ট্যালকট পারসন্সের সমাজের কাঠামোগত পরিবর্তন তত্ত্ব আলোচনা

ট্যালকট পারসন্স-এর সমাজের কাঠামোগত পরিবর্তন তত্ত্ব আলোচনা

ভূমিকা: ক্রিয়াবাদ সমাজ পরিবর্তনের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যায় বিবর্তনবাদের বিরোধী একটি মতবাদ। এ মতবাদ সমাজ পরিবর্তনকে বিবর্তনবাদের ন্যায় স্তরে স্তরে বা পর্যায়ে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে না, বরং ক্রিয়াবাদ সমাজকে জানার ও বুঝার জন্য সমাজের বিভিন্ন অনুষ্ঠান-প্রতিষ্ঠান তথা এর বিভিন্ন অংশের চলমান বা বর্তমান ভূমিকা, পারস্পরিক সম্পর্ক ও কার্যাবলি অনুধাবনের প্রচেষ্টা চালায়। আধুনিক সমাজবিজ্ঞান চিন্তার পরিমণ্ডলে যে সকল চিন্তাবিদ সমাজ বিশ্লেষণে জিয়াবাদী দৃষ্টিভঙ্গিকে মূল আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেন তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন ট্যালকট পারসন্স। কার্যকারীবাদ বা ক্রিয়াবাদের দৃষ্টিকোণের একজন জোরালো প্রবক্তারূপেও পারসন্স সুরিমিত।

ট্যালকট পারসন্সের সমাজের কাঠামোগত পরিবর্তন তত্ত্ব

ট্যালকট পারসন্সের সমাজের কাঠামোগত পরিবর্তন তত্ত্ব:

পারসন্স ছিলেন একজন অমার্কসীয়। ডুর্খেইম, প্যারেটো ও ওয়েবার প্রভৃতি তাত্ত্বিকদের চিন্তাধারা দিয়ে তিনি প্রভাবিত হয়েছিলেন। সমাজ ও সংস্কৃতি ক্রমে পরিবর্তনশীল। এ পরিবর্তন একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ক্রমে এক অবস্থা থেকে অন্য। অবস্থায় উপনীত হয়। পারসন্স এ অবস্থার উপর যথেষ্ট গুরুত্বারোপ করেছেন এবং সামাজিক পরিবর্তনকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দুটি বিষয়ের উপর আলোকপাত করেছেন, যথা-  ১। সমাজের অন্তর্গত পরিবর্তন এবং ২। সমাজের কাঠামোগত পরিবর্তন নিম্নে এগুলো সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-

১. সমাজের অন্তর্গত পরিবর্তন

সমাজের ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থা রেখে যে পরিবর্তন সাধিত হয় তাই হলো সমাজের অন্তর্গত পরিবর্তন। এ ধরনের পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সাধারণত আন্তঃব্যক্তিক ক্রিয়া পারস্পরিক মনোভাব এবং স্থায়ী আচরণকে অগ্রাধিকার দেয়। গারসন্স মনে করেন কোনো সমাজই সম্পূর্ণ নিশ্চল নয় এবং তা মান্য জটিলতায় পরিপূর্ণ। তবে বিশেষ স্থিতাবস্থা বজায় রাখার জন্য সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ, বিশ্বাস, প্রতীক ইত্যাদির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পারসন্স তার সমাজ পরিবর্তন সম্পর্কিত আলোচনায় চার ধরনের ক্রিয়াগত প্রয়োজনের কথা বলেছেন। যথা- (ক) অভিযোজন; (খ) লক্ষ্য অর্জন (গ) সংহতি (ঘ) সুপ্ত। উপরের চারটি ক্রিয়াকে একত্রে AGIL বলা হয়। নিম্নে এ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-

(ক) অভিযোজন

অভিযোজন প্রক্রিয়াটি জৈবিক ব্যবস্থার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। এটি পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে চলে।

( খ) লক্ষ্য অর্জন:

এটি ব্যক্তিত্ব ব্যবস্থার সাথে সম্পর্কিত। এটি হলো য়াজনৈতিক। প্রতিটি ব্যক্তির সুনির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্য থাকে এবং সমাজ কিছু ঠিক করে দেয়। যে ব্যক্তি বা সমাজ লক্ষ্যকে বেশি গুরুত্ব দেয় সে ব্যক্তি ও সমাজ তত উন্নত হয়।

(গ) সংহতি

এটিও সামাজিক ব্যবস্থার সাথে সম্পর্কযুক্ত। এটি হলো আইনগত ব্যবস্থা। এটি সমাজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে সমন্বয় সাধনে ব্যাস্ত থাকে। মানবদেহ যেমন বিভিন্ন অঙ্গ-প্রতঙ্গের দ্বারা পরিচালিত হয় সমাজও তেমনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দ্বারা পরিচালিত হয়।

(ঘ) সুপ্ত

এটি সাংস্কৃতিক ব্যবস্থার সাথে সম্পর্কযুক্ত। সমাজে যখন কোনো সংঘর্যমূলক অবস্থায় সৃষ্টি হয়, তখন এর মাঝে যে স্থিতিশীলতা বিরাজ করে সেটিই হলো সুপ্ত।

২। সমাজের কাঠামোগত পরিবর্তন:

পারসন্স সমাজের কাঠামোগত পরিবর্তনের চারটি কারণের কথা বলেছেন। যথা- i. পার্থক্যকরণ, ii. অভিযোজিত আপগ্রেডিং। iii. অন্তর্ভুক্তি, এবং iv. মূল্য সাধারণীকরণ, v মূল্য সাধারণীকরণ

মূল্যবোধের কাজ হচ্ছে ধারাবাহিকতা রক্ষা করা। নিয়মাবলীর কাজ হচ্ছে সংঘবদ্ধকরণ। সমষ্টিগতের কাজ হচ্ছে লক্ষ্য অর্জন এবং ভূমিকার কাজ হচ্ছে অভিযোজন সম্পাদন করা। পারসন্স পরিবর্তনকে একটি প্রক্রিয়া হিসেবে চিহ্নিত করে বলেছেন সমাজ ক্রমান্বয়ে নিম্ন পর্যায় থেকে উচ্চ পর্যায়ে উন্নীত হচ্ছে। এক্ষেত্রে তিনি তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েছেন। যথা-

১. কার্যকরী আন্তঃনির্ভরতার ধরণে সিস্টেম ইউনিটগুলির বিভেদ বৃদ্ধি

২. নতুন নীতি প্রতিষ্ঠা এবং বিভেদমূলক সিস্টেমে একীকরণের প্রক্রিয়া 

৩. পরিবেশে বিভেদমূলক সিস্টেমগুলির অভিযোজন ক্ষমতা বৃদ্ধি

পারসন্সের মতে, বিবর্তনীয় পরিবর্তনের মূলকথা হচ্ছে সামাজিক ব্যবস্থায় মিথস্ক্রিয়া প্রধান বৈশিষ্ট্য। তিনি একটি প্রক্রিয়া হিসেবে চিহ্নিত করেন যার ভিত্তি হলো ভাষা। প্রক্রিয়াটি হলো-ভাষা যোগাযোগ বিনিময়ের মাধ্যম অভিযোজিত আপগ্রেডিং সমাজ ক্রমান্বয়ে নিম্ন পর্যায় থেকে উচ্চ পর্যায়ের দিকে উন্নীত হয়। তিনি মানবসমাজকে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করেছেন। যথা-

১. আদিম সমাজ:

পারসন্স সমাজ বিবর্তনের প্রাথমিক ধাপ হিসেবে আদিম সমাজের কথা বলেন। তিনি আদিম সমাজের চারটি উপাদানের কথা বলেন, যাদের উন্নয়নের উপর ভিত্তি করেই পরবর্তীতে জটিল সমাজেরর বিবর্তন হয়েছে। এই চারটি উপাদান হলো- i. ধর্ম, ii. আত্মীয়তা, iii প্রযুক্তি, iv প্রতীকী যোগাযোগ।

২. অন্তর্বর্তীকালীন সমাজ

সমাজ বিবর্তনের দ্বিতীয় ধাপ হচ্ছে অন্তর্বর্তীকালীন ধাপ এই স্তরে মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে লিখিত ভাষার বিকাশের মাধ্যমে সমাজ ক্রমশ আদিম পর্যায় থেকে বেরিয়ে আসে। সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক ব্যবস্থায় এই পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। লিখন ক্ষমতার কারণে সমাজ এক স্তর থেকে অন্য হয়ে চলে আসে।

৩. আধুনিক সমাজ:

এটা সমাজ বিবর্তনের সর্বশেষ প্রাণ। এর ভিত্তি হচ্ছে রোমান আইন, আধুনিক আইনের কাছাকাছি। সুতরাং যেসব সমাজ আধুনিক আইন আয়ত্ত করতে পারে তারা আধুনিক সমাজে যেতে পারে। আধুনিক সমাজের বৈশিষ্ট্যগুলো প্রাচীন গ্রিস ও রোমে সীমাবদ্ধ থাকলেও পরবর্তীতে ইউরোপ আবির্ভূত হয়। এই সমাজকে Society a Seedbed Society বলা যেতে পারে।

সমালোচনা:

ট্যালকট পারসন্সের তত্ত্বের সমালোচনা রয়েছে প্রচুর, যদিও তিনি অন্যদের তত্ত্বের অসম্পূর্ণতা, যথার্থতায গ্রাহ্যতার কথা বলেছেন।

প্রথমত:

তাঁর তত্ত্ব সহজ বোধগম্য নয়। যেকোনো পাঠকরে পরিশ্রম করে তাঁর তত্ত্বের সারবস্তু উদ্ধার করতে হয়। মোটকথ যে কোনো সহজ এবং সবল বিষয়কে দীর্ঘ এবং জটিল ক্যা তোলেন পারসন্স তাঁর পুস্তকসমূহে।

দ্বিতীয়ত:

তাঁর তত্ত্বসমূহের মৌলিক তত্ত্বের ব্যাপারে যা শু যায় যে, তা খাদবিহীন ছিল না। মার্টিন্ডেল এর মতে, পারসবের সমাজ কাঠামোর বিশ্লেষণটি নতুন কিছু নয়। জেনেনিবকি, দিও জার্থ এবং মিলস, মার্টন এবং অন্যানারা অনেকেই এ সম্পরে তাঁর পূর্বে বলেছেন।

তৃতীয়ত:

তিনি যে একশন তত্ত্ব সম্পর্কে বলেছেন তাও নতুন কিছু নয়। বস্তুত জার্থ এবং মিলস্, টমাস, জেনেনিককি এবং অন্যরা একশনের কথা বলেছেন। এটি অনেক পুরনো ধারণা, বলা যায় সে এরিস্টটলের সময় থেকে পাওয়া।

চতুর্থত:

সামাজিক পরিবর্তন বিষয়ে তিনি ইতিহাসের পরিবর্তে নিজের মতামতকে বেশি গুরুত্ব দেন।

পঞ্চমত:

তার সমাজ কাঠামো ও ক্রিয়াবাদের ধারণা নতুন কিছু নয়। তার পূর্বে অনেকে এ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন।

ষষ্ঠত:

বটোমোরের মতে, তিনি সামাজিক পরিবর্তন বিশ্লেষণে বস্তুগত উপাদানের চেয়ে ভাবগত উপাদানকে গুরুত্ব দিয়েছেন।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ক্রিয়াবাদী তত্ত্বের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন হলো কাঠামোগত ক্রিয়াবাদের মাধ্যমে। পারসন্সের কাঠামোগত ক্রিয়াবাদী তত্ত্বের কিছু ত্রুটি থাকলেও আধুনিক সমাজতাত্ত্বিক চিন্তার বিকাশে তত্ত্বটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করতে সক্ষম হয়েছে। এ তত্ত্বের কল্যাণেই পারসন্স একজন কাঠামোগত ক্রিয়াবাদী সমাজতাত্ত্বিক হিসেবে সর্বাধিক পরিচিতি লাভ করেছেন।

নবীনতর পূর্বতন