মার্কসবাদী আলোচনায় সমাজে ধর্মের ভূমিকাকে কীভাবে মূল্যায়ন করা হয়
অথবা, সমাজে ধর্মের ভূমিকা সম্পর্কে কার্ল মার্কসের ধারণাটি ব্যাখ্যা কর।
ভূমিকা: সমাজতত্ত্বে ধর্মের একটি বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। মানব সভ্যতার ইতিহাসে ধর্ম নিয়ে আলোচনা, পর্যালোচনা এবং সমালোচনা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। বর্তমান বিশ্বও ধর্মের বিশাল প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। তাই সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের প্রাক্কালে গবেষকগণ অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এই বিষয়ে আলোকপাত করেছেন। বিশেষ করে কার্ল মার্কস (Karl Marx) তাঁর বস্তুবাদী দর্শনের আলোকে ধর্মের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তি অত্যন্ত যুক্তিসম্মতভাবে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর মতে, ধর্ম কোনো দৈব শক্তি নয়, বরং সমাজ কাঠামোর একটি অংশ যা মানুষের বাস্তব জীবন ও শোষণের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আজকের ব্লগে আমরা সমাজে ধর্মের ভূমিকা সম্পর্কে মার্কসের মূল ধারণাগুলো আলোচনা করব।
ধর্ম কী:
ধর্ম হচ্ছে কিছু প্রতীকের সমষ্টি, যেগুলো আমাদের মাঝে শ্রদ্ধা কিংবা শ্রদ্ধা মিশ্রিত ভয়ের সৃষ্টি করে। এই ধর্মীয় প্রতীকগুলো সকলের কাছে পবিত্র বলে বিবেচিত হয়। ধর্মের একটা সুন্দর সংজ্ঞায়ন করার চেষ্টা করে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর গেভিন ফ্লাড বলেছেন, "ধর্ম সংস্কৃতির বাইরে কিছু নয়, ধর্ম সংস্কৃতির নিগড়ে গাঁথা। তবে সংস্কৃতির আওতা অনেক বিশাল, তাতে রাজনৈতিক, সমাজ, সমাজ কাঠামো, সবই থাকতে পারে। ধর্ম মূলত সংস্কৃতিরই অংশ। ধর্ম হচ্ছে আত্মজিজ্ঞাসার আইনসিদ্ধ স্থান যা কখনোই সংস্কৃতির বহির্ভূত নয়।
সমাজে ধর্মের ভূমিকা সম্পর্কে কার্ল মার্কসের ধারণা:
ধর্ম নিয়ে তিনজন বিখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী কার্ল মার্কস, এমিল ডুর্নেইম ও ম্যাক্স ওয়েবার তাদের তাত্ত্বিক আলোচনা ব্যক্ত করেছিলেন। এ সকল তাত্ত্বিকদের মধ্যে নিম্নে কার্ল মার্কসের ধর্মতত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করা হলো- ধর্ম সম্পর্কে কার্ল মার্কস-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বিখ্যাত উক্তি আছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেই উক্তির শুধুমাত্র শেষাংশটুকুই কেন্দ্র করে মার্কস-এর বক্তব্যের সমালোচনা করার চেষ্টা করেছেন অনেকেই। ধর্ম সম্পর্কে কার্ল মার্কস বলেছেন, "Religion is the sigh of the oppressed creature the heart of a heartless world, and the soul of souliess conditions It is the opium of the people এক কথায় ধর্ম সম্পর্কে এটি তার একটি অসাধারণ কথা, কিন্তু ধর্ম সম্পর্কে It is the opium of the people "শোষিত মানুষের কাছে ধর্ম আফিমস্বরূপ। এই কথাটিকে উল্লেখ করে সকলে মার্কসের সমালোচনা করেছেন। কিন্তু ধর্ম সম্পর্কে তৎকালীন মানুষদের এই সমালোচনা ভ্রান্ত ছিল বলে অনেকেই মত প্রকাশ করেছেন। তারা মার্কসের এই উক্তির যথার্থতা ব্যাখ্যা করে বলেছেন, আজকালকার মতো আফিম ওই সময়ে নেশাদ্রব্য ছিল না, তখনকার চিকিৎসকরা ব্যাথা বা চেতনানাশক হিসেবে আফিমকে ব্যবহার করতো। আর মার্কস নিপীড়িত, শোষিত মানুষের কাছে ধর্মকে আফিমস্বরূপ বলতে এটাই বুঝতে চেয়েছিলেন যে, সমাজ থেকে প্রাপ্ত যাবতীয় সুঃখ, যন্ত্রণা, কষ্ট, অন্যায়, নির্যাতন লাঘবের চেষ্টায় যখন কোনো ব্যক্তি ব্যর্থ হয়, তখন সৃষ্টিকর্তার কাছে সমস্ত অন্যায়ের বিচার ভার অর্পণ করে। কার্ল মার্কসের ধর্ম সম্পর্কে স্কুল ব্যাখ্যা একান্তই কমিউনিস্ট আর অন্যদিকে স্নায়ুযুদ্ধের সময় সাম্রাজ্যবাদীদের প্রপাগান্ডার ফল। উভয়েই মার্কস ধর্মকে আফিম বলেছেন এই প্রচার চালাতো। কমিউনিস্টরা চালাতো কারণ তারা মনে করে ধর্ম থেকে মুক্ত হয়ে নাস্তিক হওয়াটাই প্রগতিশীল। কমিউনিস্ট হতে হলে নাস্তিক, ইসলাম বিদ্বেষী হতে হবে।
মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী প্রপাগান্ডার প্রধান অস্ত্র ছিল ধর্ম। তারা প্রচার করতো কমিউনিস্টরা আল্লাহ খোদা মানে না, তারা ধর্মবিদ্বেষী। এই অস্ত্র দিয়েই তারা কমিউনিজম ও কমিউনিস্ট উভয়কে সফলভাবে ঘায়েল করতে পেরেছে। ধর্মকে আশ্রয় করেই তারা সকল যন্ত্রণা লাঘবের চেষ্টা করে কিংবা ভুলে থাকে। নিজে যখন বদলা নিতে ব্যর্থ হয় তখন সে মনে করে একদিন না একদিন তার প্রতি এ অন্যায়ের বিচার সৃষ্টিকার্তা করবেন। এ প্রেক্ষাপটেই কার্ল মার্কস এই উক্তিটি করেছিলেন ধর্মের ওপর বেশ ভালো দখল থাকা সত্ত্বেও মার্কস আলাদা করে ধর্ম নিয়ে বিশদ পাড়ালেখা করেন নি। তবে ধর্ম সম্পর্কে মতামত ব্যক্ত করতে গিয়ে তিনি উনিশ শতকে কয়েকজন দার্শনিক দ্বারা প্রভাবিত হন। এদের একজন হলেন ফয়েরবাক। ধর্ম সম্পর্কে ফয়েরবাকের একটি বিখ্যাত রচনা আছে, যার নাম 'Essence of Christanity.
ফয়েরবাকের মতে, ধর্ম হলো সেই সমস্ত মূল্যবোধ ও ধারণার সমষ্টি, যেগুলো মানুষ তাঁদের সাংস্কৃতিক বিকাশের ধারায় সৃষ্টি করেছেন, কিন্তু ভুলভাবে সেগুলোর ওপর ঐশ্বরিক শক্তি বা দেবদেবীদের ইতিহাস বোঝে না, তাই তাঁরা সমাজসৃষ্ট মূল্যবোধ, নিয়মকানুন ঈশ্বরের ক্রিয়াকলাপ বলে।
কার্ল মার্কস-এর মতে সমাজে ধর্মের ভূমিকা:
১। মানুষ তাঁদের দুর্ভাগ্য কিংবা বিপদের সময়ে ধর্মের কাছে আশ্রয় নিয়ে তাঁদের বিপদ থেকে তরে উঠার জন্য দয়া, করুণা, প্রার্থনা করে এবং একাগ্রচিত্রে করুণা প্রার্থনা করায় তাঁরা তা পেয়ে যান।
২। মার্কস বলেছিলেন, ধর্মের সাথে জাদুবিদ্যার একটা সম্পর্ক আছে। তাবিজ, লকেট, বিভিন্ন মন্ত্রপাঠ করে বিপদ-আপদ দূরীকরণ, মঙ্গল কামনায় দোয়া প্রর্থনা ইত্যাদি ধর্মের অংশ। ধর্মে এসব কার্যাবলিকে জাদুবিদ্যা বলা না গেলেও এগুলো প্রায় জাদুবিদ্যা।
৩। প্রতিটি ধর্মেই নির্দিষ্ট কিছু নিয়মকানুন মেনে চলতে হয়।আর এসব নিয়মকানুন মানতে গিয়ে মানুষের মধ্য একটা শৃঙ্খলাবোধের জন্ম হয়। যার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে পড়ে সমাজ ও সাংস্কৃতিক ব্যবস্থার উপর।
৪। ধর্মের মাধ্যমে সমাজে বসবাসরত মানুষের মাঝে দুই ধরনের বন্ধন সৃষ্টি করে, তা হলো স্বধর্মের মানুষেদের পারস্পরিক একাত্মাতা তৈরি করে এবং স্বধর্মের বাইরের মানুষের সঙ্গে বিভেদের সৃষ্টি করে।
৫। মার্কস ধর্মকে মানুষের সত্যিকারের মর্মযাতনার অভিব্যক্তি এবা বাস্তবের নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বলে গণ্য করতেন।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, কার্ল মার্কস ধর্ম সম্পর্কে যে ধারণা ব্যক্ত করেছেন সমাজব্যবস্থা, জতিভেদে সকলে তাদের স্বার্থে তার ব্যাখ্যা করেছেন। তবে মার্কসের ধর্ম সম্পর্কে বিখ্যাত উক্তি, 'ধর্ম নির্যাতিত মানুষের আফিমস্বরূপ। আজও চিরসত্য হিসেবে প্রতীয়মান এবং সমাজ জীবনে চির বাস্তব হয়ে দেখা নিয়েছে।
