উন্নয়নমূলক সমাজবিজ্ঞান কী? বাংলাদেশের উন্নয়নের নির্ঘণ্ট বা সূচকসমূহ লিখ

উন্নয়নমূলক সমাজবিজ্ঞান কী? বাংলাদেশের উন্নয়নের সূচকসমূহ

ভূমিকা:- সমাজবিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শাখা হিসেবে উন্নয়ন সমাজবিজ্ঞানের আর্বিভাব অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ। উন্নয়নমূলক সমাজবিজ্ঞান অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশসমূহের উন্নয়ন সমস্যা অর্থাৎ অনুন্নত দেশসমূহ কেন অনুন্নত, উন্নয়নের পথে কি বাধা রয়েছে এবং কীভাবে সেসকল সমস্যা সমাধান করা যায় তা নিয়ে আলোচনা করে থাকে।

উন্নয়নমূলক সমাজবিজ্ঞান কি? উন্নয়নের সূচকসমূহ

উন্নয়নমূলক সমাজবিজ্ঞান

সাধারণ অর্থে আর্থসামাজিক মুক্তির লক্ষ্যে সমাজবিজ্ঞানের যে বিষয় বা শাখায় উন্নয়নের সামগ্রিক বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা করা হয় তাকেই উন্নয়নমূলক সমাজবিজ্ঞান বলে।

জেরি and জেরি তাদের Collins Dictionary of Sociology গ্রন্থে উন্নয়নের সমাজবিজ্ঞানের সংজ্ঞা প্রদান করতে গিয়ে বলেন উন্নয়নের সমাজবিজ্ঞান হলো সমাজবিজ্ঞানের সেই শাখা যা কৃষিমূলক সমাজ থেকে শুরু করে শিল্পভিত্তিক সমাজে উত্তরণের বিভিন্ন দিক আলোচনা করে।

Andrew Webster's তার Introduction t the Sociology of Development গ্রন্থে উন্নয়নমূলক সমাজবিজ্ঞানকে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে একই সাথে উন্নয়নের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, বিদ্যমান সামাজিক বাস্তবতা এবং আধুনিকায়ন তথা শিল্পায়ন, নগরায়ন ও অন্যান্য সামাজিক পরিবর্তন প্রক্রিয়াকে প্রাধান্য দিয়েছেন।

উপরিউক্ত আলোচনার আলোকে বলা যায় যে, উন্নয়নমূলক সমাজবিজ্ঞান হচ্ছে সমাজবিজ্ঞানের সেই শাখা যা সমাজের উন্নয়নকে একটি প্রক্রিয়া হিসেবে বিশ্লেষণ করে থাকে।

উন্নয়নের নির্ঘণ্ট বা সূচকসমূহ

কোন দেশ কতটা উন্নত তা নির্ধারনের জন্য যে মানদন্ড ব্যবহার করা হয় তাই উন্নয়নের সূচক হিসেবে পরিচিত। যেমন- শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গৃহায়ন ইত্যাদি। উন্নয়নের নির্ঘণ্টকে চারটি সূচকের মাধ্যমে প্রকাশ করা যায়। যেমন-

ক. অর্থনৈতিক নির্ঘট (Economic indicator):

নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে অর্থনৈতিক মাত্রায় উন্নয়নের সূচক বা নির্ঘণ্টকে ভাগ করা হয়েছে-

১. মাথাপিছু আয় (Per capital income):

সমগ্র দেশের ব্যবসায়ী, শিক্ষক, শ্রমিক, কৃষক বার্ষিক যে পরিমাণ আয় করে থাকে, তাদের সবার আয়কে জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করে পাওয়া যায় গড় আয়। এর মাধ্যমে একটি দেশের সামগ্রিক অবস্থা বুঝা । এবং দেশের সম্পদ কতখানি থাকে তা বুঝা সম্ভব। মাথাপিছু গড় আয় একটি অতি প্রয়োজনীয় বা অপরিহার্য পরিমাপ। উন্নত দেশের তুলনায় উন্নয়নশীল দেশের মাথাপিছু আয় অত্যন্ত কম। যেমন- উন্নয়শীল তথা বাংলাদেশের জনগণের মাথাপিছু আয় উন্নত দেশের তুলনায় নগণ্য।

২. মোট জাতীয় উৎপাদন (Gross national production):

উন্নত দেশের তুলনায় অনুন্নত দেশের মোট জাতীয় উৎপাদন খুবই কম। এর কারণ অনুন্নত বিশ্বে কৃষিক্ষেত্রে উদ্ভাবিত যন্ত্র ও কলাকৌশল ব্যবহারের অনীহা, মূলধন ও সামথ্যের অভাব ইত্যাদি কারণে উন্নত দেশের তুলনায় অনুন্নত দেশের মোট জাতীয় উৎপাদন অত্যন্ত কম।

৩. শিল্পায়ন (Industrialization):

আধুনিক উন্নত বিশ্ব শিল্পের মাধ্যমে উন্নত হচ্ছে। কোনো দেশের শিল্পের বিকাশের উপর ভিত্তি করে উন্নয়নের নির্দেশক চিত্র পাওয়া যায়। আবার শিল্পায়ন ব্যতিরেকেও অনেক দেশ মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে শিল্পায়িত দেশের থেকে এগিয়ে গেছে। যেমন- ব্রুনাই, কুয়েত, আরব ইত্যাদি দেশের মাথাপিছু আয় অত্যন্ত বেশি। এর কারণ হিসেবে তেল সম্পদের কথা উল্লেখ করা যায়।

৪. কলাকৌশল গ্রহণ (Taking tacties):

অনুন্নত দেশে যেমন- এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার দেশসমূহে শিল্প বা কৃষিতে অধিকাংশ যন্ত্রপাতি সেকালের হাতে চালানো কলা-কৌশলের ফলে উন্নত বিশ্বের সাথে এদেশের উৎপাদন অনেক পিছিয়ে রয়েছে। একটি দেশের জাতীয় উৎপাদনে কী ধরনের প্রযুক্তি ও কলাকৌশল ব্যবহার করে তার সাহায্যে উন্নয়নের মাত্রা নিরূপণ করা যায়।

৫. জাতীয় সম্পদের বণ্টন (Distribution of national property):

জাতীয় সম্পদের বণ্টন ব্যবস্থাকে উন্নয়নমূলক সমাজবিজ্ঞানে Indices হিসেবে ধরা হয়। অনুন্নত দেশের জাতীয় সম্পদের অসম বণ্টন উন্নয়ন ক্ষেত্রে এক বিরাট অন্তরায় সৃষ্টি করে। যেমন- পাকিস্তানের সামগ্রিক শিল্প ব্যবস্থা এবং বর্তমান বাংলাদেশের শিল্প ব্যবস্থা সে পরিবার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।

৬. বাজার অর্থনীতি (Market economy):

ঔপনিবেশিকতার প্রভাবে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী বাজারজাতকরণ সম্ভব হয়নি। বাজার অর্থনীতি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিশেষ মূল্যবান বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়াও সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সাথে আমাদের দেশের পণ্যসামগ্রী গুণগত মান দিয়ে টিকে থাকতে পারছে না এবং ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে না।

৭. বাণিজ্যিক ভারসাম্য (Commercial equilibrium):

এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিমাণ এবং ভারসাম্য উন্নয়নের নির্ঘণ্ট হিসেবে বিবেচ্য। অনুন্নত বিশ্বের দেশসমূহে শর্তসাপেক্ষে বাণিজ্য পরিচালনার কারণে বাণিজ্য ক্ষেত্রে ভারসাম্যহীনতা একটি নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ক্ষেত্রে কোনো সুরাহা করতে পারছে না।

খ. সামাজিক নির্বট (Social Indicator):

নিম্নে উন্নয়নের সামাজিক নির্ঘণ্ট আলোচনা করা হলো।

১. শিক্ষার হার (Rate of education):

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যেমন মাথাপিছু আয়, তেমনি সামাজিক ক্ষেত্রে শিক্ষার হার গুরুত্বপূর্ণ। উন্নয়নের ক্ষেত্রে শিক্ষার হারের ভূমিকা রয়েছে, যা সামাজিক উন্নয়নের চিত্রকে ধরে রাখে। তাই শিক্ষার হারকে কোনো দেশের উন্নয়নের মানদণ্ড হিসেবে ধরা হয়। যেমন-জাপান, সিংগাপুর, হংকং, মালয়েশিয়া শিক্ষার মাধ্যমে উন্নত দেশ হিসেবে পরিগণিত হয়েছে।

২. জনসংখ্যা (Population):

জনসংখ্যা বৃদ্ধি অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে। অনুন্নত বিশ্বের প্রায় সকল দেশেই জনসংখ্যার হার অত্যন্ত বেশি যা সামগ্রিকভাবে উন্নয়নের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। তাই উন্নয়নমূলক সমাজবিজ্ঞানে এটাকে Indices বলে।

৩. সমাজ কাঠামো (Social structure):

উপনিবেশিক তথ্য সাম্রাজ্যবাদী প্রভাবে প্রভাবিত অনুন্নত বিশ্বের প্রতিটি দেশ। এখানকার সমাজ কাঠামোকে একটি বিশেষ পর্যায়ে স্থিতিশীল করে রেখেছে বিভিন্ন কুসংস্কার এবং ঐতিহ্য। তাই এখানে উন্নয়ন হচ্ছে না। এ কারণে উন্নয়নের আলোচনা সাম্রাজ্যবাদ হিসেবে বিবেচা বিষয়।

৪. নগরায়ন (Urbanization):

নগরায়নকে উন্নয়নের মানদণ্ড হিসেবে ধরা হয়। অর্থাৎ, কোনো দেশের মোট জনসংখ্যার কত শতাংশ লোক শহরে বাস করে তা দিয়ে দেশ কতটা উন্নত নির্ণয় করা যায়। বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার শতকরা ২৫% লোক শহরে বাস করে। উন্নত দেশে ৭০% অথবা ৮০% লোক শহরে বাস করে।

৫. শ্রমশক্তি (Manpower):

শ্রমশক্তির ভূমিকা অগ্রগণ্য উন্নয়নের নির্ঘণ্ট হিসেবে। জনসংখ্যা তত্ত্বকে শ্রমশক্তির বিচারে ভাগ করা যায়। যথা- ক. শিল্প খ. কৃষি এবং গ. ব্যবসায়। ব্যবসায়, কৃষি ও শিল্প শ্রমিকের সংখ্যা নির্ধারণ করে দেয় একটি দেশ কতটুকু উন্নত। উন্নত বিশ্বে শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিক বেশি। আর অনুন্নত দেশে কৃষিতে নিয়োজিত শ্রমিক বেশি।

গ. রাজনৈতিক নির্ঘণ্ট (Political Indicator)

উন্নয়নের মানদণ্ড হিসেবে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে নির্ঘণ্টের ভূমিকা অপরিহার্য। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে উন্নত বিশ্বে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়। যেমন- ইংল্যান্ড ও আমেরিকায় High political culture রিদ্যমান। এছাড়া সংক্ষেপে বলা যায়-

১. শক্তিশালী গণতন্ত্র বিশেষ করে ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় কার্যকরী ভূমিকা।

২. রাজনৈতিক গতিশীলতা।

৩. রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান বা দলসমূহের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও স্বকীয়তা।

৪. ধারাবাহিকভাবে নির্বাচন সম্পন্ন ইত্যাদি।

ঘ. সাংস্কৃতিক নির্ঘণ্ট (Cultural Indicator):

উন্নয়নের সাংস্কৃতিক নির্ঘণ্টসমূহ নিম্নে আলোচনা করা হলো।

১. গণমাধ্যম (Mass media):

উন্নয়নের অপরিহার্য মানদণ্ড হিসেবে গণমাধ্যমকে বিবেচনা করা হয়। যে দেশের গণমাধ্যম যত বেশি স্বাধীন ও সক্রিয় সে দেশ তত বেশি উন্নত।

২. সংবাদ পরিবেশনায় বস্তুনিষ্ঠতা (Substance of news):

আমাদের দেশে শিক্ষার হার কম হওয়ায় পাঠকের হারও কম। অথচ উন্নত বিশ্বে ৯০ ভাগ জনগণই পত্রিকা পাঠের আওতাধীন। সেখানে সমষ্টিগত উন্নয়নের কথা চিন্তা করা যায় না। উন্নত দেশে গণমাধ্যমের প্রভাবে উন্নয়ন ব্যাহত হলে সম্মিলিতভাবে প্রতিহত করা যায়। অভ্যন্তরীণ প্রকৃত সংবাদ প্রকাশে তাদের কোনো দুর্বলতা পরিলক্ষিত হয় না। তৃতীয় বিশ্ব তথ্য উন্নয়নশীল দেশসমূহের নির্ঘণ্টের যথোপযুক্ত প্রয়াস ও ব্যবস্থারের মাধ্যমে। উন্নত হওয়ার বিশেষ সুযোগ রয়েছে।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, শিক্ষা তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নের প্রধান মাপকাঠি। শিক্ষা বিস্তারের মাধ্যমে সামাজিক পর্যায়ে উন্নয়ন সম্ভব। উন্নত বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যায় যে, তাদের উন্নয়নের পিছনে সবচেয়ে বড় অবদান হলো শিক্ষা। উন্নয়ন বিনিয়োগ ক্ষেত্রে শিক্ষার ভূমিকা রয়েছে। উন্নত বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যায় যে, তাদের উন্নয়নের পিছনে সবচেয়ে বড় অবদান শিক্ষা।

Md Belal Hossain

আমি মোঃ বেলাল হোসাইন, বাংলাদেশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে মাস্টার্স/স্নাতকোত্তর (M.S.S) ডিগ্রী অর্জন করেছি এবং Shikhaprotidin-এর প্রতিষ্ঠাতা। Shikhaprotidin একটি শিক্ষামূলক প্ল্যাটফর্ম যেখানে আমি সমাজবিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলোকে উপস্থাপন করি ও শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষামূলক দিকনির্দেশনা প্রদান করি।

নবীনতর পূর্বতন