লুম্পেন বুর্জোয়া কারা? মার্কবাদের বিকাশে কার্ল ক্রোচের চারটি মূলনীতি লিখ

লুম্পেন বুর্জোয়া কারা? মার্কবাদের বিকাশে কার্ল ক্রোচের চারটি মূলনীতি লিখ

ভূমিকা: সমাজবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক আলোচনায় 'লুম্পেন বুর্জোয়া' এবং 'কার্ল ক্রোচ' (Karl Korsch)-এর মার্কসবাদী বিশ্লেষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লুম্পেন বুর্জোয়া শব্দটি দুটি ভিন্ন ভাষার সংমিশ্রণ; 'লুম্পেন' (Lumpen) শব্দটি জার্মান, যার অর্থ জীর্ণ বা নীতিহীন এবং 'বুর্জোয়া' (Bourgeoisie) শব্দটি ফরাসি, যা ধনিক বা মালিক শ্রেণিকে নির্দেশ করে। পুঁজিবাদের বিকাশের কালে এই শব্দটি মূলত সেই ধনিক শ্রেণিকে বোঝাতে ব্যবহৃত হতো যারা উৎপাদনের সাথে সরাসরি জড়িত নয়, বরং লুটেরা প্রবৃত্তির মাধ্যমে সম্পদ কুক্ষিগত করে। পুঁজিবাদী শ্রেণির উৎপাদন বিচ্ছিন্ন লুটেরাদের ধরন বোঝাতে সর্বপ্রথম ১৯২৬ সালে একজন অস্ট্রিয়ান এ শব্দ দুটি ব্যবহার করেন। অন্যদিকে, মার্কসবাদকে একটি সমাজবিজ্ঞান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে কার্ল ক্রোচ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি প্রদান করেছেন। আজকের পোস্টে আমরা এই দুটি বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

লুম্পেন বুর্জোয়া কারা? মার্কবাদের বিকাশে কার্ল ক্রোচের চারটি মূলনীতি

Lampen Bourgeoisie (লুম্পেন বুর্জোয়া)

লুম্পেন বুর্জোয়া বলতে এমন একটি শ্রেণিকে বোঝায়, যারা নিজেদের বিত্ত অর্জনের জন্য উৎপাদনশীল পথের চেয়ে দ্রুত মুনাফা অর্জনের অন্যান্য সহজ ও চোরাই পথ গ্রহণে বেশি আগ্রহী থাকে। এগুলোর মধ্য চোরাচালানি, মাদক ব্যবসা, ব‍্যাংক ঋণ, জবরদখবল, জালিয়াতি ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এর জন্য সব অপতানের পথ তারা গ্রহণ করে নির্দ্বিধায়।

বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থায় এটিকে বড় দুর্নীতিবাজ হিসেবে আন্তজাতিকভাবে স্বীকৃত ব্যাক্তির নেতৃত্বে স্বৈরাচারী শাসন, অন্যদিকে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ এডিবির সাংস্কার কর্মসূচিতে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর হাতে রাষ্ট্রীয় সম্পদ হস্তান্তরের নীতিমালার চাপ নব্য ধনিকদের জন্য খুবই অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে। ক্ষমতাবানদের সঙ্গে যোগাযোগে দক্ষ ব্যক্তিরা রাতারাতি তখন অনেক সম্পদের মালিক হয়ে যায়, এর জন্য তাদের উদারভারে ব্যাংক ঋণ দেওয়া হয়। এটা সম্ভব হয় ক্ষমতার সঙ্গে একটা অংশীদারত্বের চুক্তি সফলভাবে সম্পূর্ণ করার কারণে। রাষ্ট্র ব্যবস্থা, ধর্ম-লুন্ঠন সবকিছুকে প্রভাবিত করে নিজেদের ফায়দা লুটে লুম্পেন বুর্জোয়া শ্রেণি।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, বর্তমান সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থায়ও এই শ্রেণির সরব উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। আকাঙ্ক্ষা ও সুযোগ দুটোই বেশি এই শ্রেণির কাছে। তাই পুরো ব্যাংক খেয়ে ফেলে, এমনকি সর্বজনের সব সম্পদই এই শ্রেণির কামনাবাসনার লক্ষ্যবস্তু। বৃহৎ চুক্তিতে বৃহৎ কমিশন, জমি, নদী-খাল-বন দখল, সর্বজনের সম্পদ আত্মসাৎ, মেগা প্রকল্পে মেগা চুরির রাস্তা তৈরিসহ পুরো সমাজ বা রাষ্ট্র এই শ্রেণির ভোগ্যবস্তু।

মার্কবাদের বিকাশে কার্ল ক্রোচের চারটি মূলনীতি

ভূমিকা: সমাজ ও রাষ্ট্র দর্শনের ইতিহাসে যে দার্শনিক তত্ত্বগুলো অসামান্য অবদান রেখেছে তার মধ্যে মার্কসবাদ অন্যতম। আর মার্কসবাদকে দার্শনিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা করার জন্য যে সকল চিন্তাবিদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন তাদের মধ্যে কার্ল ক্রোচ অন্যতম।

কার্ল ক্রোচ রচিত মার্কসবাদের চার মূলনীতি:

১৯৩৭ সালে ক্রোচ একটি নিবন্ধে মার্কসবাদ ও আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষার মধ্যকার সম্পর্ককে পরীক্ষা ও বিচার-বিশ্লেষণ করেন। এক্ষেত্রে তিনি মার্কসবাদের চারটি মূলনীতি রচনা করেন, যথা-

১. ঐতিহাসিক সুনির্দিষ্টতা নীতিবাদ:

মার্কস সমস্ত বস্তুকে সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক যুগের বিচারে সামাজিক বলে বর্ণণা করেন।

২. বাস্তব প্রয়োগের নীতি:

এই নাীতি বুর্জোয়া পরিবার, সম্পাত্তি, সম্পর্ক ইত্যাদির মার্কসীয় সমালোচনার অভিজ্ঞতাবাদী ভিত্তির কথা বলেন।

৩. বৈপ্লবিক পরিবর্তনের নীতি:

এই নীতিকে তিনি বিবর্তনবাদ সম্পর্কে আলোচনা করেন। আর এই আলোচনা ছিল বিপ্লবতত্ত্বের বিপরীত। তাই এ নীতিতে বিবর্তনবাদী তত্ত্বের বিপরীত নীতি হিসেবে অভিহিত করা হয়।

৪. বৈপ্লবিক প্রয়োগের নীতি:

সমালোচনা ও বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে পরবর্তী সামাজিক বিকাশের মূল ধারাগুলো আবিষ্কার করা এবং ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার সচেতন মুক্তিপ্রণালি অংশগ্রহণাক সম্ভব করে তোলা।

ক্রোচ তার Karl Marx গ্রন্থে বলেন, সমাজবিজ্ঞান ও মার্কসীয় সমাজবিজ্ঞানের মধ্যে প্রধান পার্থক্য হলো সমাজতত্ত্ব যা সামাজিক সম্পর্ক ব্যবস্থাকে একটি স্বাধীন অনুসন্ধানের ক্ষেত্র হিসেবে দেখে। পক্ষান্তরে, মার্কসীয় বিশ্লেষণ ধারা এই সামাজিক ব্যবস্থাকে অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করে।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, ক্রোচ সমাজবিজ্ঞান ও মার্কসীয় সমাজবিজ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণের মাধ্যমে মার্কসীয় সমাজবিজ্ঞানের রূপরেখা অত্যন্ত বিমূর্তভাবে উপস্থাপন করেন এবং অভিজ্ঞতাবাদী বিষয়ে তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব প্রদান করেন, যা ক্রোচ কর্তৃক প্রণীত মার্কসবাদের চার মূলনীতির মাধ্যমে সুন্দরভাবে ফুটে ওঠে।

Md Belal Hossain

আমি মোঃ বেলাল হোসাইন, বাংলাদেশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে মাস্টার্স/স্নাতকোত্তর (M.S.S) ডিগ্রী অর্জন করেছি এবং Shikhaprotidin-এর প্রতিষ্ঠাতা। Shikhaprotidin একটি শিক্ষামূলক প্ল্যাটফর্ম যেখানে আমি সমাজবিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলোকে উপস্থাপন করি ও শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষামূলক দিকনির্দেশনা প্রদান করি।

নবীনতর পূর্বতন