মার্কসবাদ ও আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় কর

মার্কসবাদ ও অধুনিক সমাজবিজ্ঞানের মধ্যকার বৈসাদৃশ্য

ভূমিকা: আধুনিক সমাজচিন্তা ও রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে যে সকল দার্শনিক ও সমাজবিজ্ঞানী তাঁদের ক্ষুরধার মেধা ও দূরদৃষ্টি দিয়ে নতুন যুগের সূচনা করেছেন, কার্ল মার্কস (Karl Marx) তাঁদের মধ্যে অন্যতম। সমাজ বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে মার্কসের এই বিজ্ঞানভিত্তিক ও দ্বান্দ্বিক দৃষ্টিভঙ্গিই বিশ্বজুড়ে 'মার্কসবাদ' (Marxism) হিসেবে পরিচিত। মার্কস তাঁর কালজয়ী রচনাসমূহের মাধ্যমে দর্শন, অর্থনীতি ও সমাজবিজ্ঞানের এক অনন্য সমন্বয় ঘটিয়েছেন। তবে আধুনিক সমাজতাত্ত্বিক আলোচনায় মার্কসবাদ এবং মূলধারার সমাজবিজ্ঞানের মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গিগত ও পদ্ধতিগত ব্যাপক বৈসাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। আজকে আমরা বিভিন্ন তাত্ত্বিকদের আলোচনার প্রেক্ষিতে মার্কসবাদ ও আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের মধ্যকার মৌলিক পার্থক্যসমূহ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

মার্কসবাদ ও আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য

মার্কসবাদ ও আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য:

নিম্নে বিভিন্ন তাত্ত্বিকদের আলোচনার ভিত্তিতে মার্কসবাদ ও আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের মধ্যকার পার্থক্যসমুহ তুলে ধরা হলো-

১. দার্শনিক বিশ্ববীক্ষা বনাম অভিজ্ঞতাবাদী বিজ্ঞান

মার্কসবাদ ও সমাজবিজ্ঞানের সম্পর্ক বিষয়ে আন্তোনিও গ্রামসি (Antonio Gramsci) অনেকটা জর্জ লুকাসের অনুরূপ মত পোষণ করেন। গ্রামসির মূল লক্ষ্য ছিল মার্কসবাদকে একটি 'দার্শনিক বিশ্ববীক্ষা' (Philosophical Worldview) হিসেবে উপস্থাপন করা। তিনি মনে করতেন, সমাজবিজ্ঞান যেখানে কেবল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সমাজকে দেখে, মার্কসবাদ সেখানে সমাজকে পরিবর্তনের একটি সামগ্রিক দর্শন হিসেবে বিবেচনা করে। অন্যদিকে, জর্জ লুকাস ও ক্রোচ-এর মতে, মার্কসবাদ হলো বৈপ্লবিক শ্রমজীবীদের তাত্ত্বিক বহিঃপ্রকাশ, যা কেবল সমাজতাত্ত্বিক বর্ণনায় সীমাবদ্ধ নয়।

২. উৎপত্তিগত বৈসাদৃশ্য (Origin and Reaction)

তাত্ত্বিক বেনেদেত্তো ক্রোচ (Benedetto Croce) একটি নিবন্ধে মার্কসবাদ ও আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের পারস্পরিক সম্পর্ক পরীক্ষা করেন। তিনি অগাস্ট কোঁৎ-এর সমাজবিজ্ঞানকে সরাসরি নাকচ করে দিয়ে বলেন যে, আধুনিক সমাজবিজ্ঞান মূলত মার্কসবাদ ও সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে একটি 'প্রতিক্রিয়া' হিসেবে সৃষ্টি হয়েছে। জন স্টুয়ার্ট মিল এবং হার্বার্ট স্পেন্সার কর্তৃক প্রচারিত সমাজবিজ্ঞান মূলত স্থিতিশীল সমাজকাঠামো বজায় রাখার চেষ্টা করে, যেখানে মার্কসবাদ সমাজকাঠামো ভেঙে ফেলার বা আমূল পরিবর্তনের কথা বলে।

৩. পদ্ধতির ভিন্নতা: ঐতিহাসিক বস্তুবাদ বনাম প্রত্যক্ষবাদ

ঐতিহাসিক বস্তুবাদের মূল লক্ষ্য দার্শনিক নয়, বরং অভিজ্ঞতাবাদী পদ্ধতি। ক্রোচ তাঁর 'কার্ল মার্কস' নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, আধুনিক সমাজবিজ্ঞান যেখানে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের অনুকরণে সমাজকে বুঝতে চায় (Positivism), মার্কসবাদ সেখানে ঐতিহাসিক বস্তুবাদের মাধ্যমে সমাজের অর্থনৈতিক ও বৈষয়িক ভিত্তিকে প্রধান্য দেয়। মার্কসবাদ মনে করে, সমাজকে বুঝতে হলে তার ইতিহাসের বস্তুবাদী চালিকাশক্তিকে বুঝতে হবে, যা প্রচলিত সমাজবিজ্ঞানে অনুপস্থিত।

৪. বিষয়বস্তুর বিচার: সমাজতত্ত্ব বনাম রাজনৈতিক অর্থনীতি

ক্রোচের মতে, সমাজবিজ্ঞান ও মার্কসীয় তত্ত্বের মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে।

আধুনিক সমাজবিজ্ঞান: এটি সামাজিক সম্পর্ক ব্যবস্থাকে একটি 'স্বাধীন' বা স্বতন্ত্র অনুসন্ধান ক্ষেত্র হিসেবে দেখে (যেমন- পরিবার, ধর্ম বা সংস্কৃতি)।

মার্কসবাদ: এটি সকল সামাজিক সম্পর্ককে মূলত অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করে।

এই কারণে অনেক সমালোচক মনে করেন, মার্কসবাদ প্রকৃত অর্থে কোনো সমাজবিজ্ঞান নয়; বরং এটি একটি রাজনৈতিক অর্থনীতি (Political Economy)। মার্কসবাদী ধারায় সমাজকে একটি অর্থনৈতিক একক হিসেবে দেখা হয়, যা আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের বহুমুখী (Multidimensional) দৃষ্টিভঙ্গির সাথে সাংঘর্ষিক।

৫. স্থিতিশীলতা বনাম বৈপ্লবিক পরিবর্তন

আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের একটি বড় অংশ (বিশেষ করে ক্রিয়াবাদ বা Functionalism) সমাজের সংহতি ও স্থিতিশীলতা নিয়ে আলোচনা করে। তারা সমাজকে একটি দেহের সাথে তুলনা করে যেখানে প্রতিটি অঙ্গ একে অপরকে সাহায্য করে। বিপরীতে, মার্কসবাদ সমাজকে একটি 'দ্বন্দ্বের ক্ষেত্র' হিসেবে দেখে। এখানে বিবর্তনের পরিবর্তে বৈপ্লবিক পরিবর্তন (Revolutionary Change) প্রক্রিয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। প্রচলিত সমাজবিজ্ঞানের কাছে যা শৃঙ্খলা, মার্কসবাদের কাছে তা শোষণের নামান্তর।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, সমাজবিজ্ঞানের মার্কসীয় সমালোচনা হিসেবে তার যাত্রা শুরু হলেও মার্কসীয় তত্ত্বের মৌল ধারণা থেকে তা অধিকতর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং সাম্প্রতিক সমাজতন্ত্রের ধারণা ও পদ্ধতিসমূহের নিকটবর্তী হয়ে পড়ে। সমাজবিজ্ঞানের পদ্ধতিগত বিতর্কটির বিশিষ্টরূপের পুনরাবৃত্তি মার্কসবাদে ঘটেছে। পক্ষান্তরে, মার্কসবাদের অনেক বিতর্ক ও সমাজবিজ্ঞানে অঙ্গীভূত হয়েছে।

Md Belal Hossain

আমি মোঃ বেলাল হোসাইন, বাংলাদেশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে মাস্টার্স/স্নাতকোত্তর (M.S.S) ডিগ্রী অর্জন করেছি এবং Shikhaprotidin-এর প্রতিষ্ঠাতা। Shikhaprotidin একটি শিক্ষামূলক প্ল্যাটফর্ম যেখানে আমি সমাজবিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলোকে উপস্থাপন করি ও শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষামূলক দিকনির্দেশনা প্রদান করি।

নবীনতর পূর্বতন