Advanced capitalism বা পুঁজিবাদ সম্পর্কিত মার্কুইসের ধারণা বিশ্লেষণ
ভূমিকা: "বিংশ শতাব্দীর বিশিষ্ট নব্য-মার্কসবাদী দার্শনিক হার্বার্ট মার্কুইস (Herbert Marcuse) তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ 'One-Dimensional Man'-এ উন্নত শিল্পোন্নত সমাজ বা উন্নত পুঁজিবাদ (Advanced Capitalism) সম্পর্কে এক অনন্য বিশ্লেষণ প্রদান করেছেন। মার্কুইসের এই তাত্ত্বিক আলোচনায় কার্ল মার্কসের শ্রম শোষণ এবং ফ্রয়েডের মনস্তাত্ত্বিক অবদমন উভয় ধারণার এক অভূতপূর্ব সমন্বয় লক্ষ করা যায়।
তবে মার্কুইসের স্বাতন্ত্র্য এখানেই যে, তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে আধুনিক প্রযুক্তি এবং বাজার অর্থনীতি মানুষকে সরাসরি শাসন না করেও পরোক্ষভাবে শোষণের এক নতুন শৃঙ্খলে আবদ্ধ করেছে। তিনি একে প্রযুক্তিগত যৌক্তিকতা (Technological Rationality) হিসেবে অভিহিত করেছেন। উন্নত পুঁজিবাদ সম্পর্কে মার্কুইসের মূল চিন্তাধারা ও তাঁর স্বতন্ত্র মতবাদগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা।"
Advanced capitalism বা পুঁজিবাদ সম্পর্কে মার্কুইসের ধারণা:
মার্কুইসের পুঁজিবাদের বিশ্লেষণ আংশিকভাবে কার্ল মার্কসের মৌলিক প্রত্যয় বস্তুবাদ থেকে গ্রহণ করা হয়, যেখানে পুঁজিবাদ এবং পুঁজিবাদী সমাজে বিচ্ছিন্নতাবোধের কথা বলা হয়েছে। পুঁজিবাদী সমাজে ধনিক শ্রেণি কর্তৃক শ্রমিক শ্রেণি শোষিত হয়। মার্কসের এ ধারণাকে মার্কুইস বিশ্বাস করেন এবং এ সংক্রান্ত ধারণাকে আরো ব্যাপকভাবে বিশ্লেষণ করেন। তাঁর মতে, পুঁজিবাদ এবং শিল্পায়ন শ্রমিকদেরকে কঠিন অবস্থার দিকে ঠেলে দেয় এবং তারা নিজেদেরকে উৎপাদিত বস্তুর বর্ধিতাংশ হিসেবে দেখতে পায়। মার্কুইস তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'One Dimensional Man' গ্রন্থে বলেন, "The people recognize themselves in their commodities. They find their soul in their automobile hi-fi set, split level home, kitchen equipment."
বৈপ্লবিক নেতৃবৃন্দ হিসেবে শ্রমিকদের দিকে দৃষ্টিপাতের চেয়ে মার্কুইস তাঁর বিশ্বাস মৌলিক জোটভুক্ত বুদ্ধিজীবীদের সন্নিবিষ্ট করেন এবং ঐ সকল শ্রেণি তখনো এক সমাজে অন্তর্ভুক্ত হয় নি, যারা সামাজিকভাবে মার্জনকৃত, বহিরাগত ও বহিঃবর্ণের উপবিভাগ, নির্যাতিত, অন্য জাতি ও বর্ণের লোকদের নির্যাতিত, স্বার্থের জন্য তাদের ব্যবহার করা এবং বেকার ও বেকারযোগ্য।
আধুনিক পুঁজিবাদের বিশ্লেষণ করতে গিয়ে মার্কুইস বলেন, "These were the people whose standards of living demanded the ending of intolerable conditions and whose resistance to one dimensional society would not be diverted by the system. The opposition was revolutionary even if their consciousness was not অর্থাৎ, এরাই ছিল সেই ব্যক্তি যাদের জীবনযাত্রার মান সহ্যসীমার চূড়ান্ত পর্যায় উপনীত হয় এবং যাদের প্রতিরোধ শক্তি এই ব্যবস্থা দ্বারা একমুখী সমাজের দিকে বিমুখ করা হয় নি। তাদের প্রতিপক্ষ ছিল বৈপ্লবিক, যদিও তাদের চেতনা বৈপ্লবিক ছিল না। আধুনিক পুঁজিবাদের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মার্কুইস পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থাকে দুইটি ভাগে বিভক্ত করেছেন। যথা- ১। Capital Society বা পুঁজিবাদী সমাজ, ২। Industrial Society বা শিল্পভিত্তিক সমাজ।
এই দুই ধরনের সমাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো পুঁজিবাদ, ব্যক্তিমালিকানা। তাছাড়া শিল্পভিত্তিক সমাজের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটি প্রযুক্তিনির্ভর। মার্কুইস প্রযুক্তিগত যৌক্তিকতা দ্বারা পুঁজিবাদকে ব্যাখ্যার প্রয়াস পেয়েছেন। তাঁর মতে, এই প্রযুক্তির উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠা পুঁজিবাদ নতুন মাত্রার শোষণের সূচনা করেছে। অপরদিকে, সমাজতান্ত্রিক সমাজের মূল ভিত্তি হলো সামাজিক মালিকানা। পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক উভয় সমাজেই প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজ এক ধরনের যৌক্তিকতা সৃষ্টি করে, যা প্রযুক্তিগত যৌক্তিকতা নামে পরিচিত। মার্কুইস প্রযুক্তিগত যৌক্তিকতার সাথে নতুন ধরনের শোষণকে এই তাত্ত্বিকের অধীনে আলোচনা করেন। এই তাব্লিক দৃষ্টিভঙ্গির সাথে তিনি Depressive desublimation ধারণাটি সংযুক্ত করেন।
মার্কুইসের আধুনিক পুঁজিবাদ একমাত্রিক সমাজের উদ্ভব ঘটায়। তাঁর মতার্দশানুযায়ী নিম্নলিখিত উপায়ে একমাত্রিক সমাজের বিকাশ ঘটে।
১. প্রযুক্তিগত যৌক্তিকতা:
গণমাধ্যম, প্রচারণা এবং শিল্পের ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্রযুক্তি মানুষের মধ্যে কৃত্রিম চাহিদার সৃষ্টি করে, যা মানুষকে মোহগ্রস্ত করে ফেলে। অন্যদিকে, মানুষের কৃত্রিম চাহিদাগুলো প্রকৃত চাহিদাগুলোকে দূরে ঠেলে দেয়।
২. কৃত্রিম বনাম প্রকৃত চাহিদা:
মূলত বিলাসবহুল পণ্যসামগ্রীর চাহিদাগুলোকে মানুষের কৃত্রিম চাহিদা বলা হয়। যেমন- স্মার্টফোন, ট্যাব, এসি, ডিএসএলআর ইত্যাদি। কৃত্রিম চাহিদা সৃষ্টির ফলে মানুষের মধ্যে ভোগের চাহিদা অনেক বেড়ে গেছে। এ ধরনের চাহিদা মানুষের মধ্যে এক ধরনের পরাধীনতা ও অমানবিকতায় সৃষ্টি করেছে।
৩. নতুন ধরনের সামাজিক শোষণ:
মানুষের জীবনকে সহজ ও আরামদায়ক করার পাশাপাশি প্রযুক্তি মানুষের স্বাধীনতাকে খর্ব করতে শুরু করেছে। মানুষের ব্যক্তিগত বিষয় আজ প্রযুক্তির কারণে সবার সামনে এসে উপস্থিত, ফলে ব্যক্তিস্বাধীনতা খর্ব হচ্ছে। অপরদিকে, দৈনন্দিন জীবনে প্রযুক্তির কারণে উদ্ভাবিত মানুষের কৃত্রিম চাহিদাগুলো মেটাতে গিয়ে মানুষকে তার অবসয় বিসর্জন দিয়ে অতিরিক্ত কাজ করতে হচ্ছে। এ বিষয়টি মার্কুইস Dehumanization' এবং Surpis Repression নামে চিহ্নিত করেছেন। এ দুইটি বিষয়ই মানুয়কে সামাজিক শোষণের শিকারে পরিণত করেছে। মার্কুইস একে "New form of Social Control নামে আখ্যায়িত করেছেন।
৪. একমাত্রিক মানুষ বা সমাজ
ভোগবাদিতার মাধ্যমে প্রযুক্তিগত যৌক্তিকতা শিল্পায়িত সমাজের মানুষকে সামাজিক শোষণের শিকারে পরিণত করেছে। এ সামাজিক শোষণের ফলে একমাত্রিক মানুষ বা সমাজব্যবস্থার সৃষ্টি হয়। একমাত্রিক সমাজে Critical চিন্তার সক্ষমতা ও সুযোগ থাকে না। অর্থাৎ কোনো সমালোচনা ছাড়াই আমরা যেকোনো কিছুকে গ্রহণ করে নেই। এরূপ সমাজব্যবস্থার ব্যক্তিকে ভোগ ও উৎপাদনে অধিকহারে সম্পৃক্ত করা হয়। এভাবে প্রযুক্তি একমাত্রিক সমাজে একমুখী মানুয়ের সৃষ্টি করে।
উপসংহার: উপরিউক্ত আলোচনা সাপেক্ষে বলা যায় যে, মার্কুইসের পুঁজিবাদের ব্যাখ্যায় মার্কুইসের প্রভাব স্পষ্ট। মার্কস পুঁজিবাদের ব্যাখ্যায় শ্রমিক শোষণের কথা বলেছে, অন্যদিকে মার্কুইসও শোষণের কথা বলেছেন, তবে তা নতুন ধরনের সামাজিক শোষণ। আর পুঁজিবাদের ব্যাখ্যায় মার্কুইসের One Dimentional Man' ধারণাটি একটি যুগান্তকারী ধারণা নতুন যুগের বামপন্থি পুঁজিবাদী আলোচনায় মার্কুইস তাই আবশ্যক হিসেবে বিবেচিত।
