যুর্গেন হেবারমাসের পরিচয় ও তাঁর যোগাযোগমুখী ক্রিয়াতত্ত্ব (Theory of Communicative Action) বিশ্লেষণ
ভূমিকা: "বর্তমান সময়ের অন্যতম প্রভাবশালী জার্মান সমাজতাত্ত্বিক ও দার্শনিক হলেন যুর্গেন হেবারমাস (Jürgen Habermas)। তিনি মূলত সমালোচনামূলক তত্ত্ব বা ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুল ঘরানার একজন প্রবাদপ্রতীম ব্যক্তিত্ব। হেবারমাস ফুকো, দেরিদা এবং রলসের মতো মহান চিন্তাবিদদের ধারণাকে বিচার-বিশ্লেষণ করে আধুনিক সমাজতত্ত্বকে এক নতুন রূপ দান করেছেন।
সামাজিক পরিবর্তন, আধুনিকতা এবং জ্ঞানতত্ত্বের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য হলেও, তিনি বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে বেশি পরিচিত তাঁর 'যোগাযোগমুখী ক্রিয়াতত্ত্ব' (Theory of Communicative Action)-এর মাধ্যমে। তাঁর মতে, সমাজের মূল ভিত্তি কেবল অর্থ বা শক্তি নয়, বরং মানুষের পারস্পরিক বোধগম্য যোগাযোগ। আজকের নিবন্ধে আমরা হেবারমাসের পরিচয় এবং তাঁর যোগাযোগমুখী ক্রিয়াতত্ত্বের যৌক্তিকতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।"
যুর্গেন হেবারমাসের জীবনী:
বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমাজচিন্তাবিদ হেবারমাস ১৯২৯ সালের ১৮ জুন জার্মানির ডাসেলডর্ফে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পরিবার ছিল মধ্যবিত্ত শ্রেণি ও ঐতিহ্যবাহী। হেবারমাসের পিতা ছিলেন ভাসেলডর্ফ Chamber and Commence এর পরিচালক। তাঁর শৈশবকালেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয় এবং হেবারমাস এই যুদ্ধ দ্বারা সাংঘাতিকভাবে আক্রান্ত হন। যুদ্ধের যবনিকা জার্মানদের অনেকের মতো হেবারমাসের জন্যও নতুন আশা ও সুযোগ বয়ে এনেছিল। নাৎসিদের পতন জার্মানিদের ভবিষ্যৎকে আশাবাদী করে তুলেছিল কিন্তু যুদ্ধের অব্যবহিত পরে নাটকীয় উন্নতির অভাবহেতু হেবারমাস হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। নাৎসিনাদের পতনের সাথে সাথে সব ধরনের যুদ্ধবৃত্তিক সুযোগের দ্বারা উন্মোচিত হয় এবং একদা নিষিদ্ধ বিভিন্ন ধরনের গ্রন্থ যুবক হেবারমাসের কাছে সহজলভ্য হয়ে যায়। পশ্চিমা এবং জার্মান সাহিত্যের পাশাপাশি মার্কস এবং এঙ্গেলস-এর রচনাবলিও সকলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। হেবারমাস ১৯৪৯-১৯৫৪ সালের মধ্যে গোটিনজেল, জুরিখ এবং বনে দর্শন, মনোবিজ্ঞান এবং জার্মান সাহিত্যের উপর ব্যাপক অধ্যয়ন করেন। হেবারমাস ১৯৫৪ সালে জার্মানির বন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন এবং ২ বছর সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেন। হেবারমাস ১৯৫৬ সালে ফ্রাঙ্কফুর্ট Institute for Social Research এ সহযোগী হিসেবে যোগদান করেন এবং ঐ স্কুলের একজন নামকরা সদস্য হিসেবে গবেষণা সহকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। যুর্গেন হেবারমাস ১৯৬১ সালে Marburg বিশ্ববিদ্যালয় থেকে 'Habilitation' সম্পন্ন করেন। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রচনাবলি প্রকাশের পর এমনকি তাঁর Habilitation সম্পন্ন হওয়ার আগেই তাঁকে হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়। ১৯৬৪ সালে ফ্রাঙ্কফুর্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনশাস্ত্র ও সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে যোগদানের পূর্ব পর্যন্ত তিনি Max Planck Institute এর পরিচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১৯৮২ সালে তিনি পুনরায় ফ্রাঙ্কফুর্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনশাস্ত্রের অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন এবং ১৯৯৪ সালে তিনি ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমিরেটাম প্রফেসর হিসেবে নিয়োজিত হন। তিনি অনেকগুলো মর্যাদাপূর্ণ একাডেমিক পুরস্কার লাভ করেন এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসূচক অধ্যাপক পদে ভূষিত হন। ১৯৫৪ সালে জার্মানির বন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন এবং দুই বছর সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেন।
অনেক বছর ধরেই হেবারমাস নব্য-মার্কসবাদীদের পথিকৃৎ হিসেবে প্রতিভাত। তাঁর কর্মের বিশালতাই তাঁকে বর্তমান সময়ের শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদের আসনে সমাসীন করা হয়েছে। সামাজিক বিজ্ঞানে বৃহৎ পরিসর তত্ত্ব এবং আধুনিকতার প্রধান ত্রাণকর্তা হিসেবে হেবারমাস বর্তমান সময়ের সবচেয়ে প্রোজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব হিসেবে সারা পৃথিবীতে পরিচিত।
হেবারমাসের রচনাবলি:
যুর্গেন হেবারমাসের লেখা গ্রন্থসমূহের মধ্যে নিম্নলিখিত গ্রন্থগুলো উল্লেখযোগ্য-
১। Knowledge and Human Interests (1971)
২। Structural Transformation of the Public Shone (1962)
৩। Toward a Rational Society (1970)
8 Theory and Practice (1973)
৫। Legitimation Crisis (1975)
৬। Communication and the Evolution of Society (1979)
৭। Between facts and Norms (1992)
৮। The Theory of Communicative Action (1984)
হেবারমাসের যোগাযোগমুখী ক্রিয়াতত্ত্ব:
হেবারমাস মনে করেন, মানবসমাজে আমরা যদি একটি নৈতিক বন্ধনের সৃষ্টি করতে চাই, তাহলে অন্যান্য সংস্কৃতির সাথে আমাদের যোগাযোগ করতে হবে এবং আমাদেরও সেটাই করতে হবে পৃথিবীর সমন্ত্র মানবজাতি সদ্য সর্বদা যা করে। এক্ষেত্রে বিশ্বজনীন সামাজিক উপলক্ষ্যগুলোও আমাদের বিবেচনায় আনতে হবে। আমাদেরকে একে অপরের সংথ ঐকমত্যে পৌছার জন্য সংলাপ চালিয়ে যেতে হবে এবং অর্থের কোনো সাদৃশ্যপূর্ণ স্বরূপ নির্ধারণের জন্য ঐকমত্যে, পৌঁছার চেষ্টা করতে হবে। হেবারমাস মনে করেন, মানবজাতি কখনো সংস্কৃতির শৃঙ্খলাবন্দি হতে পারে না। আমাদের সংস্কৃতির প্রট্রিজ্জ্বনি যতই ভিন্ন হোক না কেন, জীবন অভিজ্ঞতা সম্বন্ধনীয় চিন্তাধারা যতই বিপরীত হোক না কেন, মানবজাতির একটি গুণ হচ্ছে জষার মাধ্যমে একে অন্যের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করা।
হেবারমাস মনে করেন, প্রত্যেক যোগাযোগের একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হয়েছে। এই উদ্দেশ্য ও লক্ষাগুলোকে বাস্তবায়নের জন্য আমাদেরকে সংলাপ চালিয়ে যেতে হবে। দৈনিক সামাজিক জীবনের সাথে প্রতিপক্ষের সাথে সহাবস্থান করার জন্য আমরা স্বত্তাদের যৌক্তিক এবং বিবেকসম্পন্ন ক্ষমতাকে কাজে লাগাতে মারি। একই পদ্ধতিতে আমরা আমাদের সাংস্কৃতিক বিভাজনগুলো ডিঙ্গিয়ে আসতে পারি। একজন ব্যক্তি যদি অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি মেনে না নিতে বদ্ধপরিকর থাকে এবং প্রয়োজনে নিজের অবস্থান থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য নিজের সুযোগ না থাকে, তাহলে যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রত্যাশিত ফল আশা করা যায় না। আমাদের যোগাযোগভিত্তিক মিলন মেলা তখনই সফল হবে, যখন আমায়ো লক্ষ্যস্থল হবে অভিন্ন এবং সুনির্দিষ্ট।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, দার্শনিক হেবারমাসের যোগাযোগমুখী ক্রিয়াতত্ত্ব বর্তমানে সমাজগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি বজায় ও অসাম্প্রদায়িক রেষারেষি দূর করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।
