ম্যাক্স হোর্খেইমারের বিশ্লেষণী তত্ত্বের প্রধান প্রস্তাবসমূহ
ভূমিকা: জার্মান-ইহুদি দার্শনিক ও সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স হোর্খেইমার (Max Horkheimer) ছিলেন বিখ্যাত ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। তিনি মূলত 'ক্রিটিক্যাল থিওরি' (Critical Theory) বা সমালোচনামূলক তত্ত্বের প্রধান প্রবক্তা। হোর্খেইমারের এই তত্ত্ব কেবল সমাজকে ব্যাখ্যা করার জন্য নয়, বরং সমাজকে শোষণের হাত থেকে মুক্ত করার এক দার্শনিক হাতিয়ার।
হোর্খেইমার মনে করতেন, প্রচলিত সমাজবিজ্ঞান কেবল তথ্য সংগ্রহ করে (Traditional Theory), কিন্তু ক্রিটিক্যাল থিওরি সমাজের অন্তর্নিহিত বৈষম্য ও অন্যায়কে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আজকের এই পোস্টে আমরা হোর্খেইমারের বিশ্লেষণী তত্ত্বের প্রধান প্রস্তাবসমূহ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
হোর্খেইমারের বিশ্লেষণী তত্ত্বের প্রধান প্রস্তাবসমূহ:
হোর্খেইমারের বিশ্লেষণী তত্ত্বের প্রধান প্রস্তাবনাসমূহ সম্পর্কে নিচে আলোচনা করা হলো।
১. যুক্তি ও বাস্তবতা:
দোকার্তে দ্বৈত ভূমিকায় যখন বলা হয়, যৌক্তিক বাস্তব হয়ে যায় আর বাস্তব যৌক্তিক হয়ে ওঠে। তখন হোর্খেইমার প্রশ্ন উত্থাপন করেন, যদি যৌক্তিক বাস্তব হয়ে যায় আর বাস্তব যৌক্তিক হয়ে ওঠে তাহলে মানুষের আর কিছু অবশিষ্ট থাকে কি? হোর্খেইমারের প্রস্তাবনা হচ্ছে যুক্তি ও বাস্তব উভয় ভিন্ন এবং তা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হবে।
২. মানুষের অবস্থান:
হোর্খেইমার মনে করেন রিয়াল এবং র্যাশনালের একাত্মাতায় দর্শনের বাইরে মানুষের আর কোনো অবস্থান থাকবে না। তিনি মনে করেন, যে যুক্তি মানুষের মুক্তির পথকে রুদ্ধ করে, সেই যুক্তিবিজ্ঞান অনুসৃত নয়।
৩. বৈজ্ঞানিক চিন্তা:
হোর্খেইমার বলেন, বৈজ্ঞানিক চিন্তাপদ্ধতিতে অযৌক্তিকের কোনো স্থান নেই। তার মতে, Social Democracy ও সোভিয়েত মডেল কোনোটাই মানুষকে র্যাডিক্যালভাবে মুক্ত করতে পারেনি। তিনি আধুনিক যুক্তিত কূটাভাসকে রাজনৈতিকভাবে নয় বরং নান্দনিকভাবে বিরোধিতা করেছেন।
৪. সমাজ-সাংস্কৃতিক পুনরুজ্জীবিতকরণ:
হোর্খেইমার বিশ্লেষণী তত্ত্বের মাধ্যমে মৌল সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক সমালোচনাকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করেছেন। তিনি প্রভুত্ববাদ, সামরিক মনোবৃত্তির প্রাবল্য, অর্থনৈতিক ভাঙন, পরিবেশগত সমস্যা এবং বৃহৎ সংস্কৃতির দরিদ্রতা নিয়ে ব্যাখ্যা ও প্রস্তাবনা করেন।
৫. মার্কসীয় গদ্ধতি প্রসঙ্গ:
হোর্খেইমার র্যাডিক্যাল ও কনজারভেটিভ-এর সমন্বয়ে বিশ্লেষণী তত্ত্ব প্রস্তাবনা করতে চেয়েছিলেন, যা মার্কসবাদ হতে বাধাপ্রাপ্ত হয়। বিশ্লেষণী তাত্ত্বিকরা মার্কসবাদে অবমূল্যায়িত মানব ব্যাপারগুলো বড় করে দেখেন। হোর্খেইমার বলেন, "সমাজের ডাইনামিকস বুঝার জন্য মার্কস এঙ্গেলসের পদ্ধতি যদিও এখনো অপরিহার্য, তবু গার্হস্থ্য উন্নয়নে বা নানাজাতির আন্তর্জাতিক যোগাযোগ মার্কসবাদ ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ।"
৬ মানব মুক্তির যুক্তি:
হোর্খেইমার নিজের সম্পদ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বিশ্লেষণী তত্ত্বের বিকাশ ঘটান। যেখানে তিনি বুর্জোয়া এবং দারিদ্র্যের পাশাপাশি অবস্থান অবলোকন করেছেন। এ তত্ত্ব সমাজের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে সাধুবাদ জানিয়ে মানবতার মুক্তির জন্য, যা যৌক্তিক সেই যুক্তির দিকে ধাবিত হয়।
৭. শিল্পের অনুসরণ:
বিশ্লেষণী তত্ত্ব মূলত একটি শিল্পের অনুসরণ। এটা এমন একটা বিশ্ব তৈরি করবে, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, যেখানে মানুষের প্রয়োজন ও সন্তুষ্টির বিষয়টিকে অতীব গুরুত্ব দেওয়া হয়।
৮. ইতিহাসের পাঠোদ্ধার:
এ তত্ত্বের অন্যতম প্রস্তাবনা ইতিহাসের পাঠোদ্ধার করতে হবে। ক্রিটিক্যাল থিওরি জান ইতিহাসের পরিপূর্ণ পাঠোদ্ধারে ব্রত।।
৯. সামাজিক পূর্ণাঙ্গতার গুরুত্ব:
বিশ্লেষণী তত্ত্ব Social Totality-এর উপর গুরুত্ব দিয়ে থাকে। কেননা Social Totality মানুষ, মানব ইতিহাস, সংস্কৃতি ও তার বিকাশকে পরিস্ফুটিত করে থাকে। এ প্রসঙ্গে হোর্খেইমার বলেন, "The concept of social totality refers to the history of man, himself to his building, his cultural formation and development."
১০. নৈতিক প্রস্তাবনা:
এক্ষেত্রে প্রত্যক্ষবাদী ধারণা বিশ্লেষণী ধারণার সাথে অনেকটা সাংঘর্ষিক। কারণ প্রত্যক্ষবাদী ধারণায় বলা হয়, নৈতিক ও রাজনৈতিক পছন্দের সকল আলোচনাই অধিবিদ্যামূলক এবং অযৌক্তিক। সকল নৈতিক প্রস্তাবনাই সমানভাবে অর্থহীন। বিশ্লেষণী তত্ত্বের মূল লক্ষ্যই হলো সকল যুক্তি বহির্ভূত যুক্তিশীলতাকে নৈতিক মূল্যবোধের আওতায় এনে মানবিক যুক্তিশীলতায় রূপান্তরিত করা।
১১. নতুন রাজনৈতিক অর্থনীতি বিনির্মাণ:
হোর্খেইমার নতুন রাজনৈতিক অর্থনীতি বিনির্মাণ করার প্রস্তাবনা করেছেন। হোর্খেইমার মার্কসের রাজনৈতিক অর্থনীতি হিসেবে বিবেচনা করেন যেটা বিশ্লেষণী তত্ত্বকে নতুনভাবে বিনির্মাণ করে। বিশ্লেষণী তত্ত্ব শুধু পুঁজিবাদকেই নয়, সমগ্র পাশ্চাত্য ইতিহাসকেও সমালোচনা করেছে।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, ম্যাক্স হোর্খেইমারের মাত্রায় নিয়ে গেছে। বিশ্লেষণী তত্ত্বের মাধ্যমে প্রস্তাবনাসমূহ সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। এটি সময়োপযোগী একইসাথে কার্যোপযোগীও বটে। তাই হোর্খেইমার-এর বিশ্লেষণী তত্ত্ব সমাজবিজ্ঞানকে এক অনন্য মাত্রায় নিয়ে গেছে।
