মার্কসীয় সমাজবিজ্ঞানের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ আলোচনা কর

মার্কসীয় সমাজবিজ্ঞানের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ

ভূমিকা: আধুনিক যুগের রাজনৈতিক দর্শন, সমাজতত্ত্ব ও অর্থশাস্ত্রের জগতে কার্ল মার্কসের প্রভাব অপরিসীম এবং তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। মার্কসীয় সমাজবিজ্ঞানের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশে যে সকল মনীষী আধুনিক সমাজচিন্তা ও রাষ্ট্রচিন্তার বৈপ্লবিক সম্প্রসারণ ঘটিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে কার্ল মার্কস (Karl Marx) প্রধানতম। সমাজ বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে মার্কসের যে বিজ্ঞানভিত্তিক ও দ্বান্দ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি, তা বিশ্বজুড়ে 'মার্কসবাদ' (Marxism) হিসেবে পরিচিত। সমাজতাত্ত্বিক গবেষণায় মার্কস এবং মার্কসবাদকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার কোনো সুযোগ নেই; কারণ তাঁর তত্ত্বগুলোই আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। আজকের পোস্টে আমরা মার্কসীয় সমাজবিজ্ঞানের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও এর বিকাশের পর্যায়গুলো আলোচনা করব।

মার্কসীয় সমাজবিজ্ঞানের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ

মার্কসীয় সমাজবিজ্ঞানের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের পর্যায়সমূহ

মার্কসীয় সমাজবিজ্ঞানের উদ্ভব ও বিকাশকে মূলত পাঁচটি প্রধান পর্বে বিভক্ত করা যায়। নিম্নে এসকল পর্ব সম্পর্কে বিস্তারিত আলোকপাত করা হলো:

১. উন্মেষ পর্ব (The Emergence Phase)

মার্কসীয় সমাজবিজ্ঞান বিকাশের প্রথম পর্যায়টি হলো উন্মেষ পর্ব। এই সময় মার্কসবাদ সমাজতাত্ত্বিক গবেষণার একটি শক্তিশালী বিকল্প হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। মার্কসীয় সমাজবিজ্ঞানের বিকাশ সম্পর্কে প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী টি. বি. বটমোর মন্তব্য করেছেন, "বিভিন্ন সমাজতাত্ত্বিক তাঁদের নিজস্ব তত্ত্বকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াসে মার্কসীয় তত্ত্বকে সমাজতত্ত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দানে বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করেন।" উদাহরণস্বরূপ, ফার্ডিন্যান্ড টনিজ তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ 'Gememschah and Gesellschaft' (1887)-এ পুঁজিবাদী উৎপাদন পদ্ধতির প্রকৃত স্বরূপ উদঘাটনের জন্য কার্ল মার্কসের প্রতি তাঁর অকুণ্ঠ ঋণ স্বীকার করেন। পরবর্তীতে ১৮৯৪ সালে প্রথম আন্তর্জাতিক কংগ্রেসে কোভালেভস্কি এবং ১৯০০ সালে দ্বিতীয় সমাজতত্ত্ব কংগ্রেসে মার্কসীয় ঐতিহাসিক বস্তুবাদের ওপর ব্যাপক গুরুত্বারোপ করা হয়। ১৮৯০-এর দশকে ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্ল গুনবার্গ, ইতালির এন্টোনিও ল্যাব্রিওলা এবং ফ্রান্সের জর্জ সোরেলের মতো তাত্ত্বিকগণ মার্কসবাদকে পূর্ণাঙ্গ সমাজতত্ত্ব হিসেবে চিহ্নিত করেন।

২. সুবর্ণ যুগ (The Golden Age)

উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে ১৯১৪ সাল পর্যন্ত সময়কালকে মার্কসীয় সমাজবিজ্ঞানের 'সুবর্ণ যুগ' হিসেবে অভিহিত করা হয়। তাত্ত্বিক এল বোউডিল সর্বপ্রথম এই নামকরণ করেন। এ যুগেই মার্কসীয় সমাজতত্ত্বের পদ্ধতিগত অগ্রগতি ঘটে এবং একটি সুনির্দিষ্ট ঘরানা তৈরি হয়, যা সমাজতাত্ত্বিক ইতিহাসে 'অস্ট্রো-মার্কসীয় ঘরানা' নামে পরিচিত।

এই পর্বের প্রধান পথিকৃৎরা হলেন ম্যাক্স এডলার, ওটো বাউয়ার, রুডলফ হিলফারডিং এবং কাল রেনার। তাঁদের মধ্যে ম্যাক্স এডলার মার্কসবাদকে সমাজতত্ত্বের সাথে অভিন্ন সত্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি মার্কসীয় দৃষ্টিকোণ থেকে মতাদর্শ, সংস্কৃতি এবং গণতন্ত্রের ব্যাপক তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ প্রদান করেন। পানেকফ এবং লুডউইক ক্রেজিউইকির অবদানে এই সময়ে সমগ্র ইউরোপজুড়ে মার্কসীয় সমাজতত্ত্ব একটি দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে যায়।

৩. গোঁড়া মার্কসীয় সমাজতত্ত্ব পর্ব (The Orthodox Phase)

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূচনালগ্নে এই পর্বের সূচনা ঘটে এবং রুশ বিপ্লবের বিজয়ের মাধ্যমে এর বিস্তার ঘটে। এই সময়ে মার্কসীয় চিন্তাধারার মূল কেন্দ্র পশ্চিম ইউরোপ থেকে স্থানান্তরিত হয়ে পূর্ব ইউরোপে চলে আসে। এর মাধ্যমেই সূচনা ঘটে 'গোঁড়া মার্কসবাদ'-এর। এ সময় মার্কসবাদ কেবল সমাজতাত্ত্বিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ না থেকে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক মতাদর্শে পরিণত হয়।

সোভিয়েত ইউনিয়নে লেনিন, ট্রটস্কি এবং স্টালিনের নেতৃত্বে মার্কসবাদ প্রাতিষ্ঠানিক ও আনুষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। তবে একই সময়ে জার্মানির ক্রোচ, হাঙ্গেরির লুকাস এবং ইতালির আন্তোনিও গ্রামসি মার্কসীয় সমাজতত্ত্বের একটি বিকল্প ধারা তৈরি করেন, যা পরবর্তীকালে 'পশ্চিমা মার্কসবাদ' (Western Marxism) নামে বিশ্বব্যাপী সমাদৃত হয়।

৪. অন্ধকারাচ্ছন্ন পর্ব (The Dark Period)

১৯৩০-এর দশক থেকে ১৯৫০-এর দশকের মধ্যভাগ পর্যন্ত সময়কালকে মার্কসীয় সমাজবিজ্ঞানের জন্য একটি চরম সংকটের সময় হিসেবে গণ্য করা হয়। টি. বি. বটমোর এই দুই দশককে "অন্ধকারাচ্ছন্ন পর্ব" হিসেবে অভিহিত করেছেন। এ সময় ফ্রাঙ্কফুট ইনস্টিটিউট ফর সোশ্যাল রিসার্চ (Frankfurt School) তাদের বিচারবাদী তত্ত্বের (Critical Theory) মাধ্যমে গোঁড়া মার্কসবাদ ও পশ্চিমা মার্কসবাদ উভয়কেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

ম্যাক্স হরখিমার, থিওডর এডোর্নো এবং হার্বার্ট মার্কুসে দাবি করেন যে, "শ্রমিক শ্রেণি আর বিপ্লবী শ্রেণি এক নয়।" এই বক্তব্যের মাধ্যমে তাঁরা মার্কসবাদের মৌল বৈশিষ্ট্যকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেন। এছাড়া ইউরোপে ফ্যাসিবাদের উত্থানের ফলে মার্কসীয় বুদ্ধিজীবীরা দেশত্যাগে বাধ্য হন এবং অনেক গবেষণা কেন্দ্র ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। ঠান্ডা লড়াইয়ের বিস্তৃতির ফলে সমাজতত্ত্ব 'বুর্জোয়া' ও 'মার্কসীয়' এই দুই ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়ে।

৫. পুনর্জাগরণের পর্ব (The Revival Phase)

১৯৫০-এর দশকের পরবর্তী সময় থেকে বর্তমান পর্যন্ত সময়কালকে মার্কসীয় সমাজবিজ্ঞানের পুনর্জাগরণের কাল বলা হয়। স্টালিনোত্তর যুগে পূর্ব ইউরোপে 'স্টালিনবাদ বিসর্জন' প্রক্রিয়া শুরু হলে মার্কসের অনেক পূর্বে বাতিল হওয়া চিন্তাগুলো পুনরায় আলোচনায় আসে। এ সময় মার্কসের দুটি গুরুত্বপূর্ণ পাণ্ডুলিপি— 'Economic and Philosophical Manuscript (1844)' এবং 'Grundrisse (1857-58)' প্রকাশিত ও অনুদিত হয়।

এর ফলে সমাজতাত্ত্বিক গবেষণায় নতুন উদ্দীপনার সৃষ্টি হয় এবং মার্কসীয় সমাজতত্ত্ব দুটি শক্তিশালী ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়ে: ১. বিচারবাদী তত্ত্ব (Critical Theory): হরখিমার, এডোর্নো এবং হেবারমাসের নেতৃত্বে। ২. অবয়বাদী মার্কসবাদ (Structural Marxism): লুই আলথুজার, লেডি স্ট্রায় এবং গোল্ডম্যানের নেতৃত্বে।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, মার্কসবাদ কেবল আবেগতাড়িত কোনো অনুভূতি নয়, বরং এটি সর্বহারা বা প্রলেতারিয়েত শ্রেণির স্বার্থের এক অনন্য বৈজ্ঞানিক অভিব্যক্তি। কার্ল মার্কসের মহান ঐতিহাসিক কীর্তি হলো এই মার্কসবাদ, যার সুদৃঢ় ভিত্তি হলো বিজ্ঞান। এই দর্শন পুঁজিবাদী সমাজের অন্তর্নিহিত সংকটগুলো উন্মোচন করতে এবং শ্রমিক শ্রেণির মুক্তির বাস্তবসম্মত ও বিজ্ঞানসম্মত পথ দেখাতে আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। মার্কসীয় সমাজবিজ্ঞানের এই পর্যায়ক্রমিক বিবর্তনই মূলত আধুনিক সমাজচিন্তার প্রেক্ষাপট রচনা করেছে।

shikhaprotidin

I have a Master's degree in Sociology from the National University and I run my sociology and education platform Shikhaprotidin.com to help students.

নবীনতর পূর্বতন