কোলম্যানের যৌক্তিক পছন্দ তত্ত্ব বা সামাজিক পছন্দ তত্ত্ব
জেমস স্যামুয়েল কোলম্যান-এর যৌক্তিক নির্বাচন তত্ত্বটি বিশ্লেষণ
ভূমিকা: আমেরিকান সোসিওলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের প্রাক্তন সভাপতি এবং প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী জেমস স্যামুয়েল কোলম্যান (James Samuel Coleman) সমাজতাত্ত্বিক গবেষণায় গাণিতিক ও প্রায়োগিক ধারার এক নতুন মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'Foundations of Social Theory' (১৯৯০)-এ তিনি যৌক্তিক পছন্দ তত্ত্ব (Rational Choice Theory) বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।
কোলম্যান মনে করেন, সমাজের প্রতিটি মানুষ মূলত একজন 'যৌক্তিক অভিনেতা' (Rational Actor)। ব্যক্তি তাঁর সীমাবদ্ধ সম্পদের মধ্যে সর্বোচ্চ উপযোগিতা (Utility) পাওয়ার লক্ষ্যে সিদ্ধান্ত নেয়। এই ব্যক্তিগত পর্যায়ের সিদ্ধান্তগুলোই পরবর্তীতে বৃহৎ সামাজিক ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটায়। আজকে কোলম্যানের সামাজিক পছন্দ তত্ত্ব বা যৌক্তিক তত্ত্বের মূল ভিত্তি ও প্রয়োগ নিয়ে আলোচনা করব।
সামাজিক ও ব্যক্তিগত জীবন থেকে কোলম্যানের যৌক্তিক পছন্দ তত্ত্ব বা সামাজিক পছন্দ তত্ত্ব
সমাজবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক আলোচনায় সমাজবিজ্ঞানী জেমস স্যামুয়েল কোলম্যানের গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো সমাজবিজ্ঞানে Rational Choice বা যৌক্তিক পছন্দ তত্ত্ব বিনির্মাণের রূপরেখা প্রণনয়ন। তিনি তাঁর Foundations of Social Theory (1990) গ্রন্থে Rational Choice সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তিনি বলেন যে, সমাজবিজ্ঞানে অবশ্যই সামাজিক ব্যবস্থার উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করা উচিত কিন্তু তাদের অভ্যন্তরীণ উৎপাদনসমূহ দ্বারা এ ধরনের বৃহৎ প্রপক্ষকে ব্যাখ্যা করতে হবে। তিনি আরো বলেন, ঘটনা বা উপাত্তসমূহকে সাধারণত ব্যক্তিগত পর্যায়ে সংগ্রহ করা হয়। অতঃপর সেগুলোকে ব্যবস্থা পর্যায়ে (System level)-এ সুবিন্যস্ত করা হয়। কোলম্যানের ধারণা হচ্ছে, সামাজিক অনুশীলনের (Asademic exercise), (System Theory) নিছক একাডেমিক অনুশীলনের (Academic exercise) বিষয় নয়, বরং বিশেষ Intervention এর মাধ্যমে এটি সামাজিক জগতকে প্রভাবিত করে।
কোলম্যানের সামাজিক ব্যবস্থা:
কোলম্যানের Rational Choice ব্যাখ্যা করার আগে Social System-টি ব্যাখ্যা করা দরকার। Social System হচ্ছে Human Action System এর একটা Sub-System মাত্র। অন্যান্য সাব-সিস্টেমগুলো হলো সাংস্কৃতিক, ব্যক্তিত্ব ও জৈবিক ব্যবস্থাসমূহ। যেহেতু একটির সাথে অন্যটি অবিচ্ছেদ্য, সেজন্য অন্য তিনটি ক্রিয়া ব্যবস্থা Social System বা সামাজিক ব্যবস্থাকে নিম্নোক্তভাবে ব্যাখ্যা করা যায়।
১। Social System বা সামাজিক ব্যবস্থা ব্যক্তির পারস্পরিক ক্রিয়া থেকে গঠিত।
২। প্রত্যেক কর্তা (Actor) সে নিজের জন্য এবং প্রত্যক্ষকারীর জন্য অবহিতির (Cognitive) বিষয় হয়ে দাঁড়ায় যা তার নিজের জন্যও প্রযোজ্য।
৩। কর্তা তার নিজের লক্ষ্য বা লক্ষ্যসমূহ স্থির করে।
৪। কর্তাকে বিভিন্ন সামাজিক এবং পরিবেশগত প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়।
৫। কর্তার এ অবস্থা মোকাবিলার জন্য উদ্বুদ্ধকরণকারীর এবং মূল্যবোধভিত্তিক অবহিত হতে থাকেন।
যৌক্তিক পছন্দ পরিস্থিতি:
কোলম্যানের যৌক্তিক পছন্দ পরিস্থিতি (Rational Choice Orientation) সংক্রান্ত প্রত্যয়টি অত্যন্ত প্রাঞ্জল এবং পরিষ্কার। তাঁর মৌল ধারণা হচ্ছে, "Persons act Purposively toward a gooal, (thus the actions) Shaped by values or Preferences" (1990, 13)। অর্থাৎ ব্যক্তি লক্ষ্যে পৌছানোর জন্য উদ্দেশ্যমূলক কাজ করে এবং মূল্যবোধ বা অভিরুচি দ্বারা তার লক্ষ্য রূপায়িত হয়।
কোলম্যান যুক্তি দেখান যে, অধিকাংশ তত্ত্বগত অভিপ্রায়ের জন্য তার প্রয়োজন হয় অর্থনীতি থেকে উদ্ভূত যৌক্তিক কর্তার সুস্পষ্ট প্রত্যয়গত ধারণা, যেখানে কোনো একজন কর্তাকে দেখে ঐ ক্রিয়াকে পছন্দ করে, যা উপযোগিতাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে আসে এবং তাদের প্রয়োজন এবং চাহিদা সন্তুষ্টি বিধান করে।
কোলম্যান যৌক্তিক পছন্দ তত্ত্বের ব্যাখ্যায় দুইটি মৌল উপাদানের কথা বলেছেন। সেগুলো হলো- (১) কর্তা (Action) এবং (২) সম্পদ (Resources).
১. কর্তা: কর্তা হলো সম্পদের উপর নিয়ন্ত্রণ থাকা বা নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারে এমন ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ।
২. সম্পদ: সম্পদ হচ্ছে সেই সকল জিনিস যার উপর কর্তার নিয়ন্ত্রণ থাকে এবং এর প্রতি তার আগ্রহ থাকে। এই দুটি উপাদানের মিথস্ক্রিয়া System level কে পরিচালিত করে। এ সম্পর্কে কোলম্যান বলেন- "A minimum basic for a social system if action is two actors, each having controls of interest to the other. It is each one's interest in resources under the others control that leads the two. as purposive actions to engage in actions that involve each other..... a system of action...... In this structure, together with the fact that the actions are purposive each having the goal of maximizing, the realization of his interests, that gives the independence of systematic Characters, to thus actions (Coleman, 1990; P-29] যদি ও rational choice তত্ত্বের কোলম্যানের বিশ্বাস আছে তথাপি তিনি বিশ্বাস করেন না যে, এই দৃষ্টিভঙ্গিতে কমপক্ষে কর্মপ্রণালিতে পরিবর্তন হতে পারে। এক্ষেত্রে তাঁর যুক্তিটি হচ্ছে- "Success of a social theory based on rationality lies in successively demising that domain of social activity that cannot be accounted for by the theory, অর্থাৎ যৌক্তিকতা-নির্ভর সামাজিক তত্ত্বের সফলতা নিহিত আছে ক্রমাগতভাবে হ্রাসপ্রাপ্ত সামাজিক কর্মকান্ডের ঐ ক্ষেত্রে, তত্ত্ব দ্বারা যার কারণ ব্যাখ্যা করা যায় না।
জেমস কোলম্যান স্বীকার করেন যে, বাস্তব বিশ্বে সকল বাক্তি সবসময় যৌক্তিকভাবে আচরণ করতে পারে না। তবে তার চেয়ে কিছুটা ভিন্ন চিত্র তিনি তার তত্ত্বে বিধৃত করেন। তাছাড়া ব্যক্তিগত যৌক্তিক ক্রিয়ার দিকে তার তত্ত্বে বিধৃত করেন। তাছাড়া ব্যক্তিগত যৌক্তিক ক্রিয়ার দিকে তার পরিস্থিতি অনুসরণ করে কোলম্যানের দৃষ্টি নিবন্ধ হচ্ছে ক্ষুদ্র বৃহৎ ইস্যু কিভাবে বাক্তিবর্গের ক্রিয়া System এর আচরণ সম্পর্কে বৃহৎ পরিসরের দিকে সংযুক্তি তৈরি করে সে সম্পর্কে তিনি ধারণা দেন। Micro থেকে Macто এর দিকে প্রাধান্য দেওয়া সত্ত্বেও তিনি Micro-Macro-এর দিকেও আগ্রহ দেখান, সেখানে কিভাবে ব্যবস্থা কর্তায় পরিস্থিভিকে প্ররোচিত করে। অবশেষে তিনি Micro থেকে Macro সম্পর্কের দিকে আগ্রহ প্রকাশ করেন অথবা অন্য ব্যক্তিগত ক্রিয়ার উপর ব্যক্তিগত ক্রিয়ার প্রভাব। বস্তুত Rational choice theory আলোচনা করতে গিয়ে কোলম্যান Micro থেকে Macro level. Macro থেকে Micro level এবং Micro থেকে Micro level-কর্তা ও কর্মের পারস্পরিক সম্পর্কের দিক তুলে ধরেছেন।
উপযুক্ত তিনটি Level এর মধ্যে ভারসাম্য প্রতীয়মান হওয়া সত্ত্বেও তার দৃষ্টিভঙ্গির তিনটি প্রধান দুর্বলতা লক্ষ করা যায়।
প্রথমত, তিনি Macro থেকে Macro ইস্যুকে অতিমাত্রায় প্রাধান্য দিয়ে তদানুযায়ী অন্যদের সম্পর্কের সাথে স্বল্প দায়সারা ব্যবহার প্রদান করেন।
দ্বিতীয়ত, তিনি Micro থেকে Macro ইস্যুকে উপেক্ষা করেছেন। সর্বশেষ তার কার্যকরণ সম্বন্ধীয় তীরটি একমুখিতার দিকে ধাবিত হয়, অন্য কথায় তিনি Micro এবং Macro প্রপঞ্চসমূহের মধ্যে দ্বান্দ্বিক সম্পর্কে উপেক্ষা করেছেন। বস্তুত Rational Choice Approach ব্যবহার করে Coleman অনেকগুলো Micro level প্রপঞ্চসমূহকে ব্যাখ্যা প্রদান করেন।
যৌক্তিক পছন্দ তত্ত্ব বা সামাজিক পছন্দ তত্ত্বসমালোচনা:
কোনো তত্ত্বই সমালোচনার উর্ধ্বে নয়। কোলম্যানের এ তত্ত্বটি নিমোক্তভাবে সমালোচিত হয়েছে।
১। হোর্কেইমার তাঁর এ তত্ত্বকে সমাজবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এক ধরনের Hysteria হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তাই তত্ত্বটি যৌক্তিক পছন্দের ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ না। বরং অসম্পূর্ণ।
২। Tilly বলেন, কোলম্যান তার এ তত্ত্বে সুনির্দিষ্ট কার্যকরণ সবন্ধীয় কৌশলসমূহকে উপেক্ষা করেছেন, যা Psychological reductiontin কে বিভ্রান্ত করে।
৩। সমাজবিজ্ঞানী Blau কোলম্যানের Macro Structure এর সমালোচনা করে বলেন, সমাজবিজ্ঞানকে অবশ্যই Macro level Phenomena'র দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করা উচিত।
8। Green এর Shapito বলেন, এ তত্ত্বটি কি ব্যাখ্যা করতে চায় তা যেমন অস্পষ্ট, তেমনি তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দানেও অপারগ।
৫। Smelser বলেন, এ তত্ত্বটি সবকিছু ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কিছুই ঠিকভাবে ব্যাখ্যা না করার মাধ্যমে দ্বিরুক্ত এবং দুর্বল তত্ত্ব হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, সমালোচনা সত্ত্বেও যৌক্তিক পছন্দ তত্ত্ব সমাজবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে নতুন ধারণার সৃষ্টি করেছে। Micro থেকে Macro Level এ দৃষ্টি নিবিদ্ধ করার কারণে জেমস স্যামুয়েল কোলম্যান নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে। Rational Choice Theory সমাজজীবনে নিঃসন্দেহে গুরুত্বের দাবিদার।
