'জনপরিসর' বলতে জুর্গেন হেবারমাস কী বুঝিয়েছেন? জনপরিসর তত্ত্বের সীমাবদ্ধতা আলোচনা
ভূমিকা: যোগাযোগমুখী ক্রিয়াতত্ত্বের প্রবক্তা মার্কসবাদী আত্ত্বিক জুর্গেন হেবারমাস (১৯২৯ ব্রাহ্মফুট স্কুলের এক মুখ্য বিশ্লেষণী তাত্ত্বিক। তিনি মনে করেন, মানবজাতি প্রকৃত সত্য উদঘাটনে সক্ষম হবে এবং নিশ্চিতও হতে পারবে। তাঁর নন্দনতত্ত্ব, সামাজিক রাজনৈতিক মতবাদ, জ্ঞান তত্ত্ব, যোগাযোগমুখী ক্রিয়া তত্ত্ব, উন্নয়ন মনোবিজ্ঞান ও ধর্মতত্ত্ব সমাজবিজ্ঞানকে অলঙ্কৃত করেছে। তিনি সমাজবিজ্ঞানের বৃহৎ পরিসর তত্ত্বের আধুনিকতার প্রধান প্রাণকর্তা হিসেবে পরিচিত। তিনি তার Public Sphere তত্ত্বে জনপরিসর সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন।
জুর্গেন হেবারমাসের জনপরিসর
হেবারমাস Communication Action ও Public Sphere এর মধ্যে জনপরিসর আলোচনা করেছেন। তিনি মনে করেন, জনপরিসর রাজনৈতিক ক্রিয়া ও সাংস্কৃতিক ক্রিয়ার মধ্যে নিহিত। তিনি মনে করেন, মানবসমাজে আমরা যদি একটি নৈতিক বন্ধনের সৃষ্টি করতে চাই তাহলে অন্যান্য সংস্কৃতির সাথে আমাদের জনপরিসর বৃদ্ধি করতে হবে এবং পৃথিবীর মানবজাতি যা করে আমাদের তখন তাই করতে হবে। এক্ষেত্রে বিশ্বজনীন সামাজিক উপলক্ষ্যগুলো জনপরিসরে যুক্ত হবে। হেবারমাস বলেন, মানবজাতি কখনো সংস্কৃতির শৃঙ্খলাবন্দি হতে পারে না। আমাদের সংস্কৃতি যতই ভিন্ন হোক না কেন, জীবন অভিজ্ঞতা সম্বন্ধীয় চিন্তাধারা যতই বিপরীত হোক না কেন, মানবজাতি জনপরিসর বৃদ্ধির মাধ্যমে একে অন্যের পরিপুরক হতে পারে। এতে সংহতি ও শৃঙ্খলা বৃদ্ধি পাবে, একটি রাজনৈতিক দলীয় ব্যবস্থা তখনই টিকে থাকে যখন এর সদস্যদের মধ্যে অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি বিরাজা করে। একে অপরকে সমানভাবে নিজস্ব আচরণ পরিচালিত করে এবং সবসময়ে ঐক্যমতো পৌঁছার আশা রাখে, জনগণের পরিসর নিকটস্থ থাকে তখনই একটি রাজনৈতিক দল সক্রিয় থাকতে সক্ষম হয়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনপরিসর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জনপরিসর বিচ্ছিন্ন হলে বাজনৈতিক কাঠামো অচিরেই ভেঙে যায়। তখন তারা জনগণের আস্থা হারায়। রাজনৈতিক কাজে জনপরিসর নিকটই হলে দল বাই ক্ষমতায় আসে। আবার জনপরিসর বিচ্ছিন্ন হলে অনেকবার দেখা গিয়েছে। জনগণের ঐক্য ও আস্থার অবস্থ তখন দল ক্ষমতা থেকেও ভূপাতিত হয়। পৃথিবীতে এমন নজিন জনপরিসর বৃদ্ধিতে দেখা যায়। জনপরিসর বিষয়টি মনোবিজ্ঞান থেকে হেবারমাস সমাভ্যবিজ্ঞানে এনেছেন। এটি জনমতের প্রতিফলনেও ব্যবহৃত হয়।
হেবারমাস জনপরিসর বিষয়ে গণযোগাযোগ ক্রিয়ার কথাও বলেছেন। মানুষ সমাজে তাদের আন্তঃক্রিয়ার মাধ্যমে যোগাযোগ রক্ষা করে চলে। জনপরিসর গণতন্ত্রে ব্যাপক কার্যকরী। জনগণের মন্যেসংযোগ ও ঐক্যের মাধ্যমে সমাজ কাঠামোর মূল্যবোধ প্রস্ফুটিত হয়। পুজিবাদী সমাজেও এ অবস্থা তুলে ধরেছেন।
জনপরিসর তত্ত্বের সীমাবদ্ধতা
জুর্গেন হেবারমাস জনপরিসর তত্ত্ব উদ্ভাবন করলেও তাঁর আধুনিকতার প্রেক্ষিতে এর কিছু সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। জনপরিসর তত্ত্বের সীমাবদ্ধতাসমূহ নিম্নরূপ।
১. দ্বান্দ্বিক মতাদর্শ
এখানে দ্বান্দ্বিক মতাদর্শ সবসময়ই বিদ্যমান। মানবজাতি কখনোই একীভূত হতে পারে না। তাই স্থান-কাল পাত্রভেদে বিভিন্ন সমাজ তৈরি হয়েছে। আবার সেখান থেকে ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। তাই এ তত্ত্বের অন্যতম সীমাবদ্ধতা দ্বান্দ্বিক মতাদর্শের আলোকে সমাজ ভিন্ন ভিন্ন রশে বিনির্মিত, যা এ তত্ত্বে অনুপস্থিত।
২. মানবজাতির বৈষম্য:
হেবারমাস এক্ষেত্রে মানবজাতির। বৈষম্য নিরূপণে ঘাটতি দেখিয়েছেন। তিনি মনে করেন, যোগাযোগের মিলনমেলা তখনই সফল হবে যখন আমাদের লক্ষ্যস্থল হবে অভিন্ন এবং সুনির্দিষ্ট দলগুলোর সবাই যখন একত্রিত হবে তখন ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারবে। তখন বৈষম্য থাকবে না। কিন্তু বাস্তবে কখনোই এরকমটা সম্ভব নয়।
৩. সাংস্কৃতিক ভিন্নতা
হেবারমাস এক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক একীভূতকরণের কথা বলেছেন, যা বাস্তবে কখনোই সম্পদ নয়। স্থান-কাল-পাত্রভেদে সাংস্কৃতিক ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। সাংস্কৃতিক ভিন্নতা জনপরিসর তত্ত্বে তেমনভাবে স্বীকার করা হয়নি। তাই বলা যায়, সাংস্কৃতিক বিষয়টি এ তত্ত্বের অন্যতম সীমাবদ্ধতা।
৪. নৈতিকতা ও মূল্যবোধ
হেবারমাস বলেন, আন্তঃসংস্কৃতির ঐক্যমতের মূলভিত্তি হবে নৈতিকতা ও সঠিক মূল্যবোধ। কিন্তু পৃথিবীর সব জায়গার মূল্যবোধ এ রকম নয়। একেক সমাজের মূল্যবোধে একেক রকম পার্থক্য রয়েছে, যা জনপরিসরের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ করতে হেবারমাস সক্ষম হননি।
৫. সামাজিক উপলক্ষ্যগুলোর ভিন্নতা
Public Sphere-এ সামাজিক উপলক্ষ্যগুলোর ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়নি। এখানে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিগুলো একই রূপে দেখানো হয়েছে, যদিও তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এক নয়।
৬. যৌক্তিকতা
হেবারমাস এক্ষেত্রে যৌক্তিকতার উপর অধিক জোর দিয়েছেন। মানবজাতির যুগে যুগে সবক্ষেত্রে সং সময় যৌক্তিকতার প্রয়োজন পড়েনি। তিনি এক্ষেত্রে যৌক্তিকতায় দুর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়ায় অন্যান্য দিকের প্রাধান্য কম হয়েছে, যা অসঙ্গতিপূর্ণ।
৭. সমাজের অগ্রগতি
হেবারমাস তার তত্ত্বে সমাজের অগ্রগতির শুধু নেতিবাচক দিক দেখিয়েছেন। তিনি বলেন, আধুনিকতার ভিত্তি হলো পুঁজিবাদ আর পুঁজিবাদের অপর নাম ভোগবাদ। কিন্তু সমাজ এখন বহুবিধ কুসংস্কার থেকে মুক্ত হয়েছে। বিশ্ব পেয়েছে নতুনত্ব। উন্নয়ন ক্রমান্বয়ে ঘটেছে।
৮. পরিবেশগত দিক
হেবারমাস মনে করেন, মানুষের অফুরন্ত চাহিদার কারণে সমাজ ও পরিবেশ হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। আতি-ধর্ম-বর্ণ সবাই সামাজিক সমস্যা সৃষ্টির জন্য দায়ী। ক্লিন্তু বর্তমানে টেকসই উন্নয়নের প্রতি জোর দেওয়া হচ্ছে। পরিবেশবিদরা অধিকতর সোচ্চার হচ্ছে- এসব বিষয় হেবারমাস উপেক্ষা করেছেন।
৯. চলমান প্রক্রিয়া:
জনপরিসর বিষয়টি আধুনিকায়নের সাথে সম্পৃক্ত থাকায় এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। কিন্তু অনেক তাত্ত্বিক হেবারমাসের সাথে এক্ষেত্রে দ্বিমত পোষণ করে বলেন, এটি একটি বিচ্ছিন্ন উন্নয়ন প্রক্রিয়া।
১০. যোগাযোগমুখী আন্তঃক্রিয়া
হেবারমাস মনে করেন, যোগাযোগমুখী আন্তঃক্রিয়ার মাধ্যমে মানুষ সম্পূর্ণভাবে শৃঙ্খলাবদ্ধ হতে পারবে। কিন্তু বাস্তবে তা অসম্পূর্ণ। জীবন অভিজ্ঞতা, চিন্তাধারা, বয়স সবকিছুই একটা সময় জীবনীশক্তি হ্রাস করে। তখন নতুন অবস্থা তৈরি হয়। তাই Action কে স্থান-কাল পাত্রভেদে বিবেচনা করতে হয়।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, হেবারমাসের Public Sphere অন্যতম তাত্ত্বিক অবদান। যদিও তিনি হেগেল, মার্কস যোর্থেইমার, কান্ট প্রকৃতি তাত্ত্বিক দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। তবুও তার পৃথক অবদান সমাজ বিশ্লেষণে খুবই কার্যকর বলে মনে করা হয়। তাঁর Public Sphere-এর সীমাবদ্ধতা থাকলেও সমাজবিজ্ঞানে এর ভূমিকা খুবই কার্যোপযোগী।
