মার্কসবাদ হলো একটি বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞান ব্যাখ্যা
ভূমিকা: আধুনিক যুগের রাজনৈতিক চিন্তা, সমাজতত্ত্ব ও অর্থশাস্ত্রের জগতে কার্ল মার্কসের প্রভাব অপরসীয় তথা অবিস্মরণীয়। সমাজ বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে মার্কসের যে বস্তুনিষ্ঠ ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি, তা বিশ্বজুড়ে 'মার্কসবাদ' (Marxism) হিসেবে সমাদৃত। সমাজচিন্তা ও রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে কার্ল মার্কস এবং মার্কসবাদকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার কোনো অবকাশ নেই। মার্কসবাদ মূলত কোনো নিছক কল্পনাপ্রসূত ধারণা নয়, বরং এটি একটি বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞান, যা সমাজের অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের ধারাকে বৈজ্ঞানিক সূত্রের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করে।
সমাজবিজ্ঞান হিসেবে মার্কসবাদ বা মার্কসবাদ একটি সমাজবিজ্ঞান:
মার্কসবাদ একটি বিশিষ্ট সমাজতত্ত্ব বা বিজ্ঞান। এটি কেবল কোনো অর্থনৈতিক রূপরেখা বা দলীয় রাজনৈতিক মতবাদ নয়; বরং এটি ইতিহাসের দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় গড়ে ওঠা একটি সুশৃঙ্খল সমাজতাত্ত্বিক পদ্ধতি। সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক, অ-অধিবিদ্যাগত এবং প্রাকৃতিক সমাজতত্ত্ব গড়ে তোলার যতগুলো প্রয়াস সমাজবিজ্ঞানের ইতিহাসে পরিলক্ষিত হয়, তার মধ্যে মার্কসীয় সমাজতত্ত্ব অন্যতম। নিচে মার্কসবাদকে সমাজবিজ্ঞান হিসেবে মূল্যায়নের প্রধান ভিত্তিগুলো আলোচনা করা হলো:
১. বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের উদ্ভাবন (Discovery of Scientific Socialism)
মার্কসবাদকে সমাজবিজ্ঞানের মর্যাদা দানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে কার্ল মার্কস কর্তৃক প্রণীত 'বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের তত্ত্ব'। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে যখন ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও জার্মানিতে পুঁজিবাদ চরম শিখরে পৌঁছায়, তখন এর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বসমূহ প্রলেতারিয়েত (শ্রমিক) ও বুর্জোয়া (মালিক) শ্রেণির মধ্যে সংঘাতকে তীব্র করে তোলে।
কার্ল মার্কস প্রত্যক্ষ করেন যে, বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ছাড়া শ্রমিক শ্রেণি সফলভাবে এই অসম ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারবে না। তিনি সমাজতন্ত্রকে নিছক 'স্বপ্নলোক' (Utopia) থেকে বের করে বিজ্ঞানের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করেন। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, সমাজের পরিবর্তন কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি বস্তুগত এবং অর্থনৈতিক কারণের ফল। এজন্যই মার্কসবাদকে একটি প্রাণবন্ত, সৃজনশীল ও নিরন্তর বিকাশমান বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
২. মানবসমাজের বিবর্তন ও শ্রেণিসংগ্রামের তত্ত্ব
সমাজতত্ত্ব হিসেবে মার্কসবাদের অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি হলো এর উৎপাদন প্রণালীর (Mode of Production) বিশ্লেষণ। মার্কস দেখিয়েছেন যে, উৎপাদনের উপকরণের মালিকানা পরিবর্তনের সাথে সাথে সমাজের শ্রেণি কাঠামোও পরিবর্তিত হয়।
ঐতিহাসিক বিকাশ: মানবসমাজের ঐতিহাসিক বিবর্তনের মূলে রয়েছে শ্রেণিদ্বন্দ্ব।
পুঁজিবাদের পতন: মার্কসীয় সমাজতত্ত্ব পুঁজিবাদের উৎপত্তি ও বিকাশের ঐতিহাসিক সূত্রাবলি ব্যাখ্যা করে প্রমাণ করে যে, শ্রেণি সংগ্রামের অনিবার্য পরিণতি হিসেবে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার পতন ঘটবে এবং সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে।
সৃষ্টবাদী বিজ্ঞান হিসেবে মার্কসবাদ সমাজবিজ্ঞান গড়ে ওঠার সূচনালগ্নে গভীর প্রভাব বিস্তার করে। বর্তমানের বেশিরভাগ গুরুত্বপূর্ণ সমাজতাত্ত্বিক তাত্ত্বিক কাঠামো গঠনে মার্কসবাদকে একটি অপরিহার্য 'টুল' বা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন।
৩. ঐতিহাসিক বস্তুবাদের বিশ্লেষণ ও তাত্ত্বিক সম্প্রসারণ
১৮৯৪ সালে সমাজতত্ত্বের প্রথম আন্তর্জাতিক অধিবেশনে বহু বিশিষ্ট তাত্ত্বিক মার্কসীয় তত্ত্বকে সমাজবিজ্ঞানের প্রধান ধারা হিসেবে সম্প্রসারিত করেন। ১৯০০ সালে দ্বিতীয় অধিবেশনে মার্কসের ঐতিহাসিক বস্তুবাদ (Historical Materialism) নিয়ে ব্যাপক তাত্ত্বিক আলোচনা হয়। সমসাময়িক সময়ে সমাজবিজ্ঞানী জর্জ সোরেল যখন এমিল ডুর্খেইমের সমাজতত্ত্ব নিয়ে তুলনামূলক আলোচনা করছিলেন, তখন এন্টোনিও ল্যাব্রিওলা মার্কসীয় তত্ত্বের ভিত্তিতে ঐতিহাসিক বস্তুবাদের সমাজতাত্ত্বিক গুরুত্ব তুলে ধরেন। এছাড়া বেনেদেত্তো ক্রোচে তাঁর নিবন্ধগুলোতে মার্কসবাদকে একটি একাডেমিক সমাজতত্ত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। মাক্স ওয়েবার থেকে শুরু করে সমসাময়িক সকল সমাজবিজ্ঞানী মার্কসীয় তত্ত্বের গুরুত্ব স্বীকার করেছেন, যা এই মতবাদকে একটি বিজ্ঞান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, মার্কসবাদের সঙ্গে সমাজতত্ত্বের এক নিবিড় ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিদ্যমান। মার্কসীয় দর্শনই সমাজ সম্পর্কিত বিষয়াদির ক্ষেত্রে গভীর চিন্তাভাবনাকে জাগরিত করেছে এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে উৎসাহিত করেছে। এটি সামাজিক সমস্যাসমূহকে এমন একটি বাস্তবধর্মী ও বৈজ্ঞানিক কাঠামোর মাধ্যমে উপস্থাপন করেছে যে, মার্কসবাদ নিজেই একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ সমাজবিজ্ঞানে পরিণত হয়েছে। তাই সমাজ বিকাশের বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব হিসেবে মার্কসবাদের গুরুত্ব অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।
