রাজনৈতিক ব্যবস্থার সংজ্ঞা এবং গুরুত্ব আলোচনা
ভূমিকা:- রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানের আলোচ্য প্রত্যয় গুলোর মধ্য অন্যতম হলো রাজনৈতিক ব্যবস্থা বা রাজনীতি। একটি দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা দ্বারা সেই দেশ বা সমাজ ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়। আবার একটি দেশ বা সমাজের উন্নয়ন সেই দেশের রাজনীতি ব্যবস্থার উপর নির্ভর করে। যে দেশের রাজনীতি রাজনীতি ব্যবস্থা যত স্থিতিশীল ও শক্তিশালী হবে সে দেশ বা সমাজ তত বেশি উন্নতি লাভ করবে। তাই রাজনৈতিক ব্যবস্থা একটি দেশ বা সমাজের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
রাজনৈতিক ব্যবস্থা
সাধারণভাবে রাজনৈতিক ব্যবস্থা বলতে বোঝায় একটি সমাজের সামগ্রিক ব্যবস্থা বিশ্লেষণকারী প্রক্রিয়া, যেখানে সেই সমাজের ক্ষমতা, কর্তৃত্ব, সামাজিক সংগঠন ইত্যাদির ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করা। একটি সমাজের রাজনীতি ব্যবস্থা মূলত ঐ সমাজের প্রতিনিধিত্ব করে ।
রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রামাণ্য সংজ্ঞা
বিভিন্ন সমাজতাত্ত্বিক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে রাজনৈতিক ব্যবস্থার সংজ্ঞা প্রদান করেছেন। নিম্নে কয়েকটি বিজ্ঞানীর সংজ্ঞা তুলে ধরা হলো।
সমাজতাত্ত্বিক ডেভিড ইস্টন (David Easton) রাজনৈতিক ব্যবস্থার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন-“রাজনৈতিক ব্যবস্থা হলো এক পারস্পরিক প্রতিক্রিয়ার ব্যবস্থা যার মাধ্যমে মূল্যের বাধ্যতামূলক এবং কর্তৃত্বসম্পন্ন বরাদ্দের কাজ সম্পন্ন করা হয়।”
সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার (Max Weber) এর মতে-“রাজনৈতিক ব্যবস্থা হলো একটি জনগোষ্ঠী যা কোন নির্ধারিত ভূখন্ডে সফলতার সঙ্গে একচেটিয়া ভাবে বৈধ দৈহিক শক্তি প্রয়োগ করে।”
প্রফেসর রবার্ট ডাল (Prof. Robert Dhull) এর মতে-“একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা বলতে যেকোন মানব সম্পর্কের স্থায়ী কাঠামো বা পরিমাণ অন্তর্ভূক্ত করে ক্ষমতা, বিধি বা কর্তৃত্বকে বোঝায়।”
বিয়াব ও ওলমের মতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের একটি ব্যবস্থাই হলো রাজনৈতিক ব্যবস্থা।
অ্যালমন্ড ও পাওয়েল এর মতে রাজনৈতিক ব্যবস্থা হলো সেই ব্যবস্থা যার মধ্যে সব ধরনের মিথস্ক্রিয়া বর্তমান। এসব মিথস্ক্রিয়ার দ্বারা বিধিসম্মত দৈহিক পীড়নের প্রয়োগের হুমকি প্রভাবিত হয়।
রাজনৈতিক ব্যবস্থার গুরুত্ব:
রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ব্যক্তি জীবন হতে শুরু করে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় সকল ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
১. সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা:
রাজনৈতিক ব্যবস্থা সমাজের বিভিন্ন গোষ্ঠী ও স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে সমাজে আইন-শৃঙ্খলা, ন্যায়বিচার ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করে।
২. উন্নয়নে সহায়তা:
উন্নয়নের জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিকল্পিত রাজনৈতিক ব্যবস্থাই উন্নয়ন নীতি বাস্তবায়নে সহায়ক হয়।
৩. জনগণের অংশগ্রহণ:
গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় জনগণের মতামত, মত প্রকাশ ও নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ থাকে।
৪. আন্তর্জাতিক সম্পর্ক:
একটি দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা কেমন, তা আন্তর্জাতিক পর্যায়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। যেমন- একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ব্যবস্থা বিদেশের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপনের মধ্য দিয়ে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
৫. নীতিনির্ধারণ ও সম্পদ বণ্টন:
রাজনৈতিক ব্যবস্থার মাধ্যমেই রাষ্ট্রীয় সম্পদ, সুযোগ ও ক্ষমতা বণ্টিত হয়।
৬. আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ:
রাষ্ট্রের নাগরিকদের অধিকার রক্ষা এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করা রাজনৈতিক ব্যবস্থার মূল কাজ।
৭. অর্থনৈতিক উন্নয়ন:
একটি দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ও বিভিন্ন নীতি নির্ধারণ সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। স্থিতিশীল রাজনীতিই বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
৮. দ্বন্দ্ব নিরসন:
সমাজে বিদ্যমান বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক দ্বন্দ্ব আলোচনার মাধ্যমে মিমাংসা করে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করা রাজনৈতিক ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, রাজনৈতিক ব্যবস্থা কোন সমাজের প্রতিনিধিত্ব করে। যেখানে ঐ নির্দিষ্ট সমাজের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও আইনগত প্রতিষ্ঠানের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া নির্দেশ করে। আর এই রাজনৈতিক ব্যবস্থা কোন সমাজের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাই প্রভাবিত করেনা, বরং আন্তর্জাতিক পরিবেশকে প্রভাবিত করে। সুতরাং রাজনৈতিক ব্যবস্থা একটি সমাজের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ কেননা সেই সমাজের কাঠামো ও পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে। তাই রাজনৈতিক ব্যবস্থা যত সুদৃঢ়, জবাবদিহিমূলক ও জনমুখী হবে, সেই সমাজ বা রাষ্ট্র ততই উন্নত, সুশাসিত ও স্থিতিশীল হবে।
