মার্কসবাদ হলো সমাজতত্ত্ব বা সমাজবিজ্ঞানের বিরুদ্ধে উক্তিটি বিশ্লেষণ
ভূমিকা: ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে তৎকালীন ইউরোপের অস্থিতিশীল সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে বিজ্ঞানভিত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে একটি স্বতন্ত্র জ্ঞানের শাখা হিসেবে সমাজবিজ্ঞানের (Sociology) উদ্ভব ঘটে। অন্যদিকে, সমাজের প্রতিটি উপাদান ও দ্বন্দ্বকে কার্ল মার্কসের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে ব্যাখ্যা করার মাধ্যমে গড়ে ওঠে মার্কসবাদ (Marxism), যা অনেকের কাছে 'মার্কসীয় সমাজবিজ্ঞান' নামে পরিচিত। তবে সমাজতাত্ত্বিক মহলে একটি বিতর্ক দীর্ঘদিনের- মার্কসবাদ কি আদৌ সমাজবিজ্ঞান, নাকি এটি সমাজবিজ্ঞানের প্রচলিত সংজ্ঞার বিরুদ্ধে এক বৈপ্লবিক অবস্থান? অনেক তাত্ত্বিক মনে করেন, মার্কসবাদ তার রাজনৈতিক ও বৈপ্লবিক চরিত্রের কারণে বিশুদ্ধ সমাজবিজ্ঞানের মর্যাদা লাভ করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং প্রচলিত সমাজবিজ্ঞানের ধারার বিরুদ্ধাচরণ করেছে।
সমাজতত্ত্ব বা সমাজবিজ্ঞানের বিরুদ্ধে মার্কসবাদ
সমাজ বিকাশের বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব হিসেধে মার্কসবাদের বিকাশ সর্বক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য ছিল না। মার্কসবাদের সঙ্গে সমাজতত্ত্বের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও মার্কসবাদে বৈজ্ঞানিক ক্রিয়াকলাপ ও সামাজিক সমস্যাসমূহকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যে, অনেক ক্ষেত্রেই মার্কসবাদকে পুরোপুরি সমাজবিজ্ঞান নয় বলে অনেক তাত্ত্বিকই মত প্রকাশ করেন। ফলে বিভিন্ন বিষয়ের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে সমাজবিজ্ঞান ও মার্কসবাদের মধ্যে বিপরীত সম্পর্ক প্রকাশ পায়। নিম্নে এ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো:
১. হেগেলীয় ভাষবাদপুষ্ট মার্কসবাদ
মার্কসবাদকে সমাজবিজ্ঞান হিসেবে মেনে না নেওয়া তথা স্বীকৃতি দানের ক্ষেত্রে বিতিন্ন বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তাভাবনার পাশাপাশি রাজনৈতিক ঘটনাবলিও প্রভাব বিস্তার করে। এক্ষেত্রে মার্কসবাদকে দৃষ্টিবাদী বিজ্ঞান হিসেবে গড়ে ওঠার প্রাক্কালেই তথা ১৮৯০-এর দশকেই বিরুদ্ধে বিদ্রোহ চরম আকার ধারণ করে। যার প্রস্তাব কিছু কালের মধ্যেই মার্কসীয় চিন্তাধারায় প্রতারিত হয়। এ প্রসঙ্গে Croce মার্কসবাদকে ঐতিহাসিক বিশ্লেষণের পদ্ধতি হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং বলেন যে, মার্কসীয় তত্ত্ব তথা মার্কসবাদ হেগেলীয় দর্শনের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। তাই মার্কসবাদ কখনো সমাজবিজ্ঞান বলে চিহ্নিত হতে পারে না।
২. মার্কসবাদ হলো বিপ্লবিক সিন্ডিক্যালবাদ
Sorel-এর মতে স্বনামধন্য দার্শনিক মার্কসবাদকে সমাজতত্ত্ব হিসেবে গ্রহণ করেন নি। তার মতে, মার্কসবাদ কোনো সমাজতত্ত্ব নয়, বরং এটা হল বৈপ্লবিক "সিন্ডিক্যালবাদ"। মার্কস সমাজতান্ত্রিক সমাজের যে ধারণা প্রদান করেন এর বিপরীতে সরেল বলেন, সমাজতন্ত্র হলো মূলত এক ধরনের নৈতিক নীতি, যা আপোষহীন প্রতিপক্ষ হিসেবে বুর্জোয়া বিশ্বের মুখোমুখি হয় এবং বুর্জোয়া বিশ্বকে বস্তুগত বিপর্যয় অপেক্ষা নৈতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন করে অধিক ভীতসন্ত্রস্ত করে তোলে।
৩. রাজনৈতিক ঘটনাবলি ও শ্রেণির সম্পর্ক
মার্কসবাদের একটি বিশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ মতবাদ বা তত্ত্ব হলো শ্রেণিসংগ্রান সম্পর্কিত ধারণা। আয় তৎকালীন বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনার প্রেক্ষাপটে মার্কস বর্ণিত শ্রেণি সম্পর্কের অবস্থানও পরিবর্তিত হয়। যেমন- নাৎসী ও ফ্যাসিবাদী আন্দোলনের সাফল্য এবং এক্ষেত্রে শ্রমিক শ্রেণি কর্তৃক মালিক/শোষক শ্রেণিতে বাধা দানের অক্ষমতা প্রদান করে যে, শ্রমিক শ্রেণি ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি কিছু অংশের মধ্যে এরা শোষক শ্রেণির কিছু অংশের মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ত সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, যা সমাজতন্ত্রে উত্তরণের গাথে শ্রমিক শ্রেণির ভূমিকাকে বিপর্যস্ত করে এবং এরূপ অবস্থা ভ্রান্ত ও বিশজ্জনন আর এই সকল আন্দোলনে শ্রমিক শ্রেণির ভূমিকা নতুন নতুন সমস্যার জন্ম দেয়।
৪. সাধারণ সমাজতত্ত্ব হিসেবে মার্কসবাদ
লুকাস মার্কসবাদির সমালোচনা করে বলেন, মার্কসবাদ পুরাপুরি সমাজবিজ্ঞান নয়। বরং মার্কসীয় ধারণা এক ধরনের সাধারণ সমাজতত্ত্ব। সমাজতত্ত্বকে যেখানে কোনো খাঁটি পদ্ধতির মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যায় না এবং তা স্বীয় লক্ষ্যসহ স্বাধীন বিজ্ঞান হিসেবে বিকশিত হয় সেখানে মার্কসবাদের মধ্যে এই ধরনের বিষয় অনুপস্থিত।
৫. সর্বহারা সম্পর্কে ভুল চিন্তাভাবনা
লুকাসের মতে, মার্কসবাদ ও সর্বহারা শ্রেণি সম্পর্কে যে সকল চিন্তাভাবনা করা হয়েছে তার মধ্যের অসংগতি পরিলক্ষিত হয়। যেমন- পুঁজিবাদী যুগে ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার যথাযথ যা প্রকৃত অন্তদৃষ্টি সর্বহারাদের সমাজে একমাত্র তাদের অবস্থানজনিত কারণে লাভ করতে পারে। যেখানে মার্কসীয় তত্ত্বে এই অন্তর্দৃষ্টিকে সর্বহারাদের যুক্তিসিদ্ধ ও সুসংহতভাবে দেখানো হয়েছে। তাই এই অন্তসৃষ্টিকে সর্বহারাদের শ্রেণি চেতনার সঙ্গে অভিন্ন বলে চিহ্নিত করা যায়। যেহেতু শ্রচিত্র শ্রেণির প্রকৃত চেতনা বিভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করে, সেহেতু তা মূলত বৈপ্লবিক নয়। আর এই কারণে তা ইতিহাসের মার্কসীয় ধারণাকে মূর্ত করে না, যা সমাজবিজ্ঞানের বৈশিষ্ট্যের সাথে সামঞ্জস্যহীন।
৬. মার্কসীয় সমাজবিজ্ঞান হলো রাজনৈতিক অর্থনীতি
বিখ্যাত সমাজ দার্শনিক Korsch মার্কসবাদকে সমাজবিজ্ঞান হিসেবে স্বীকৃতি না দিয়ে একে রাজনৈতিক অর্থনীতি হিসেবে অভিহিত করেন এবং এদের মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরেন। তাঁর মতে, সমাজবিজ্ঞান ও মার্কসীয় সমাজবিজ্ঞান তথা মার্কসবাদের মধ্যে মূল পার্থক্য হলো, সমাজতত্ত্ব পার্থক্য সামাজিক সম্পূর্ণ ব্যবস্থাকে একটি স্বাধীন অনুসন্ধান ক্ষেত্র হিসেবে দেখে। পক্ষান্তরে, মার্কসবাদ বা মার্কসীয় বিশ্লেষণ ধারা এই সামাজিক ব্যবস্থাকে অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করে। এই দৃষ্টিকোস্ থেকে মার্কস রচিত সামাজিক বিভিন্ন তত্ত্ব ও সমাজের বস্তুবানী বিজ্ঞান সমাজবিজ্ঞান নয় এবং তা হলো রাজনৈতিক অর্থনীতি।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, মার্কসবাদকে সমাজবিজ্ঞানের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর পেছনে প্রধান কারণ হলো এর প্রয়োগবাদী ও বৈপ্লবিক চরিত্র। তবে আধুনিক সমাজবিজ্ঞানে 'দ্বন্দ্বতত্ত্ব' (Conflict Theory) একটি অপরিহার্য শাখা হিসেবে স্বীকৃত হওয়ার পর এই বিতর্ক অনেকটা ম্লান হয়ে গেছে। মার্কসবাদ যদি প্রচলিত সমাজবিজ্ঞানের রক্ষণশীল ধারার বিরুদ্ধে অবস্থানও নেয়, তবুও এটি সমাজকে দেখার একটি নতুন ও শক্তিশালী দৃষ্টিভঙ্গি সরবরাহ করেছে, যা ছাড়া আধুনিক সমাজতাত্ত্বিক আলোচনা অসম্পূর্ণ।
