সমাজবিজ্ঞানে মার্কসবাদ অধ্যয়নের প্রয়োজনীয়তা আলোচনা কর

সমাজবিজ্ঞানে মার্কসবাদ অধ্যয়নের প্রয়োজনীয়তা

ভূমিকা: আধুনিক যুগের রাজনৈতিক চিন্তা, সমাজতত্ত্ব ও অর্থশাস্ত্রের জগতে কার্ল মার্কসের প্রভাব অপরিসীম তথা অবিস্মরণীয়। সমাজবিজ্ঞানে যে সকল দার্শনিক ও চিন্তাবিদ আধুনিক সমাজচিন্তা ও রাষ্ট্রচিন্তার বৈপ্লবিক সম্প্রসারণ ঘটিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে কার্ল মার্কস (Karl Marx) অন্যতম। সমাজ বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে তাঁর দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ এবং ঐতিহাসিক বস্তুবাদ এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। বর্তমানের জটিল সামাজিক কাঠামো, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং শ্রেণিগত সম্পর্ক বিশ্লেষণের জন্য মার্কসীয় দর্শন পাঠের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। আজকে আমরা সমাজবিজ্ঞানে মার্কসবাদ অধ্যয়নের বহুমুখী প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করব।

সমাজবিজ্ঞানে মার্কসবাদ অধ্যয়নের প্রয়োজনীয়তা

সমাজবিজ্ঞানে মার্কসবাদ অধ্যয়নের প্রয়োজনীয়তা

সমাজবিজ্ঞানে মার্কসবাদ অধ্যয়নের প্রয়োজনীয়তা নিচে আলোচনা করা হলো-

১. সামাজিক দ্বন্দ্ব অনুধাবন

সামাজিক দ্বন্দ্বকে অধ্যয়ন করার জন্য সর্বজনগণ্য তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিটি উদ্বৃত হয় মার্কসবাদ হতে। সুতরাং সমাজে বিদ্যমান শ্রেণিদ্বয়, লিঙ্গীয় দ্বন্দ্ব এবং অন্যান্য সব দ্বন্দ্বের অধ্যয়ন মার্কসবাদ ছাড়া অসম্পূর্ণ ও অসমাপ্ত। সামাজিক দ্বন্দ্ব পঠনে তাই মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গি সমাজবিজ্ঞানে সংযুক্ত হওয়া অত্যাবশ্যক।

২. সামাজিক শ্রেণি সম্পর্ক অনুধাবন

মার্কসবাদের আলোচনায় অনেক বড় জায়গা জুড়ে আছে সমালে শ্রেণি সম্পর্ক, উত্থান এবং তার পর তার টিকে থাকার বাস্তবতা। সমাজবিজ্ঞানের সামাজিক শ্রেণিবিষয়ক আলোচনা তাই মার্কসবাদী শ্রেণি ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ ছাড়া কোনোভাবেই করা সম্ভব নয়।

৩. সামাজিক বিবর্তন ইতিহাস পর্যালোচনা

মার্কসবাদের মূল আলোচনার প্রেক্ষাপটে সামাজিক বিবর্তন না হলেও সামাজিক বিবর্তনের আলোচনা এখানে পার্শ্বীয়ভাবে হলেও এসেছে। সামাজিক বিবর্তন এবং সামাজিক ইতিহাস বিষয়ক অধ্যয়ন মার্কসবাদ ছাড়া অসম্ভব। তাই সামাজিক ইতিহাস ও বিবর্তন অধ্যয়নে অবশ্যই মার্কসবাদকে সমাজবিজ্ঞানের আলোচনায় যুক্ত করতে হয়।

৪. সমাজে অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণবান আলোচনা

সমাজের বিভিন্ন সম্পর্কের অর্থনৈতিক প্রেক্ষিত নির্ধারণের যে দৃষ্টিভঙ্গি তাকে অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণবাদ যা Economic determinism বলা হয়। মার্কসের তত্ত্বে সমাজ বিশ্লেষণের দৃষ্টিভঙ্গি হলো অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণবাদী সমাজবিজ্ঞানের আলোচনার অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণবানী প্রেক্ষাপট অধ্যয়নের জন্য অবশ্যই মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গিকে এখানে যুক্ত করতে হয়।

৫. আর্থ-রাজনৈতিক ক্ষমতা অধ্যয়ন

সমাজে অর্থ সম্পর্ক কীভাবে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের প্রেক্ষাপট তৈরি করে তা অধ্যয়নের জন্য আবশ্যক ও সমাজতত্ত্বের আলোচনায় মার্কসবাদী তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিকে যুক্ত করতে হয়। সমাজের যে-কোনো ক্ষমতার সম্পর্কের বিকাশ এবং তা চর্চার প্রেক্ষাপট বাস্তবতা অধ্যয়নেই মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গিকে ব্যবহার করা হয়।

৬. সম্পত্তির ধারণা অধ্যয়ন

মার্কসের আলোচনা অনুসারে সমাজে সব সময়ে সম্পত্তির ধারণা ছিল না। বিবর্তনের একটি পর্যায়ে সম্পত্তির ধারণা এসেছে। সম্পত্তিবিষয়ক যে-কোনো রকম সমাজতাত্ত্বিক অধ্যয়নের জন্য তাই মার্কসীয় আলোচনা সমাজবিজ্ঞানে সবসময় প্রাসঙ্গিক ও যৌক্তিক।

৭. সমাজ মনস্তত্ব অধ্যয়ন

মার্কসের তত্ত্বে দেখানো হয় কীভাবে সমাজের ঘটনাবলি ব্যক্তির মধ্যে 'একাকিত্ব, 'বিচ্ছিন্নতাবোধ' জন্ম দিবে। এই বিচ্ছিন্নতাবোধ বা alienation-এর ধারণা পরবর্তী অনেক মনোবিজ্ঞানীকে মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্লেষণে আগ্রহী করে তোলে। সমাজ মনস্তঢ়ে অধ্যয়নে যেসব সমাজতাত্ত্বিক যুক্ত তাদের অবশ্যই মার্কসঝাদের এই বিচ্ছিন্নতাবোধের ধারণা অধ্যয়ন করতে হয়।

৮. পুঁজিবাদী সমাজ বিশ্লেষণ

পুঁজিবাদী সমাজের অসমতা, অন্ম, ক্ষমতার বাস্তবতার বিকাশ এবং তা সময়ের সাথে সাথে আরও পোক্ত করে তোলার বিভিন্ন বিষয়গুলো মার্কসীয় তত্ত্বে অধ্যয়ন করা হয়। পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা অধ্যয়নে মার্কসবাদকে বাদ দিয়ে কোনোভাবে সমাজতাত্ত্বিক আলোচনা সম্ভব হয় না।

৯. সমাজের অসমতা অধ্যয়ন

সমাজে অসমতা কখন, কীভাবে, কেন উদ্বৃত্ত হলো তা মার্কসবাদের আলোচনা দ্বারা সর্বপ্রথম সবার সামনে এসেছিল। সমাজবিজ্ঞানের আলোচনায় অনেক বড় জায়গা জুড়ে রয়েছে সামাজিক অসমতা বিষয়ক বিশ্লেষণ। সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিতে অসমতা বিষয়ক সবরকম আলোচনায় তাই মার্কসবাদকে যুক্ত করা অত্যাবশ্যক।

১০. আন্তঃবিষয় সমন্বয়:

মার্কসবাদ শুধুমাত্র সমাজবিজ্ঞানেই গুরুত্বপূর্ণ তা নয়। বরং অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং অন্যান্য অনেক মৌলিক সমাজবিষয়ক জ্ঞানকাণ্ডে মার্কসীয় আলোচনার প্রেক্ষিতে নতুন নতুন উপশাখা উদ্বৃত হয়েছে, যেমন-মার্কসীয় রাষ্ট্রবিজ্ঞান, মার্কসীয় অর্থনীতি ইত্যাদি। এভাবে মার্কসবাদ এসব সমাজবিজ্ঞানের সাথে সমাজতত্ত্বের সংযোজন সূত্র হিসেবে কাজ করে।

১১. সামাজিক গোত্রী অধ্যয়ন

বৃহৎ সমাজমূল অনেক মধ্যম, ক্ষুদ্র এবং বৃহৎ বিভিন্ন ধরনের গোষ্ঠী, উপগোষ্ঠীর সমন্বয় হিসেবে বিরাজ করে। এসব গোষ্ঠী উপগোষ্ঠীর বিভিন্ন আন্তঃসম্পর্কের প্রেক্ষিত অনেক ধরনের নিয়ন্ত্রণবাদী পরিসরে নির্ধারিত হলেও মূল নিয়ন্ত্রক শক্তিটি হলো রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক। সামাজিক গোষ্ঠী বিষয়ক এসব নিয়ন্ত্রণের অধ্যয়নে সমাজবিজ্ঞানে অবশ্যই মার্কসবাদী তত্ত্ব যুক্ত করা অত্যাবশ্যক।

১২. সমাজতত্ত্বের মার্কসবাদী উপশাখার বিন্যাস

সমাজতত্ত্বের মূল উপশাখাগুলোর প্রায় প্রতিটির মার্কসবাদী অধ্যয়নভিত্তিক নিজস্ব উপশাখা রয়েছে। এই মার্কসবাদী উপশাখাগুলোর মাধ্যমে সমাজবিজ্ঞানে মার্কসীয় দৃষ্টিতে সমাজের প্রতিটি বিচ্ছিন্ন উপবিভাগকে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করা হয়। এভাবে মার্কসবাদের প্রভাবে সমাজবিজ্ঞানের পরিধি ও বিষয়বস্তু অনেক বিস্তৃত হয়েছে।

১৩. নব্য মার্কসবাদী বিশ্লেষণ

মার্কসবাদের বিভিন্না সংশ্লেষণ, বিশ্লেষণের প্রেক্ষিতে যে নতুন তাব্লিক ধারা উদ্ধৃত হয় তাকে নব্য মার্কসবাদী ধারা বলা হয়। অনেক সময়ে সমাজবিজ্ঞানে মার্কসবাদী উপশাখার পাশাপাশি নব্য মার্কসবাদী উপশাখারও বিস্তার ঘটেছে। এভাবে মার্কসবাদের সাথে সাথে নব্য মার্কসবাদ ও সমাজবিজ্ঞানের ত চনায় প্রতিনিয়ত আরও সরকারি হয়ে উঠেছে।

১৪. সমাজ কাঠামো অধ্যয়ন

মার্কসবাদের আলোচনায় সমাজকে দুটি কাঠামোতে বিভক্ত করা হয়। মৌল কাঠামো এবং উপরি কাঠামো। সমাজ কাঠামো বিষয়ক আলোচনায় মার্কসীয় এই কাঠামো বিষয়ক আলোচনা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। সমাজ কাঠামো বিষয়ক সমাজতাত্ত্বিক আলোচনা কোনোভাবেই মার্কসবাদী কাঠামোবাদ ছাড়া সম্পূর্ণ হতে পারে না।

১৫. সমাজ নির্ভরশীলতা অধ্যয়ন

সমাজের বিভিন্ন অংশের আন্তানির্ভরশীলতা সমাজের যে মূল কাঠামো নির্মাণ করে তা যেমন মার্কসীয় দৃষ্টিতে অধ্যয়ন করতে হয়, তেমনি স্থানীয়, জাতীয়, বিশ্ব পর্যায়ের নির্ভরশীলতা বীজারে রাজনৈতিক ক্ষমতার সম্পর্কের প্রসার ঘটায় তা বোঝার জন্য সমাজতত্ত্বের আলোচনায় মার্কসবাদ অপরিহার্য।

১৬. দমন পীড়ন অধ্যয়ন

সমাজের গোষ্ঠীগত পর্যায়ে দমনপীড়ন, রাষ্ট্র পর্যায়ে সমনপীড়ন এমনকি বাক্তি পর্যায়ের দমনপীড়ন বঞ্চনায় জটিলতা বোঝার জন্য সমাজতত্ত্বের আলোচনায় মার্কসবাদ সবার আগে ভূমিকা রেখেছিল। এখনও এসব আলোচনায় মার্কসবাদ একইভাবে প্রাসঙ্গিক এবং অপরিহার্য।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, মার্কসবাদের সঙ্গে সমাজতন্তের মনিষ্ঠ সম্পর্ক বিদ্যমান। মার্কসীয় দর্শন তথা মার্কসবাদই সমাজ সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়াদির ক্ষেত্রে গভীর চিন্তাভাবনাকে জাগরিত করেছে, গবেষণাকে উৎসাহিত করেছে, বৈজ্ঞানিক ক্রিয়াকলাপকে সম্প্রসারিত করেছে এবং সামাজিক সমস্যাসমূহকে এমনভাবে উপস্থাপিত করেছে যে, মার্কসবাদ সমাজবিজ্ঞান তথা সমাজতত্ত্বে পরিণত হয়েছে। তাই বলা যায়, সমাজবিজ্ঞান হিসেবে মার্কসবাদ তথা সমাজ বিকাশের বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব হিসেবে মার্কসবাদের গুরুত্ব অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।

shikhaprotidin

I have a Master's degree in Sociology from the National University and I run my sociology and education platform Shikhaprotidin.com to help students.

নবীনতর পূর্বতন