৃগোষ্ঠী: চুল, দাঁত এবং চোখের পাতার আকৃতির দিক থেকে আমেরিকার ইন্ডিয়ানরা যথেষ্ট স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন হলেও তারা মঙ্গোলীয়দের অনুরূপ। তাদের মধ্যে 'B' শ্রেণির রক্ত ঘুম কম দেখতে পাওয়া যায় এবং মনে হয় কলম্বাসের আবির্ভাবের আগে এ মহাদেশে B শ্রেণির রক্তবিশিষ্ট মানুষ একেবারেই ছিল না।

৪. পলিনেশিয়ান ভৌগোলিক নৃগোষ্ঠী: দক্ষিণে তুবুয়ই দ্বীপপুঞ্জ থেকে শুরু করে উত্তরে ইস্টার দ্বীপ পর্যন্ত সমগ্র মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপমালা পলিনেশিয়ার অন্তর্গত। বিশাল সাগরের জলরাশি পলিনেশিয়ার দ্বীপগুলোকে বিচ্ছিন্তা করায় এলিনেশীয় নৃগোষ্ঠীর আঞ্চলিক পার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে। দৈহিক গঠন, উচ্চতা, চুলের আকৃতি, মুখমণ্ডলের গঠন, চামড়ার বং নাকের গঠন প্রভৃতি বৈশিষ্ট্যের জন্য পলিনেশীয়রা অন্যান্য নৃগোষ্ঠী থেকে স্বতন্ত্র। এদের দেহ লম্বা, হাড় বড় এবং মাথায় সচরাচর ঢেউ খেলানো চুল দেখতে পাওয়া যায়।

৫. মাইক্রোনেশীয় ভৌগোলিক নৃগোষ্ঠী: পশ্চিম প্রশস্থ মহাসাগরে ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জের পূর্বে মাইক্রোনেশীয় অবস্থিত। অতীতে সংস্কৃতি ও মানবধারা উভয় দিক থেকে মাইক্রোনেশীয়দের প্রায়ই পলিনেশীয়দের সাথে যুক্ত করা হয়। কিন্তু অধুনা অপেক্ষাকৃত কালো চামড়া, খর্ব আকৃতি এবং তরঙ্গায়িত, পেঁচানো এমনকি কুঞ্চিত চুলের জন্য তাদের আলাদা নৃগোষ্ঠী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। নিউজিল্যান্ডের মাউরি উপজাতি এ নৃগোষ্ঠীর অভাতি।

৬. মেলানেশীয় পাগুয়া ভৌগোলিক নৃগোষ্ঠী: মাইক্রোনেশিয়ার দক্ষিণে মেলানেশিয়া অবস্থিত। নিউজিল্যান্ড থেকে ফিজি পর্যন্ত তিন হাজার মাইল জুড়ে এ নৃগোষ্ঠীর বাসভূমি বিস্তৃত। আধুনিক কালের পূর্ব পর্যন্ত পৃথিবীর অন্যান্য স্থান থেকে আপেক্ষিকভাবে বিচ্ছিন্ন এ নরগোষ্ঠীর সদস্যদের চামড়া যথেষ্ট কালো, খুলি আদিম প্রকৃতির এবং চুল কুজিত থেকে তরঙ্গায়িত।

উপর্যুক্ত আলোচনা শেষে বলা যায় যে, নৃগোষ্ঠী হায় জনসংখ্যার সেই এক বিশেষ অংশ, যারা জৈবিক উত্তরাধিকার সূত্রে কতকগুলো নির্দিষ্ট দৈহিক বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। ভৌগোলিক দৃষ্টিকোণ থেকে নৃগোষ্ঠীকে উপযুক্ত ছয়টি শ্রেণিতে বিভক্ত করা যায়।

নৃগোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্যসমূহ উল্লেখ কর।

পৃথিবীতে বিভিন্ন জাতির মানুষের বসবাস। কিন্তু বিজ্ঞানের বিচারে এরা সবাই একই গোষ্ঠীভুক্ত। নৃগোষ্ঠীর মাধ্যমে পৃথিবীর বিভিন্ন মানুষের বংশানুসারে দৈহিক আকৃতিসহ জীবনের বিভিন্ন লক্ষণ শনাক্ত করা যায়। এ ছাড়া এর মাধ্যমে বিভিন্ন মানবজাতির সামাজিক, মানসিক, সাংস্কৃতিক ও সভ্যতাকেন্দ্রিক বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য প্রতিভাত হয়। ফলে নৃগোষ্ঠী বা মানবগোষ্ঠী বয়ে আনে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও স্বতন্ত্র ইতিহাস ধারা।।

নৃগোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্য: নৃগোষ্ঠীর সংজ্ঞাসমূহ বিশ্লেষণ করলে এর বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়। সেগুলি নিম্নরূপ-

১. নৃগোষ্ঠী মাত্রই মানবজাতির একটি উপবিভাগ।

২. ঐ উপবিভাগের সদস্যদের মধ্যে কতকগুলো সাধারন দেহিক বৈশিস্ট্য বিদ্যমান থাকে।

৩. সাধারণ দৈহিক বৈশিষ্ট্যগুলো উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত এবং ঐ বৈশিষ্ট্যাবলি জৈবিক সূত্রে বংশধরদের মধ্যে বর্তিয়ে থাকে।

৪. নৃগোষ্ঠীগুলো একে অন্য থেকে ভিন্নতর।

৫. নৃগোষ্ঠী ইতিহাসের ঘটনাধারায় গড়ে ওঠা একটি জনসমষ্টি।

৬ এদের নিজেদের একই ভাষা ও এরা একই অঞ্চলে বসবাস করে।

৭. এরা এমন জনগোষ্ঠী, যারা যৌগোলিক কারণেও একটু পৃথক।

৮. একই নৃগোষ্ঠীর সবাইকে দেখতে একই রকম লাগে।

নৃগোষ্ঠী মানব প্রজাতির এমন এক দিককে বোঝায়, যার সদস্যবৃন্দ তাদের শারীরিক বৈশিষ্ট্য যা বংশ পরস্পরায় পেয়ে থাকে এবং নৃগোষ্ঠীসমূহের মাধ্য ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান রয়েছে।

ভূমিকম্প কি? প্রভাব, করণীয় ও পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি

 ভূমিকম্প: প্রভাব, করণীয় ও পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি


ভূমিকম্প হলো পৃথিবীর ভেতরে হঠাৎ করে সঞ্চিত শক্তির মুক্তির কারণে সৃষ্ট একটি প্রাকৃতিক কম্পন যা কয়েক সেকেন্ড থেকে কয়েক মিনিট পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। এটি পৃথিবীর অন্যতম বিধ্বংসী প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যা মুহূর্তের মধ্যেই ঘরবাড়ি, স্থাপনা, সেতু, রাস্তাঘাট ধ্বংস করে দিতে পারে এবং বড় ধরনের প্রাণহানির কারণ হতে পারে। তাই ভূমিকম্প সম্পর্কে জ্ঞান ও প্রস্তুতি সকলের জন্য জরুরি।

ভূমিকম্প কি? প্রভাব, করণীয় ও পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি


ভূমিকম্প কি?

ভূমিকম্প (Earthquake) হলো পৃথিবীর ভূগর্ভে সঞ্চিত শক্তি হঠাৎ মুক্তি পাওয়ার ফলে সৃষ্ট কম্পন। পৃথিবীর ভূ-পৃষ্ঠ শক্ত প্লেট দিয়ে তৈরি, যেগুলো সবসময় ধীরে ধীরে নড়াচড়া করে। এই প্লেটগুলো যখন একে অপরের সাথে সংঘর্ষে আসে, সরে যায় বা ঘর্ষণের কারণে আটকে থাকে, তখন তাদের ভেতরে প্রচুর শক্তি জমা হয়। কোনো এক পর্যায়ে এটি আর ধরে রাখতে না পেরে হঠাৎ ফেটে যায় এবং কম্পনের সৃষ্টি হয় এটাই ভূমিকম্প।

ভূমিকম্পের কেন্দ্রকে বলা হয় হাইপোসেন্টার, আর ভূমি পৃষ্ঠে সেই কেন্দ্রের ঠিক উপরের স্থানকে বলা হয় এপিসেন্টার।


ভূমিকম্পের মাত্রা কিভাবে মাপা হয়?

✔ রিক্টার স্কেল (Magnitude)

এই স্কেলে ভূমিকম্পের শক্তি মাপা হয়।

3.0 – ছোট

5.0 – মাঝারি

7.0+ – বড় ও ধ্বংসাত্মক


✔মারকেলি স্কেল (Intensity)

মানুষ কতটা অনুভব করেছে সেটা মাপা হয়।



ভূমিকম্পের সময় কী হতে পারে?

* ভবন কাঁপতে থাকা

* দেয়ালে ফাটল

* জিনিসপত্র পড়ে যাওয়া

* রাস্তা ফেটে যাওয়া

* গ্যাস লাইন লিক

* বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন

* আতঙ্কে মানুষের হুড়োহুড়ি

এই সময় শান্ত থাকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।


ভূমিকম্প হলে করণীয়

ভূমিকম্প চলাকালীন সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত প্রাণ রক্ষা করতে পারে। নিচে ঘরে, বাইরে এবং গাড়িতে থাকা অবস্থায় করণীয় তুলে ধরা হলো-


যদি আপনি ঘরের ভেতরে থাকেন

✔ ১.Drop, Cover, Hold পদ্ধতি অনুসরণ করুন

* মাটিতে বসে পড়ুন

* মজবুত টেবিল/ডেস্কের নিচে আশ্রয় নিন

* টেবিলের পা শক্ত করে ধরে থাকুন


✔ ২. দরজা বা জানালার কাছে যাবেন না

এগুলো থেকে কাচ ভেঙে আঘাত লাগতে পারে।


✔ ৩. লিফট ব্যবহার করবেন না

সবসময় সিঁড়ি ব্যবহার করুন।


✔ ৪. রান্নাঘরে থাকলে চুলা বন্ধ করে বের হয়ে আসুন

গ্যাস লিক হয়ে বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।


✔ ৫. বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি থেকে দূরে থাকুন



যদি আপনি বাইরে থাকেন

* ভবন, গাছ, বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে দূরে নিরাপদ স্থানে যান

* খোলা মাঠে থাকলে সবচেয়ে নিরাপদ

* সেতুর নিচে বা ভবনের ছায়ায় দাঁড়াবেন না


যদি গাড়িতে থাকেন

* গাড়ি থামিয়ে রাস্তায় দাঁড়ান

* সেতু, ফ্লাইওভার, বিল্ডিংয়ের নিচে নয়

* গাড়ির ভেতরেই থাকুন কম্পন থামা পর্যন্ত




ভূমিকম্পের আগে করণীয় (পূর্বপ্রস্তুতি)

ভূমিকম্প কখন হবে কেউ বলতে পারে না, তাই প্রস্তুতি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

✔ ১. জরুরি ব্যাগ প্রস্তুত রাখুন

ব্যাগে রাখুন-

* পানি

* শুকনো খাবার

* টর্চ

* পাওয়ার ব্যাংক

* ওষুধ

* ফার্স্ট এইড

* কাগজপত্রের কপি

* নগদ টাকা


✔২. ঘরের ভারী জিনিসপত্র সুরক্ষিতভাবে বসান

* আলমারি/শোকেস দেয়ালের সাথে স্ক্রু দিয়ে বেঁধে রাখুন

* গ্লাসের জিনিসপত্র নিচের তাকে রাখুন


✔৩. পরিবারকে ভূমিকম্প মহড়া শেখান

সন্তানদের Drop–Cover–Hold অনুশীলন করান।


✔৪. গ্যাস লাইন, ইলেকট্রিক লাইন নিয়মিত চেক করুন


✔৫. বের হওয়ার পথ আগে থেকে ঠিক করে রাখুন



ভূমিকম্পের পর করণীয় (পরবর্তী কার্যক্রম)

ভূমিকম্প থেমে গেলেও বিপদ কাটে না। পরবর্তী সময়ে সতর্ক থাকতে হবে।

✔১. ভবন চেক করুন

ফাটল, ঝুঁকিপূর্ণ অংশ, দেয়াল ক্ষতিগ্রস্ত হলে ভবনে প্রবেশ করবেন না।


✔২. গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির লাইন বন্ধ করুন

লিক বা শর্ট সার্কিট হলে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।


✔৩. এলিভেটর ব্যবহার করবেন না

লিফট আটকে যেতে পারে।


✔৪. পরিবার ও প্রতিবেশীদের সাহায্য করুন

বিশেষ করে

* শিশু

* বৃদ্ধ

* অসুস্থ

* প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা


✔৫. রেডিও বা মোবাইল দিয়ে খবর শুনুন**

সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করুন।


✔৬. আফটারশক বা পরাঘাতের জন্য প্রস্তুত থাকুন

ভূমিকম্পের পর আবারো ছোট বা বড় কম্পন হতে পারে।


✔৭. রক্তদান ও জরুরি সেবায় যুক্ত হোন (যদি সম্ভব হয়)


বাংলাদেশে ভূমিকম্প ঝুঁকি

বাংলাদেশ ভারতীয় প্লেট ও বার্মিজ প্লেটের কাছে অবস্থিত হওয়ার কারণে ঝুঁকি অনেক বেশি। ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম এবং বঙ্গোপসাগর উপকূলীয় অঞ্চল ১ম ও ২য় শ্রেণীর ঝুঁকিপূর্ণ জোনে রয়েছে।

ভবিষ্যতে বড় ভূমিকম্পের সম্ভাবনা থাকায় সচেতনতা ও প্রস্তুতি অত্যন্ত জরুরি।


উপসংহার: ভূমিকম্প একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, কিন্তু সচেতনতা ও পূর্বপ্রস্তুতি জীবন রক্ষা করতে পারে। ভূমিকম্পের সময় শান্ত থাকা, Drop Cover Hold পদ্ধতি অনুসরণ করা, পরিবারকে প্রস্তুত রাখা এবং পরবর্তীকালে নিরাপদ পদক্ষেপ নেওয়া এসবই আমাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়ায়। নিজের এবং সমাজের সুরক্ষার জন্য সবাইকে ভূমিকম্প সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান রাখতে হবে।