মার্কসীয় বস্তুবাদ ও হেগেলীয় ভাববাদের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয়
ভূমিকা: জার্মান দার্শনিক গেয়র্গ ভিলহেল্ম ফ্রিডরিখ হেগেলের (G.W.F. Hegel) দ্বন্দ্ববাদ থেকেই কার্ল মার্কসের দ্বান্দ্বিক ধারণার উৎপত্তি। দ্বন্দ্ববাদের ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো 'Dialectics', যা গ্রিক শব্দ 'Dialego' থেকে এসেছে। এর আদি অর্থ হলো তর্ক-বিতর্কের মধ্য দিয়ে কোনো সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো বা সত্য নির্ণয় করা। ব্যাপক অর্থে দ্বান্দ্বিকতা হলো দুটি পরস্পর বিরোধী শক্তির সংঘাত এবং এই সংঘাতের মাধ্যমে একটি নতুন শক্তির উদ্ভব। হেগেলের মতে, জগতে কোনো কিছুই শাশ্বত বা স্থির নয়; সবকিছুই পরিবর্তনশীল এবং এই পরিবর্তনের মূলে রয়েছে দ্বন্দ্ব। কার্ল মার্কস হেগেলের এই দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি গ্রহণ করলেও এর মূল ভিত্তি বা আধেয় (Content) সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছেন।
মার্কস ও হেগেলের দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের মধ্যে পার্থক্য বা বৈসাদৃশ্য
হেগেল এবং মার্কস উভয়েই দ্বান্দ্বিক পদ্ধতিতে বিশ্বাসী হলেও তাঁদের দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। নিম্নে তাঁদের মধ্যকার মৌলিক পার্থক্যসমূহ আলোচনা করা হলো-
১. শক্তি এবং উপাদান
ভাববাদে মনে করা হয় দৃশ্যমান ও অদৃশ্য জগতের মূল উপাদান হলো ভাববাদী উপাদান বা ভাববাদী শক্তি। ইংরেজিতে এই উপাদানকে বলা হয় ideal factor এই ideal factor-ই হলো সমগ্র জগতের মূল উপাদান।
বস্তুবাদে মনে করা হয় অর্থনীতি, পরিবেশগত এবং ইতিহাসিক উপাদান হলো জগত সংসার এবং সমাজের মূল নিয়ামক শক্তি।
২. দৃশ্যমানতা/অদৃশ্যমানতা
ভাববাদে মনে করা হয় যে সমাজ-সংস্কৃতি বা জগত সংসারের মূল নিয়ামক শক্তি বা নিয়ন্ত্রক শক্তি মূলত অদৃশ্যভাবে কাজ করে। তবে কোনো দৃশ্যমান উপাদানের উপর কাজ করে তা তাকে পরিচালনা করে। তখন শক্তির দৃশ্যগত উপস্থাপনা ঘটলেও দৃশ্যমানতা চলক উপাদান নয়।
বস্তুবাদে মনে করা হয় যে সমাজ-সংস্কৃতি এবং জগতসংসারের মূল নিয়ামকশক্তি অবশ্যই দৃশ্যমান জগতে অবস্থান করে এবং তা চেখে দেখা যায় ও স্পর্শ দ্বারা অনুভব করা যায়। দৃশ্যমানতার বাইরে কোনো অদৃশ্য অতিপ্রিয় আধ্যাত্মিক উপাদানকে এখানে স্বীকার করা হয় না।
৩. শক্তির অস্তিত্ব
ভাববাদে মনে করা হয় শক্তির সর্বময় রূপটি হলো অদৃশ্য। সব শক্তিগুলোই অদৃশ্য। তবে তারা দৃশ্যমান সত্তার মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হতে পারে। কিন্তু মহাশক্তি বা চূড়ান্ত শক্তি বা সর্বোচ্চ শক্তিটি অবশ্যই অদৃশ্য থাকে।
বস্তুবাদে মনে করা হয় যে অতীন্দ্রিয় মহাশক্তিধর অলৌকিক কোনো ক্ষমতাধর শক্তি আলাদাভাবে থাকে না।
৪. বিজ্ঞানের পরিসীমা
ভাববাদে মনে করা হয় বিজ্ঞানের চেনা পরিচিত জগতের বাইরে একটি জগত রয়েছে, যা বিজ্ঞান দ্বারা ব্যাখ্যা করা যায় না।
বস্তুবাদে মনে করা হয়, আমাদের দেখা, অদেখা জগতের সবকিছুই বিজ্ঞান দ্বারা ব্যাখ্যা করা যায় বিজ্ঞান দিয়ে যা ব্যাখ্যা করা যায় না এমন কিছুর আসলে কোনো অস্তিত্বই নেই।
৫. অস্তিত্বের সূচনাবিন্দু
ভাববাদে মনে করা হয় যে, কোনো ঘটনা বা কোনো বস্তুর সূচনাটি প্রথমে ঘটে অদৃশ্যমান, অতীন্দ্রিয় ও আধ্যাত্মিকভাবে, অদৃশ্য অতিন্দ্রিয় জগত যা আমরা চোখে দেখতে পাই না। বস্তুর অতিন্দ্রিয় সূচনাই তার অস্তিত্বের সূচক হিসেবে কাজ করে।
বস্তুবাদে মনে করা হয় ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যভাবে যখন বম্ভর অস্তিত্ব প্রকাশ পায়, তখনই তার অস্তিত্বের সূচনা ঘটে। অর্থাৎ, যখন থেকে যন্ত্রকে অনুভব করা যাবে পঞ্চইন্দ্রিয় দিয়ে, তখনই তা বস্তুর মর্যাদা পাবে, নতুবা নয়।
৬. মার্কসবাদের সাথে সম্পর্ক
ভাববাদী দর্শনের বিভিন্ন আলোচনা মার্কসীয় তত্ত্বে কোনো ভাবেই প্রাসঙ্গিক নয়। বলা যায় যে, মার্কসীয় আলোচনায় ভাববাদের কোনো গ্রহণযোগ্যতাই নেই।
বস্তুবাদী দর্শন মার্কসীয় তত্ত্বের অনেক বড় আয়গা দখল করে আছে। মার্কস, এঙ্গেলস থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে নব্য মার্কসবাদী তত্ত্বেও বস্তুবাদী দর্শনের প্রবল প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।
৭. স্রষ্টার অস্তিত্ব
ভাববাদী দর্শনে স্রষ্টার অস্তিত্বকে প্রবণভাবে স্বীকার করা হয়। মনে করা হয়, অদৃশ্য স্রষ্টা ব্যতীত পৃথিবীর কোনো কিছুই সৃষ্টি হওয়া সম্ভব ছিল না এবং তা সম্ভবও নয়।
বস্তুবাদী দর্শনে স্রষ্টার অস্তিত্বকে অনেক সময়ে সরাসরি অস্বীকার করা হয়। এজন্য অনেক সময়ে বস্তুবাদী তত্ত্বকে নাস্তিক তত্ত্বও বলা হয়। বস্তুবাদী তত্ত্বে মনে করা হয়, মানুষ সবকিছু নিজেই নির্মাণ করে, এখানে স্রষ্টার কোনো অবদান নেই।
৮. সমাজ পরিবর্তন
ভাববাদী দর্শনে মনে করা হয় যে, সমাজ এবং বিশ্ব সংসারের যে-কোনো ধরনের পরিবর্তন শুধুমাত্র অতীন্দ্রিয় শক্তি দ্বারাই হওয়া সম্ভব। অন্য কোনোভাবে পরিবর্তন সম্ভব নয়। মানুষের পক্ষে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।
বস্তুবাদী দর্শনে মনে করে নেওয়া হয় যেসব ধরনের পরিবর্তন যা দৃশ্যমান বা অদৃশ্যভাবে ঘাটে তা মূলত মানুষের দ্বারাই হয়। এখানে অদৃশ্য অতীন্দ্রিয় আধ্যাত্মিক কোনো শক্তি ক্রিয়াশীল থাকে না।
৯. দ্বাম্বিক শক্তির প্রভাব
ভাববাদী দার্শনিক হেগেলের তত্ত্ব অনুসারে মহাবিশ্বে মূল দ্বন্দ্বের প্রেক্ষাপটটি কাজ করে মূলত অলৌকিক অতীন্দ্রিয়তার সাথে লৌকিক ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতার মধ্যে। এই দ্বন্দ্বের প্রেক্ষাপটে মহাবিশ্বের অদৃশ্য পরিবর্তনগুলো ঘটে, যা দৃশ্যমান জীবনে স্পষ্ট হয়।
বস্তুবাদী দর্শনে মনে করা হয়, বস্তুগত বিভিন্ন বিষয়াবলি ও ঘটনার সাপেক্ষে মানুষের বস্তুগত জীবনে দ্বন্দ্বের প্রকাশ ঘটে। তাই যা কিছু দ্বান্দ্বিক পরিস্থিতি দৃশ্যমান জীবনে প্রতীয়মান হয় সব কিছু বস্তুগত কারণে ঘটে এবং বস্তুগত বিভিন্ন ফলাফলে তা প্রকাশ ঘটে।
১০. ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতার প্রভাব
ভাববাদে যেসব শক্তি বা বিষয়ের উল্লেখ করা হয় তার কোনো ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতা নাও থাকতে পারে। যেমন- তাকে চোখে দেখা যায় না, কানে শোনা যায় না, গন্ধ পাওয়া যায় না, হাত দিয়ে স্পর্শ করা যায় না।
কিন্তু, বস্তুবাদে মনে করা হয় চোখে দেখা যায় না, কানে শোনা যায় না, গন্ধ পাওয়া যায় না, হাতে স্পর্শ করা যায় না, এমন কিছু থাকতে পারে না, অর্থাৎ, মানুষের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতার বাইরে কোনো কিছুই থাকতে পারে না।
১১. বিকাশ পর্যায়
ভাববাদ বিকাশের প্রাচীন ধ্রুপদী যুগের তাত্ত্বিক যেমন- সক্রেটিস, এরিস্টটল, প্লেটো প্রমুখ ভাববাদী দর্শনের বিকাশের পর্যায়ে ভূমিকা রেখেছিলেন।
বস্তুবাদ বিকশিত হয় মূলত ঊনবিংশ শতকের মধ্যভাগ হতে শেষভাগে এবং বস্তুবাদী দর্শন তত্ত্ব বিকাশে মূল ভূমিকা রেখেছিলেন মার্কবাদি তাত্ত্বিকরা।
১২. জ্ঞানকাণ্ডীয় ভিত্তি
মূলত ধর্মতত্ত্ব, সৃষ্টিতত্ত্ব আধ্যাত্মিকতাবাদ প্রভৃতি জ্ঞানকাণ্ডের সাথে ভাববাদী দর্শনের নিবিড় সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়।
বিজ্ঞান এবং ভৌতবিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা মূলত বিকশিত ও বিস্তৃত হয়েছে বস্তুবাদী দর্শনের ভিত্তিতে।
১৩. আশাবাদ/নৈরাশ্য
ভাববাদী দর্শনের তত্ত্বসমূহকে নৈরাশ্যবাদী তত্ত্ব বা Passimistic তত্ত্ব বলা হয়। কারণ এখানে যেভাবে বলা হয় তাতে মনে হয় বিশ্বজগতের সৃষ্টি পরিবর্তন এমনকি অস্তিত্বের মধ্যেও মানুষের কিছু করার নাই। তার সবকিছুই অদৃশ্য মহাশক্তির উপর নির্ভরশীল।
বস্তুবাদী দর্শনে বিপরীতভাবে আশাবাদী দর্শন মনে করা হয়, কারণ এই দর্শদে মানুষের ক্ষমতা, পরিবর্তনের ক্ষমতা এবং তার নিজের জীবদে অস্তিত্ব লাভ করার ক্ষমতার স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
১৪. সংগঠন
ভাববাদী তত্ত্বে মনে করা হয়, দৃশ্যমন জগতে যা কিছু সামাজিক সংগঠন যেমন- অর্থনীতি, রাজনীতি ইত্যাদি আমরা দেখি এসব কিছুর নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা শক্তি মানুষের করায়াত্ত নয়। এগুলো সবই অতিপ্রিয় অলৌকিক শক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নির্মিত এবং পরিবর্তিত হয়।
বস্তুবাদী দর্শনে মনে করা হয়, সব সামাজিক সংগঠনের সব রকম নিয়ন্ত্রণ শক্তি, নির্মাণ শক্তি ও পরিবর্তন শক্তি মানুষের করায়র। অন্য কোনো অদৃশ্য শক্তি এখানে কিছু করে না।
১৫. অর্থনীতি
ভাববাদী দর্শনে মনে করা হয় যে, অর্থনীতি সমাজের মূল চালিকাশক্তি নয়। কারণ অর্থনীতি নিজেই চালিত সমাজে অর্থনৈতিক সংগান এবং অর্থনীতিই মূল চালিকাশক্তি হয় অদৃশ্য আধ্যাত্মিকতা দ্বারা।
বস্তুবাদী দর্শনে মনে করা হয় যে, হিসেবে কাজ করে। অর্থনীতি ক্ষমতার সংগঠন এবং অন্যান্য সামাজিক সংগঠনের মূল চালিকাশক্তি।
১৬. প্রতিশব্দগত ভিত্তি
ভাববাদী দর্শনকে অধিবিদ্যা Phenomenology আধ্যাতিকতাবাদ, অতীন্দ্রিয়বাদ ইত্যাদি বিভিন্ন প্রতিশব্দ দ্বারা অভিহিত করা হয়।
বস্তুবাদকে অস্তিত্ববাদ, ইন্দ্রিয়বাদ, Materialis ইত্যাদি বিভিন্ন নামে অভিহিত করা হয়।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, মার্কসীয় বস্তুবাদ ও হেগেলীয় ভাববাদের মধ্যে পদ্ধতিগত মিল থাকলেও বিষয়বস্তুগত পার্থক্য আকাশ-পাতাল। হেগেল যেখানে ভাবনার জগতে বিচরণ করেছেন, মার্কস সেখানে মাটির পৃথিবীর কঠোর বাস্তবতাকে আঁকড়ে ধরেছেন। হেগেলের দ্বান্দ্বিক পদ্ধতিকে গ্রহণ করে মার্কস তাকে এক বৈজ্ঞানিক ও বস্তুনিষ্ঠ রূপ দিয়েছেন, যা আধুনিক সমাজবিজ্ঞান ও রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তি হিসেবে আজও অনস্বীকার্য।
