ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুল কী? ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলে হোকেইমার এবং যুর্গেন হেবারমাসের অবদান
ভূমিকা: "বিশ শতকের যুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে যখন নানাবিধ সামাজিক সংকট ও অস্থিরতা চরম আকার ধারণ করে, তখন সমাজ ও সংস্কৃতিকে নতুন করে দেখার এক বৈপ্লবিক ধারা তৈরি হয়। এই নতুন ধারার প্রাণকেন্দ্র ছিল জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুল। ১৯২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই 'ইনস্টিটিউট ফর সোশ্যাল রিসার্চ' থেকে উদ্ভব হয় বিখ্যাত সমালোচনামূলক তত্ত্ব (Critical Theory)।
এই স্কুলটি কেবল যুক্তি বা বিজ্ঞানের জয়গান গায়নি, বরং যুক্তির আড়ালে লুকিয়ে থাকা আধুনিকতার সংকটগুলোকেও চিহ্নিত করেছে। ম্যাক্স হোর্কেইমার এবং যুর্গেন হেবারমাসের মতো কালজয়ী তাত্ত্বিকদের হাত ধরে এই স্কুল সমাজ ও মানুষের মুক্তির পথ অনুসন্ধান করেছে। আজকের পোস্টে আমরা ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের প্রেক্ষাপট এবং এতে হোর্কেইমার ও হেবারমাসের অবদান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।"
ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুল:
ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুল বা ঘরানা বলতে একটি প্রতিষ্ঠান ও তার চিন্তা পদ্ধতিকে বুঝায়। ১৯২৩ সালে জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে এই বিশেষ স্কুল বা সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৩১ সালে হোর্কেইমারের অধ্যক্ষতায় এ সংস্থা চাঙ্গা হয়ে ওঠে। (১৯৩১-১৯৫০) এই দুই দশকের মধ্যে ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুল আধুনিক জীবনের একটা নতুন, আকর্ষণীয় ও শক্তিসম্পন্ন অধিবিচার উপস্থিত করে। এই অধিবিচার একদিকে ঘাট দশকের স্মরণীয় ছাত্র-আন্দোলনসমূহের চেতনার ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে, অন্যদিকে একাডেমিক জ্ঞানান্বেষায় যুগান্তকারী আলোকবর্তিকা হিসেবে প্রভাব বিস্তার করেছে। ফ্রাঙ্কফুর্ট ঘরানা মনোযোগ নিবদ্ধ করেছে যুক্তিবহির্ভূত যুক্তিশীলতা ও আধুনিক কুটাভ্যাসে এবং সমাজের বিদ্যমান যুক্তির প্যারাডক্সকে তারা ভাবতে, বুঝতে ও ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন। হিটলার ক্ষমতায় এলে ঘরানার কর্মীরা সংস্থাটিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্থানান্তর করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৫০ সালে সংস্থাটি আবার জার্মানিতে প্রত্যাবর্তন করে।
ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুল একদিকে আধুনিকতার অতিরঞ্জনকে অস্বীকার করে অন্যদিকে আধুনিতায় অন্তঃসার মান্য করে। সর্বোপরি ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুল আধুনিকতার নিজস্ব বোধকে নিন্দা করেছে কিন্তু আধুনিকতার প্রজেক্টকে স্কুল উপেক্ষা করে নি। ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুল একটি বস্তু ও তার আভার মধ্যে পার্থক্য করতে চেয়েছে। স্কুল মূলত বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে এক বিদ্রোহ, যে বিদ্রোহ র্যাডিকাল। ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুল কেন্দ্রীয় ভাবনা মানুষের স্বাধীন ও উন্মুক্ত কর্মপ্রবাহ। স্কুল মানবতাকে বুঝতে চেয়েছে মানবসম্মতভাবে, তত্ত্ব যুক্তি দিয়ে, যেখানে বিতর্কের কোনো স্থান নেই।
ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের একটি মেথড ছিল বিশ্লেষণী তত্ত্ব বা ক্রিটিক্যাল থিওরি। এ বিশ্লেষণী তত্ত্ব বয়ান তারা ব্যবহার করেছেন অবিরল। বিশ্লেষণী পদ্ধতি যেকোনো সরল সমর্পণ বা সমঝোতার বিরোধী, তাই ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলেরও কোনো একটি মাত্র দর্শনে সরলভাবে সমর্পিত হয় নি। তবে স্কুলের লক্ষ্য অনন্য, তা হলো আধুনিকতার উৎপত্তি তার সংকট অনুধাবন করা এবং তার ভাষ্য ও বিশ্লেষণ করা। বিশ্লেষণী তত্ত্ব বা ক্রিটিক্যাল থিওরি প্রসঙ্গে Turner তার Sociological Theory 2003 গ্রন্থে বলেন, ক্রিটিক্যাল থিওরি যা বিশ্লেষণী তত্ত্বের সৃষ্টি এমন একটি সময়, যখন সমাজের বিদ্যমান সমস্যা থেকে মানুষের মুক্তির পথ খুব বেশি একটা প্রশস্ত ছিল না। ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের তাত্ত্বিকেরা সমাজের এহেনা পরিস্থিতিতে অর্থাৎ নাৎসিদের যুক্তি এবং যুক্তির সুদক্ষ ব্যবহারের মানবতা যখন বিপন্ন ঠিক তখন স্কুল যুক্তির এবং বাস্তবতার মধ্যকার বিচ্ছিন্নতা দূর করে যুক্তি এবং দর্শনের যথাযথ ব্যবহার ও উপস্থাপনের মাধ্যমে ক্রিটিক্যাল থিওরি বা বিশ্লেষণী তত্ত্বের জন্ম দেয়। এ মেথড পদ্ধতি বা তত্ত্বাফ তারা সমাজ বিশ্লেষণের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করেছেন।
সুতরাং ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুল তথাকথিত সামাজিক সমস্যার সমাধানে বিশ্লেষণী তত্ত্ব বা স্লমালোচনামূলক তাত্ত্বিক কাঠামোর মাধ্যমে অনন্য অবদান রেখেছে।
ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলে ম্যাক্স হোকেইমারের অবদান:
সমাজবিজ্ঞানের হোকেইমারের (১৮৯৫ ১৯৭৩) অবদান অপরিসীম। ১৯৩০ সালে তিনি ফ্রাঙ্কফুর্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হন। ১৯৩১ সালে উক্ত প্রতিষ্ঠানের পরিচালক পদে দায়িত্ব পেয়ে তিনি পুরো একাডেমিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনেন। হোর্কেইমার ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলে Critical Theory বা বিশ্লেষণী তত্ত্বের অবতারণা করেন। হোর্কেইমার মনে করেন, রিয়াল এবং র্যাশনালের একাত্মতায় দর্শনের বাইরে মানুষের আর কোনো অবস্থান থাকবে না। তিনি মনে করেন যে, যুক্তি মানুষের মুক্তির পথকে রুদ্ধ করে সেই যুক্তিবিজ্ঞান অনুসৃত নয়। বৈজ্ঞানিক চিন্তা পদ্ধতিতে অযৌক্তিকের কোনো স্থান নেই। হোর্কেইমার সোশ্যাল ডেমক্রেসি এবং সেভিয়েট মডেল কোনোটাই মানুষকে র্যাডিক্যালভাবে যুক্ত করতে পারে নি। তিনি আধুনিক যুক্তির কূটাভাসকে রাজনৈতিকভাবে নয়, বরং নান্দনিকভাবে বিরোধিতা করেছেন। তিনি বিশ্লেষণী তত্ত্বের মাধ্যমে মৌল সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক সমালোচনাকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করেছেন। তিনি প্রভুত্ববাদ, সামরিক মনোবৃত্তির প্রাবল্য, অর্থনৈতিক ভাঙন, পরিবেশগত সমস্যা, এবং বৃহৎ সংস্কৃতির দরিদ্রতা নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি র্যাডিকেল এবং কনজারাভেটিভ এর সমন্বয়ে বিশ্লেষণী তত্ত্ব প্রদান করতে চেয়েছিলেন, যা, মার্কসবাদ হতে বাধাপ্রাপ্ত হয়। মার্কসিস্টরা যেখানে মানুষের সাম্যের কথা বলেন রাজনৈতিকভাবে অর্থাৎ প্রাকৃতিক সাম্যের তুলনায় যখন তারা রাজনৈতিক সাম্যকে বড় করে দেখেন, যখন তারা গায়ের জোরে রাজনৈতিক সাম্যকে প্রাকৃতিক সাম্য বলতে চান যেখানে হোর্কেইমার এর মতো ক্রিটিক্যাল তাত্ত্বিকেরা বা বিশ্লেষণী তাত্ত্বিকেরা মার্কসবাদে অবমূল্যায়িত মানব ব্যাপারগুলোতে বড় করে দেখেন। এ প্রসঙ্গে হোংকইমার বলেন- "সমাজের ডাইনামিকস বুঝবার জন্য মার্কস এঙ্গেলসের পদ্ধতি যদিও এখনো অপরিহার্য, তবুও গার্হস্থ্য উন্নয়নের বা নানাজাতির আন্তর্জাতিক যোগাযোগ মাকর্সবাদ ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থ।"
হোকেইমার নিজের সম্পদ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বিশ্লেষণী তত্ত্বের বিকাশ ঘটান, যেখানে তিনি বুর্জোয়া এবং দারিদ্রের পাশাপাশি অবস্থান অবলোকন করেছেন। এ তত্ত্ব সমাজের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে সাধুবাদ জানিয়ে মানবতান্ত মুক্তির জন্য যা যৌক্তিক সেই যুক্তির দিকে ধাবিত হয়।
মূলত বিশ্লেষণী তত্ত্ব একটি শিল্পের অনুসরণ। এটা এমন একটা বিশ্ব তৈরি করবে, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, যেখানে মানুষের প্রয়োজন ও সন্তুষ্টির বিষয়টিকে অতীব গুরুত্ব দেওয়া হবে। ক্রিটিক্যাল থিওরি জ্ঞান এবং ইতিহাসের পরিপূর্ণ পাঠাদ্ধারে ব্রত। ক্রিটিক্যাল থিওরি বা বিশ্লেষণী তত্ত্ব সোশ্যাল টোটালিটি এর উপর বেশ গুরুত্ব দিয়ে থাকে, কেননা সোশ্যাল টোটালিটি মানুষ মানব ইতিহাস, সংস্কৃতি ও তার বিকাশকে পরিস্ফুটিত করে। হোকেইমার মার্কসের রাজনৈতিক অর্থনীতি হিসেবে বিবেচনা করেন যেটা বিশ্লেষণী তত্ত্বকে নতুনভাবে বিনির্মাণ করে। বিশ্লেষণ তত্ত্ব শুধু পুঁজিবাদকেই নয়, সমগ্র পাশ্চত্য ইতিহাসকেও সমালোচনা করেছে। এই তত্ত্ব বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের প্রত্যক্ষবাদী ধারণার বিরোধিতা করেছে, কেননা প্রত্যক্ষবাদী ধারণা বিশ্লেষণী
ধারণার সাথে অনেকটা সাংঘর্থিক, কারণ রাত্যক্ষবাদী ধারণায়। এটা বিশ্বাস করা হয় যে নৈতিক এবং রাজনৈতিক পছন্দের সকল আলোচনাই অধিবিদ্যামূলক এবং অযৌক্তিক। সহজভাবে বলতে গেলে, সকল নৈতিক প্রস্তাবনাই সমানভাবে অর্থহীন। অন্যদিকে, বিশ্লেষণী ওড়ের মূল লক্ষ্যই হলো সকল যুক্তি বহির্ভূত যুক্তিশীলভাকে নৈতিক মূল্যবোধের আওতায় এনে মানবিক যুক্তিশীলতায় রূপান্তরিত করা।
ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলে যুর্গেন হেবারমাসের অবদান:
নব্য মার্কসবাদী প্রতিনিধিত্বশীল বিশ্লেষণী তাল্লিক Jurgen Habermas তাকে ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের মুখ্য আলোচক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। হেবারমাস আলোকিত যুগের অধিকারী হওয়ায় Critical Theory তে অবতারণা করেছেন। তিনি Gadamer, Putnam, Foucault, Rawls, Derrida Brandom প্রমুখের ধারণাকে নানাভাবে বিশ্লেষণ ও সমালোচনা করেন। তিনি উত্তরাধুনিকতাবাদের সাথে এই বিষয়ে একমত নন যে, মানবজাতি প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনে সক্ষম হবে না। তিনি বিশ্বাস করেন, মানবজাতি প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনে সক্ষম হয়ে এবং প্রকৃত সত্য সম্বন্ধে নিশ্চিত হতে পারবে। ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলে থেকে তিনি নন্দনতত্ত্ব, সামাজিক-রাজনৈতিক মতবাদ, জ্ঞানতত্ত্ব, আধা সংক্রান্ত ধর্মীয় দর্শনের ভাবধারা ইত্যাদি বিষয়ের অবতারণা করেন। এছাড়াও তিনি অলংকারশাস্ত্র, যোগাযোগবিদ্যা, যুক্তি প্রদর্শনমূলক মতবাদ, উন্নয়নমূলক মনোবিজ্ঞান এবং ধর্মতত্ত্বের অবতারণা করেন।
বর্তমানে তিনি জার্মানির বিখ্যাত পত্রিকা Die zeil তে বিভর্কিত বিভিন্ন ইস্যুতে লেখালেখি করেন। তিনি ১৯৯৪ সালে ফ্রাঙ্কফুর্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন ও সামাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন এবং ঐ বছরেই ফ্রাঙ্কফুর্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমিরেটাস প্রফেসর হিসেবে নিয়োজিত হন। সমাজবিজ্ঞানের বৃহৎ পরিসর তত্ত্ব ও আধুনিকতার প্রধান ত্রাণকর্তা হিসেবে হেবারমাস পৃথিবীজুড়ে খ্যাতি লাভ করেছেন।
হেবারমাস তাঁর যোগাযোগমুখী ক্রিয়াতত্ত্বে সমাজবিজ্ঞান ও দার্শনিকের ব্যাখ্যামূলক, প্রায়োগিক ও নিয়মাত্মক বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি মনে করেন, মানবসমাজে আমরা যদি একটি নৈতিক বন্ধনের সৃষ্টি করতে চাই তাহলে বিশ্বজনীনভাবে অন্যান্য সংস্কৃতির সাথে আমাদের যোগাযোগ করতে হবে। পারস্পরিক ঐকমতো পৌছার জন্য সংলাপ চালিয়ে যেতে হবে। মানবজাতি কখনো সংস্কৃতির শৃঙ্খলাবন্দি হতে পারে না। প্রান্তিক যোগাযোগের মাধ্যমে সামাজিক কর্মকাণ্ড প্রতিফলিত হবে।
হেবারমাস আধুনিকতার সমর্থনে তাত্ত্বিক কাঠামো বিনির্মাণ করেছেন। হেরারমাদের আধুনিকতা ওয়েবারের তত্ত্বের ভিত্তিতে নির্মিত। তিনি আধুনিকতাবাদের রাজনীতিতে লক্ষ্য করেন একটি ইতিবাচক ব্যাডিকালিজম। এটি অভিপ্রেত প্রণতির সহায়ক। হেবারমাস বলেন, আধুনিকতাবাদী শিল্পকলা কখনোই বুজোঁয়া পুঁজিবাদকে চূড়ান্ত মনে করে না। আধুনিকতাবাদী আঙ্গিকের ভেতর যে সৃষ্টিশীলতা, স্বপ্ন ও উদ্ভাবনশীলতা আছে তা প্রগতিশীল রাজনীতির বাঞ্চিত প্রেরণা।
পরিশেষে বলা যায় যে, আধুনিকতার ক্ষেত্রে হেবারমাসের ধারণা মিশ্র। সমালোচনামূলক ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলে হোর্কেইমার ও হেবারমাস উভয়েই এক চিরস্মরণীয় নাম। সমাজবিজ্ঞানের কল্যাণে উভয়ের অবদান অপরিসীম।
