আধুনিকতা সম্পর্কে হেবারমাসের ধারণা মূল্যায়ন
"বর্তমান সময়ের অন্যতম প্রভাবশালী জার্মান দার্শনিক ও সমাজতাত্ত্বিক যুর্গেন হেবারমাস (Jürgen Habermas) আধুনিকতাকে এক নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করেছেন। তিনি তাঁর লেখনীতে নন্দনতত্ত্ব, রাজনীতি, জ্ঞানতত্ত্ব এবং যোগাযোগমুখী ক্রিয়াতত্ত্বের এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়েছেন।
যেখানে অনেক সমসাময়িক চিন্তাবিদ আধুনিকতাকে ব্যর্থ বলে ত্যাগ করতে চেয়েছিলেন, সেখানে হেবারমাস আধুনিকতাকে রক্ষা করার পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন। তাঁর মতে, আধুনিকতা কোনো ফেলে দেওয়ার মতো বিষয় নয়, বরং এটি একটি 'অসম্পূর্ণ প্রকল্প' (Unfinished Project)। আমরা আজকের পোস্টে আধুনিকতা সম্পর্কে হেবারমাসের এই বৈপ্লবিক ধারণা এবং সমাজবিজ্ঞানে এর গুরুত্ব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।"
আধুনিকতা সম্পর্কে হেবারমাসের ধারণা:
আধুনিকতা (Modernity) হলো সমাজের একটা রূপ আধুনিকায়ন (Modernization) হলো ঐ সমাজের একটি প্রক্রিয়া, আর আধুনিকতাবাদ (Modernism) হালা আধুনিক সমাজের নান্দনিক অভিব্যক্তি। আধুনিকতার সাথে জড়িয়ে আছে আধুনিকায়ন, অর্থাৎ আধুনিকতা ও আধুনিকায়ন পরস্পর সাপেক্ষ পরস্পর সাপেক্ষ বলেই এই রূপ ও তার প্রক্রিয়ার সাথে মিশে আছে রাজনীতি।
হেবারমাস আধুনিকতা এবং উত্তর আধুনিকতা নিয়ে ব্যাগক আলোচনা করেছেন। হেবারমাসের আধুনিকতা সম্পর্কে আলোকপাত করতে গিয়ে প্রখ্যাত চিন্তাবিদ ও দার্শনিক Scadman বলেন "In contrast to many contemporary intellectuals who have opted for an anti or post modernisty position Habermas sees in the institutional orders of modernity structures of rationality whereas many intellectuals have become cynical about the emancipator potential of modernity.... Habermas continues to insist on the utopian potential of modernity in a social context in which faith in the enlightenment project of a good society promoted by reason sees a fading hope and spurned idol, Habermas emains one of its strongest defenders"
হেবারমাস আধুনিকতাবাদের বেশকিছু আদিককে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও ইতিবাচক মনে করেছেন। তিনি আধুনিকতাবাদের প্রাজনীতিতে একটি ইতিবাচক ব্র্যাডিকালিজম লক্ষ করেন এবং তা অভিপ্রেত প্রগতির সহায়ক। হেবারমাস বলেন, "The main trand of social theory from Marx via Spencer and Durkheim to Simmel, Weber and Lukacs has to be understood as the answer to the entry of system viroment bound aries into society itself, to the gentesis the internal foreign country which has been nderstood as the hallmark of modernity"
আধুনিকতার বৈশিষ্ট্য:
হেবারমাসের ধারণানুযায়ী আধুনিকতার কতকগুলো বৈশিষ্ট্য রয়েছে। নিম্নে এই বৈশিষ্ট্যগুলো সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-
১. আধুনিক বিজ্ঞান:
আধুনিক বিজ্ঞান আধুনিজতার প্রধান বৈশিষ্ট্য। বস্তুত আধুনিক বিজ্ঞান ছাড়া আধুনিকতা সম্ভব নয়।
২. যৌক্তিকতার উদ্ভব:
হেবারমাসের ধারণা অনুযায়ী আধুনিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো যৌক্তিকতার উদ্ভব। যৌক্তিকতার উদ্ভব ব্যতীত আধুনিকায়ন সম্ভব নয়। যৌক্তিকতার উদ্ভব ঘটেছে বিজ্ঞানের দ্বারা, এ কারণে অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান, পর্যবেক্ষণমূলক জ্ঞান হলো আধুনিকতার ভিত্তি। আর এ সবকিছুই enlightment এর উপাদান।
৩. সৃষ্টিশীলতা, স্বপ্ন ও উদ্ভাবনশীলতা:
হেবারমাস বলেন, আধুনিকতাবাদী আঙ্গিকের চেয়ে যে সৃষ্টিশীলতা, স্বপ্ন ও উদ্ভাবনশীলতা আছে তা প্রগতিশীল রাজনীতির বঞ্চিত প্রেরণ।। আধুনিকতাবাদী আঙ্গিকের উদ্ভাবনশীলতা হলো বিপ্লবাত্মক এবং আধুনিকতাবাদ যে স্বপ্ন তৈরি করে তা বুর্জোয়া সমাজের বাইবে একটা বাস্তবতা এবং তা অভিনন্দনযোগ্য।
৪. সমাজ চূড়ান্ত নয়:
আধুনিকতার একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো আধুনিক কোনো সমাজই চূড়ান্ত নয়। অর্থাৎ সমাজ যে কোনো সময় যেকোনো অবস্থার প্রেক্ষিতে পরিবর্তিত হতে গায়ে। না। এছাড়া সমাজে পরিবর্তন দরকার।
৫. দ্বৈততা অনিশ্চয়তা ও অনির্দিষ্টতা:
দ্বৈততা, অনিশ্চিয়তা ও অনির্দিষ্টত। আধুনিকতার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য। আধুনিকতাবাদ একটা বস্তুকে যুগপৎ স্বীকার এবং অস্বীকার করে এবং এই দ্বৈততা সচেতন অন্তত অসচেতন নয়। আধুনিকতাবাদীসের অস্তি ও নাস্তি, হ্যাঁ ও না। প্রবেশ ও প্রত্যাখ্যান একই সাথে সক্রিয়।
৬. অসমন্বিত দ্বন্দ্ব ও বৈপরীত:
আধুনিকতার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো আধুনিক সমাজে অসমন্বিত দ্বন্দ্ব ও বৈপরীত্য বিরাজমান। এই বিরোধ ও দ্বৈততায় ভেতর কাজ করেন আধুনিক শিল্পী। আর এই বিরোধ ও দ্বৈততা থেকে আধুনিকতাবাদীদের কোনো মুক্তি নেই এবং মুক্তি তার কাম্য নয়।
৭. বুর্জোয়া পুঁজিবাদ চূড়ান্ত নয়:
আধুনিকতাবাদীরা যেমন সমাজকে চূড়ান্ত মনে করেন না তেমনি তারা বুর্জোয়া পুঁজিবাদকেও চূড়ান্ত বলে স্বীকার করে না। আর তারা চূড়ান্ত বলে স্বীকার করে না বলেই অনেক আধুনিকতাবাদী র্যাডিক্যাল।
আধুনিকতার সমস্যাসমূহ:
নিম্নে আধুনিকতার সমস্যাসমূহ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।
১. দ্বান্দ্বিক অবস্থা:
আধুনিকতার বিভিন্ন মতামত নিয়ে দ্বান্দ্বিক অবস্থার সৃষ্টি হয়। বলা হয়, আধুনিকতা শুধু বর্তমানের, কিন্তু আধুনিকতা অতীতের সাথেও জড়িত। এই দুই মতাদর্শ নিয়ে দ্বান্দ্বিক অবস্থার সৃষ্টি হয়। আবার আধুনিকায়নের ধারায়ও দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়।
২. বিচ্ছিন্ন মতামত:
আধুনিকতা নিয়ে বিভিন্ন রকম মতামত প্রচলিত আছে। অনেকে মনে করে এটা সম্পূর্ণরূপে স্বাধীন, এর কোনো অতীত নেই। অপরদিকে, হেবারমাস বলেন, রোমানটিসিস্টরা মনে করে আধুনিকতা হলো অতীতের ধারাবাহিকতা। এটা একটা বাড় সমস্যা যে আধুনিকতা নিয়ে প্রচলিত বিভিন্ন মতামতের কোনটি সঠিক তা সমাজবিজ্ঞানীরা নির্ধারণ করতে পারে না।
৩. সামাজিক সমস্যার সৃষ্টি:
সামাজিক উন্নয়নের পাশাপাশি আধুনিকতা কিছু সামাজিক সমস্যারও সৃষ্টি করে। সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট সংস্কৃতির বিভিন্ন দিকের প্রেক্ষিতে আধুনিকতার বিকাশ ঘাটে। আধুনিকতা, অনেক সময় সংস্কৃতিয় বিভিন্ন উপাদান যেমন- জাতি, ধর্ম, বর্ণ প্রভৃতি ক্ষেত্রে বৈষম্যের সূত্রপাত ঘটায়, যা সামাজিক সমস্যা সৃষ্টির জন্য দায়ী।
৪. চলমান প্রক্রিয়া:
রোমান্টিক ধারার তাত্ত্বিকগণ আধুনিকতাকে একটা চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে আখ্যায়িত করেন। অথচ কিছু তাত্ত্বিক মনে করেন যে এটা কোনো চলমান প্রক্রিয়া নয়, বরং বিচ্ছিন্ন উন্নয়ন।
৫. আত্ম-উপলব্ধি
ইমানুয়েল ক্লান্ট এর মতে, আধুনিকতা আত্ম-উপলব্ধির জন্ম দেয়। একই সাথে একটা বিষণ্নতা, ধ্বংস ও আত্মসচেতনতা সৃষ্টি করে। আধুনিকতার এরূপ বৈপরীত্য সমস্যার সৃষ্টি করে।
৬. যৌক্তিকতা:
আধুনিকতার ডাব্লিক ব্যাখ্যায় হেবারমাস বালন, "আধুনিকতায় যৌক্তিকতাকে অপরিহার্য ধরা হলেও বাস্তবে তা ঘটে না, যা এর একটা বড় সমস্যা।
৭. ভোগবাদিতা:
পুঁজিবাদ হলো আধুনিকতার ভিত্তি। বর্তমানে পুঁজিবাদের অপর নামই হলো ভোগবাদ। মানুষের অফুরন্ত চাহিদার কারণে সমাজ ও পরিবেশ হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে।
উপসংহার: উপরিউক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, আধুনিকতায় ক্ষেত্রে দার্শনিক হেবারমাসের ধারণা মিশ্র। কখনও তিনি ইতিবাচক দিকগুলোর প্রতি ইঙ্গিত করেছেন কখনো আবার আধুনিকতার সমস্যা সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। হেবারমাসের এরূপ বিশ্লেষণী আলোচনা আধুনিকতা বুঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।
