-->

সুশীল সমাজ বলতে কী বোঝায়? সুশীল সমাজের বৈশিষ্ট্য আলোচনা কর

সুশীল সমাজ কী? সুশীল সমাজের বৈশিষ্ট্য আলোচনা

ভূমিকা:- একটি গণতান্ত্রিক দেশে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা করার জন্য এবং উন্নয়নশীল দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে সুশীল সমাজ বেশ কার্যকরী ভূমিকা পালন করে থাকে। কারণ, সুশীল সমাজ সবসময় সরকার ও রাষ্ট্রের মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক বজায় রাখে যাতে দেশের জনগণ এবং সরকার উভয় রাষ্ট্রের উন্নয়নে ভূমিকা পালন করতে পারে। কারণ,জনগণ সরকারের আনুগত্য প্রকাশ করে আর সরকার সবসময় জনগণের জন্য কাজ করে।

সুশীল সমাজ কী? সুশীল সমাজের বৈশিষ্ট্য

সুশীল সমাজের সংজ্ঞা:

সুশীল সমাজ যার ইংরেজি প্রতিশব্দ হচ্ছে Civil Society. সুশীল সমাজ বলতে বুঝায় এমন এক ধরনের গোষ্ঠীকে যারা সবসময় জনগণের জন্য কল্যাণের কাজ করে। সুশীল সমাজের ব্যক্তিবর্গ স্বতন্ত্র এরা কোন রাজনীতি করে না। কারণ এরা কোন দলের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত থাকে না, হোক সরকারি দল বা অন্য বিরোধী কোন দল। সুতরাং সুশীল সমাজ হলো এমন এক ধরনের গোষ্ঠী যারা কোন রাজনৈতিক দলের সাথে সংযুক্ত না থেকে সবসময় জনগণের কল্যাণে কাজ করে।

সুশীল সমাজ প্রামাণ্য সংজ্ঞা:

বিভিন্ন সমাজবিজ্ঞানী বিভিন্নভাবে সুশীল সমাজের সংজ্ঞা প্রদান করেছেন। নিম্নে সুশীল সমাজ সম্পর্কে বিভিন্ন সমাজবিজ্ঞানীদের কয়েকটি জনপ্রিয় সংজ্ঞা প্রদান করা হলো-

সমাজবিজ্ঞানী ল্যারি ডায়মন্ডের মতে “সুশীল সমাজ এমন এক ধরনের গোষ্ঠী যারা একটি মধ্যবর্তী অস্তিত্বের যারা ব্যক্তিগত ক্ষেত্র ও রাষ্ট্রের মাঝামাঝি অবস্থান করে।”

কার্ল মার্কস বলেন “সুশীল সমাজ হচ্ছে এমন এক ধরনের বস্তুবাদের ভিত্তি ভূমি যা আধুনিক সম্পত্তি সম্পর্কে ব্যক্তিদের সংগ্রাম ও চরম ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের ক্ষেত্র বিশেষ।”

বিচারপতি হাবিবুর রহমান বলেন “সুশীল সমাজ এমন এক ধরনের গোষ্ঠী যার ধারণা এসেছে আঠারো শতকে পশ্চিম ইউরোপের পুঁজিবাদী বুদ্ধিজীবীদের মধ্য থেকে যারা সর্বদা জনকল্যাণের জন্য কাজ করে থাকে।”

ইউএনডিপির মতে সুশীল সমাজ হচ্ছে এমন এক ধরনের ক্ষেত্র বিশেষ যেখানে বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলন জন্ম নিবে ও বিকশিত হবে।”

ফার্নেস্ট গ্লেনস বলেন “সুশীল সমাজ হচ্ছে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমষ্টি যার মাধ্যমে রাষ্ট্র ভারসাম্য রক্ষা করতে সক্ষম।

পরিশেষে বলা যায় যে, সুশীল সমাজ এমন এক ধরনের গোষ্ঠী যারা সবসময় রাষ্ট্রের উন্নয়নে কাজ করে থাকে এবং এরা কোন রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত নয়।

সুশীল সমাজের বৈশিষ্ট্যসমূহ

সুশীল সমাজের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য রয়েছে সে সম্পর্কে নিচে আরোচনা করা হলো-

১. রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা:

সুশীল সমাজ কোন রাজনৈতিক দলের অংশ নয়। তারা নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কাজ করে।

২. জনকল্যাণমূলক চিন্তা ও কর্ম:

জনগণের মৌলিক অধিকার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখে।

৩. সরকার ও জনগণের সেতুবন্ধন

সুশীল সমাজ সরকার এবং জনগণের মধ্যে তথ্য ও দৃষ্টিভঙ্গির আদান-প্রদান করে যার মাধ্যমে সরকার ও জনগণের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি হয়।

৪. সচেতনতা সৃষ্টি

সামাজিক সমস্যা নিয়ে আলোচনা, বিতর্ক ও গণমাধ্যমে মত প্রকাশের মাধ্যমে সচেতনতা বাড়ায়।

৫. নাগরিক অধিকার রক্ষা

আইন, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার রক্ষায় সোচ্চার থাকে।

৬. সামাজিক আন্দোলনের নেতৃত্ব

দুর্নীতি, নিপীড়ন, বৈষম্য ও অনিয়মের বিরুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা রাখে।

৭. পরিবেশ ও মানবসম্পদ রক্ষা

পরিবেশ সচেতনতা এবং টেকসই উন্নয়নে নানা রকম সামাজিক কর্মসূচি গ্রহণ করে।

৮. তদারকি ও চাপ সৃষ্টিকারী ভূমিকা

সরকার যদি ভুল পথে চলে, তখন সুশীল সমাজ নীতিনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে।

৯. জ্ঞানভিত্তিক সহায়তা:

সুশীল সমাজ বিভিন্ন ধরনের গবেষণা, পরামর্শ এবং নীতি নির্ধারণে সরকারের সহায়তা প্রদান করে। তারা তথ্য সংগ্রহ করে, বিশ্লেষণ করে এবং জনসাধারণের মধ্যে বিতরণ করে।

১০. প্রতিক্রিয়া ও দায়িত্বশীলতা:

সুশীল সমাজ রাষ্ট্রের নীতি ও কার্যক্রমের প্রতি পর্যবেক্ষণ রাখে এবং সরকারের ভুল বা অবহেলার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়। তাদের কাজের মধ্যে অংশগ্রহণ এবং সরকারের প্রতি গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখে।

১১. সম্প্রদায়িক এবং সামাজিক সংহতি:

সুশীল সমাজ বিভিন্ন সম্প্রদায়, জাতি, ধর্ম বা মতাদর্শের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে, সামাজিক সংহতির মাধ্যমে বিভাজন ও বৈষম্য হ্রাসের প্রচেষ্টা চালায়।

উপসংহার: সুশীল সমাজ সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি রাষ্ট্র এবং জনগণের মধ্যে একটি কার্যকর সেতুবন্ধন তৈরি করে, যা জনগণের কল্যাণে কাজ করে এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন ভুল বা অনিয়ম সংশোধন করে। সুশীল সমাজের কার্যক্রম গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে, এবং এর মাধ্যমে সমাজে উন্নতি, ন্যায়বিচার, মানবাধিকার এবং পরিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব।

নবীনতর পূর্বতন