বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র কী? মার্কসীয় সমাজতত্ত্বের মৌলিকতা সম্পর্কে লিখ

বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র কী? মার্কসীয় সমাজতত্ত্বের মৌলিকতা

ভূমিকা: যখন সমাজে পুঁজিপতি ও শ্রমজীবী জনগণের মধ্যকার বৈরীমূলক দ্বন্দ্বগুলো তীব্র আকার ধারণ করে, তখন সমাজতন্ত্রের ধারণা নিছক কল্পনার স্তর থেকে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রে (Scientific Socialism) উপনীত হয়। কার্ল মার্কস ও ফ্রেডরিখ এঙ্গেলসের প্রচারিত বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র মূলত সেই সুখী, সমৃদ্ধ ও সমতাবাদী সমাজের দাবিকে বাস্তবতার স্পর্শ দিয়েছে। তাঁরা সমাজতন্ত্রকে কেবল একটি নৈতিক আকাঙ্ক্ষা বা কাল্পনিক স্বর্গ হিসেবে নয়, বরং বিজ্ঞানসম্মত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে এক নতুন সাম্যবাদী সমাজের চিত্র আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। এই কারণেই বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র বাস্তবসম্মত সমাজ গঠনের ধারণার দিক থেকে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।

বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র কী? মার্কসীয় সমাজতত্ত্বের মৌলিকতা

বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের সংজ্ঞা:

কার্ল মার্কস ও এঙ্গেলস মানবসমাজের উৎপত্তি, বিকাশ ও ভবিষ্যৎকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে ব্যাখ্যা করে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের মতবাদ প্রতিষ্ঠা করেন। এই দুই মনীষী ইতিহাসের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে এই ধ্রুব সত্য আবিষ্কার করেন যে, নিছক সংস্কার সাধন বা উচ্চবিত্তের শুভচেতনার মাধ্যমে শ্রেণিবৈষম্যমূলক সমাজের রূপান্তর সম্ভব নয়।

শ্রেণিসংগ্রামের অনিবার্যতা: মার্কস মনে করেন, শোষক ও শোষিত শ্রেণির মধ্যকার তীব্র সংঘাত বা শ্রেণিসংগ্রামই সমাজ পরিবর্তনের মূল চাবিকাঠি। শ্রেণিবিপ্লব ছাড়া সমতাবাদী সমাজ গঠন অসম্ভব, কারণ অহিংস পথে শোষক শ্রেণিকে ক্ষমতাচ্যুত করা বাস্তবসম্মত নয়।

মূল ভিত্তি: মানুষ ও জড় পদার্থ উভয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য সর্বজনীন নিয়মগুলোকে আশ্রয় করে সত্যের ভিত্তিতে সমাজ সম্পর্কে যে বিজ্ঞানসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠেছে, তাকেই 'বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র' বলা হয়। ফ্রেডরিখ এঙ্গেলসের মতে, এই বিজ্ঞানের প্রধান দুটি স্তম্ভ হলো ইতিহাসের বস্তুবাদী ধারণা এবং উদ্বৃত্ত মূল্যতত্ত্ব। এই দুটি আবিষ্কারের মাধ্যমেই সমাজতন্ত্র একটি নিছক আবেগ থেকে পূর্ণাঙ্গ বিজ্ঞানে রূপান্তরিত হয়েছে।

মার্কসীয় সমাজতত্ত্বের মৌলিকতা (Originality of Marxist Sociology)

মার্কসীয় সমাজতত্ত্ব কেবল একটি সামাজিক তত্ত্ব নয়, বরং এটি একটি 'বিপ্লবের দর্শন'। এর মৌলিকত্ব মূলত নিচের বিষয়গুলোর মাধ্যমে স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে:

১. বিজ্ঞানমনস্কতা ও বাস্তবধর্মী বিশ্লেষণ

মার্কস তাঁর বিভিন্ন রচনায় পুঁজিবাদী সমাজের স্বরূপ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। পুঁজি বৃদ্ধি, মুনাফা এবং শ্রেণিসংগ্রামের পারস্পরিক সম্পর্কের যে ব্যাখ্যা তিনি দিয়েছেন, তা ইতিহাসের অভিজ্ঞতায় আজও প্রাসঙ্গিক। তাঁর চিন্তার এই বৈজ্ঞানিক চরিত্রটি গড়ে উঠেছে দ্বান্দ্বিক কাঠামোর (Dialectical Framework) ওপর ভিত্তি করে। পুঁজিবাদ আজ বিশ্বব্যাপী যে কাঠামোগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, মার্কসের মৌলিক সূত্রগুলো আজও তার ব্যাখ্যা দিতে সক্ষম।

২. সমাজ পরিবর্তন ও সচেতনতার সমন্বয়

মার্কসীয় সমাজতত্ত্বের মৌলিকতা কেবল তাত্ত্বিক আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মার্কস মনে করতেন, সমাজের শোষণ ও বৈষম্যের শুধুমাত্র পদ্ধতিগত বিশ্লেষণই যথেষ্ট নয়। এই বিজ্ঞানসম্মত বিশ্লেষণের সাথে তাঁর চিন্তায় যুক্ত হয়েছিল আরও একটি গভীর মাত্রা যার মূলকথা হলো সমাজের পরিবর্তন সাধনে মানুষের সচেতনতা, সংগঠন ও মতাদর্শ। এই উপাদানগুলো ছাড়া বিকল্প সমাজ জীবনের চিন্তা করা নিরর্থক। এখানেই মার্কসীয় দর্শনের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয়।

৩. কর্মকাণ্ডের দর্শন ও যুক্তির প্রয়োগ

মার্কসীয় সমাজবীক্ষা শুধুমাত্র একটি বুদ্ধিদীপ্ত সমালোচনামূলক তত্ত্ব নয়। এই দর্শনের প্রকৃত মৌলিকত্ব নিহিত রয়েছে যুক্তিজ্ঞানকে প্রয়োগের (Praxis) সাথে সমন্বয় করার মধ্যে। এটি এমন এক বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি যা মানুষকে কেবল সমাজ বুঝতে শেখায় না, বরং সমাজকে পরিবর্তন করার সক্রিয় পথ দেখায়। মার্কসের বিখ্যাত উক্তি "দার্শনিকরা জগতকে কেবল ব্যাখ্যাই করেছেন, কিন্তু আসল কাজ হলো একে পরিবর্তন করা" মার্কসীয় সমাজতত্ত্বের এই প্রয়োগবাদী মৌলিকত্বকে ধারণ করে।

বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

পশ্চিম ইউরোপ, বিশেষ করে জার্মান বুদ্ধিজীবীদের আন্দোলনের কথা এখানে স্মরণ করতে হয়। হেগেলীয় দর্শনের প্রভাবে অনেক তাত্ত্বিক মার্কসবাদকে পুনরায় বিমূর্ত দার্শনিক কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু মার্কস ও এঙ্গেলস সমাজতন্ত্রকে সেই দার্শনিক ধোঁয়াশা থেকে বের করে শ্রমজীবী মানুষের মুক্তি সংগ্রামের হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। হেগেলীয় দ্বান্দ্বিকতাকে মার্কস 'মাথা থেকে পায়ের ওপর' দাঁড় করিয়ে একে বস্তুনিষ্ঠ রূপ দিয়েছেন।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র কেবল একটি রাজনৈতিক মতবাদ নয়, এটি সমাজ বিকাশের এক অমোঘ বৈজ্ঞানিক সত্য। ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যা এবং উদ্বৃত্ত মূল্যের রহস্য উদঘাটন এই দুটি বিরাট আবিষ্কারের জন্য সমাজতন্ত্র আজ বিজ্ঞানে পরিণত হয়েছে। মার্কসীয় সমাজতত্ত্বের মৌলিকত্ব হলো এর বৈপ্লবিক পরিবর্তনকামী চরিত্র এবং যুক্তি ও প্রয়োগের অনন্য সমন্বয়। বর্তমান বিশ্বেও সামাজিক বৈষম্য ও শোষণের স্বরূপ বুঝতে এই বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের কোনো বিকল্প নেই।

shikhaprotidin

I have a Master's degree in Sociology from the National University and I run my sociology and education platform Shikhaprotidin.com to help students.

নবীনতর পূর্বতন