উন্নয়নশীল দেশে মার্কসবাদের তাৎপর্য
ভূমিকা: বিংশ শতাব্দী থেকে একবিংশ শতাব্দী সময়ের পরিক্রমায় বিশ্ব রাজনীতির মানচিত্র অনেক বদলেছে, কিন্তু শোষক ও শোষিতের মধ্যকার ব্যবধান আজও ঘুচেনি। বিশেষ করে এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং সামাজিক অস্থিরতা এক প্রকট সমস্যা। এই প্রেক্ষাপটে কার্ল মার্কসের দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ এবং শ্রেণি সংগ্রামের তত্ত্বটি নতুন করে আলোচনার দাবি রাখে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক মুক্তি এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তির প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসার লড়াইয়ে মার্কসবাদের তাৎপর্য অপরিসীম। আজকের নিবন্ধে আমরা উন্নয়নশীল দেশসমূহের প্রেক্ষাপটে মার্কসীয় দর্শনের গুরুত্ব ও এর প্রয়োগ নিয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করব।
উন্নয়নশীল দেশে মার্কসবাদের তাৎপর্য
উন্নয়নশীল দেশগুলোর আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকট সমাধানে মার্কসবাদ যে দিকগুলো নির্দেশ করে, তা নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:
১. দ্বন্দ্ব সম্পর্কে ধারণা:
প্রতিটি প্রক্রিয়াতেই পরস্পর বিরোধী ঝোঁকের ঐক্য এবং সংগ্রাম লক্ষণীয়। কেবলমাত্র আকস্মিক বা 'বাহ্যিক কারণের ফলস্বরূপ এই বিরোধ' ঝোঁকগুলোর দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয় না। বস্তু ও ঘটনাপ্রবাহের একটি সহজাত বৈশিষ্ট্য হলো পারস্পরিক বৈপরীত্য, বিরোধী ঝোঁক এ প্রবণতা। বস্তুজগতের মধ্যে যে গতি ও পরিবর্তনের সন্ধ্যার হয় তার মূলে রয়েছে এই সহজাত বৈশিষ্ট্য। তাই স্ট্যালিন যথার্থই বলেছিলেন, "প্রকৃতির অন্তর্ভুক্ত সকল বস্তু ও ঘটনার মধ্যকার অন্তনিহিত যন্ম হলো সহজাত ব্যাপার। কারণ, তাদের সকলের মধ্যে আছে ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক, অতীত ও ভবিষ্যতের দিক, সৃষ্টি ও ফাংসের দিক।" স্থান, কাল, পাত্রভেদে জাগতিক সকল প্রক্রিয়াতেই দ্বন্দ্ব সর্বব্যাপী। মার্কসবাদের মাধ্যমে আমার এই দ্বন্দ্ব সম্পর্কে পরিপূর্ণ ধারণা লাভ করতে পারি।
২. মানব ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা লাভ
মানবসমাজের ইতিহাস এক সুদীর্ঘ পথ পরিক্রমার ইতিহাস। যাকে আমরা আজ মানব সভ্যতা বলে অভিহিত করছি তা একদিনে সূচিত হয় নি বরং বন্য দশা থেকে বর্বরতার মধ্য দিয়ে আজ এই সভ্যতার উত্তরণ ঘটেছে। মানব সভ্যতার একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা। জ্ঞান-বিজ্ঞানের শাখা-প্রশাখাসমূহ মানুষের চিন্তা-ভাবনাকে আরো গতিশীল ও সমৃদ্ধ করেছে। আর এরই মাধ্যমে সমাজস্থ মানুষ নিজেকে ও তার পারিপার্শ্বিকতাকে উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছে।
৩. পুঁজিবাদী সমাজের ধারণা:
মার্কসবাদেই প্রথম পুঁজিবাদী সমাজ সম্পর্কে ধারণা ব্যক্ত করেন মার্কস। যে পুঁজিবাদ বর্তমান বিশ্বে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে আলোচনার প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মার্কস তার পুঁজিবাদী আলোচনায় বলেছিলেন, পুঁজিবাদী সমাজে উৎপাদন শক্তির অদ্ভুতপূর্ব উন্নতি সাধন হলেও এবং শ্রমজীবী মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি সাধিত হলেও Marx এ সমাজকে সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট সমাজ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এ সমাজে সৃষ্ট বুর্জোয়া শ্রেণি সকল প্রকার উৎপাদন উপকরণের মালিক আর অন্য শ্রেণিটি অর্থাৎ প্রলেতারিয়েত শুধু কায়িক শ্রমের মালিক যা, সে বিক্রি করতে বাধ্য। উৎপাদন উপকরণের মুষ্টিমেয় মালিকরা শ্রমিকের শ্রমকে চুরি করে বা উদ্বৃত্ত মূল্য শোষণ করে বিপুল ধনসম্পদের মালিক হতে থাকে। উৎপাদনের উপায়ের মালিকানা গুটিকয়েক মানুষের হাতে থাকে আর অধিকাংশ মানুষ হয়ে পড়ে কপর্দকহীন। Marx-এর মতে, "পুঁজিবাদী সমাজ হচ্ছে চূড়ান্তভাবে শ্রেণিবিভক্ত সমাজ। এ সমাজের পরস্পরবিরোধী প্রধান দুটি শ্রেণি হচ্ছে পুঁজিপতি বা বুর্জোয়া এবং শ্রমিক, সর্বহারা বা প্রলেতারিয়েত।"
৪. পণ্য মূল্য সম্পর্কে জ্ঞানলাভ
বর্তমান বিশ্বের বাজার ব্যবস্থার অন্যতম উপাদন হলো পণ্য মূল্য সম্পর্কে ধারণা লাভ করা। কারণ উন্নয়নের গতিশীলতাকে ধরে রেখে আরো সমৃদ্ধির দিকে যেতে হলে এ সম্পর্কে অবগত হওয়াটা বাঞ্ছনীয়। আর মার্কসবাদের আলোচনা থেকে আমরা সহজে তা জানতে পারি। যেমন- মার্কস তার তত্ত্বে বলেছেন, উন্নত পণ্য উৎপাদন প্রথায় যখন মুদ্রার দ্বারা পণ্যের বিনিময় ঘটে, তখন প্রতিটি পণ্যকেই নির্দিষ্ট পরিমাণ মুদ্রার সাথে তুলনা করা হয়। মুদ্রার অঙ্কেই পণ্যের মূল্য প্রকাশ পায়। সুতরাং বিনিময় মূল্যই হয়ে দাঁড়ায় পণ্যের মূল্য। মুদ্রার হিসাবে ব্যক্ত কোনো নির্দিষ্ট পণ্যের মূল্যই হলো তার দাম বা মূল্য।
৫. উদ্বৃত্ত মূল্যতত্ত্ব:
পুঁজিবাদী সমাজে কীভাবে শোষণ অব্যাহত থাকে সে সম্পর্কে মার্কসবাদের মাধ্যমে জানা যায়। মার্কস-এর অর্থনৈতিক তত্ত্বের মূল কথাই হলো এই উদ্বৃত্ত্ব মূল্য তত্ত্ব। মার্কস তার 'Das Capital' গ্রন্থে পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করে আবিষ্কার করেন উদ্বৃত্ত মূল্য তত্ত্ব'। সমসাময়িক বিশ্বে প্রত্যেক উন্নয়নশীল দেশে বাজার ব্যবস্থায় নানা সমস্যায় জর্জরিত। আর তার মধ্য একটি মূল্যের উদ্বৃত্ত। আর মার্কসবাদের আলোচনায় এ সম্পর্কে সুস্পষ্ট বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যা দান করা হয়েছে।
৬. শ্রম ও উৎপাদন শক্তি সম্পর্কে অবহিত
শ্রম হলো সমাজের অস্থিত্ব ও বিকাশের মূল চালিকাশক্তি। পৃথিবীর যাবতীয় সম্পদের মূলে রয়েছে শ্রম। মানুষ আর প্রয়োজনের তাগিদে শ্রম, প্রাকৃতিক উপাদান, যন্ত্রপাতি ইত্যাদির মাধ্যমে উৎপাদন করে থাকে, যাকে বলা হয় উৎপাদনশক্তি। উৎপাদন শক্তি প্রয়োগ করে যে উৎপাদন পাওয়া যায়, তা সাধারণত শ্রেণিসমূহের মধ্যে সমভাবে বন্টিত হয় না।
৭. সামাজিক শ্রেণির ধারণা প্রদান
"উৎপাদন সম্পর্কে গোষ্ঠীবদ্ধ মানুষের স্থান ও উৎপাদন যন্ত্রের সাথে তার সম্পর্কের দ্বারাই সামাজিক শ্রেণি নির্ধারিত হয়। মার্কস-ই সর্বপ্রথম বলেন, 'সামাজিক শ্রেণি' একটি নির্দিষ্ট উৎপাদন ব্যবস্থার মধ্যে উদ্ভব হয়। ব্যক্তিগত মালিকানাকে ভিত্তি করে সমাজে শ্রেণির উদ্ভব ঘটেছে এবং ব্যক্তিমালিকানার অবসান হলে শ্রেণিরও অবসান ঘটবে।
৮ শ্রেণিদ্বন্দ্বের কারণ ব্যাখ্যা
সমাজে শ্রেণিক সূত্রপাত ঘটার সাথে সাথেই সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য সৃষ্টি হয় এবং উৎপাদন সম্পর্কের ভিন্নতর অবস্থান সৃষ্টি হওয়াতে শ্রেণি শোষণের প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উত্থাপিত হয় এবং শ্রেণিভুক্ত মানুষ তার নিজস্ব শ্রেনীস্বার্থ সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠে। এই সচেতনতা মুলত ঐ বিশেষ শ্রেণিতে তার নিজস্ব অবস্থান হওয়ার জন্য। শ্রেণি সচেতনতা মানুষকে শ্রেণিস্বার্থ সংরক্ষণে সচেষ্ট করে তোলে। কেননা, তার নিজের অবস্থাও কেবল তখন-ই নিশ্চিত হতে পারে। শ্রেণি স্বার্থ সংরক্ষণের সচেতনতা থেকেই পরবর্তীতে শ্রেণি দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়।
৯. আধুনিক রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের কার্যাবলি সম্পর্কে ধারণা লাভ
মার্কসবাদের আলোচনা থেকে সহজেই রাষ্ট্র সম্পর্কে পরিপূর্ণ ধারণা লাভ করা যায়। বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্পর্কে মার্কসবাদীদের আলোচনা থেকে প্রবল যুক্তিযুক্ত ছিল এবং রাষ্ট্রের কার্যাবলি কেমন হওয়া উচিত তাও মার্কসবাদের থেকে জানা যায়।
১০, শ্রমিক সচেতনতা সৃষ্টি
মার্কসবাদে শ্রমিক শোষনের সম্পার্কে আলোকপাত করে শাস্ত্রীয় ব্যবস্থায় শ্রমিকদের করুণ পরিণতি ব্যাখ্যা দিয়েছেন এবং শ্রমিকদের অধিকার সচেতন হওয়ার দিকনির্দেশনা, সাংগ্রাম ও শ্রেণি বৈষম্য দূর করে সমতাভিত্তিক সমাজের রূপরেখাও মার্কসবাদে দেওয়া হয়েছে।
১১. মানষ মুক্তির পথ প্রদর্শন
পৃথিবীর রাষ্ট্রব্যবাস্থা আজ শ্রেণি বৈষম্য, অবিচার, অত্যাচার, বঞ্চনা, শোষণে পরিপূর্ণ। ক্ষমতাধরেরা ধরাকে সরাজ্ঞান না করে ব্যক্তিগত স্বার্থে সমস্ত অপরাধ করছে। জুলুম নির্যাতন চালাচ্ছে পিছিয়ে পড়া মানুষগুলোর ওপরে। সমাজে সমাজে, দেশে দেশে আজ এ যেন স্বাভাবিক এক ধারা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এ সমস্ত কিছু থেকে মুক্তির মাধ্যমে সমতাভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে মার্কসবাদের গ্রহণযোগ্যতা, প্রয়োজনীয়তা আজও বিকল্পনীয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, মার্কসবাদ কেবল ইউরোপের শিল্প বিপ্লবের সময়কার কোনো পুরাতন তত্ত্ব নয়, বরং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এটি একটি জীবন্ত দর্শন। সাম্রাজ্যবাদী শোষণ, অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের বেড়াজাল ভেঙে মুক্তির পথ খুঁজতে মার্কসীয় সমাজতত্ত্বের কোনো বিকল্প নেই। যতক্ষণ পর্যন্ত সমাজে শোষক ও শোষিতের অস্তিত্ব থাকবে, ততক্ষণ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মার্কসবাদের তাৎপর্য চিরকাল অম্লান থাকবে।
