সমাজবিজ্ঞানে তত্ত্ব নির্মাণের সমস্যাসমূহ আলোচনা
ভূমিকা: যেকোনো বিজ্ঞানকে বোঝার একটি প্রধানতম মাধ্যম হলো তত্ত্ব। তাই যেকোনো বিজ্ঞানের প্রধান লক্ষ্যই থাকে তৎসংশ্লিষ্ট প্রত্যয়সমূহের তত্ত্ব প্রদান। তত্ত্বের মাধ্যমে যেকোনো প্রত্যয় বা ধারণাকে একটি সুসংগঠিত কাঠামোবদ্ধ করার প্রচেষ্টা করা হয় যার মাধ্যমে প্রত্যয় বা ধারণাটি সম্পর্কে সুস্পষ্ট জ্ঞান লাভ করা সম্ভব হয়। সমাজবিজ্ঞান একটি বিজ্ঞান। সমাজব্যবস্থা কীভাবে কাজ করছে তার বর্ণনা ও বিশ্লেষণই সমাজবিজ্ঞানের কাজ। আর সমাজ বিশ্লেষণের এই কাজটি প্রতিটি সমাজবিজ্ঞানী তত্ত্বের সাহায্যেই করে থাকেন। কিন্তু সমাজবিজ্ঞান প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় একজন সমাজবিজ্ঞানীকে সামাজিক তত্ত্ব নির্মাণে নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়।
সমাজবিজ্ঞানে তত্ত্ব নির্মাণের সমস্যা
যেকোনো বিজ্ঞানের অন্যতম লক্ষ্য হলো তত্ত্ব গঠন বা নির্মাণ করা। তাই সমাজবিজ্ঞানীরাও সমাজবিজ্ঞানের উন্নয়নকল্পে বিভিন্ন তত্ত্ব নির্মাণের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। এক্ষেত্রে সমাজবিজ্ঞানীরা বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হন।
নিম্নে সমাজবিজ্ঞানের তত্ত্ব নির্মাণের প্রধান প্রধান সমস্যাসমূহ সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো-
১. পরীক্ষানিরীক্ষার সুযোগ নেই:
পর্যাপ্ত পরীক্ষানিরীক্ষার সুযোগের অভাব হলো সমাজবিজ্ঞানের তত্ত্ব নির্মাণে সর্বাপেক্ষা এর বড় সমস্যা। প্রাকৃতিক বিজ্ঞানভুক্ত বিষয়সমূহের তত্ত্ব নির্মাণের নর ক্ষেত্রে তাত্ত্বিক পরীক্ষানিরীক্ষা করার যে অবারিত সুযোগ পেয়ে ক থাকেন, একজন সমাজতাত্ত্বিক সে রকম সুযোগ পান না বললেই চলে। কেননা সমাজবিজ্ঞানে কোনো পরীক্ষাগার নেই বললেই, চলে। তাছাড়া সমাজবিজ্ঞানে গবেষণার বিষয়বস্তুকে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে আনয়ন করা যায় না। কেননা সামাজিক বিষয়গুলোর প্রকৃতি অত্যন্ত জটিল এবং স্থির নয়। শুধু ইতিহাস থেকে ঘটনার স্বরূপ জানা যায়।
২. বস্তুনিষ্ঠ বা নিরপেক্ষ মানদণ্ডের অভাব:
সমাজবিজ্ঞানের অ তত্ত্ব নির্মাণে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো বস্তুনিষ্ঠ বাক নিরপেক্ষ মানদণ্ডের অভাব। কেননা সমাজবিজ্ঞানের প্রত্যয়সমূহ। মূলত বিমূর্ত প্রকৃতির। তাছাড়া সমাজবিজ্ঞানে তত্ত্ব নির্মাণ করা হয় সামাজিক মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে। সমাজের প্রতিটি ও মানুষের নিজস্ব মূল্যবোধ ও আবেগ রয়েছে। তাছাড়া একেক সমাজের মানুষের মূল্যবোধ ও আবেগ একেক রকম। যার কোনো নির্দিষ্ট বা নিরপেক্ষ মানদণ্ড নেই। ফলে সমাজবিজ্ঞানীরা তত্ত্ব নির্মাণে ব্যাপক সমস্যার সম্মুখীন হন।
৩. পরিমাপের সমস্যা:
পরিমাপের সমস্যা হলো সমাজবিজ্ঞানের তত্ত্ব নির্মাণে অন্য আরেকটি সমস্যা। সমাজতাত্ত্বিক ইচ্ছা করলেই কোনো প্রত্যয়ের সংখ্যাত্মক পরিমাপ। করতে পারেন না। কেননা, সমাজবিজ্ঞানে গুণাত্মক বিষয় নিয়েই অধিকাংশ গবেষণা হয়ে থাকে, যেখানে সংখ্যাত্মক বা পরিমাণবাচক বিষয়বস্তু নেই বললেই চলে। যদিও গুণাতত্মক অনেক বিষয়কে সংখ্যার পরিমাপ করা যায় তথাপি এটিকে প্রকৃত পরিমাপ নির্ণয় বলা চলে না। যেমন- বয়স, জনাহার, মৃত্যুহার, প্রজনন হার ইত্যাদিকে সংখ্যায় প্রকাশ করা গেলেও অনেক সমস্যা থেকে যায়। পদার্থবিজ্ঞানীরা যেমন তত্ত্ব নির্মাণ করার জন্য বিভিন্ন প্যারাডাইম নির্ধারণ করে নেন, সমাজবিজ্ঞানীরা সেটা করতে পারে না। কারণ সমাজবিজ্ঞানে বিষয়বস্তু পরিমাপের সঠিক বা সর্বজনীন কোনো প্যারাডাইম আজও আবিষ্কৃত হয়নি বললেই চলে।
৪. বিষয়বস্তুর গতিশীল প্রকৃতি:
সমাজবিজ্ঞানে গবেষণার অন্যতম বিষয় হচ্ছে মানুষ ও সমাজ। কিন্তু মানুষ ও সমাজ উভয়ই গতিশীল বিষয়, স্থির নয়। গবেষণার বিষয়বস্তু যদি স্থির। না হয় তাহলে সঠিক তত্ত্ব নির্ণয় করা সম্ভব নয়। সমাজবিজ্ঞানে গবেষণার প্রধান বিষয়বস্তু যেহেতু মানুষ সেহেতু এখানে সমস্যাও প্রচুর। কেননা মানুষ শুধু একটা বিষয় বা বস্তু আবিষ্কার করেই ক্ষান্ত হয় না, কিংবা অর্থ প্রদান করেই সন্তুষ্ট হয় না। সাথে সাথে এর মূল্যায়নও করে থাকে। মানুষের আচরণ বা মূল্যবোধ যেহেতু পরিবর্তনশীল সেহেতু সমাজবিজ্ঞানী কোনো বিষয়কে পরিবর্তন বা রূপান্তর করার পূর্বেই ব্যক্তি নিজকে পরিবর্তন করে ফেলে।
৫. সামাজিক বৈচিত্র্য ও সংস্কৃতির প্রভাব:
সমাজবিজ্ঞানে গবেষণার প্রধান বিষয় হলো সমাজ ও মানুষের আচরণ। কিন্তু সমাজের প্রতিটি উপাদান মানুষ, সংস্কৃতি, ধর্ম, মূল্যবোধ ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে, এমনকি এক সমাজের মধ্যেও বিভিন্ন শ্রেণি, জাতি বা গোষ্ঠী থেকে ভিন্ন ভিন্ন মনোভাব ও আচরণ দেখা যায়। এজন্য সমাজবিজ্ঞানীকে এককভাবে কোন নির্দিষ্ট তত্ত্বের মাধ্যমে সকল মানুষ ও সমাজের আচরণ ব্যাখ্যা করতে সমস্যা হয়। মানুষের চিত্তবৃত্তি, ধর্মীয় বিশ্বাস, সাংস্কৃতিক পার্থক্য এসব বিষয় তত্ত্ব নির্মাণে এক বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
৬. অন্তর্নিহিত পক্ষপাতিত্ব ও মূল্যবোধের প্রভাব:
সমাজবিজ্ঞানীরা যারা তত্ত্ব তৈরি করেন, তাদের নিজের ব্যক্তিগত মূল্যবোধ ও পক্ষপাতিত্বও তত্ত্ব নির্মাণের প্রক্রিয়ায় অবদান রাখতে পারে। কেউ যদি কোনো নির্দিষ্ট সামাজিক ব্যবস্থা বা রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রতি পক্ষপাতী হন, তবে তাদের তত্ত্বও তার প্রভাবের সঙ্গে আবদ্ধ হয়ে পড়তে পারে। ফলে, সমাজবিজ্ঞানে তত্ত্ব নির্মাণের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা রক্ষা করা একটি গুরুতর সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।
৭. গবেষণার ফলাফলকে সাধারণীকরণ করার সমস্যা:
সমাজবিজ্ঞানে একজন গবেষক যেসব ফলাফল পায়, তা বিশেষ পরিস্থিতি বা সময়ের ওপর ভিত্তি করে হতে পারে। যে কারণেই তা সাধারণভাবে সব সমাজ বা সময়ের জন্য প্রযোজ্য নাও হতে পারে। মানব আচরণের ক্ষেত্রে এমন অনেক বিষয় রয়েছে যা এক অঞ্চলে প্রযোজ্য হতে পারে কিন্তু অন্য অঞ্চলে সঠিক ফলাফল নাও দিতে পারে। অতএব, সমাজবিজ্ঞানে তত্ত্বের সাধারণীকরণ প্রক্রিয়া অনেক জটিল এবং কঠিন।
উপসংহার: উপরিউক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায় যে, তত্ত্বের সঠিক সংজ্ঞা দেওয়া যেমন কঠিন তেমনি সঠিক তত্ত্ব নির্মাণ বা নির্ণয় করা আরও বেশি কঠিন। অন্যান্য বিজ্ঞান বিশেষ করে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের তুলনায় সমাজবিজ্ঞানের তত্ত্ব নির্মাণ বা নির্ণয় করা বেশ কষ্টসাধ্য। পরীক্ষানিরীক্ষার পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাব, বস্তুনিষ্ঠতার অভাব, বিষয়বস্তু পরিমাপের সুনির্দিষ্ট বা সর্বজনীন পরিমাপকের অভাব সর্বোপরি বিষয়বস্তুর গতিশীলতা সমাজবিজ্ঞানের তত্ত্ব নির্মাণের কাজটিকে আরও সমস্যার সম্মুখীন করে তুলেছে।
