সমাজচিন্তায় হার্বার্ট মার্কুইসের অবদান আলোচনা
ভূমিকা: "বিংশ শতাব্দীর সমাজচিন্তায় এবং নব্য-মার্কসবাদী দর্শনে এক প্রভাবশালী নাম হার্বার্ট মার্কুইস। ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের অন্যতম সদস্য হিসেবে তিনি আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজের কঠোর সমালোচনা করেছেন। মার্কুইসের সমাজচিন্তার একটি অন্যতম আকর্ষণীয় দিক হলো তাঁর নন্দনতাত্ত্বিক আলোচনা (Aesthetics)।
তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'The Aesthetic Dimension'-এ তিনি শিল্প ও নন্দনতত্ত্বের মাধ্যমে সমাজের মুক্তির পথ খুঁজেছেন। মার্কুইসের নন্দনতাত্ত্বিক আলোচনা মার্কসবাদের প্রথাগত ধারণাকে অতিক্রম করে এক নতুন স্তরে নিয়ে গেছে, যাকে বলা হয় মার্কসবাদের অধিবিচার। তাঁর চিন্তা মার্কসবাদ থেকে বিচ্যুত নয়, বরং এটি মার্কসবাদী নন্দনতত্ত্বেরই একটি আধুনিক ও সম্প্রসারিত রূপ। নিম্নে সমাজচিন্তায় হার্বার্ট মার্কুইসের অবদান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।"
সমাজচিন্তায় হার্বার্ট মার্কুইসের অবদান:
নিম্নে সমাজচিন্তা হার্বার্ট মাকুইসের অবদান সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো
১. মার্কুইসের ধারণা:
হাবার্ট মাকুইিসের উল্লেখযোগ্য ধারণাসমূহ নিম্নরূণ- Surplus repression (উদ্ধৃত নিপীড়ন), Performance principle (সম্পাদিত কার্যনীতি), One Dimensional Man (একরৈখিক মানুষ), Negation (অস্বীকৃতি) Repressive tolerance (নিপীড়ন সহিষ্ণুতা) এবং Totalitarian democracy (সর্বগ্রাসী গণতন্ত্র)।
২. মাকুইস ও পুঁজিবাদ:
মার্কুইসের পুঁজিবাদ সংক্রান্ত আলোচনা কিছুটা মার্কসের বস্তুবাদ সংক্রান্ত আলোচনার সাথে সংগতিপূর্ণ, যেখানে পুঁজিবাদ ও পুঁজিবাদী সমাজে বিচ্ছিন্নতাবোধের কথা বলা হয়েছে। মাকুইস তাঁর One Dimensional Man' গ্রন্থে উল্লেখ করেন, পুঁজিবাদী তথা ভোগরাদী সমাজে মানুষ তার। ক্রয়কৃত পণ্যের বর্ধিতাংশ হিসেবে আবির্ভূত হয়। তিনি মনে করেন, আধুনিক পুঁজিবাদ কৃত্রিম চাহিদা এবং কৃত্রিম সচেতনতা (false needs and false consciousness) সৃষ্টি করে ভোগকৃত পণ্যের উপর নির্ভরশীল করে তোলে। মূলত যখন থেকে আধুনিকতার মূল হিসেবে পুঁজিবাদকে অর্থনৈতিক গতিশীল নিয়ামক হিসেবে চিহিত করা হলো তখন থেকে পুঁজিবাদের মধ্যে নাটকীয়া পরিবর্তন দেখা দেয়।
৩. মাকুইস ও সংস্কৃতি:
Reperssive dosublimation ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মাকুইস দুই ধরনের সংস্কৃতির মধ্যে পার্থক্য করেছেন।
Higher Culture: Higher Cultry প্রযুক্তির সাথে সংগতিপূর্ণ নয়। এটি Elite culture নামেও পরিচিত। এর গুরুত্বপূর্ণ কিছু বৈশিষ্ট্য হলো-
Fre-technology: প্রযুক্তিগত বাধ্যবাধকতা এদের আচার-আচরণের লাগাম টেনে ধরতে পারে না। এরা নিয়ন্ত্রণহীন মুক্তির স্বাদে বিশ্বাসী।
Elite: এই Culture এর ভিতরের মানুষগুলো খুব সম্ভ্রান্ত পরিবারের ও সমাজের হয়ে থাকে।
Transcendental: এটা একটা অপ্রত্যক্ষ সর্বোৎকৃষ্ট সংস্কৃতি। যেমন- রবি ঠাকুরের সাহিত্য।
Non instrumental: এটা not-instrumental society culture সেখানে টাকার মূল্যমানতা কম, নেই বললেই চলে।
Multi-dimentional: বহু ধরনের চিন্তা-চেতনা ও কার্যকলাপের কেন্দ্রস্থল higher culture। এখানে কেউ
কারো ব্যক্তি স্বাধীনতার উপর হস্তক্ষেপ করে না।
Low culture: Les culture প্রযুক্তিগত যৌক্তিকতার সাথে দৃঢ়ভাবে সম্পর্কযুক্ত। তাই এ culture surplus production এ চরমভাবে অবদান রাখে
৪. মার্কুইস-এর নন্দনতত্ত্ব:
বর্তমান বিশ্বে মার্কসবাদী নন্দনতত্ত্বের-যেসব ব্যাখ্যাশাস্ত্র তৈরি হয়েছে, তার সূত্রপাত বিশের দশকে জার্মানিতে, যার নাম ফ্রাষফুর্ট স্কুল বা ফ্রাঙ্কফুর্ট ঘরানা। এই ঘরানার অন্তত তিনজন এমন ব্যক্তি ছিলেন, যাদের চিন্তা ভাবনা এখনো বুদ্ধিবৃত্তিক ও নন্দন তাত্ত্বিক জিজ্ঞাসার প্রধান উৎসরূপে বিবেচিত। এঁরা হলেন ওয়াটার বেনজামিন, থিওডর আর্ডানো ও হার্বার্ট মার্কুস।
নন্দন শব্দের অর্থ যা থেকে আনন্দ পাওয়া যায় বা যার দ্বারা আনন্দ দেওয়া যায় তাই নন্দন। যেহেতু আনন্দের উৎস সৌন্দর্য, তাই নন্দন শব্দের অন্য অর্থ হলো সৌন্দর্য প্রদায়ক। এই বিচারে নন্দনতত্ত্বের আভিধানিক অর্থ হলো-সৌন্দর্য প্রদায়ক তত্ত্ব। কিন্তু দর্শনের একটি বিশেষ শাখা হিসেবে নন্দন ব্যাপক অর্থ প্রদান করে। বৈজ্ঞানিকভাবে বললে বলা হয়, নন্দনতত্ত্ব মানুষের সংবেদনশীলতা ও আবেগের মূল্য এবং অনুভূতি ও খাদের বিচার নিয়ে আলোচনা করে। আর একটু বৃহৎ অর্থে বলা যায়, নন্দনতত্ত্ব শিল্প, সংস্কৃতি এবং প্রকৃতি নিয়ে সুক্ষ্ম ও সমালোচনামূলকভাবে আলোচনা করে। নন্দনতত্ত্ব একটি অদৃশ্য বিষয় কিন্তু এটি বাক্তি বা বস্তুর আচরণের প্রতাক্ষণ যা বোধের বিকাশ ও ঘটাতে পারে। মূলত স্বাধীনতা, পূর্ণতা দায়িত্বশীলতা, ন্যায়পরায়ণতা ও ন্যায়ানুগত। মানুষের এই পাঁচটি বৈশিষ্ট্য থেকেই নৈতিক উপলব্ধির জন্য নেয়। নন্দনতত্ত্ব যেহেতু নীতিবিদ্যার দ্বায়। প্রত্যরিত ফুলে মানুষের ইচ্ছার ক্রিয়ায় যে সামঞ্জস্য বা অসামঞ্জস্য তা নির্ণয় করাই নীতি বিদ্যার বিষয়বস্তু।
ব্যাপকতার দিক থেকে সৌন্দর্য তত্ত্ব কেবল শিল্পকলার সৌন্দর্যকে বিশ্লেষণ করে না, সৌন্দর্য তত্ত্বের প্রধান আলোচ্য বিষয় হাজ মানুষ, তার সৃজনশীল সমতার বাস্তব প্রকাশ। মহত্ত্বের জন্য জীবন উৎসর্গ, দাসত্ব থেকে মুক্তির সংগ্রামে যে আনন্দানুভূতি সে বোধ করে কিবে। বর্ষরতার আঘাতে যে ঘৃণা তার মনে উদ্বৃত হয়, তার বিকাশ প্রক্রিয়া এবং বৈশিষ্ট্যই হলো নন্দনতত্ত্ব নন্দনতত্ত্ব এমন একটি বৈজ্ঞানিক দর্শন, যার বিষয়ে আলোচনা কোনো বাস্তবতা নিয়ে নয়, বরং এটি একটি মূল্য নিয়ে আবেগ, অনুভূতি নিয়ে। এই তত্ত্ব যারা কোনো তথ্য যা ঘটনা আবিষ্কার করা যায় না, মূলত কোনো তথ্য বা ঘটনার মূল্য নির্ধারণ করাই নন্দনতত্ত্বের কাজ। প্রাচীন দর্শন ছিল নান্দনিক।
জার্মান দার্শনিক হার্বাট মাকুইস মার্কসবাসের অধিবিচার করেছেন। তাঁর নন্দনতাত্ত্বিক বক্তব্যে মার্কসবাদের সমালোচনা আছে কিন্তু তা মার্কসবাদচ্যুত নয়। মার্কুইসের নন্দনতত্ত্ব তাই মার্কসবাদী নন্দনতত্ত্ব, কেননা মার্কসবাদের ভেতর যদি চিন্তার এবং ভাবুকতার এই রকম প্রাণশক্তি না থাকত, মাকুইসের পক্ষে The Aesthetic Dimension (1977) লেখা সম্ভবপর হতো না যেখানে তিনি নন্দনতত্ত্বের বিশাল ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
৫. সমাজ পরিবর্তন সংক্রান্ত ধারণা
ইতিহাসের বাস্তবতা ও ধারাবাহিকতা সমাজ পরিবর্তনে মেহনতিজনতা, বুদ্ধিজীবী ও ছাত্র সমাজের ভূমিকা জাতীয় মুক্তি আন্দোলনও বিশ্বব্যাপী সমাজবাদী সংগ্রাম এবং সমকালীন উন্নয়নশীল দেশসমূহের সম্ভাবনা ইত্যাদি বিষয় তার বক্তব্যের মাধ্যমে স্পষ্টভাবে জানতে পারি।
৬. মার্কসবাদের পর্যালোচনা
মাকুইস তাঁর বক্তব্য রাখতে গিয়ে মার্কস, এঙ্গেলস ও লেনিনকে তীব্র জাগায় সমালোচলা করেছেন। তাঁর মতে, মার্কসবাদ হেগেল দর্শনের সরলীকরণ ছাড়া আর কিছু নয়। তিনি মার্কসবাদের অনেক সূত্র ও উৎসকে উপেক্ষ্য করায় প্রয়াস পেয়েছেন। তাঁর মতে, এঙ্গেলস ও লেনিন মার্কবাদকে অগ্রসর করে নিতে পারেন নি, শুধুমাত্র মার্কসবাদ রহির্ভূত গুটিকয়েক উপাদানের প্রয়োগে তাঁরা সহায়তা করেছেন। তিনি উৎপাদন প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা সংক্রান্ত মার্কণীয় বক্তব্যকে খণ্ডন করতে চেয়েছেন। তিনি আরো বলেছেন যে, মার্কসীয় Dialectics হেগেলকে ছাড়িয়ে পুরোপুরি বস্তুবাদী হতে পারে নি।
৭. ইতিহাস সম্পর্কে অভিমত:
মাকুইস ইতিহাসের বাস্তবতা ও ধারাবাহিকতাকে স্বীকার করেন না। তিনি মার্কসের Form the realm of necessity to the realm of freedom e বক্তব্যে বিশ্বাসী হলেও সমাজ উত্তরণের সুনির্দিষ্ট ধারাবাহিক নীতি ও পদ্ধতিকে মানেন না। মার্কুইসের মতে, পুঁজিবাদী সমাজ নিয়ম শৃঙ্খলার নিগড়ে আবদ্ধ। তাই সমাজতান্ত্রিক সমাজে নিয়ম-শৃঙ্খলা খাড়া উচিত নয়। মানুষের নিয়ম-শৃঙ্খলাবিহীদ মুক্ত সমাজে কেবল স্বতঃস্ফূর্ত কাজই স্বাধীন কাজ বলে গণ্য হতে গারে। আর এভাবেই মানুষ প্রয়োজনের বন্ধন থেকে সার্থক মুক্তি লাভ করবে। তাঁর মতে, মানুষের অতীত ইতিহাসকে জানার প্রয়োজন নেই, অতীতকে বরং ভেঙে দিতে হবে।
৮. বিপ্লব সম্পর্কে বিশ্লেষণ
মার্কুইসের মতে, বিপ্লবে শ্রমিক শ্রেণির আর কোনো অগ্রণী ভূমিকা থাকবে না। তিনি নিজে ফোনো শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন না বলে শ্রমিক শ্রেণির বিপ্লবী ভূমিকাকে এভাবে গৌণ করে দেখতে পেরেছেন। এছাড়া তিনি মনে করেন, মার্কস শ্রমিক শ্রেণির বিপ্লবী চেতনা কিভাবে ঘটবে একথা বলেন নি। সে জন্য তিনি মার্কসের ঐ দৈস্যকে দূর করার জন্য ফ্রয়েডের শরণাপন্ন হয়েছিলেন।
৯. সমাজ পরিবর্তনের সংক্রান্ত মতবাদ:
মাকুইস তাঁর One Dimention সংক্রান্ত তত্ত্ব দিয়ে প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে, আধুনিক শিল্পোন্নত ধনবাদী ব্যবস্থা সনাতন ধনবাদী ব্যবস্থা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ধরনের। সে জন্য পূর্বতন ধনবাদী ব্যবস্থায় সর্বহারার যে ধরনের ভূমিকা পালিত হয়েছে তা এখন আর লক্ষ করা যায় না। অর্থাৎ সামাজিক পরিবর্তনে নতুন সামাজিক শক্তির সন্ধান করতে হবে। আর এই নতুন সামাজিক শক্তি হলো পুঁজিবাদবিরোধী এক শ্রেণির বুদ্ধিজীবী ও মুক্তি পাগল অস্থির হাত্রসমাজ।
উপসংহার উপরিউক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে হার্বার্ট মার্কুইসের জীবনীর পর্যালোচনার মাধ্যমে সমাজতাত্ত্বিক গবেষণা ও চিন্তাধারায় তার অবদান অনস্বীকার্য। তার সকল রচনায় তিনি মানবজীবনের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সকল দিককেই নিখুঁতভাবে উপস্থাপন করেছেন। তার তাত্ত্বিক মতবাদের মাধ্যমে সমাজব্যবস্থার নানা দিক ও উপাদান নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা সমাজতাত্ত্বিক গবেষণার ভাণ্ডারকে করেছে সমৃদ্ধ।
