এমিল ডু্রখেইমের পরিচয় এবং শ্রমবিভাজন নীতি আলোচনা
ভূমিকা:- সমাজবিজ্ঞানের উৎপত্তি ও বিকাশে যে সব মনীষীদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে তাদের মধ্যে এমিল ডুর্খেইম অন্যতম। তিনি ছিলেন বহুমুখী প্রতিবার অধিকারী। সমাজ সম্পর্কে তিনি অনেক মতবাদ তৈরী করেন। সমাজকে উন্নতির চরম শিখরে আরোহণে তার অবদান অপরিসীম। আজকের আলোচনার বিষয় এমিল ডুর্খেইম কে ছিলেন ও সমাজবিজ্ঞানে এমিল ডুর্খেইমের শ্রমবিভাজন নীতির গুরুত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত।
এমিল ডুরখেইম-এর পরিচয়
এমিল ডুরখেইম সমাজবিজ্ঞানের উৎপত্তি ও বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। নিম্নে এমিল ডুর্খেইম এর পরিচয় ও অবদান সম্পর্কে উল্লেখ করা হলো-
১। জন্ম: এমিল ডুরখেইম ১৮৫৮ সালের ১৫ এপ্রিল ফ্রান্সের নরিন প্রদেশের ইপিনামে এক ধর্মভীরু পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
২। শিক্ষাজীবন: তিনি প্যারিসের বিখ্যাত 'ইকোল নরমাল সুপিরিয়র' থেকে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন। ছাত্র হিসেবে তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন।
৩। বিবাহ ও সন্তান: ১৮৮৭ সালে, ডুর্খেইম লুইস ড্রেফাসকে বিয়ে করেন। তাদের দুটি সন্তান ছিল যাদের নাম- মারি এবং আন্দ্রে।
৪। সমাজবিজ্ঞানী হিসেবে: এমিল ডুরখেইমের আর একটি পরিচয় হলো তিনি ছিলেন ফ্রান্সের একজন নামকরা সমাজবিজ্ঞানী। সমাজবিজ্ঞানের উদ্ভব ও বিকাশে তার অবদান অতুলনীয়।
৫। দার্শনিক হিসেবে: এমিল ডুর্খেইম একজন সমাজবিজ্ঞানী ছিলেন না পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন দার্শনিক । সমাজ নিয়ে তিনি দার্শনিকের মত চিন্তা করতেন।
৬। লেখক হিসেবে: এমিল ডুরখেইম একজন লেখক ছিলেন।যিনি সমাজবিজ্ঞানের উন্নতি ও বিকাশে অনেক গ্রন্থ রচনা করেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হলো- The Division of labour in society -১৮৯৩, The Rules of Sociological method -১৮৯৫, Suicide -১৮৯৭, Third Famous ইত্যাদি।
৭। সংস্কারক হিসেবে: তিনি ছিলেন একজন সমাজ সংস্কারক। তিনি সমাজের অসঙ্গতি দুর করেন । সমাজ বিকাশে তিনি শ্রমবিভাজন, আত্মহত্যা, পুঁজিবাদ ইত্যাদি মতবাদ আলোচনা করেন।
৮। মৃত্যু: ১৫ই নভেম্বর ১৯১৭ (৫৯ বছর) বয়সে ফ্রান্সের প্যারিসে।
পরিশেষে বলা যায় যে, এমিল ডুরখেইম ছিলেন একজন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। তিনি ছিলেন কবি, সাহিত্যিক, লেখক ও দার্শনিক। সমাজবিজ্ঞানের উদ্ভব ও বিকাশে এমিল ডুর্খেইম এর অবদান অপরীসীম।
এমিল ডুরখেইমের শ্রমবিভাজন নীতি
চিন্তা জগৎ এর ইতিহাসে এব অনবদ্য কৃতিত্বের অধিকারী ব্যক্তিরুপে এমিল ডুরখেইম (Emile Durkhim) ঘটে। তিনি তার The Division of labour গ্রন্থে শ্রমবিভাজন সংক্রান্ত বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। সমাজকে তিনি বিশেষভাবে বিশ্লেষণ করে শ্রমবিভাজনের কথা উল্লেখ করেছেন। শ্রমবিভাজনের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে তিনি বলেছেন- The Division of labour is a low of nature, also a moral rale of human conduct.
শ্রমবিভাজন
এমিল ডুরখেইম (Emile Durkhim) সমাজতাত্ত্বিক আলোচনার যেসব মতবাদ আলোচনা করেছেন তার মধ্য অন্যতম হলো সমাজে শ্রমবিভাজন সম্পর্কিত তত্ত্ব। তিনি যে মতবাদের ভিত্তিতে সমাজে শ্রমবিভাজন করেন সেটি হলো সামাজিক সংহতি বা যৌথ প্রতিরুপ।
শ্রমবিভাজন সম্পর্কে ইংরেজি অক্সফোর্ড ডিকশনারিতে বলা হয়- একটি প্রক্রিয়ার বিভাজন বা অংশগুলির মধ্যে একটি নিয়োগ, যার প্যাচ একটি পৃথক ব্যক্তি দ্বারা সঞ্চালিত হয়
ডুর্খেইম তার ‘Division of labour’ পুস্তকে শ্রমবিভাজন সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তিনি বলেন, ব্যক্তিসত্তার সাথে সমাজ সত্তার সম্পর্ক আছে আর এখান থেকে তিনি এ ধরনের প্রেরণা পান। তিনি দেখান যে, শ্রম বিভাজনের দিক থেকে সমাজে দুই ধরনের সংহতি পাওয়া যায়- ১। যান্ত্রিক সংহতি (mechanical solidarity) ও ২। জৈবিক সংহতি (Organic solidarity)।
ক. যান্ত্রিক সংহতি
এটি মূলত আদিম বা প্রাচীন সমাজে দেখা যায়। এই সমাজে সবার কাজ, চিন্তা এবং বিশ্বাস প্রায় একই রকম থাকে। এখানে ব্যক্তিগত স্বাতন্ত্র্য কম থাকে এবং সবাই সমষ্টিগত চেতনায় বিশ্বাসী।
আইন: এখানে 'দমনমূলক আইন' (Repressive Law) কার্যকর থাকে। অর্থাৎ, কেউ অপরাধ করলে তাকে কঠোর শাস্তি বা জনসমক্ষে লাঞ্ছিত করা হয় যাতে অন্যরা ভয় পায়।
খ. জৈবিক সংহতি
এটি আধুনিক বা শিল্পোন্নত সমাজে দেখা যায়। এখানে শ্রমবিভাজন অত্যন্ত জটিল। মানুষ একে অপরের ওপর নির্ভরশীল (যেমন: কৃষক খাদ্যের জন্য, ডাক্তার চিকিৎসার জন্য এবং ইঞ্জিনিয়ার যন্ত্রের জন্য পরস্পরের ওপর নির্ভর করে)। এটি অনেকটা মানবদেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মতো, যেখানে প্রতিটি অঙ্গ আলাদা কাজ করলেও জীবন বাঁচাতে সবাই সবার ওপর নির্ভরশীল।
আইন: এখানে 'ক্ষতিপূরণমূলক আইন' (Restitutive Law) কার্যকর থাকে। এখানে অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার চেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া বা স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার ওপর জোর দেওয়া হয়।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, এমিল ডুরখেইম নৈতিকতার ষমাজবিজ্ঞানী হিসেবে বিশেষ মূল্যায়নের যোগ্য। শ্রম বিভাজন সম্পর্কিত আলোচনায় এমিল ডুর্খেইম তার নৈতিকতার প্রশ্নটি প্রথম সারিতে নিয়ে আসেন। যাইহোক তিনি সমাজবিজ্ঞানের বিকাশে তার অবদান অপরীসীম।
আরও পড়ুন- এমিল ডুর্খেইম-এর যান্ত্রিক ও জৈবিক সংহতির মধ্য পার্থক্য
