অস্ট্রো-মার্কসবাদ কী? মার্কসবাদ উদ্ভবের পটভূমি
ভূমিকা: সাধারণভাবে মার্কসবাদ বলতে কার্ল মার্কসের জীবনদর্শন, দৃষ্টিভঙ্গি ও তাত্ত্বিক শিল্পমালার এক অনন্য সমন্বয়কে বোঝায়। সময়ের আবর্তে মার্কসবাদের মূল ধারার সঙ্গে যখন পরবর্তী তাত্ত্বিকদের নতুন ব্যাখ্যা ও দৃষ্টিভঙ্গি যুক্ত হয়, তখন তাকে 'মধ্য-মার্কসবাদ' হিসেবে অভিহিত করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় উনবিংশ শতাব্দীর শেষ লগ্ন থেকে ১৯৩৪ সালে জার্মানিতে ফ্যাসিবাদের উত্থান পর্যন্ত অস্ট্রিয়াতে মার্কসীয় বিজ্ঞানমনস্কতার এক নতুন ধারা বিকশিত হয়, যা সমাজবিজ্ঞানের ইতিহাসে 'অস্ট্রো-মার্কসবাদ' (Austro-Marxism) নামে পরিচিত। এই ধারার প্রধান প্রবক্তাদের মধ্যে ম্যাক্স এডলার, রুডলফ হিলফারডিং এবং কার্ল রেনার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
অস্ট্রো-মার্কসবাদ:
অস্ট্রো-মার্কসবাদ মূলত কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক প্রাণতা নয়। বরং এক বিশেষ ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ড, যা তাদের সকলকে ঐক্যবদ্ধ করায় প্রয়াস পায়। যখন Stammeler, Windelband এবং Rickert-এর মতো স্বনামধন্য তাত্ত্বিকগণ দার্শনিক যুক্তিকে আশ্রয় করে মার্কসবাদকে আক্রমণ শুরু করেন ঠিক সে সময়ই আত্মপ্রকাশ ঘটে অস্ট্রো-মার্কসবাদের। অস্ট্রো-মার্কসবাদের মূল অবদান ছিল সমাজতাত্ত্বিক তত্ত্ব হিসেবে মার্কসবাদী যুক্তিধারার বিশ্লেষণ এবং সমাজ জীবনের নতুন নতুন ক্ষেত্রে মার্কসীয় গবেষণাকে প্রসারিত করা। এই গোষ্ঠীর অন্যতম পথিকৃৎ ম্যাক্স এডলার বলেন যে মার্কস সামাজিক মানুষের ধারণা সহযোগে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের ভিতি প্রতিষ্ঠা করেন এবং নানারকম বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে প্রকৃতি ও সমাজকে একত্রিত করাতে সক্ষম হন। এডলারের মতে মাসীয় সমাজতত্ত্ব ক্যান্টীয় দর্শনের সাথে সম্পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ কেননা, মার্কসের তত্ত্ব ক্যান্টের মতোই বিচারবাদী। এই তত্ত্বে প্রতিষ্ঠিত নির্ধারকসমূহ দ্বারা মানুষের সমাজ জীবন উপলব্ধি করা সম্ভব। বেশিরভাগ অস্ট্রো-মার্কসবাদ তাত্ত্বিকগণ এডলার প্রদত্ত্ব মার্কসীয় ব্যাখ্যাকে বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব হিসেবে গ্রহণ করেন এবং মনে করেন যে, অভিজ্ঞতালব্ধ গবেষণা এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক ও সমাজতাত্ত্বিক তত্ত্বের সাথে বিচারবাদী সংঘাতের মধ্য দিয়ে মার্কসীয় তত্ত্বের বিকাশ ঘটানোই হলো তাদের মূল কাজ। মার্কস যেসকল বিষয়ে বিশদ আলোচনা করেন নি, যেমন- পুঁজির কেন্দ্রীকরণ, সমাজের প্রসার, আন্তর্জাতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা জাতীয়তাবাদের সামাজিক তাৎপর্য প্রভৃতি বিষয়ে বিশদ আলোচনা ও ব্যাখ্যা করেন এ অস্ট্রো-মার্কসবাদী তাত্ত্বিকরা।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, মার্কস-এর মৃত্যুর পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিস্তৃত কালপর্বে মার্কসবাদ নানা শাখা-প্রশাখায় বিকশিত হয়েছে। আলোচনা পদ্ধতি ও বিষয়বস্তুর ক্ষেত্রেও ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। বিপ্লবের মতাদর্শ থেকে সমাজবীক্ষণের পদ্ধতিতে রূপান্তরিত হয়েছে মার্কসবাদ। আর এ মার্কসবাদেরই একটি ক্ষেত্র হলো অস্ট্রে-মার্কসবাদ।
মার্কসবাদ উদ্ভবের পটভূমি লিখ
ভূমিকা: মার্কসবাদের উদ্ভব মানবসমাজ ও ইতিহাসের গতিধারা থেকে বিচ্ছিন্ন এবং মার্কস ও এঙ্গেলসের মস্তিষ্কজাত ফসল এমনটি চিন্তা করা সমীচীন নয়। কেননা, তা হবে অনৈতিহাসিক ও অবৈজ্ঞানিক চিন্তা-প্রসূত ধারণা এবং মার্কসবাদ বিরোধী চিন্তা।
মার্কসবাদের উদ্ভবের পটভূমি:
মার্কসবাদের উদ্ভবের ১০টি সুনির্দিষ্ট পটভূমি রয়েছে। এই পটভূমি সমাজ ও বিজ্ঞানের বিকাশের ফলশ্রুতি হিসেবেই রচিত হয়েছিল। যে সকল বিষয় মার্কবাদের উদ্ভবের জন্য প্রয়োজনীয় অনুকূল অবস্থাসমূহ তৈরি করেছিল সেগুলো হলো-
১. অনুকূল সামাজিক অবস্থা:
ইউরোপের পুঁজিবাদের উদ্ভব ও বিকাশ মার্কসবাদের উদ্ভবের অনুকূল সামাজিক অবস্থাসমূহ সৃষ্টি করেছিল। ১৪-১৫ শতকে পুঁজিবাদ উদ্ভব শুরু হয়। তবে মার্কসের মতে, আধুনিক পুঁজিবাদের ইতিহাস ষোলো শতক থেকে যাত্রা শুরু করে। পুঁজিবাদ হলো এক বিশেষ ধরনের উৎপাদন প্রণালিভিত্তিক সামাজিক ব্যবস্থা, এই সমাজে পুঁজিবাদী উৎপাদন সম্পর্ক পরিলিক্ষিত হয়। পুঁজিবাদের উত্তব ও ক্রমবিকাশের সাথে জড়িয়ে রয়েছে সর্বহারা শ্রেণির উদ্ভব ও ক্রমবিকাশের প্রসঙ্গটি। পুঁজিবাদী সমাজে শ্রমিক শ্রেণি অবহেলিত ও শোষিত হয়, দুর্দশায় পতিত হয়, যা অনেক চিন্তাবিদতেই বিচলিত করেছিল। কিন্তু উনিশ শতকে পুঁজিবাদের সাথে শ্রমজীবী শ্রেণির দ্বন্দ্ব তীব্র আকার ধারণ করে। আর এরই ধারাবাহিকতায় এসব শ্রমিক শ্রেণির মুক্তির পথনির্দেশকারী এক বৈপ্লবিক মতাদর্শের উদ্ভবের প্রয়োজনীয়তাকে নির্দেশ করেছিল।
২. প্রকৃতি বিজ্ঞানের জগতে উন্নতি:
মার্কসবাদের উদ্ভাবের সাথে প্রকৃতিবিজ্ঞানের জগতে আবিষ্কার ও অগ্রগতির একটা গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। দর্শন ও বিজ্ঞানকে দুটি ভিন্ন মেরুর বিষয় বলেই সাধারণভাবে গণ্য করা হয়। কিন্তু আলতুশের (Louis Althusser) এই মত প্রকাশ করেন যে বিজ্ঞানের ভিত্তিতেই দর্শন জন্ম নেয় ও পুনর্জন্য লাভ করে। এপি শেপটুলিন (A.P. Sheplution) বলেন, ১৯ শতকের গোড়ার দিকে এবং বিশেষভাবে মাঝামাঝি সময়ে প্রকৃতি বিজ্ঞানসমূহের ক্ষেত্রে যে অগ্রগতি হয়েছিল তা দ্বন্দ্বতত্ত্বের গুরুত্বপূর্ণ নীতিগুলোর সূত্রায়ন ও প্রতিষ্ঠা এবং একটি সুসংবদ্ধ বৈজ্ঞানিক বিশ্ববীক্ষা গড়ে তোলার কাজটি সম্ভব করে তুলেছিল।
৩. চিন্তার জগতের অবস্থা:
প্রাক মার্কসীয় সময়কালে মানব জাতির চিন্তার জগতে যে ব্যাপক উন্নতি ঘটেছিল তা মার্কসবাদের উদ্ভবের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। তাই বলা হয়ে থাকে, মার্কসবাদের উন্নয়কে প্রাক-মার্কসীয় যুগের চিন্তাভাবনা, ধ্যানধারণার বিকাশ তথা সেই সময়কার বৌদ্ধিকমন্ডল থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার উপায় নেই।
উপরিউক্ত অবস্থার প্রেক্ষাপটে দেখা দিয়েছিল এমন এক দর্শনের যা পুঁজিবাদী সমাজের অন্তর্থকগুলো বুঝতে সক্ষম এবং যা শ্রমিকশ্রেণির মুক্তির বাস্তবসম্মত, বিজ্ঞানসম্মত পথ দেখতে সক্ষম। মার্কসবাদ হলো এরই উপর প্রতিষ্ঠিত একটি দর্শন। দ্বান্দিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ বিশ্ববীক্ষার উপর প্রতিষ্ঠিত মার্কসবাদ এই ঐতিহাসিক প্রয়োজনটি পূরণ করেছিল।
৪. শিল্প বিপ্লব ও সর্বহারা শ্রেণির সংগ্রাম
শিল্প বিপ্লবের ফলে উৎপাদন ব্যবস্থায় যে আমূল পরিবর্তন আসে, তা সমাজকে দুটি স্পষ্ট শ্রেণিতে বিভক্ত করে ফেলে। শ্রমিকদের সচেতনতা এবং সংগঠিত হওয়ার প্রক্রিয়া মার্কসবাদকে একটি রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করতে সহায়তা করে।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, মার্কসবাদ হলো আমাদের এই জগৎ এবং তারই অংশ মানবসমাজ সমন্ধে সাধারণ তত্ত্ব, যার উৎপত্তি ঘটে মানুষের চিন্তাজগৎ, সামাজিক অবস্থা, জান বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে নিপুণ মনের কারিগরি চিন্তনের মাধ্যমে।
