নারী ক্ষমতায়ন সংজ্ঞা ও নরী ক্ষমতায়নের গুরুত্ব আলোচনা
ভূমিকা:- নারী ও পুরুষ নিয়ে মানবসমাজ গঠিত হয়। সমাজ তথা রাষ্ট্রের অগ্রগতি ও উন্নয়নের সাথে নারী ও পুরুষ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। পৃথিবীর প্রায় সমগ্র মানবগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেক নারী তাই একটি দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও দারিদ্র্য হ্রাসের লক্ষ্যে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর পুরুষের পাশাপাশি নারীর ক্ষমতায়ন নারী উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য।
নারীর ক্ষমতায়ন
নারীর ক্ষমতায়ন মূলত একটি বহুমাত্রিক ধারণা। সাধারণভাবে বলা যায়, নারীর ক্ষমতায়ন হলো নারীর সেই অর্জিত অধিকার যার মাধ্যমে নারী তার পারিপার্শ্বিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে পারে এবং সে সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করতে পারবে নিজের চারপাশ বিচার-বিশ্লেষণ করতে পারবে।
প্রামাণ্য সংজ্ঞা
বিভিন্ন সমাজবিজ্ঞানী নারীর ক্ষমতায়ন সম্পর্কে বিভিন্ন ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন মতামত ব্যক্ত করেছেন নিম্নে তা তুলে ধরা হলো-
নারীর ক্ষমতায়ন সম্পর্কে জাতিসংঘ বলেন “নারী ক্ষমতায়ন এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে নারী কল্যাণে সমতা এবং সম্পদ আহরণের সমান সুযোগ অর্জনের লক্ষ্যে কাজ করে এবং নারী পুরুষের সমান সুযোগ, সম্পদ আহরণ, লিঙ্গবৈষম্য চিহ্নিতকরণ ও বিলোপ সাধনের জন্য একজোট হয়।”
সুজান কিন্ডারভেটার বলেন “নারীর ক্ষমতায়ন হচ্ছে একটি পারিপার্শ্বিক রাজনৈতিক শক্তি সম্পর্কে উপলব্ধি এবং তার উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার এমন এক প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে সমাজে ব্যক্তির অবস্থানকে উন্নত করা যায়।”
নারী উন্নয়ন গবেষক শামীমা পারভিন বলেন “নারী ক্ষমতায়ন হচ্ছে এমন প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে নারী বস্তুগত ও মানবিক সম্পদের উপর অধিকতর নিয়ন্ত্রণ অর্জন করে পিতৃতন্ত্র ও সকল প্রতিষ্ঠান এবং সমাজের সকল কাঠামো নারীর বিরুদ্ধে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যকে চ্যালেঞ্জ করে।”
হল সি মার্গারেট বলেন “ক্ষমতায়ন সমতা লাভের দাবিকে সম্পৃক্ত করে এবং এক্ষেত্রে অন্য কারো ওপর নির্ভর নয় বরং ব্যক্তিকে তার নিজস্ব দাবি উপস্থাপন করতে হবে।”
নারীর ক্ষমতায়নের গুরুত্ব
১. সমান অধিকার নিশ্চিতকরণ
নারী ক্ষমতায়নের মাধ্যমে সমাজে নারী ও পুরুষের মধ্যে সমান অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়। এতে বৈষম্য কমে এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে ওঠে।
২. অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়
নারীরা যখন শিক্ষা, চাকরি ও উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ পায়, তখন তারা অর্থনীতিতে সক্রিয়ভাবে অবদান রাখে। এতে পরিবার ও দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটে।
৩. শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ইতিবাচক প্রভাব
ক্ষমতাবান নারী সাধারণত নিজেদের ও সন্তানের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের প্রতি বেশি গুরুত্ব দেয়। ফলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আরও সচেতন ও সুস্থ হয়ে ওঠে।
৪. টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিতকরণ
নারী ক্ষমতায়ন ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। নারীর নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করে।
৫. পারিবারিক ও সামাজিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ:
নারীরা যখন পরিবার ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নিতে পারে, তখন মতের ভারসাম্য তৈরি হয়। এতে পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় হয়, ভুল সিদ্ধান্ত কমে এবং নারী নির্যাতন ও অবহেলা হ্রাস পায়। সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অংশগ্রহণ একটি সুস্থ ও সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনে সহায়ক।
৬. লিঙ্গবৈষম্য দূরীকরণ:
নারী ক্ষমতায়নের মাধ্যমে নারী ও পুরুষের মধ্যে বিদ্যমান লিঙ্গবৈষম্য কমে আসে। শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক মর্যাদায় সমান সুযোগ নিশ্চিত হলে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয় এবং নারীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে যেতে পারে।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে নারীর ক্ষমতায়ন বলতে বোঝায় এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে নারী সর্বস্তরে সম্মানের সাথে নাগরিকের মর্যাদা নিয়ে সবকিছুতে অংশগ্রহণ, চর্চা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবে এবং পিতৃতন্ত্রসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ মুক্তভাবে তা বাস্তবায়নে পুরুষের সমান ভূমিকা রাখতে পারবে। নারীর ক্ষমতায়নের মাধ্যমে নারী তার অধিকার অর্জনের সুযোগ পাবে পুরুষের সাথে তারাও তাল মিলিয়ে সমাজের উন্নয়নমূলক কাজে নিজেদেরকে নিয়োজিত করতে সক্ষম হবে।
